ঢাকা     মঙ্গলবার   ২১ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪৩১

নয়নে সমুখে তুমি নাই

ডা. অঞ্জনা দত্ত  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৩৩, ২ জুন ২০২৩   আপডেট: ১১:৩৫, ২ জুন ২০২৩
নয়নে সমুখে তুমি নাই

প্রদীপ কুমার দত্ত

আজ ২ জুন। আমাদের পরিবারের জন্য একটি অতি বিষাদময় দিন। যেমনটি হয়ে থাকে সারা দেশে বছরের প্রতিটি দিন কোন না কোন ত্রিশ লক্ষাধিক পরিবারে ... অনেকের পরিবারে মন খারাপ করে থাকার মতো এখন হয়তো বা কেউ বেঁচে নেই। চার লক্ষাধিক সম্ভ্রম হারানো কোন মা বোনকে কেউ লেখালেখি বা বক্তৃতা বিবৃতি ছাড়া মনে করে? 

ওদের পরিবারের সদস্যরাও সমাজের ভয়ে এই হতভাগীদের অস্বীকার করেছিল। দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা তাঁদের সর্বোচ্চ সম্মান বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়েছিল ...ধুলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল...রাষ্ট্র থেকে তাঁরা কি পেয়েছিলেন? সমুখে না হলেও আড়ালে তাঁদের নিয়ে উপহাস করা হয়েছে। আর যারা প্রাণের দায়ে কেউ স্বজন হারানোর পরে বা পূর্বে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটির মায়া ত্যাগ করে প্রতিবেশি দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন...তাঁরা যে মানবেতর জীবনযাপন করেছিলেন সেটি বুঝার ক্ষমতা ’৭১ পরবর্তী প্রজন্মের নেই। এমনকি ’৭১ সালে যারা দেশে রয়ে গিয়েছিল ... তাদের মধ্যেও একটি অংশ বুঝতে পারেনি , ভুল বললাম , বুঝতে চায়নি , তারা কী ভুল কাজ করে যাচ্ছে !

এখনও বুঝে না। এরা এখনও মনে করে তারা ঠিক কাজটিই করেছে। হিন্দুদের সম্পত্তি লুটপাট করা, হিন্দু মেয়েদের খান সেনাদের হাতে তুলে দেওয়া ... এগুলো যুদ্ধে করা জায়েজ। সেই সময়ে এই অত্যাচার থেকে মুসলিম মেয়েরাও রক্ষা পায়নি। মুসলিম পরিবারও বাঁচতে পারেনি যারা মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন। যাদের সন্তানেরা যুদ্ধে গিয়েছিল। যারা মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের ভিতরে আশ্রয় দিয়েছিলেন তাদের অনেকেই জালিমদের হাত থেকে বাঁচতে পারেননি।

আজ ২ জুন পি কে ডির (প্রদীপ কুমার দত্ত) বাবা (আমার শ্বশুরমশাই) শহিদ হিরন্য কুমার দত্তকে ফটিকছড়ির নানুপুর গ্রামে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি বাঁচতে পারতেন। যদি সময়মতো দেশ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিতেন। নেননি। নিজের বাড়িঘর, দেশ ছেড়ে কেই বা অকূল পাথারে গা ভাসিয়ে দিতে চায়? অনিশ্চিত জীবনের পথে পা বাড়াতে চায়? তা রয়েছে ছোটো ছোটো শিশু সন্তানেরা। একমাত্র পুত্রসন্তান পি কে ডি বছরখানেক আগে বুয়েটে ভর্তি হয়েছিল। বড়ো মেয়েটি ক্লাস নাইনে পড়ত। বাকি দুজন মনে হয় ক্লাস টু থ্রিতে পড়ত। একেবারে ছোটোটি পুতুলের মতো মেয়েটি সবার কোলে কোলে ঘুরত।

হিরন্য কুমার শহরের বাড়িতে থাকতে পারেননি। বাড়ি তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল। যখন চট্টগ্রাম শহরের পতন হয় ২৮ মার্চের দিকে। তবে এর আগে তিনি স্ত্রী ও বাচ্চাদের পাঠিয়ে দিয়েছিলেন প্রতিবেশি এক পরিবারের বাড়িতে। বাড়িতে ছিলেন তিনি, বুয়েটে পড়া তাঁর সন্তান এবং ছেলেটির কাকু। ২৮/ ২৯ তারিখের দিকে তিনি তাঁর এক মুসলিম প্রতিবেশির সাথে ভাই এবং ছেলেকে সাথে নিয়ে শহর ছাড়লেন। চট্টগ্রাম থেকে বের হওয়ার পথে ওদের চাক্তাই খাল পার হতে হয়েছিল। এটি তখন পাক আর্মিদের দখলে ছিল। প্রতিবেশি চাচা খুব ভালো উর্দু বলতে পারতেন। তিনিই পাক সৈন্যদের সাথে কথা বলে সেই যাত্রায় সবাইকে নিয়ে প্রাণ হাতে বাড়ি এসে পৌঁছালেন।

হিরন্য কুমার এসে উঠলেন ধলঘাটে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাড়িতে। এই সেই ধলঘাট যেখানে জন্মেছিলেন বীরকন্যা প্রীতিলতা। কে জানে তিনি হয়তো আকাশ থেকে নক্ষত্র হয়ে এই জানোয়ারদের কাজকর্ম দেখছিলেন এবং আর তাঁর হাত নিশপিশ করছিল যদি সেই পিস্তল দিয়ে এদের মাথা ফুটো করে দেওয়া যেত ! সেই সময়ে গ্রামেও কেউ নিশ্চিন্তে থাকতে পারত না। কেননা এই দেশের কিছু জারজ সন্তান মে মাসের কোন এক সময় পাকদের সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সংগঠিত হতে থাকে। বাঙালিদের মধ্যে যারা পাকদের অত্যাচারকে রুখে দিতে চেয়েছিলেন, সে মুসলিম হোক বা হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিস্টান যেই হয়ে থাকুন না কেন, পাকিস্তানি সৈন্যদের মূল টার্গেট ছিল হিন্দু জনগোষ্ঠী। পাকিস্তানি শাসকরা ধরেই নিয়েছিল বাঙালিরা অস্ত্র হাতে নিয়েছে ভারতের ইন্ধনে। আর এই কাজে সহায়তা করছে হিন্দুরা... এছাড়া তারা পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিমদের ইসলামে  বিশ্বাসী বলে ভাবত না ... কেননা এরা ভাষার জন্য প্রাণ দিতেও পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায়...রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়, কথায় কথায় জঙ্গি মিছিল করে...টিয়ার গ্যাস, বেয়োনেট চার্জ, গুলি কিছুকেই ভয় করে না আর এইসবের পিছনে রয়েছে ভারত, অতএব হিন্দু বাড়ি পেলে, হিন্দু পরিবার পেলে ওদের আর নিস্তার ছিল না। তাঁদের দিতে হতো চড়ামূল্য। আর এইসাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের যারা যুদ্ধ করেছিল, ছেলেদের আশ্রয় দিয়েছিল রাজাকারদের লুকিয়ে অথবা ধরা পড়লে এর কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে সেটি জেনেও তাঁরা নিজেদের সন্তানসম দামাল ছেলেদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেননি।

এটি ছিল জেনোসাইড। একটি জাতিসত্তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ষড়যন্ত্র বা একটি সম্প্রদায়কে চিরতরে বিলুপ্ত করে দেওয়ার প্রচেষ্টাকে জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী এটিকে জেনোসাইড বলা হয়। তবে দুঃখের বিষয় নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষাধিক বাঙালিকে হত্যা করার পরে এবং চার লক্ষাধিক মা বোনের ইজ্জত সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দ্বিধা করেনি , বরং উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। দেশের ভিতরে নির্বিচারে গণহত্যা করেছিল। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল। এক কোটি লোক প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছিল প্রতিবেশি দেশ ভারতে। এতকিছুর পরেও জাতিসংঘ আজ পর্যন্ত আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে জেনোসাইড হিসাবে স্বীকৃতি দেয়নি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জাতিসংঘের ভূমিকা ছিল যুদ্ধবিরতির জন্য কাজ করা। কিন্তু পাকদের বলেনি অবিলম্বে বাঙালিদের হত্যা করা বন্ধ করো। জানতে চায়নি সমস্যার শিকড় কোথায়?

হিরন্য দত্ত ছিলেন এই জেনোসাইডৈর শিকার। যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানে দিনের বেলায় থাকতে পারতেন না। পাহাড়ে পাহাড়ে পালিয়ে বেড়াতেন। সন্ধ্যার পরে বাড়ি ফিরে যেতেন। ছেলেরা সাধারণত এইরকম করতেন। এইভাবে আর কত পারা যায়? একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন ভারতে চলে যাবেন। সেই ভেবে নানুপুরে চলে এলেন। নানুপুরে মির্জাবু পরিবারের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন জেনারেল ম্যানেজার। মির্জাবু সাহেবের এক ছেলে ছিলেন ’৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের থেকে নির্বাচিত এম পি এ। তাঁর ছোটো ভাই পি কে ডি’র বয়েসি, তিনি গিয়েছিলেন রণাঙ্গনে। হিরন্য কুমারকে তাঁরা বহুবার খবর পাঠিয়েছিলেন তাঁদের বাড়িতে চলে আসতে। ভারতে যাওয়ার ব্যবস্থা করবেন তাঁরা। এমনকি মির্জা আবু মনসুর এম পি এ মার্চের শেষদিকে যখন দেশ ছাড়ছিলেন তখনও হিরন্য কুমারকে ডেকেছিলেন তাঁর সাথে চলে যেতে। তিনি তখন আমলে নেননি। নাকি চিত্রগুপ্তের খাতায় তাঁর নাম তখনই উঠে গিয়েছিল ত্রিশ লক্ষ শহিদের নামের সাথে। কে জানে ! মায়ার ছলনায় সব ভুলে গিয়েছিলেন।

মির্জাবু সাহেবদের বাড়িতে পৌঁছানোর পরের দিনই সম্ভবত পাক আর্মি সেই বাড়ি ঘিরে ফেলেছিল বিশ্বাসঘাতক প্রতিবেশিদের সহায়তায়। মির্জা সাহেব রাতে বাড়িতে থাকতেন না। ভোর হওয়ার সাথে সাথে হিরন্য কুমার, তাঁর ভাই এবং ছেলেকে আটক করে বাড়ির সামনের মাঠে এনে জড়ো করে। আরও অনেক লোককে ধরে এনেছিল পাকিস্তানিরা। পাশের বাড়ির রাজাকাররা হিরন্য কুমারকে চিনিয়ে দিয়েছিল। তাঁর বুয়েটে পড়ুয়া ছেলেকে ওরা চিনত না। হিরন্য কুমারকে তখন তখনই আলাদা করে মাঠের একপাশে বসিয়ে রেখেছিল। গ্রামে আর্মি এসে মানুষের ওপর অত্যাচার করছে শুনে শহরে অবস্থান করা ঐ গ্রামের চেয়ারম্যান সাহেব ছুটে এসেছিলেন গ্রামের লোকদের বাঁচাতে। তাঁকে পাক বাহিনী আটক করল। কেননা তিনি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হতে চাননি। একসময় বাকিদের বেদম মারধর করে ছেড়ে দিল। সাথে নিয়ে চলল হিরন্য কুমার এবং ঐ গ্রামের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ সাহেবকে। খালপাড় পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে নূর মোহাম্মদ সাহেবের জন্য একটা গুলি খরচ করেছিল। আর হিরন্য কুমারকে খালের পানিতে চুবিয়ে চুবিয়ে...কী আক্রোশ মেটালো জল্লাদবাহিনী কে জানে!

আজ সেই বিভীষিকাময় দিন পি কে ডি’র পরিবার ও নূর মোহাম্মদ সাহেবের পরিবারের জন্য। এছাড়াও ঐ অঞ্চলে আরও পাঁচজন শহিদের পরিচয় জানা গেছে। অতল শ্রদ্ধা শহিদদের প্রতি।

আমাদের দুর্ভাগ্য বাংলাদেশ আজও নয়মাসের হত্যাযজ্ঞকে জেনোসাইড হিসাবে স্বীকৃতি আদায় করতে পারেনি। যদিও বড়ো একটি কাজ করেছে দেশে বিদেশে প্রবল বাধাবিপত্তির মুখেও কয়েকজন মানবতাবিরোধীদের বিচার কার্যক্রম ফাঁসির মাধ্যমে সম্পন্ন করেছে। বিচারে শাস্তিপ্রাপ্ত একজন পলাতক রয়েছে। একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড  ভোগ করছে। একজন জেলে থাকাকালীন মারা গেছে। বিচারকার্য এখনও চলমান আছে। এর মধ্যে কারও মৃত্যুদণ্ড , কারও বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। 

পাকি বাহিনী এবং তাদের দোসরদের দ্বারা সংগঠিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে জেনোসাইড হিসাবে স্বীকৃতি আদায়ের কাজ আমাদের দেশের কয়েকটি সংগঠন অক্লান্তভাবে করে যাচ্ছে। এক পা দু’ পা করে সাফল্যের দিকে তাঁরা এগোচ্ছে। আমাদের সরকারও এ নিয়ে কাজ করছে। ৫২ বছর বয়েসি একটি দেশ ২১ বছর উল্টো পথে হেঁটেছিল। তার মানে এই নয় যে তারা সব উল্টে দিতে পেরেছিল। ওরা সেরকম স্বপ্নই দেখেছিল। কিন্তু সেটি যে সম্ভব নয়, অন্তত বাঙালি জাতির ইতিহাস তা বলে না। এখানেই দালালরা মস্ত বড়ো ভুল করেছিল।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল

/এসবি/

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়