ঢাকা     শনিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৫ ১৪২৯

যুক্তরাষ্ট্রকে এখন চীনের পাশাপাশি রাশিয়াকে নিয়েও ভাবতে হচ্ছে

অলোক আচার্য || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৫০, ৩১ মে ২০২২   আপডেট: ১৪:০০, ৩১ মে ২০২২
যুক্তরাষ্ট্রকে এখন চীনের পাশাপাশি রাশিয়াকে নিয়েও ভাবতে হচ্ছে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই পৃথিবীতে তার প্রভাব ধরে রেখেছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের সামরিক, অর্থনৈতিক উত্থান এবং আরেক পরাশক্তি রাশিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এবং ক্রমশ তাদের আধিপত্য বিস্তার আমেরিকাকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। এটা এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ।

এক সময় রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই স্নায়ুযুদ্ধ চলেছিল বহু বছরব্যাপী। এখন তা নতুন রূপ পেয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও প্রতিযোগিতায় রয়েছে চীন-অস্ট্রেলিয়া। এ অঞ্চলের দ্বীপগুলো এত দিন অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের প্রভাব বলয়ের মধ্যেই ছিল বলে মনে করা হতো। সম্প্রতি সলোমন দ্বীপপুঞ্চের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তির পর গত শনিবার সামোয়ার সঙ্গেও চুক্তি করেছে চীন। রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের ডামাডোলে এমনিতেই উত্তেজনা চরমে রয়েছে। এর মধ্যেই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে এই ঘটনা। 

ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সমুদ্রপথ। সাগরের পথ, বিশাল মৎসভাণ্ডার, সম্পদ এবং কৌশলগত অবস্থান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় কোনো দেশই এখন সমুদ্রে অন্য দেশের আধিপত্য মেনে নিতে রাজি নয়। ফলে উল্লেখিত অঞ্চলে নতুন করে প্রতিযোগিতা এবং সমীকরণ তৈরি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারও কূটনীতিতে এ অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সাথে ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া মিলে গঠন করেছিল ‘কোয়াড’ নামে একটি জোট। এটি চতুর্পাক্ষিক নিরাপত্তা সংলাপ নামেও পরিচিত। বলা যায়, এই জোট গঠনের একটি বড় লক্ষ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রম অগ্রসরমান আধিপত্য ঠেকানো। 

এই মুহূর্তে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো কোয়াডের দ্বিতীয় সম্মেলন। যুদ্ধের সময় এই সম্মেলন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, এবারের সম্মেলনে কোয়াড ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। যদিও এ জোটের আরো বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি ও করোনা মহামারী ইত্যাদি। এ সম্মেলনে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সমুদ্র রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। 

২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরে বিধ্বংসী সুনামির পর একটি অংশীদারিত্ব গ্রুপ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল কোয়াড। এরপর ২০০৭ সালে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কোয়াডকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেন। প্রায় ১০ বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর ২০১৭ সালে এটি সক্রিয় হতে শুরু করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পরে জো বাইডেনের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র কোয়াড শক্তিশালী করণের মাধ্যমে মূলত চীনের দৃঢ় পদক্ষেপের মোকাবিলা করতে চায়। চীনের সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং একে অপরকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যেই এ জোট গঠিত হয়েছে। আধিপত্যবাদ শব্দটি দ্বারা সাধারণত বোঝানো হয় প্রভাব বিস্তার করা। নিজের কর্তৃত্ব যে কোনো উপায়ে বজায় রাখার একটি কৌশল। নিজেকে সুরক্ষিত রেখে আধিপত্য বিস্তারের কৌশল বেছে নেওয়া হয়। এটি যেমন প্রতিটি দেশে সামাজিক শৃঙ্খলা বাধাগ্রস্ত করে তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রভাব বিস্তার করে। বিভিন্ন জোট গঠনের মাধ্যমে এই বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়। 

যদিও কোয়াডভুক্ত দেশগুলো মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর নেই। ২০২১ সালের মার্চ মাসে দেওয়া স্পিরিট অব কোয়াড বা কেয়াডের রূপরেখা ঘোষণায় নেতারা বলেছিলেন, আমরা বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছি এবং মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য একটি একক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা ঐক্যবদ্ধ। কোয়াড সদস্যরা বলছে, ইন্দো-প্যাসিফিক পার্টনারশীপ ফর মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস (আইপিএমডিএ) প্রকল্পের মাধ্যমে প্যাসিফিক, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত সাগর সংলগ্ন দেশগুলো তাদের জলসীমায় অবৈধ মাছ ধরা এবং অন্যান্য তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে দীর্ঘদিন ধরেই ঐ অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে- চীনা জলযান তাদের জলসীমায় অবৈধভাবে প্রবেশ করে।

উন্নত ক্ষমতাধর দেশগুলো এভাবেই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করে আছে। আধিপত্যবাদে অন্যকে নিজের আয়ত্ত্বে রাখা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজের পক্ষে মতামত দেওয়াকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। আজ বিশ্বজুড়ে শক্তিমত্তা প্রদর্শনের খেলায় মত্ত্ব ক্ষমতাশালী দেশগুলো। এসব দেশের রয়েছে আধুনিক অস্ত্রসম্ভার, কারিগরী দক্ষতা, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ইত্যাদি। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে তারা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে মরিয়া। এই আধিপত্য ধরে রাখার প্রতিযোগিতা আজ থেকে শুরু হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের। সিই সময়ে স্নায়ুযুদ্ধ মানুষ ভুলে যায়নি। 

যদিও এখন চিত্রটা ভিন্ন। কারণ উন্নত দেশগুলো সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখছে এবং একইসঙ্গে নৌ, সমুদ্র ও আকাশপথে নিরাপত্তা জোরদার করছে। গত কয়েক বছরে চীন বিশ্বের পরাশক্তির কাতারে। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব স্পষ্ট। ফলশ্রুতিতে কৌশল হিসেবে মিত্রদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজ বলয়ের প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

এদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারত নিজেদের পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে মিত্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। কিন্তু এখন এসব ছাড়িয়ে চীনের আধিপত্য বেশি লক্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য যুদ্ধ করোনার আগে পর্যন্ত বেশ জোরেসোরেই চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের বিপরীতে চীনও পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। এতেই বোঝা যায় চীন পিছিয়ে যেতে আগ্রহী নয়। এর কারণ চীনের পৃথিবীব্যাপী পণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে। এখন হয়তো চীন এশিয়া বা নিজের আশেপাশে প্রভাব বিস্তারে আরো মনোযোগী হবে। ভবিষ্যতে এর বিস্তার যে আরও বৃদ্ধি পাবে তা নিশ্চিত। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন চীন, রাশিয়া উভয়কে নিয়েই মাথা ঘামাতে বাধ্য হচ্ছে।  

লেখক: শিক্ষক ও মুক্তগদ্য লেখক

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়