ঢাকা, সোমবার, ২২ আষাঢ় ১৪২৭, ০৬ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারে ইঁদুর দৌড় এবং রাজনীতি

মোস্তফা মোরশেদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৮ ৩:১৬:০০ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-২৪ ১:২৬:৩৬ পিএম

পরম স্থান ও কাল নিয়ে দার্শনিকগণের আগ্রহের মাত্রা অনেক। বিখ্যাত দুই দার্শনিক গটফ্রীড লেইবনিজ ও ইমানুয়েল কান্ট-এর সঙ্গে বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন যুক্ত হয়ে পরম স্থান, কাল ও সময় নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের সূচনা করেছিলেন। এরপর এ বিতর্কে যুক্ত হন বিজ্ঞানী আইনস্টাইন। স্থান ও কাল নিয়ে সে-সব বিতর্কের অবসান হয়নি বলে মানবজাতির তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার নিয়ে বিজ্ঞানী বা চিকিৎসকগণ যখন দার্শনিকের মতো বক্তব্য দিতে থাকেন তখন হতাশায় ডুবে যাওয়া ছাড়া আর কিইবা করা যেতে পারে। প্রকাশিত সব খবর আর সংবাদ যাই বলুন, সব ক্ষেত্রে এক আবশ্যিক বিস্ময়সূচক চিহ্ন (!) আমাদের জীবনকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সার্বক্ষণিক আতঙ্কে থাকা মানুষের জন্য প্রতিষেধক তৈরির খবরে আর কত প্রহর গুণতে হবে?

করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে যেখানে কোনো উপসংহারে আসা যায়নি সেখানে এর প্রতিষেধক নিয়ে খুব সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া সহসাই সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। জ্বর, সর্দি, কাশি, গলা ব্যথার সঙ্গে আরও অনেক লক্ষণ করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ ও নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের এমাইটি’র যৌথ গবেষণায় ৬৫ শতাংশই রোগীর স্বাদ-গন্ধ নেবার ক্ষমতা নষ্ট হবার বিষয়টি উঠে এসেছে। ব্রিটিশ রিনোলজিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ক্লেয়ার হপকিন্স বলছেন, জ্বর বা কাশির চেয়েও হঠাৎ স্বাদ-গন্ধের অনুভূতি চলে যাওয়া এ ভাইরাসের বিশ্বাসযোগ্য উপসর্গ হতে পারে। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, সর্দির কারণে নাক বন্ধ হলে এটা ঘটতেই পারে। এছাড়া কোনো লক্ষণ ছাড়াও অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির মতো বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরাও চরম অনিশ্চয়তার মাঝে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিষেধক না আসা পর্যন্ত অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে। কেউ কেউ প্লাজমা থেরাপি নিয়ে আশার আলো দেখছেন। আবার কেউ বলছেন, লকডাউন বা সামাজিক দূরত্বকে অগ্রাহ্য করে কমিউনিটির মাঝে ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করার মাধ্যমে এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রস্তুত করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ-এর পরিচালক অ্যান্থনি ফাউচি মনে করেন, লকডাউন বা একইরকম ব্যবস্থা নিয়ে এ মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। ফলে অর্থনীতি বাঁচানোর নামে বিধিনিষেধ তুলে দেবার পক্ষপাতী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার মতামতের অবস্থান সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে ভেষজ দ্রব্যাদি যেমন রসুন, তুলসি পাতা, দারুচিনি, গোল মরিচ, কিসমিস, আদা, কালোজিরা, মধু ইত্যাদির উপর নির্ভর করা কিংবা সারা শরীরে অ্যালকোহল অথবা ক্লোরিন স্প্রে করার বিষয়। বিশেষ করে, বিশ্বাসে চিড় ধরানো সামজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে মানুষ রীতিমত অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রসুন বা অন্যান্য ভেষজের প্রভাব সরাসরি অস্বীকার করেছে। ব্লিচিং, ক্লোরিন বা অ্যালকোহলে ভাইরাস মরে গেলেও একবার সংক্রমিত হয়ে গেলে আর কিছু করা যায় না বলেও সংস্থাটি মত দিয়েছে। উপরন্তু, আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি ত্বকে প্রতিফলিত করলেও করোনা থেকে মুক্ত হওয়া যাবে না বলেও উল্লেখ করেছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিষেধক আসার বিষয়ে আশাবাদী হলেও গত ১৪ মে হতাশা ব্যক্ত করে বলেছে- হয়তো এ ভাইরাসটি কখনোই নির্মূল করা যাবে না।

প্রতিষেধক আবিষ্কারের বিষয়ে দুটি প্রশ্ন খুবই প্রাসঙ্গিক। এক) একটি কার্যকর প্রতিষেধক আসতে কতদিন লাগতে পারে? দুই) এটি স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের জন্য কতটুকু সহজলভ্য হবে? এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের যোগসূত্র রয়েছে। প্রতিষেধক আলোচনায় অনেকগুলো নাম ইতোমধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে যার মধ্যে রেমডেসিভির, ইভারমেকটিন ও ডক্সিসাইক্লিন এর যুগপৎ ব্যবহার, চ্যাডক্স–এক, অ্যাভিগান উল্লেখযোগ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় জরুরি প্রয়োজনে বায়োফার্মাসিউটিকাল প্রতিষ্ঠান গিলিয়ার্ড সায়েন্স কোম্পানির অ্যান্টি-ভাইরাল ড্রাগ রেমডেসিভির ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে যা প্রথমে ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসকেএফ রেমডেসিভির উৎপাদনের সক্ষমতা দেখিয়েছে। পাঁচ কিংবা দশ দিন- এ দু’ধরনের মেয়াদে ওষুধটি প্রয়োগ করা যাবে বলে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পাঁচ দিন হলে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও চীন এ ওষুধের কার্যকারিতা প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনের বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, ন্যানোমেটেরিয়াল নামের ওষুধটিই করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর। এরই মাঝে জাপান করোনাভাইরাসের ওষুধ হিসেবে আভিগান-এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করেছে। বলা হচ্ছে, ক্লিনিকাল পরীক্ষায়ও এর সাফল্য রয়েছে। দেশটির ফুজি ফিল্মের সহযোগী প্রতিষ্ঠান টোয়ামা-এর রাসায়নিক শাখা ‘আভিগান’ ওষুধটি উৎপাদন করে থাকে। বাংলাদেশে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও বিকন ফার্মা আভিগান গ্রুপের ফ্যাভিপিরাভি নামক ওষুধ তৈরি করেছে।

দেখা যাচ্ছে, বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসকগণ একরকম অসহায় অবস্থায় জুয়া খেলেই যাচ্ছেন। ব্রিটিশ-মার্কিন একটি সিগারেট সংস্থার গবেষকদের একদল তামাক পাতার প্রোটিন থেকে করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য প্রতিষেধক তৈরির দাবিও উত্থাপন করেছেন। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃক কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের ওপর খোসপাঁচড়া রোগে ব্যবহৃত ইভারমেকটিন ও ডক্সিসাইক্লিন প্রয়োগের সাফল্যের খবর খুবই গুরুত্বের সাথে প্রকাশ পেয়েছে। যদিও কোভিড-১৯ এর প্রতিষেধক হিসেবে বাংলাদেশের বাজারে অত্যন্ত সহজলভ্য এ দুটি ওষুধের প্রভাব কোনো গবেষণালব্ধ ফলাফল নয়। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা দল এরকম একটি দাবি বেশ আগেই উত্থাপন করেছিলেন।

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক মানব শরীরে করোনার ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করেন। ইবোলার প্রতিষেধক তৈরিতে অবদান রাখা চিকিৎসক সারা গিলবার্ট ভ্যাকসিনটির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং সেপ্টেম্বর থেকে করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক ‘চ্যাডক্স-১’ পাওয়া যাবে বলে জানান। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ছোট আকারের একটি বায়োফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা সোরেন্টো থেরাপিউটিক্স ইনকরপোরেশনও কোভিড-১৯ এর অ‌্যান্টিবডির খোঁজ পাওয়ার দাবি করে। এর পরপরই এর শেয়ারের বাজার মূল‌্য প্রায় ২৫০ শতাংশ বেড়ে যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রতিষেধক আবিষ্কারে বিশ্বব্যাপী দীর্ঘসূত্রীতা। এর নেপথ্যে দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত প্রতিষেধক আবিষ্কার খুব সহজ কাজ নয়। কারণ, বলা হচ্ছে করোনাভাইরাস প্রতিনিয়তই ‘জিন’ পরিবর্তন করছে। গবেষকরা বলছেন, এ পরিবর্তনের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। বারবার নিজেকে বদলানোর ফলে ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরি করা জটিল হয়ে পড়েছে। সাধারণত কোনো টিকা তৈরি করতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লেগে যায়। কারণ মানুষের ওপর নিরাপত্তা বিবেচনা ও প্রতিষেধকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’ আবশ্যক। ডব্লিওএইচও-এর মুখপাত্র র‍্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল (যা আরসিটি নামে পরিচিত) এর মাধ্যমে করোনাভাইরাসের প্রতিষেধকের কার্যক্ষমতা ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। সর্বোপরি, এর সঙ্গে রয়েছে উৎপাদন প্রক্রিয়া ও ওষুধ বাজারজাতকরণের অনুমতি। তবে এর মাঝে জিন-নকশা উন্মোচনে বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অণুজীববিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা এবং তাঁর বাবা অধ্যাপক সমীর সাহার অবদান বেশ জোরালোভাবে উঠে এসেছে। ফলে করোনাভাইরাস  সংক্রমণের কৌশল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে বলে সবাই আশা প্রকাশ করছেন।

দ্বিতীয়ত প্রতিষেধক আবিষ্কার বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সঠিক নির্দেশনা দেবার কোনো অথোরিটি নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, চীন, অস্ট্রেলিয়া সবাই যার যার মতো প্রতিষেধক আবিষ্কার নিয়ে কার্যত এক অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছেন। কিন্তু বৈশ্বিক এ মহামারিতে নৈতিকভাবে বিশ্বের সকল বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকগণের তথ্য ও মেধার একটি সম্মিলিত প্রয়াস নেবার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, কোনো সমন্বিত উদ্যোগ দেখা যায়নি বরং বিভিন্ন দেশ যে যার মতো এগিয়ে যেতে চাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রতিষেধক গবেষণায় ৮০০ কোটি ডলার অনুদানের ঘোষণা দিলেও এ প্রচেষ্টা থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন।

ডব্লিউএইচও নিজেই বিপরীতধর্মী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক একমাত্র অথোরিটি যেন নিজেই দ্বিধাগ্রস্ত। মৃতের দাফন নাকি সৎকার, প্রতিষেধক পাওয়া যাবে নাকি যাবে না, ইত্যাদি নানাবিধ বিষয়ে এখনও কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা তারা দিতে পারেনি। সম্প্রতি তারা কোভিড-১৯ ভাইরাসের জীবাণু দূর করতে রাস্তা বা মার্কেটে জীবাণুনাশক না ছিটানোর পরামর্শ দিয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে ময়লা আবর্জনার মধ্যে জীবাণুনাশক অকার্যকর। আর জীবাণুনাশক স্প্রে করার ফলে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়তে পারে। সংস্থাটি আরও বলছে, থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে শরীরের তাপমাত্রা মাপা গেলেও তা আসলে করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগী শনাক্তকরণে অকার্যকর। আসলে ভাইরাস প্রকৃতির এক ভয়ঙ্কর অপ্রকাশিত শক্তি যা মানবজাতিকে বারবার পরীক্ষা নিয়েছে। ভাইরাস জীব না জড়, সে বিতর্কের এখনও অবসান হয়নি! সার্স ও মার্স নামে পরিচিত দুটি ভিন্ন ধরনের করোনাভাইরাসের কার্যকর টিকা উদ্ভাবন করা হয়েছে কিনা সেটিও অমীমাংসিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বব্যাপী ছোট-বড় প্রায় ৩০টি কোম্পানি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে। ধরে নেই, একটি কার্যকর প্রতিষেধক পাওয়া গেল। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগবে, এটি সবার জন্য কতটা সহজলভ্য হবে। অন্যান্য প্রায় সকল দ্রব্য ও সেবার মতো বিশ্ববাজারের সবকিছুই গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়। তেলের বাজার হোক আর কৃষিপণ্যের বাজার হোক- উৎপাদন, বিপণনসহ সবকিছুই আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট দ্বারা পরিচালিত। ওষুধের বাজারও এর ব্যতিক্রম নয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই ওষুধের দাম কত হবে সেটির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কোনো উদ্যোগ বা সুযোগ নেই বরং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ে কোম্পানিগুলো ইচ্ছামতো দাম ঠিক করে নেয়। বৈশ্বিক ভ্যাকসিন বা টিকা শিল্পে এর প্রভাব অনেক। কারণ এখানে প্রতি ডলার বিনিয়োগে ৫০ ডলার পর্যন্ত লাভ হতে পারে। মোট রাজস্ব আয়ের ভিত্তিতে ওষুধ শিল্পের তালিকায় বড় নামগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্রের পিফাইজার (Pfizer, নিউইয়র্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান যার মোট আয় প্রায় ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), জনসন অ্যান্ড জনসন, মার্ক এন্ড কোঃ (Merck & Co.), আভভ্যি (AbbVie), সুইজারল্যান্ডের নোভারটিস (Novartis) ও রচ্যে (Roche), যুক্তরাজ্যের গ্লাক্সোস্মিথক্লাইন (GlaxoSmithKline) ও এস্ট্রাজেনেকা (AstraZeneca) এবং ফ্রান্সের স্যানোফি (Sanofi)। এরা শুধু ওষুধ নয় বরং প্রায় সকল ধরনের  ভ্যাকসিনের বাজারও নিয়ন্ত্রণ করে। পরিসংখ্যান বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মোট ওষুধ শিল্পের মূল্য ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যা সময়ের সঙ্গে বাড়ছে। সে তুলনায় এ শিল্পের গবেষণা খাতে মোট বিনিয়োগ মাত্র ২০০ বিলিয়নের কাছাকাছি যা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলেই বিশেষজ্ঞগণ মত দিয়ে থাকেন। কারণ সারাবিশ্বে স্বাস্থ্য খাতের প্রবৃদ্ধি কোনভাবেই ৭ শতাংশের কম নয়। হিসাব বলছে, ২০২১ সাল নাগাদ গবেষণা খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ হবে ১২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো যার প্রায় সবটুকুই উচ্চ আয়ের দেশে খরচ হয়ে থাকে। এ বিবেচনায় করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক উদ্ভাবনের দায়িত্ব এ সকল বড় অর্থনীতির দেশকেই নিতে হবে। মানুষের জীবনযাত্রায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যখাতে প্রতিবছরই অনেক টাকা বিনিয়োগ হয় ও রিটার্ন আসে। তবে তা মোটেও যথেষ্ট নয়। ওষুধের বাজার বিবেচনা করলে দেখা যায় ভাইরাসজনিত রোগের ওষুধের অনেক চাহিদা রয়েছে (২০১৯ সালের হিসাবে পাই ডায়াগ্রামটি দেখা যেতে পারে)। এ কারণেই ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী টিকা বিক্রি হয়েছিল পাঁচ হাজার চারশো কোটি ডলার যা ২০১৪ সালের দ্বিগুণ।

মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও মাথাপিছু আয় বেড়ে যাবার ফলে ওষুধের দাম ক্রমেই বাড়ছে। তাই করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক যদি চলেও আসে সেটি কীভাবে পৃথিবীর সব আয়ের মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যাবে সেটি হবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি বিপণন ব্যবস্থা নিয়েও ভাবতে হবে কারণ স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা নেই। ফলে সেসব দেশে ভর্তুকি দিয়ে হলেও এ প্রতিষেধক পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রসঙ্গ হচ্ছে, এ দায়িত্ব কে নিবে? একটি প্রত্যাশিত দাম নির্ধারণ ও সহজলভ্য বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সকল রাষ্ট্রকে এক হয়ে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আগামীতে করোনাভাইরাসের সহজলভ্যতার সাথে বৈশ্বিক ও আভ্যন্তরীণ অনেক বিষয় জড়িত। আমাদের দেশেও শীর্ষ ১০ ওষুধ কোম্পানির হাতে রয়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ বাজার। ফলে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব অনেক বেশি হবে। কিন্তু কোম্পানিগুলোর লাভের হিসাব করলে দেখা যায় এসব ভাইরাসজনিত রোগের জন্য দীর্ঘ বিনিয়োগ করতে হয় যা অধিকাংশ কোম্পানি করতে চায় না। তার চেয়ে নিয়মিত ও বহুল বিক্রিত ওষুধে বিনিয়োগের লাভ অনেক বেশি। একটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করি। আমাদের বাজারে সর্বাধিক বিক্রিত ১০টি ওষুধ হলো— সেকলো, সার্জেল, ম্যাক্সপ্রো, প্যানটোনিক্স, সেফ-৩, মিক্সটার্ড ৩০, লোসেকটিল, নাপা এক্সট্রা, নাপা ও ফিনিক্স। এখানে দেখা যাচ্ছে গ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ওষুধের আধিক্য রয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে আমাদের জীবনযাপন এবং খাবার গ্রহণের বিরূপ প্রভাব। ওষুধ শিল্পের গড় প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশ হলেও গ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ওষুধের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২২ শতাংশ। রাজস্ব বিবেচনায় ওষুধের বাজার অনেক বড় হলেও পূঁজিবাজারে এদের অংশগ্রহণ একেবারেই নগণ্য। মূলধন সংগ্রহের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত ব্যাংক ও বৈদেশিক ঋণের উপর নির্ভর করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। পূঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে এদের জবাবদিহিতাও কম।

আরেকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় নিতে হবে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হতে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশে প্রাথমিকভাবে উন্নতি লাভ করেছে। উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ২০২৪ সালে চূড়ান্তভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হবে। তবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রাপ্ত সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ২০২৭ সাল পর্যন্ত ভোগ করা যাবে। করোনাভাইরাসের প্রকোপ যদি এর পরও চলতে থাকে তবে এর দাম নিয়ে ভাবার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। কারণ তখন উৎপাদনে যেতে হলে মেধাসত্ত্ব পরিশোধ করতে হবে।

পরিশেষে এভাবে বলতে চাই, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে গিয়ে করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক অবিষ্কার এবং এর সহজলভ্যতার বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছাতে হবে যাতে মানুষকে বাঁচানো যায়। মানুষই যদি না বাঁচে তবে এ প্রতিষেধক কে কিনবে?

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক

 

ঢাকা/তারা