Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||  আশ্বিন ৭ ১৪২৮ ||  ১৩ সফর ১৪৪৩

আঙুলে বন্দি যে জীবন

মোস্তফা মোরশেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:০০, ৩১ জুলাই ২০২১  
আঙুলে বন্দি যে জীবন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ এক অপরিহার্য বিষয়। আহার ও বিশ্রামের মতো দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য জরুরি বিষয়গুলোর সঙ্গে ইন্টারনেটকেন্দ্রিক সামাজিক যোগাযোগের এক অবিচ্ছেদ্য বলয় তৈরি হয়েছে। ফেইসবুক, মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, লিংকডইন-এর মতো আরও অনেক মাধ্যমে আমরা আসক্ত হয়ে পড়েছি। করোনাভাইরাসের এই বৈশ্বিক অতিমারিতে তা আরো যৌক্তিকভাবে বেড়েছে। অনেক বেশি প্রবেশাধিকার থাকায় শুধু ফেইসবুকের উদাহরণ এখানে বিবেচনা করা যেতে পারে। পোল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নেপোলিয়নক্যাট-এর এক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৭৫ হাজার যা মোট জনসংখ্যার ২২.৩ শতাংশ। ২০২১ সালের একই সময়ে তা বেড়ে ২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

মোট জনসংখ্যার বিপরীতে এ সংখ্যা অনেক কম হলেও হাল আমলে ফেইসবুক ব্যবহারকারীগণ একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে ফেলেছেন। প্রচারের কোনো কিছু থাকলেই তা বাধ্যতামূলকভাবে ফেইসবুকে দৃশ্যমান হচ্ছে। সামাজিক অনেক বিষয় উঠে আসছে যা অনেক ক্ষেত্রে সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগছে। যদিও আপনি ফেইসবুকে ঢুকে নিশ্চিতভাবে মনে করবেন যে এ এক সত্যিকারের স্বর্গ। যাপিত জীবনের ফেইসবুক অংশে আমরা সবাই ‘স্বর্গের ফেরেশতা’। সৌন্দর্যের জায়গায় মেয়েরা একেকজন সাক্ষাৎ পরী বা রঙিন রূপবান আর ছেলেরা সবাই সুদর্শন পুরুষ বা সিনেমার নায়ক। সবাই প্রিয়ংবদা হিসেবেই স্বীকৃতি পেতে চাই আর তার জন্য যা করার সব করছি। নিজেকে সবচেয়ে ভালো ও সুন্দর হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে ‘নার্সিজম’ এর যে ধারা বহমান তা অদূর ভবিষ্যতে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে বলেই ধারণা করছি।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ, নাস্তা করা, অফিসে যাওয়া কিংবা ঘরে কাজ শুরু করা, গোছল করা, বারান্দায় দাঁড়ানো, হাঁচি দেয়া, রাতে ঘুমাতে যাবার আগে ওয়াশরুমে যাওয়া থেকে শুরু করে সারাদিন যে ফটোসেশন চলছে তা থেকে পরিত্রাণ পাবার কোনো উপায় নাই। একজন অপরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে নিজেকে ও তালিকায় থাকা বন্ধুদের অবলীলায় খাটো করছি। ত্রাণ বা কোরবানির গোশত বিতরণের যে ছবি আপলোড করা হয় তা কেবল নিজেকেই ছোট করে তা নয় বরং আমাদের সামাজিক দৈন্যেরও বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সবচেয়ে কষ্টকর হচ্ছে যখন কেউ বিপদে পড়ছেন তখন আমরা ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। সময়ের পরিক্রমায় আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মূলধন এতই কমে যাচ্ছে যে আমরা কেউ কারও বিপদে এগিয়ে আসছি না। এ রকম চলতে থাকলে আমাদের সামাজিক মূলধন কখনই উন্নয়নের অংশীদার হতে পারবে না। 

এ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা নিয়মিত নিজেদের উপস্থাপন করছেন তাদের মাঝে তিনটি দল খুব ভয়ঙ্করভাবে উঠে আসছে। এর একাংশ ধর্মীয় প্রচারে এতটাই মগ্ন যে পোস্ট দেখলে মনে হতে পারে তাদের সংস্পর্শে মৃত্যু পরবর্তী জীবনে মুক্তি নিশ্চিত। অপরদলের ডাক্তারি বিদ্যার বাহাদুরি যারা দীর্ঘ শ্রম দিয়ে মেডিক্যাল পাশ করেছেন তাদেরকেও হার মানায়। কীভাবে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলা যাবে কিংবা কী খেলে তাৎক্ষণিক হৃদরোগ ভালো হয়ে যাবে সে সব বিষয়ে তারা নিয়মিত নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। করোনাভাইরাসের দুর্যোগেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কী খেলে বা পান করলে এ ভাইরাস থেকে মুক্ত হওয়া যাবে তা নিয়ে ডব্লিউএইচও-এর মতো যা খুশি বলে যাচ্ছেন। বলতে দ্বিধা নাই, স্বাস্থ্যখাতে বৈশ্বিক গবেষণার যে দুর্বলতা তা তারা কার্যত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন। 

তৃতীয় দলটি আরও ভয়ঙ্কর। জীবনের নিগুর বাস্তবতা ও সত্যের পরাকাষ্ঠাকে প্রতিনিয়ত উপস্থাপনের মাধ্যমে তারা একেকজন হয়ে উঠছেন প্রথিতযশা দার্শনিক; যদিও নিজের জীবনে এর প্রতিফলন নাই। আমার শুধু মনে হয়, এ আমলে সক্রেতিস থাকলে কীভাবে নিজেকে এ সব দার্শনিক বক্তব্য আর উক্তির কাছে সমর্পণ করতেন!
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হচ্ছে, তথ্যের উৎস হিসেবে এ সকল মাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নাই। যে যে রকম করে ইচ্ছা তথ্য ও সংবাদ পরিবেশন করছেন যেখানে মিথ্যা সংবাদ সত্যের চেয়ে বেশি গতিতে ছুটে চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটির এক গবেষণা বলছে, সামাজিক এসব মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য সত্যের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি প্রচার পাচ্ছে। আখেরে কোন তথ্য টিকবে সেটি ভিন্ন বিষয় কিন্তু প্রচারিত এসব মিথ্যা তথ্য সাময়িকভাবে অনেক জীবন ও সম্পদের ক্ষতি সাধন করছে। 

এর মাঝে ফেইসবুকে আমরা কেউ কেউ প্রোফাইল লক করে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠাচ্ছি যেখানে ছবিতে আমি নাই; আছে আফ্রিকান জাতের কোনো গরু কিংবা আইরিশ জাতের কোনো ছাগলের ছবি। প্রোফাইলে যে নাম ব্যবহার করা আছে সেটিও আমার নয়। আজব আজব নাম (যেমন, ঢিল মারি তোর টিনের চালে, তার ছেড়া, কাম আছে কাজ নাই, আবেগের কাছে বিবেক, গোঁফওয়ালা এক নারী, খাইয়াই দৌড়াও, মেঘবালিকার ভাতার, ইত্যাদি) দিয়ে বিভিন্ন গ্রুপ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল তৈরি হচ্ছে যা বিভ্রান্তিকর। সুতরাং, যাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি তার বোঝার কোনো উপায় নেই যে আমি কে? অবশ্য বোঝা না বোঝার মধ্যে যে পার্থক্য তা আমাদের ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্রীয় জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে না। তবুও এ সকল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের কাছে এক আরাধ্য হয়ে উঠেছে। পাত্র- পাত্রী বাছাই করতে গিয়ে তাদের যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে এ সব মাধ্যম জায়গা করে নিয়েছে। যোগ্যতা হিসেবে এরকম শুনলে অবাক হবার কিছু নেই যে কোনো পাত্র বা পাত্রী ৪৬টি গ্রুপের অ্যাডমিন, ৭২টির মডারেটর কিংবা তার নিজের মানে ৮টি আইডি বিদ্যমান।

এ সকল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা কতটা আনন্দ পাচ্ছি সেটি নিয়ে জরিপ হতে পারে। তবে তা আমাদের সময় কেড়ে নিয়েছে অনেক। রাতে দেরি করে ঘুমাচ্ছি, আবার সকাল সকাল উঠে নেট সার্ফিং করে দেখছি গতকালের পোস্টের কী আপডেট। মাসব্যাপী যে মোবাইল ডেটা বা ওয়াইফাই ব্যবহার হচ্ছে তার কল্যাণে মেসেঞ্জার, হোয়াটস অ্যাপ, ইমো বা ভাইবারে অপ্রয়োজনীয় কথা বলছি। যদিও আমাদের ইন্টারনেটের খরচ অনেক তবুও আমরা ছেড়ে দেবার পাত্র নই। সব মিলিয়ে এক বন্ধ্যাত্ব ও নিরর্থক সময় পার করছি; হয়ে উঠছি আপাদমস্তক এক শারীরিক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মানুষ।

একের অধিক সিম ব্যবহার করার কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। এর মাঝে মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটির মতো। মুঠোফোন অপারেটরদের বৈশ্বিক সংগঠন জিএসএমএ-এর প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০২০ সালে নতুন স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৭ নম্বরে রয়েছে। যদিও ইন্টারনেটের মূল্য পরিশোধে আমরা অনেক বেশিই খরচ করছি তবুও আমাদের ব্যক্তিজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য সংস্করণ হলো হাল আমলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্য্যম। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাবল’ এর হিসাবে, বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারে সবচেয়ে কম খরচ ভারতে  (প্রতি জিবি ইন্টারনেট ০.০৯ মার্কিন ডলার) যেখানে বাংলাদেশে প্রতি জিবি ইন্টারনেটের পেছনে গড় খরচ ০.৭০ মার্কিন ডলার।

ফেইসবুক হোক আর অন্য যে কোনো মাধ্যম হোক এগুলো আসলে একটি ট্রেন্ড। সবাই যা করছে আমাকেও তাই করতে হবে। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তার ১০০ বছর পূর্তিতে নতুন প্রোফাইল বানাতে হবে। ১০০ বছর হওয়ায় ধরে নিলাম এখানে দোষের কিছু নেই; কিন্তু যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের বয়স ৬২ বা ৬৮ হয় আর সেটিকে আমার প্রোফাইলে উপস্থাপন করি তখন বিষয়টি হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। কেউ তার বিড়ালের ছবি দিলে আমাকে হয় বাজার থেকে বিড়াল কিনতে হবে নয়তো বাঘের ছবি দিয়ে নিজেকে জাহির করতে হবে। আর যা-ই হোক ট্রেন্ডের কাছে তো আর হেরে যেতে পারি না!

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেক জনপ্রিয় ইস্যু হলো অনলাইন শপিং যা করোনাভাইরাসের এ সময়ে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর গবেষণা মতে, মহামারির এ সময়ে অনলাইনে বিক্রি ৭০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টা এর তথ্যমতে, ২০১৯ সালে আমাদের ই-কমার্স মার্কেটের আকার ছিল ১৪ হাজার কোটি টাকা যা ২০২০ সালে ১৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৩ সালের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়াবে ২৬ হাজার কোটি টাকা। 

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ঈর্ষণীয় সাফল্যের ফসল হিসেবে আগামীতে আমাদের অর্থনীতিতে অনলাইন কেনাকাটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তবে সমস্যার জায়গাটা অন্যত্র। অনলাইন শপিং এর নামে যে বৃহৎ বাজার গড়ে উঠেছে তার গ্রহণযোগ্যতা কততুকু? একটা দেখিয়ে আরেকটা পণ্য সরবরাহের আশঙ্কা থেকে ক্রেতারা কেন মুক্ত হতে পারছেন না? তার উপর বিক্রেতা কেন শুধু ইনবক্সেই তার ক্রেতাকে তথ্য প্রদান করছেন? এসব এসিমেট্রিক তথ্য সরবরাহ নিশ্চিতভাবে বাজারকে ব্যর্থ করবে। 
তবে সামাজিক যোগাযোগের এ সব মাধ্যম কি শুধুই নেতিবাচক ফল নিয়ে আসছে? না, মোটেও সেরকম নয়। প্রচলিত রয়েছে, একই ফুল থেকে মৌমাছি মধু আর মাকড়সা বিষ সংগ্রহ করে। সে বাস্তবতায় অনেকেই এ সকল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের সত্যিকারের সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার সুযোগ ও উদ্দীপনা খুঁজে পেয়েছেন। অনেকেই খুঁজে পেয়েছেন তার হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে। তবে বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে দেখা যাবে এর অপকারিতার ক্ষেত্র অনেক বেশি বিস্তৃত। 

অনেকেই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। ঘটছে আত্মহত্যার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রে নিজেকে আড়াল করার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃত সত্য দূরে সরে যাচ্ছে। হাজার হাজার গ্রুপ ও বিভিন্ন সাইটের ভিড়ে আমার নিজের অবস্থানটাই নড়বড়ে ঠেকছে। তাছাড়া, বিশ্বাস না করলেও অনেক কিছু উপস্থাপন করছি যা নিজেকে প্রকারান্তরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এভাবে নিজের অস্তিত্ব বিলীন হবার এক আবশ্যিক আশঙ্কায় এগিয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সামাজিক এ সকল যোগাযোগের কল্যাণে সমাজ বদলে যাচ্ছে, যা অবশ্যম্ভাবী। মেনে নেয়া ছাড়া আদতে কোনো উপায় নাই; কিন্তু এভাবে একটি ফেইক সমাজ দিয়ে আমরা কতদূর যেতে পারব? আঙুলের কাছে বন্দি যে জীবন তা নিজেকে কতখানি শান্তি দিতে পারবে? গড়তে পারবে উন্নয়নের বুনিয়াদ?  

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক
 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়