ঢাকা     শনিবার   ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ১১ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

যেভাবে হারিয়ে গেল জনপ্রিয় স্কুটার বাজাজ চেতাক

মটো কর্নার ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৪০, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬  
যেভাবে হারিয়ে গেল জনপ্রিয় স্কুটার বাজাজ চেতাক

বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক কর্তাকে ভটভট আওয়াজ তুলতে তুলতে যে স্কুটারটি নিয়ে দেখা যেতো সেটি হচ্ছে বাজাজ চেতাক। নব্বইয়ের দশকে ভারত ও বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয় এই স্কুটারটি হঠাৎ করেই বাজার থেকে হাওয়া হয়ে গেলো। তবে বাজার থেকে হারিয়ে যাওয়ার আগে স্কুটারপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে গিয়েছিল বাজাজ চেতাক। একসময়ের ব্যাপক জনপ্রিয় এই স্কুটারটি কেন হারিয়ে গেল জানেন কি?

যাটের দশকে ভারত তার শিল্প পরিচয় গড়ে তুলতে শুরু করে। ওই সময় দেশটির মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এমন একটি নির্ভরযোগ্য পরিবহন চেয়েছিল যার জন্য উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ বা বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না। ১৯৭২ সালে মধ্যবিত্তের এই চাহিদার কথা মাথায় রেখে চেতাক স্কুটার বাজারে আনে বাজাজ। ইতালির ভেসপা স্প্রিন্ট মডেলটির অনুপ্রেরণা নিয়ে চেতাকের ডিজাইন করা হয়েছিল। আর মেওয়ারের মহারাজা প্রতাপ সিংয়ের ঘোড়ার নামানুসারে বাজাজ তাদের নতুন স্কুটারটির নাম রাখে চেতাক।

আরো পড়ুন:

স্কুটারটির দুর্দান্ত মাইলেজ, সহজ মেকানিক্স, মজবুত ধাতব বডি এবং পরিবারবান্ধব নকশার কারণে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৮০ এবং ১৯৯০ এর দশকের মধ্যে এটি একটি সাংস্কৃতিক পণ্যে পরিণত হয়েছিল। আশির দশকে ভারতীয় রাস্তায় বাবা বাজাজ চেতাক স্কুটার চালাচ্ছেন, মা পেছনে বসে আছেন, ছেলে মাঝখানে বসে আছে- এটি ছিল সাধারণ চিত্র। স্কুটারটির জনপ্রিয়তা এতোটাই তুঙ্গে ছিল যে, বাজাজকে নব্বইয়ের দশকে প্রতিদিন ৫০০ ইউনিট চেতাক উৎপাদন করতে হয়েছে।

চেতাকের এই উত্থান কিন্তু খুব বেশি দিন থাকেনি। হঠাৎ করেই এর পতন ঘটে। ভারতের বাজার থেকে হারিয়ে যায় বাজাজ চেতাক।

পতন কখন শুরু হয়েছিল?

পতনটি ১৯৯৭ সালের দিকে নীরবে শুরু হয়েছিল। ওই সময় চেতাকের বিক্রি কমতে শুরু করেছিল। ২০০৪ সালের মধ্যে বাজাজ অটোর মোট দ্বিচক্র যান আয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ ছিল স্কুটার, অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও বাজারে মোট দ্বিচক্র যান বিক্রির ৬০ শতাংশ মুনাফা আসতো চেতাক থেকে। ২০০৬ সালে বাজাজ আনুষ্ঠানিকভাবে চেতাকের উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। ২০০৬ সালে ক্ল্যাসিক চেতাকের শেষ ব্যাচ অ্যাসেম্বলি লাইন থেকে বেরিয়ে আসে, যা এর আইকনিক উৎপাদন যুগের সমাপ্তি নির্দেশ করে।

বাজাজ চেতকের পতন কেন হয়েছিল?

১. গ্রাহকদের পছন্দ পরিবর্তন: ১৯৯০-এর দশকে এক নতুন ধরণের ভারতীয় গ্রাহকের সূচনা হয় - যারা সুবিধা, স্টাইল এবং আধুনিকতা চেয়েছিলেন। শহর দখল করে নেওয়া হালকা, গিয়ারবিহীন মডেলের তুলনায় পুরনো ‘কিক টু স্টার্ট’ স্কুটারগুলো হঠাৎ ভারী এবং পুরানো মনে হয়েছিল। TVS Scooty কলেজগামী মেয়েদের জন্য তৈরি হয়েছিল — ছোট, রঙিন এবং পরিচালনা করা সহজ। Honda Activa এর সেলফ-স্টার্ট সিস্টেম এবং মসৃণ ডিজাইনের জন্য পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের কাছেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

২. জাপানি মোটরসাইকেলের উত্থান: একই সময়ে, জাপানি প্রযুক্তি মোটরসাইকেল বাজারকে পুরো ওলট-পালট করে দিয়েছিল। হিরো হোন্ডা এবং টিভিএস-সুজুকির মোটরসাইকেলগুলো ঝড়ের মতো এসেছিল — মসৃণ, শক্তিশালী এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ ছিল এবং নতুন প্রজন্মের গতি ও স্বাধীনতার অনুভূতির সাথে মিলে গিয়েছিল। ১৯৯৪ সালে লঞ্চ হওয়া হিরো হোন্ডা স্প্লেন্ডার দেশের সর্বাধিক বিক্রিত মোটরসাইকেল হয়ে ওঠে, এমনকি ১৯৯৯ সালে চেতককেও ছাড়িয়ে যায়।

৩. স্কুটার থেকে বাজাজের কৌশলগত প্রস্থান: ২০০৯ সালের শেষের দিকে বাজাজ অটোর নেতৃত্ব একটি কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ২০০৯ সালের শেষের দিকে একটি সাক্ষাৎকারে, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজীব বাজাজ ঘোষণা করেছিলেন: “আমরা স্কুটার সেগমেন্ট থেকে বেরিয়ে যাব এবং সম্পূর্ণরূপে মোটরসাইকেল ও পারফরম্যান্সের উপর মনোযোগ দেব।”

বিংশ শতাব্দিতে এসে পৃথিবীটা দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ভোক্তারা আরো উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠেছে, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রতিযোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। তবে স্কুটারপ্রেমীদের মনে যে দাগ কেটে গিয়েছিল চেতাক, তা আজও রয়ে গেছে। এখনো অনেক স্কুটারপ্রেমী সযতনে আগলে রেখেছেন বাজাজ চেতাক স্কুটারটিকে।

ঢাকা/শাহেদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়