ঢাকা     শনিবার   ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ২১ ১৪২৯

যুদ্ধজয়ের সোনালি ২১ নভেম্বর

দুলাল আচার্য || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩১, ২১ নভেম্বর ২০২২  
যুদ্ধজয়ের সোনালি ২১ নভেম্বর

৩০ লাখ শহীদ আর চার লাখের বেশি মা-বোনের সম্ভ্রমে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধে অগণিত মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল দেশ শত্রুমুক্ত করতে। বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, রাজনীতিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রাণের অর্জন এই বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বীজ বপন হয়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষ পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে পরাধীন বাংলাকে মুক্ত করার জন্য। 

এই যুদ্ধে কার্যত শুরু থেকেই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারত সরকার ও তাদের নাগরিকরা। সাধারণ বাঙালির পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী একত্র হয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, কৃষক-শ্রমিক-জনতা এবং সেনাবাহিনী একত্র হয়ে কাজ করে। তবে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক সম্মিলিত প্রতিরোধ ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর আজকের এই দিনে। এদিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে নৌ ও বিমানবাহিনী সম্মিলিতভাবে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণের সূচনা করে।

বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল দেশের সশস্ত্রবাহিনী। যুদ্ধ শুরুর পরপরই পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহ করা শত শত বাঙালি সশস্ত্র সেনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথমে পাঁচটি এবং পরে নবপ্রতিষ্ঠিত আরও তিনটি ব্যাটালিয়নই ছিল মূল চালিকাশক্তি। নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা গেরিলাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। একসময় গেরিলাযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। জেনারেল ওসমানী ও ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা এক দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। 

১৯৭১ এর ২১ নভেম্বর দিনটি বাঙালির কাছে একটি আবেগের নাম। কারণ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ ৯ মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল আজকের স্বাধীনতা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ প্রতিহত ও পরাজিত করা কখনোই সম্ভব হতো না, যদি না সঠিক রণকৌশল অবলম্বন করা হতো। আর সে কৌশলের অন্যতম ছিল ২১ নভেম্বরের তিন বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণ। আজ আমাদের আছে অতি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী একটি সশস্ত্রবাহিনী। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম ও নৃশংস আক্রমণ প্রতিহত এবং তাদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে দেশমুক্তির মাধ্যমে মানুষের সব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই ছিল এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য। তাই সশস্ত্রবাহিনী দিবস পালনের পেছনে মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অবদানকে দেশের জনগণের আত্মত্যাগের সঙ্গে একীভূত করে দেখা হয়। 

১৯৭২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তর অবলুপ্ত হয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থাপিত হয় তিন বাহিনীর জন্য পৃথক সদর দপ্তর। বাংলাদেশের সংবিধানের পরিচ্ছেদ ৪-এর ৬১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বাধিনায়কত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয় এবং আইনের দ্বারা তার প্রয়োগ নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। 

দেশ স্বাধীনের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য একটি সামরিক একাডেমি, সম্মিলিত ট্রেনিং সেন্টার, প্রতিটি সেনা কোরের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং বিভিন্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেন। জাতির পিতা বিএনএস ঈসা খান উদ্বোধন করেন। তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য দুটি যুদ্ধজাহাজ ক্রয় করেন। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে একটি বহুমুখী বাহিনীতে পরিণত করার জন্য তিনি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান মিগ-২১, আধুনিক পরিবহণ বিমান, বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং হেলিকপ্টার ক্রয় করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁর স্বপ্নকে উপেক্ষা করা হয়। এ সময় অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানে সশস্ত্রবাহিনীর বহু সদস্য নিহত হন। কোর্ট মার্শালের নামে তথাকথিত বিদ্রোহের দায়ে মুক্তিযোদ্ধাসহ সশস্ত্রবাহিনীর অনেক সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অনেককে চাকরি থেকেও বরখাস্ত করা হয়। যাদের বেশির ভাগই মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী। এতে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনী দক্ষ জনবল ও সরঞ্জামের ব্যাপক ক্ষতি করা হয়। 

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টি, অঙ্গীকার ও গতিশীল নেতৃত্বে আমাদের সশস্ত্রবাহিনী নতুনভাবে আধুনিকতার ছোঁয়া পায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ সম্পর্কে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠন করে এবং এ পর্যন্ত তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছে। ফলে ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ ও ‘ভিশন-২০৪১’ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সুদৃঢ় পরিকল্পনা, ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিতে থাকে। নতুন নতুন সেনানিবাস, নৌ ও বিমানঘাঁটি স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য শেখ হাসিনার সরকার MBT-2000, VT-5 ট্যাঙ্ক ক্রয় করেছে। BTR-80, Otokar cobra, Maxxpro MRAP, BOV M11 আর্মার্ড পার্সোনাল ক্যারিয়ার কেনা হয়েছে। এছাড়াও WS-22, TRG-300, NORA B-52, FM-90 সারফেস টু এয়ার মিসাইল, QW-2 MANPAD, Metis-M অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল, PF-98 অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক রকেট, SLC-2 রাডার, MI-17 SH হেলিকপ্টার, ইউরোকপ্টার, বেল ৪০৭ হেলিকপ্টার, CASA C295 ট্রান্সপোর্ট এয়রারক্রাফট, ডায়মন্ড DA40 trainer বিমান, Bramor C4EYE মনুষ্যবিহীন এরিয়াল ভেহিকল ইত্যাদি ক্রয় করা হয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সংযোজন ০৩৫জি সাবমেরিন, ডর্নিয়ার ২২এনজি বিমান, অগাস্টা এডব্লিউ-১০৯ হেলিকপ্টার এবং এর যুদ্ধ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ইত্যাদি। এই সময়কালে F-7BGI ফাইটার, YAK-130 জেট ট্রেনার, C-130J পরিবহণ, K-8W জেট ট্রেনার, L-410 পরিবহণ বিমান, MI-171SH হেলিকপ্টার, Agusta AW139 মেরিটাইম SAR হেলিকপ্টার, AW119KX হেলিকপ্টার ক্রয় করা হয়েছে। সরকার এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম FM-90, Selex RAT-31DL AD Rader কিনেছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ। ফোর্সেস গোল-২০৩০ এবং ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সশস্ত্রবাহিনীর জন্য আরও আধুনিক ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সরঞ্জাম, অস্ত্র, গোলাবারুদ, যুদ্ধজাহাজ এবং বিমান ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলমান। 

শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোর্সগুলো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার্থী তৈরি করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। এখানকার শিক্ষার্থীরা সম্ভাবনাময় সমুদ্র অর্থনীতির জ্ঞান আহরণ করতে এবং অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যুদ্ধবিমান, পরিবহণ বিমান এবং হেলিকপ্টার তৈরির জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হবে। 

আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত আমাদের পেশাদার সশস্ত্রবাহিনী আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্থান করে নিয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে প্রথম স্থানে অবস্থানকারী সশস্ত্রবাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আজ চিনতে পেরেছে সারা বিশ্বের মানুষ। শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সদস্যসংখ্যা বিশ্বের সর্বোচ্চ। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক শান্তি মিশনে যোগদানের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের পতাকাতলে একত্র হয় তারা। বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যোগ দেয় ১৯৯৩ সালে। বাংলাদেশ পুলিশ ১৯৮৯ সালে নামিবিয়া মিশনের মাধ্যমে জাতিসংঘ পরিবারের সদস্য হয়। অন্যদিকে শুরু থেকে অদ্যাবধি শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পেয়েছে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাতিসংঘের বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সংঘাতপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেদের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়েও আমাদের সশস্ত্রবাহিনী আর্তমানবতার সেবা করে চলেছে। 

মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আমাদের সুশিক্ষিত, পেশাদার ও শক্তিশালী সশস্ত্রবাহিনীর কোনো বিকল্প নেই। এই সত্যকে সামনে রেখেই বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী আজ পেশাদার বাহিনী হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। শ্রম, চেতনা, দেশপ্রেম এবং দক্ষতা দিয়ে সশস্ত্রবাহিনী নিজেকে গড়ে তুলেছে জাতির গর্ব হিসেবে। দেশ এবং বিদেশের বিভিন্ন ক্রান্তিকালে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা সাহস ও দক্ষতা দেখিয়েছেন। শান্তি রক্ষার জন্য সহানুভূতি ও ত্যাগ দেখিয়েছেন। ১৯৮৮ সালের বন্যা, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়, ১৯৯৮ সালের বন্যা এবং সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারির মতো সময়ে তাদের নিরলস দায়িত্ব পালন করতে দেখেছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনেও আমরা তাদের দেখেছি কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে। 

আজ এই বিশেষ দিনে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল শহীদ বীরযোদ্ধাকে। যুদ্ধজয়ের সোনালি ২১ নভেম্বরে সশস্ত্রবাহিনীর প্রতি আমাদের অশেষ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

লেখক : সাংবাদিক  
 

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়