ঢাকা     রোববার   ২৯ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪২৯ ||  ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩

এই জয়ে টেস্ট ক্রিকেটে সবার আগ্রহ বাড়বে

নাজমুল আবেদিন ফাহিম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৩৯, ৫ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ২২:০৭, ৫ জানুয়ারি ২০২২
এই জয়ে টেস্ট ক্রিকেটে সবার আগ্রহ বাড়বে

অভাবনীয় একটি পারফরম্যান্স বাংলাদেশ দলের। এই জয়ের মধ্য দিয়ে টেস্ট ক্রিকেট কিংবা লঙ্গার ভার্সনের ক্রিকেটে আমাদের জয়ের মনোভাবটা যে ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টির মতো না সেটায় পরিবর্তন আসবে। এই ফরম্যাটে খেলার ব্যাপারে আশা করি সবার আগ্রহ বাড়বে। আমাদের ক্রিকেটারদের, ক্রিকেট বোর্ডের, গণমাধ্যমের- সবারই আগ্রহটা বাড়বে।

আমরা এই দলটার মধ্যে বিশাল একটা পরিবর্তন দেখলাম। সেটা হচ্ছে শৃঙ্খলা, যার যার দায়িত্ব পালনে সবাই সচেতন ছিল, আগের দলগুলোর তুলনায় সেটা বড় পার্থক্য মনে হয়েছে। ব্যাটিংয়ের সময় যে প্র্যাকটিসটা দেখলাম, লম্বা সময় ধরে খেলতে চায়, প্রচুর ডিফেন্স করা, প্রচুর বল ছাড়া, এই খেলাটা কিন্তু কঠিন। টেস্টে এই ডিফেন্সিভ খেলাটা কিন্তু খুবই কঠিন। এর আগে আমরা চেষ্টা করেছি খেলার জন্য, যারা রান করেছে তাদের স্ট্রাইক রেট ছিল খুব হাই, শটস খেলার মানসিকতা ছিল বেশি। এখন আমরা দেখেছি খুব ডিফেন্সিভ, একটা লক্ষ্য নিয়ে দলের ব্যাটসম্যানরা ব্যাটিং করেছে যে, আমরা লম্বা সময় ধরে ব্যাটিং করব, অনেকক্ষণ ধরে ব্যাটিং করব।

টেস্টে যদি সফল হতে চান তাহলে এরকম ব্যাটিং করতে হবে। এ জিনিসটা বোধ হয় এই টেস্টে এসে আমরা বুঝতে পারলাম। পাঁচ দিনের খেলা, আপনি শুরুতে বুঝতে পারবেন না যে এই খেলা কোন দিকে যাবে। তাই শুরু থেকে আপনি নিজেকে একটা নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।  নিরাপদ জায়গা বলতে আমি যদি দুটা সেশন, তিনটা সেশন, চারটা সেশন ব্যাটিং করতে পারি তাহলে আমি অনেক দূর এগিয়ে গেলাম। পরে আবার যদি চার পাঁচ সেশন ব্যাটিং করতে পারি তাহলে আমি ম্যাচের অর্ধেকের বেশি ব্যাটিং করে ফেললাম। তাতে আমি আর যেটাই হোক হারব না, ড্র করতে পারব। কিন্তু এর মধ্যে যদি প্রতিপক্ষকে আমি কম রানে আউট করতে পারি কিংবা দ্রুত রান করতে পারি, তাহলে আমি এমন একটা জায়গায় যেতে পারি যেখান থেকে জেতার চিন্তা করতে পারি। এখানে খুব দরকার হলো অনেক সময় ধরে ব্যাটিং করা, নিরাপদে ব্যাট করা। আমরা এটা করেছি, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আমাদের।

আমার মনে হয় শুরুতে ম্যাচ জেতার চিন্তা কারো মধ্যে ছিল না। সবার চিন্তা ছিল আমরা ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাব, ড্র করব। কিন্তু পরে যখন আমাদের বোলাররা অভাবনীয় পারফরম্যান্স শুরু করল, তখন মনে হয় সবাই বুঝতে শুরু করল এই ম্যাচটা আমরা জিততে পারি।

পেসারদের পারফরম্যান্স আসলে ব্যাটসম্যানদের এই ব্যাটিংয়ের পর আরো বেশি কার্যকরী। কারণ পেস বোলিং নিয়ে কখনোই কোনো আস্থার ব্যাপার ছিল না। আমরা সবসময় বলে এসেছি যে পেস বোলাররা আমাদের খুব একটা কাজে আসে না, দলে রাখতে হয় বলেই রাখা। আমাদের সেই ধারণা এখন বদলে দিলো এই পেস বোলাররা। এই দল এটা যদি বাংলাদেশ না হয়ে অস্ট্রেলিয়া হতো, সবাই দারুণভাবে অভিনন্দন জানাতো এমন খেলার জন্য।

বাংলাদেশ এত ভালো ক্রিকেট খেলেছে। জয়ের পেছনে মূল অবদান পেস বোলারদের, ১৩টি উইকেট নিয়েছে এবং যে কন্ডিশনে নিউজিল্যান্ড ভালো খেলতে অভ্যস্ত, সেখানেও তারা নিউ জিল্যান্ডের ওপর আধিপত্য করেছে এবং ওদেরকে দাঁড়াতে দেয়নি পেস বোলিং করে, এটা একটা দারুণ ব্যাপার ছিল।

তাই আমাদের পেস বোলিংয়ের যে কোচ আছেন, তাকে ধন্যবাদ দিতেই হবে। কারণ আমি যে পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি, যে শৃঙ্খলা দেখতে পেয়েছি, সেটা এর আগে কখনোই আমরা দেখিনি। আমি আশা করছি ঘরোয়া ক্রিকেটেও পেস বোলিংয়ে কিছু পরিবর্তন দেখতে পাব। এবং টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি সবার আগ্রহ বাড়বে, সবাই টেস্ট ক্রিকেট খেলতে চাইবে। এটাই আমি আশা করি, এই জয় সে ভূমিকা রাখবে।

ইবাদতকে নিয়ে যতটা সমালোচনা হয়েছে তারপরও যে সে নিজেকে ধরে রেখেছে, এটা তার বড় কৃতিত্ব, তার স্কিল ভালো। কিন্তু এত সমালোচনার পরেও ভেঙে না গিয়ে নিজেকে ধরে রেখে পারফর্ম করেছে এবং সবাইকে প্রমাণ করে দিয়েছে যে সে তার যোগ্যতা রাখে, এটা তার বড় কৃতিত্ব। ইবাদত যে বোলিং করেছে, এটা যে কোনো বোলারের জন্য বিশাল ব্যাপার। সে যদি অস্ট্রেলিয়ান কেউ হতো তাহলে আরো প্রশংসা পেতো। আমি আবারো বলি আমাদের পেস বোলিং নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণা ছিল, সেটা মুছে যাবে। আমি আশা করব আমাদের দলে ৩-৪-৫ জন পেসার থাকবে, তারা পারফর্ম করবে।

আমার মনে হয় মিরাজ-রাব্বির পার্টনারশিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেটাই বোধহয় পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে। নিউ জিল্যান্ডের ওপরও অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করতে পেরেছিল। সেই লিডটা আমাদের স্বস্তি দিয়েছে। আমরা দুর্দান্ত খেলেছি, এই প্রথম আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ফুল পয়েন্ট পেয়েছি। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে এমন জয় আমাদের অনুপ্রেরণা যোগাবে, আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। টেস্ট ক্রিকেটে আমাদের যেটা সবচেয়ে বেশি ছিল বিশ্বাসের অভাব, সেটা এবার বাড়াবে। এখন আমরা যে কোনো কন্ডিশনে যে কোনো দলের বিপক্ষেই খেলি না কেন লড়াই করতে পারব, এমন আত্মবিশ্বাস দেবে।

এই দলের সব ক্রিকেটার, টিম ম্যানেজমেন্টকে অভিনন্দন। আশা করছি এই ধারা বজায় রেখে সামনে আরো ভালো খেলবে।

লেখক: ক্রিকেট উপদেষ্টা, বিকেএসপি।

ঢাকা/রিয়াদ/ফাহিম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়