ঢাকা, শনিবার, ২১ চৈত্র ১৪২৬, ০৪ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাত

সাহেদ মন্তাজ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৫ ১২:০২:১৫ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২৫ ৮:৫১:০৭ এএম

আজ ভয়াল ২৫ মার্চ। ইতিহাসে এ রাত চিহ্নিত হয়ে আছে পৃথিবীর বর্বর গণহত্যার স্মারক ‘কালোরাত’ হিসেবে। আজ থেকে ৪৯ বছর আগে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালিদের উপর অন্যায়ভাবে আচমকা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিচালনা করে। ভারি অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে  পৈশাচিক হত্যার উল্লাসে। পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহতম গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল বাংলাদেশে। ওই গণহত্যা আজও বিশ্ববিবেকের কাছে মানবতার লঙ্ঘন ও বর্বরতার এক ঘৃণ্যতম দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিণামে একটি জনযুদ্ধের আদলে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনা ঘটে। পঁচিশে মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ঢাকায় অজস্র সাধারণ বাঙালি নাগরিক, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশকে হত্যা করে।

এদিন বিকেল পৌনে ছয়টায় ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে জেনারেল ইয়াহিয়া সোজা এয়ারপোর্ট চলে যান। এর আগেই বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়ার মধ্যকার চলমান বৈঠক ব্যর্থ হয়ে যায়। পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট বিমানে করাচি পাড়ি জমান। শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ এড়িয়ে ইয়াহিয়া বাঙালি হত্যার নীল নকশা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে পালিয়ে যান। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের এ গণহত্যাযজ্ঞ পরিচালিত হয় ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহর এলাকায়।

সেদিন গ্রেফতার করা হয় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দল আওয়ামী লীগ প্রধান বাঙালির প্রিয় নেতা বাঙালির নয়নের মণি অবিসংবাদিত সিপাহসালার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। গ্রেপ্তারের পূর্বে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

২৫ মার্চ রাতে সমগ্র ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করা হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়েকটি সুসজ্জিত দল ঢাকার রাস্তায় নেমে পড়ে। পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী আক্রমণ শুরু করার আগেই দ্রুততার সঙ্গে ঢাকা শহরের সব যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

মুক্তিযুদ্ধপূর্ব বেশ কয়েকটি আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় পাকিস্তানিদের প্রধান টার্গেট ছিল এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিকড় উপড়ে ফেলা। তারই অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল ১৮ নং পাঞ্জাব, ২২নং বেলুচ, ৩২নং পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এবং কিছু সহযোগী ব্যাটেলিয়ন। এই বাহিনীগুলোর অস্ত্রসম্ভারের মাঝে ছিল ট্যাংক, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, রকেট নিক্ষেপক, ভারি মর্টার, হালকা মেশিনগান ইত্যাদি। এই সমস্ত অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে অগ্রসর হয়। রাতের অন্ধকারে  ৪১নং ইউনিট পূর্ব দিক থেকে, ১৮ নং ইউনিট দক্ষিণ দিক থেকে এবং ২৬নং ইউনিট উত্তর দিকে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘিরে ফেলে। অপারেশন সার্চলাইটের মোড়কে ২৫ মার্চের গণহত্যার প্রথম পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষককে হত্যা করা হয়।

অসহযোগ আন্দোলন মূলত গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের (জহরুল হক) ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন পরিষদ’কে কেন্দ্র করে। তাই পাকবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় এই হলটি। এক সূত্রে বলা হয়েছে, ওই রাতে জহুরুল হক হলের প্রায় ২০০ জন ছাত্রকে পাকবাহিনী গুলি করে হত্যা করে।

সেনাবাহিনী জগন্নাথ হলেও নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। রক্তের হোলিখেলায় মেতে ওঠে মানুষরূপী নরপিশাচরা। অসহায় নারী-পুরুষের মর্মান্তিক আর্তনাদ। চলে বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ আর ধ্বংসের উন্মত্ততা। প্রতিটি রুমে রুমে ঢুকে ঘুমন্ত ছাত্রদের গুলি করে হত্যা করে পাক জল্লাদরা। একে একে গুলি করে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে জগন্নাথ হলের ১০৩ ছাত্রকে। হলের কর্মচারীদের কোয়ার্টারে ঢুকে তাদের স্ত্রী-বাচ্চাসহ পুরো পরিবারকে একে একে নির্মমভাবে হত্যা করে। ওই রাতে মানুষরূপী হায়নারা শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বাবার সামনে মেয়েকে আর ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। কাউকে কাউকে তারা সেদিন বাঁচিয়ে রেখেছিল নিহতদের কবর খোঁড়ার কাজ করতে। মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে তাদের বাধ্য করে প্রিয়জনের কবর খুঁড়তে। তাদের দিয়েই একে একে সহপাঠীদের লাশ টেনে এনে মাটিচাপা দিয়েছিল পাক সেনারা। তারপরও ওদের শেষ রক্ষা হয়নি। কাজ শেষে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে তাদের।

রোকেয়া হলে জানোয়াররা দানবের মতো হিংস্র থাবায় তাণ্ডব চালায়। হিংস্র শ্বাপদ পাক বাহিনীর থাবা থেকে রক্ষা পেতে রোকেয়া হলের ছাদ থেকে প্রায় ৫০ ছাত্রী লাফিয়ে পড়েছিল। পাক জান্তার বর্বরতা থেকে রক্ষা পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য. ড. মনিরুজ্জামানসহ বিভিন্ন বিভাগের নয় শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। হানাদাররা চলার পথে রাস্তার দুই পাশে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে অসংখ্য নিরীহ পথচারী, পথবাসী, রিকশাচালক, ঘুমন্ত গরিব মানুষকে। ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি মেডিকেল কলেজ ও ছাত্রাবাসে গোলার পর গোলা ছুড়ে হত্যা করা হয় অসংখ্য মানুষকে। নরপশুরা সেদিন হত্যার পাশাপাশি ধর্ষণ, লুট, জ্বালাও-পোড়াও করেছিল শহরের সব জায়গায়।

২৫ মার্চের কালোরাতেই বাঙালিদের প্রথম প্রতিরোধ গড়ে ওঠে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। ওই রাতে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান পুলিশে ওয়্যারলেস অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন মো. শাহজাহান মিয়া। তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানান, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টা। আমরা শুনতে পেলাম পাকিস্তানি সেনারা ট্যাংক, মর্টার ও ভারি মেশিনগান নিয়ে এসেছে এবং আমাদের ঘিরে ফেলেছে। আমরা মাত্র ৩০৩ জন পুলিশ ছিলাম। সবার হাতে ছিল রাইফেল। আমাদের হাতে অস্ত্র বলতে কেবল ৩০৩ রাইফেল। পুলিশের সাহসী যোদ্ধাদের নিয়ে আমরা পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সামগ্রিক শক্তির মোকাবেলা করলাম। সম্মুখযুদ্ধে ওই রাতে পুলিশের প্রায় ১৫০ সদস্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন।’

১০ নং বাঙালি রেজিমেন্টকে সেনানিবাসে সহজেই নিরস্ত্র এবং পরে নিশ্চিহ্ন করে। ৩১নং ফিল্ড রেজিমেন্টকে ঢাকার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং শহরের উত্তরাংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২২নং বেলুচ রেজিমেন্ট ইপিআর সদর দফতরের বেশিরভাগ নিরস্ত্র এবং অসংগঠিত ইপিআর সৈন্যকে আক্রমণ করে। সারারাত যুদ্ধ করে অবশেষে পরাজিত ও পরাভূত করতে সক্ষম হয়। পাকিস্তানি বাহিনী কোনো বাধা ছাড়াই সহজে মিরপুরে অবস্থানরত ইপিআর বাহিনীকে গ্রেপ্তার এবং রাষ্ট্রপতি ভবন ও গভর্নর হাউস দখল করতে সক্ষম হয়। এসময় অনেকে পালাতে সক্ষম হয় এবং অনেকে মারা পড়েন। রাজারবাগে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় প্রতিরোধ গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন। যারা বেঁচে ছিলেন তাদের বেশির ভাগ ধরা পড়ে, কিছু সংখ্যক পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ভোর হওয়ার আগেই শহর পাক বাহিনীর দখলে চলে আসে।

মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চের রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সে রাতে প্রায় ৭০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেপ্তার করা হলো আরও প্রায় ৩০০০ জনকে। ঢাকায় ঘটনার শুরু হয়েছিল মাত্র । পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চলে হত্যাকাণ্ড। জ্বালাতে শুরু করল ঘরবাড়ি, দোকানপাট লুট আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হলো। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো। গোটা বাংলাদেশ হয়ে উঠল শকুনতাড়িত শ্মশান ভূমি।’

পাক সামরিক জান্তার এই অপারেশনের সুদূর প্রসারী লক্ষ্য ছিল। তারা চেয়েছিল প্রচণ্ড ভীতি তৈরি করতে, শক্তি প্রদর্শন করতে। এজন্য নেতৃস্থানীয়দের, শিক্ষিত যুবকদের, অংশত হিন্দুদের, জাতির বিবেকদের নিশ্চিহ্ন করতে উদ্যত হয়। এজন্য তারা আশ্রয় নেয় ধূর্ততা, ক্ষিপ্রতা ও নৃশংসতার।

পাকিস্তানিদের পরিকল্পিত গণহত্যার মুখে পূর্ব পাকিস্তানের সারাদেশে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। জীবন বাঁচাতে প্রায় ১ কোটি মানুষ পার্শ্ববর্তী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্য এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ দেশকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কব্জা থেকে মুক্ত করতে মাস দুয়েকের মধ্যে গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী। গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে মুক্তিবাহিনী সারাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে নয় মাসের সশস্ত্র রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানিদের পরাজিত করে বাঙালি অর্জন করে স্বাধীনতা, স্বাধীন বাংলাদেশ।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কবি ও গবেষক

 

ঢাকা/মারুফ