ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে মত প্রকাশের বাংলাদেশ চাই
মো. জসিম উদ্দিন || রাইজিংবিডি.কম
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে থাকে তার নাগরিকের নির্ভয় কণ্ঠস্বরের ওপর। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। কিন্তু গত দেড় দশকে আমরা এমন এক বাংলাদেশের সাক্ষী হয়েছি, যেখানে বাকস্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোর নজরদারি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আতঙ্ক এবং দমনমূলক আইনের বেড়াজালে দেশে এক ভয়াবহ ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৪ সাল পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রধান দাবি—এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে ভিন্নমত হবে গণতন্ত্রের চালিকাশক্তি, দমনের হাতিয়ার নয়।
বাংলাদেশে গত এক দশকে ভয়ের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে দমনমূলক আইন ও গুম আতঙ্কের মাধ্যমে। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে ভিন্নমত প্রকাশ ধীরে ধীরে অপরাধে পরিণত হয়েছে এবং রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্ক আস্থার বদলে আশঙ্কায় রূপ নিয়েছে। সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ-এর তথ্যমতে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে প্রায় সাত হাজার মামলা হয়েছে, যার বড় অংশ সাংবাদিক, শিক্ষার্থী ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে। এই আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে যে, সত্য সমালোচনাও রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে মানুষকে নীরবতায় ঠেলে দিয়েছে।
গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও দমনমূলক বাস্তবতা স্পষ্ট। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ২০২৪ সালের সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৫তম, যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার করুণ চিত্র তুলে ধরে। সাংবাদিকদের হয়রানি ও গোয়েন্দা নজরদারি সেলফ-সেন্সরশিপকে স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গুম ও মনস্তাত্ত্বিক দমন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গত পনেরো বছরে কয়েকশ মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন, যা সমাজজুড়ে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এই ভয় মানুষকে ঘরের ভেতরেও রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে নিরুৎসাহিত করেছে এবং নীরবতাকেই শাসনের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত করেছে।
একটি রাষ্ট্র যখন ভিন্নমতকে শত্রু মনে করতে শুরু করে, তখন সেই রাষ্ট্রের মেধা ও সৃজনশীলতার অপমৃত্যু ঘটে। কারণ ভিন্নমত মূলত একটি সুস্থ সমাজের চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স হিসেবে কাজ করে। যেখানে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই, সেখানে জবাবদিহিতার অভাবে দুর্নীতি ডালপালা মেলে। গত এক দশকে ব্যাংক খাতে লুটপাট এবং মেগা প্রকল্পের আড়ালে অর্থ পাচারের যে মহোৎসব চলেছে, তার প্রধান কারণই ছিল গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ এবং নাগরিকের প্রশ্ন করার সুযোগ না থাকা। এ ছাড়া, যখন প্রকাশ্য রাজনীতি বা আলোচনার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন সংক্ষুব্ধ মানুষ আড়ালে চলে যায়, যা সমাজে উগ্রবাদ ও অসহিষ্ণুতা উসকে দেয়। ভিন্নমতের চর্চাই পারে সমাজকে এমন চরমপন্থা থেকে রক্ষা করতে।
পাশাপাশি, মুক্ত চিন্তার পরিবেশ না থাকলে তরুণ প্রজন্ম যখন দেখে সত্য বলার জন্য ক্যারিয়ার বা জীবন বিপন্ন হয়, তখন তারা দেশত্যাগের পথ বেছে নেয়। এই ব্রেন ড্রেন বা মেধা পাচার দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। তাই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্যই ভিন্নমতকে দমনের পরিবর্তে স্বাগত জানানো জরুরি।
বাকস্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক অধিকার নয়, এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম অপরিহার্য শর্ত। অর্থনীতিতে ইনস্টিটিউশনাল ইকোনমিক্স তত্ত্ব অনুযায়ী—যে দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন শক্তিশালী, সেখানে বিদেশি বিনিয়োগ বেশি আসে। বিনিয়োগকারীরা মূলত তথ্যের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আছে এমন দেশকেই নিরাপদ মনে করেন। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে রিজার্ভ বা মুদ্রাস্ফীতির প্রকৃত ও নির্ভুল পরিসংখ্যান প্রকাশে এক ধরণের ভয়ের পরিবেশ বিদ্যমান ছিল, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আস্থাহীনতা তৈরি করেছিল। তথ্যের এই একপাক্ষিক নিয়ন্ত্রণই আবার বাজার সিন্ডিকেটের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। অসাধু ব্যবসায়ী ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীগুলো তথ্যের শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম সংকটের গুজব ছড়ায় এবং সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতি মুনাফা লুটে নেয়। যখন সংবাদমাধ্যম বা গবেষকরা ভয়ের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলের ত্রুটি নিয়ে কথা বলতে পারেন না, তখন সিন্ডিকেটগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাই ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়তে হলে বাকস্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। নির্ভয় সমালোচনা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহের মাধ্যমেই নীতিনির্ধারণী ত্রুটি এবং বাজার অব্যবস্থাপনা দূর করা সম্ভব।
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এক সময় মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানচর্চার বাতিঘর ছিল। কিন্তু গত দেড় দশকে ভয়ের সংস্কৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোকেও বিষাক্ত করে তুলেছে। ছাত্র রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি আর শিক্ষকদের দলীয় দলাদলির উর্ধ্বে গিয়ে ভিন্নমত প্রকাশের কোনো স্থান অবশিষ্ট ছিল না। একজন শিক্ষক যখন ক্লাসে পড়ানোর সময় এই আতঙ্কে থাকেন যে, তার কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা বা ব্যক্তিগত বিশ্লেষণকে কেউ ভিডিও করে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে কি না, তখন সেখানে শিক্ষার প্রকৃত প্রাণশক্তিই নষ্ট হয়ে যায়। ভয়ের পরিবেশে সিলেবাস শেষ করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত মানুষ গড়া অসম্ভব।
আগামীর বাংলাদেশে আমরা এমন এক শিক্ষাঙ্গন চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সাথে যুক্তিতর্ক করবে, স্বাধীনভাবে প্রশ্ন তুলবে এবং গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে। শুধু বড় বড় শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং মফস্বল ও গ্রামবাংলার জনপদের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও যেন মুক্তবুদ্ধির এই হাওয়া বইতে পারে—তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষকরা যেন নির্ভয়ে জ্ঞান দান করতে পারেন এবং শিক্ষার্থীরা যেন কোনো অদৃশ্য চাপের ভয় ছাড়াই তাদের সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে পারে। যখন দেশের তৃণমূল থেকে তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বর মুক্ত হবে, তখনই কেবল একটি জাতি প্রকৃত অর্থে স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাশীল হতে পারবে।
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরিতে প্রযুক্তির ব্যাপক অপব্যবহার করা হয়েছে। নজরদারি সফটওয়্যার এবং সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মত প্রকাশের অধিকারকে সংকুচিত করা হয়েছিল। কিন্তু একটি আধুনিক ও স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের প্রয়োজন প্রযুক্তির মাধ্যমে দমন নয়, বরং ডিজিটাল লিটারেসির প্রসার। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে যে, গুজব বা অপপ্রচার ঠেকানোর প্রকৃত উপায় কণ্ঠরোধ বা ইন্টারনেট শাটডাউন করা নয়, বরং সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। ইন্টারনেটের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে নয়, বরং এর গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের মাধ্যমেই একটি বুদ্ধিদীপ্ত ও সচেতন জাতি গঠন সম্ভব। প্রযুক্তি যখন দমনের হাতিয়ার না হয়ে ক্ষমতায়নের মাধ্যম হবে, তখনই আমরা প্রকৃত ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল পাব।
কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। যেমন-
১. আইনি সংস্কার: সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো সকল দমনমূলক আইন অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। মানহানির মামলায় কারাদণ্ডের বিধান তুলে দিয়ে কেবল দেওয়ানি প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
২. গণমাধ্যম কমিশন: গণমাধ্যমকে কর্পোরেট বা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে একটি স্বায়ত্তশাসিত ও শক্তিশালী গণমাধ্যম কমিশন গঠন করতে হবে। বিটিভি বা বেতারের মতো রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমগুলোকে দলীয় প্রচারযন্ত্রের বদলে জনস্বার্থের বাহকে পরিণত করতে হবে।
৩. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: বাক ও মত প্রকাশের কারণে কোনো নাগরিক হয়রানির শিকার হলে বিচার বিভাগকে তার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে দাঁড়াতে হবে। নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগই নাগরিকদের নির্ভয় হওয়ার সাহস জোগাতে পারে।
৪. সংবিধানের সুরক্ষা: বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এটি সরকারের কোনো দয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘প্রত্যেকেরই কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজের মতামতে অটল থাকার অধিকার রয়েছে।’ বাংলাদেশ এই সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে দায়বদ্ধ। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা কেবল নৈতিক বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথেও যুক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের GSP প্লাস সুবিধা কিংবা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব—সবই নির্ভর করে একটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর। ভয়ের সংস্কৃতি বজায় রেখে আমরা কখনোই একটি উন্নত ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারব না।
পরিশেষে বলতে পারি, ভয় দেখিয়ে মানুষকে শাসন করা যায়, কিন্তু সমাজকে এগিয়ে নেওয়া যায় না। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান আমাদের একটি সুযোগ করে দিয়েছে রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজানোর। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে একজন সাধারণ নাগরিকও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির সমালোচনা করতে দ্বিধা করবে না। যেখানে কার্টুনিস্টের তুলি বা কবির কলমকে কোনো আইন দিয়ে শৃঙ্খলিত করা হবে না।
ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে মত প্রকাশের স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণই হোক আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। মনে রাখতে হবে, ভিন্নমতের স্বাধীনতা মানেই বিশৃঙ্খলা নয়, বরং এটিই হলো উন্নতির চাবিকাঠি। কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করা মানে রাষ্ট্রের হৃৎপিণ্ড বন্ধ করে দেওয়া। আজ সময় এসেছে সেই বাঁধন মুক্ত করার। মুক্তচিন্তার বাংলাদেশই হোক আমাদের আগামীর পরম গন্তব্য।
১৮ কোটি মানুষের স্বপ্ন আজ একটিই—ভয়মুক্ত নিঃশ্বাসে বেঁচে থাকা, নির্ভয়ে কথা বলতে এবং লিখতে পারা।
ঢাকা/তারা//