RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৬ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ১২ ১৪২৭ ||  ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

মাস্কে চাপা থাকুক মোনালিসার হাসি

শেখ আনোয়ার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩০, ২০ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৩:৪০, ২০ নভেম্বর ২০২০
মাস্কে চাপা থাকুক মোনালিসার হাসি

মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত প্রাণঘাতী জীবাণু এখন করোনাভাইরাস। সভ্যতার ইতিহাসে এমন উদাহরণ খুব কমই রয়েছে যেখানে একটা রোগ এতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে! সাতটি মহাদেশে জনসংখ্যার বড় একটি অংশ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। অথচ ওষুধ নেই! দিন যত যাচ্ছে সংক্রমণের হার বাড়ছে, বাড়ছে মৃতের সংখ্যা।

ইতোমধ্যে বিশ্বে করোনাভাইরাসে সংক্রমিতের সংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। মৃতের সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। বিশ্বে প্রতি ১০ জনে একজন এরই মধ্যে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে। দুই কোটি মানুষ এর মধ্যে সেরেও উঠেছেন। মৃত্যুর হার ৫ শতাংশের কাছাকাছি। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বিশ্বে বাংলাদেশে শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৭৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। বাংলাদেশ শনাক্তের দিক থেকে পঞ্চদশ স্থানে এবং মৃতের সংখ্যায় রয়েছে ২৯তম স্থানে।

পরিসংখ্যানে যদিও অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সুস্থতার হার বেশি তবুও বিপুল জনঘনত্বের দেশে মানুষ একবার রাস্তায় বের হলে শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা কঠিন। সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তাই রয়েই যায়। সরকারিভাবে সতর্ক করে বলা হচ্ছে- ঘরের বাইরে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? বাঙালি মাস্ক পরতে চায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বারবার বলছে ‘মাস্ক পরলে জীবাণুর ড্রপলেট থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।’ বিজ্ঞানীরাও দাবি করছেন- করোনা বাতাসের মাধ্যমেও ছড়ায়। তাই মাস্ক ব্যবহার জরুরি। কিন্তু তাতে কেউ কর্নপাত করছেন বলে মনে হয় না।

যেহেতু অফিস-আদালত, কল-কারখানা খুলে গেছে, তাই জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে। এর অর্থ এই নয় যে, করোনার প্রকোপ চলে গেছে। তবে মানুষের মন থেকে ভয় চলে গেছে। করোনা নিয়ে মানুষ এখন আর আগের মতো উদ্বিগ্ন নয়। বাংলাদেশে করোনার দাপাদাপির মধ্যে বর্তমান সমাজ ছবিটা ভয়াবহ। বাজারে গেলে বোঝা যায় করোনা বলতে কিছু নেই। বহু মানুষ মাস্ক ছাড়াই দিব্যি কেনাবেচা করছেন। ক’দিন আগে অল্প একটু ভয় ছিল। মুখে মাস্ক থাকলেও তা নামিয়ে রাখা হতো থুতনির নিচে। কারও মাস্ক পকেটে। কারো মাস্ক দেখা যেত এক পাশ থেকে খোলা। কান থেকে ঝুলছে। আর এখন? থুতনি বা গলায় ঝোলা তো দূরের কথা, মুখ থেকে মাস্ক হাওয়া। এমনিতেই বাংলাদেশের মানুষ অজুহাত দিতে জানে। তাদের যুক্তির শেষ নেই। মনে নেই, মাস্কে অস্বস্তি লাগে, মাস্ক পরলে চশমা ঘোলা হয়ে যায়, দেখতে অসুবিধা, মুখ ঢাকা থাকে ইত্যাদি বাহানা রয়েছে। মাস্ক নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপও চলে। ব্রিটেনের ‘দ্য ডেইলি মেইল’ পত্রিকায় কলামিস্ট পিটার হিচেন্স লিখেছেন: ‘মুখে ঢাকনা দেওয়াটা আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের চিহ্ন। এর মাধ্যমে পৃথিবীর মুক্ত দেশের মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। মাস্ক পরার অর্থই হচ্ছে আপনি এই সামাজিক পরিবর্তনকে মেনে নিচ্ছেন।’ আবার অনেকে প্রশ্ন করেন, করোনার শুরু থেকে তো মাস্ক পরার ব্যাপারে অধিকাংশ দেশ তেমন কড়াকড়ি আরোপ করেনি। এমনকি মার্কিন মুলুকে বহু লোক প্রকাশ্যে মাস্ক পরতে চান না। এর উত্তরও সহজ। যেসব দেশ মাস্ক পরতে অবহেলা করেছে, সেসব দেশে মৃত্যুহার বেশি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও মাস্ক নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন। দীর্ঘদিন প্রকাশ্য জনসভায় মাস্ক পরেননি। মাস্ক-বিমুখ ট্রাম্প নিজেই যখন করোনা পজিটিভ হলেন তখন তিনি ঠিকই মাস্ক পরলেন।

এবার চীনের কথায় ফেরা যাক। প্রায় ১৬০ কোটি মানুষের দেশে মোট সংক্রমিত প্রায় ৮৬ হাজার। মৃত্যু হয়েছে ৪,৬৩৪ জনের। মৃত্যুর হার ০.০০৬ শতাংশ! অর্থাৎ প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যায় মাত্র ৬ জন কোভিড পজিটিভ! অথচ এই দেশ থেকেই নাকি করোনা ছড়িয়েছে। তাহলে তারা কীভাবে এই মহামারি নিয়ন্ত্রণ করলো? চীনে এখনও ৮০ শতাংশ মানুষ মাস্ক এঁটে তবেই ঘরের বাইরে বের হন। চীনের সর্বত্র, এমনকি আনাচে-কানাচেও মানুষের শৃঙ্খলাবোধ, আত্মসংযত মনোভাব, অনুশাসন দৃষ্টান্তমূলক। পুলিশের ডান্ডা, প্যাদানি, খোঁচানি দিয়ে এমনটা শেখানো যায় না। ওদিকে ফেস মাস্ক পরার নিরিখে এগিয়ে থাকা প্রথম পাঁচ দেশের মধ্যে একমাত্র স্পেনে শুরু হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বা সেকেন্ড ওয়েভ। মোট জনসংখ্যার ৯২ শতাংশ সিঙ্গাপুরবাসী নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করেছেন। ফার্স্ট তারাই। স্পেনে ৯০, থাইল্যান্ড ৮৮, হংকং ৮৬, জাপান ৮৬ শতাংশ। অথচ উল্লিখিত সময়ে বাংলাদেশের মানুষ নাকি ৮২ শতাংশ সর্বক্ষণ মাস্ক পরে থেকেছেন! যা বর্তমান বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলাতে কষ্ট হয়।

মাস্ক করোনাভাইরাস ছড়ানো আদৌ কি রুখতে পারে? গবেষকরা জোর গলায় বলেন, হ্যাঁ পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পারে। তবে সঙ্গে চাই বাকি কোভিড প্রোটোকল মেনে চলা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, তিনটে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ যা বিশ্ববাসীকে মেনে চলতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হলো মাস্ক পরা। অন্য দু’টো হলো- সামাজিক, শারীরিক দূরত্ব এবং নিয়মিত হাত ধোয়া নয়তো যথার্থ স্যানিটাইজারের ব্যবহার।’ ল্যানসেটের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় প্রকাশ: ‘মাস্ক পরা, চোখকে সুরক্ষা দেওয়া ও ঠিকভাবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারলে করোনা সংক্রমণ হ্রাস পেতে পারে।’ এছাড়া গবেষকরা জানাচ্ছেন, কয়েক মুহূর্ত থেকে কয়েক ঘণ্টা সময় পর্যন্ত বাতাসে ভেসে থাকতে পারে করোনাভাইরাস। এই ভাইরাস পেরুতে পারে দু’মিটারেরও বেশি দূরত্ব। ফলে বদ্ধ স্থান থেকেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি জোরে শ্বাস নিলেও বাতাসে ড্রপলেট ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে দাবি করেছেন গবেষকরা। বিশেষ করে গান গাইবার সময় কিংবা ব্যায়াম করার মুহূর্তে শ্বাসের গতি বেড়ে যায়। সে সময় সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে।

মাস্ক পরা কেন জরুরি তার আরেকটি কারণ হচ্ছে- নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাইরাস কোনো ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করলে ঐ ব্যক্তি সংক্রমিত হন। তার আগে নয়। মাস্ক পরা অবস্থায় সুস্থ ব্যক্তি করোনা সংক্রমিতের কাছে গেলেও সুস্থ ব্যক্তির শরীরে যে পরিমাণ ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঐ ব্যক্তিকে কাবু করার ক্ষমতা রাখে না। বরং মাস্কের মধ্য দিয়ে সামান্যতম ভাইরাস প্রবেশের ফলে দেহে রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরি হয়। এটি পরবর্তী সময়ে প্রায় ভ্যাক্সিনের মতো কাজ করে বলে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অভিমত। ভাইরাস ঠেকাতে মাস্ক তাই অন্যতম এক পরিধানের অনুষঙ্গ। এখন এটাও জানা, উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগে থেকেই সংক্রমিত ব্যক্তি ভাইরাস ছড়াতে পারেন। তাই মাস্ক পরা থাকলে আপনি কাউকে সহজে সংক্রমিত করতে পারবেন না। তিনিও আপনার শরীরে সংক্রমণ ছড়াতে ব্যর্থ হবেন।

এদিকে বেশ কিছুদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা সাবধানবাণী উচ্চারণ করে আসছেন। আবহাওয়া একটু ঠান্ডা হলেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আরও বেশি হবে। যদি তাই হয়, তাহলে শীতকালে আমাদের দেশেও ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাবে। এ থেকে নিরাপদ থাকার উপায় বের করা এখনই জরুরি। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিরা করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ সম্পর্কে জনসাধারণকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ প্রদানের পাশাপাশি করণীয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। গবেষকদের মতে, বর্তমানে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার তিনটি উপায় রয়েছে। প্রথম উপায় আক্ষরিক অর্থেই গণপ্রতিরোধ। আলাদাভাবে নয়। সবাই মিলে এক সঙ্গে মাস্ক পরে, স্পর্শ বাঁচিয়ে, ভাইরাসের এক শরীর থেকে অন্য শরীরে গমন রুখে দেওয়া। ইন্দোনেশিয়া ছাড়া চীন, জাপান, মঙ্গোলিয়াসহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অধিবাসীরা দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে মাস্ক পরে শারীরিক দূরত্ব মেনে চলতে হয়। আর তাতেই ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ হাসিল। এ সম্বন্ধে উদাসীনতা যেমন গণশিক্ষার অভাব, তেমনি দুর্বল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিচয় প্রকাশ করে।

বাংলাদেশ এ মুহূর্তে করোনার প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠে ধীরে ধীরে ছন্দে ফেরার চেষ্টা করছে। যতদিন না ভ্যাকসিন আসছে ততদিন মাস্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কারণে দূরত্ব হয়তো সবসময় মানা সম্ভব হয় না। তবুও মুখোমুখি হলে মাস্কই বাঁচাবে। মাস্ক পরার অর্থ নিজেকে বাঁচানো এবং রোগ না ছড়ানো। বাঁচার একমাত্র উপায় চোখ, নাক, মুখ ঢেকে রাখা। কিন্তু মাস্ক আর কত দিন? বিশেষজ্ঞের মতে, আগামী বাংলা নববর্ষ পর্যন্ত মাস্ক আমাদের সারাক্ষণের সঙ্গী হয়ে থাকবে বলেই মনে হচ্ছে।

লেখক: বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়