Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ০৩ মার্চ ২০২১ ||  ফাল্গুন ১৮ ১৪২৭ ||  ১৮ রজব ১৪৪২

করোনার টিকা নেওয়ার আগে পরে কী করতে হবে

মনিরুল হক ফিরোজ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৫৪, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১২:৫৭, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১
করোনার টিকা নেওয়ার আগে পরে কী করতে হবে

দেশজুড়ে করোনাভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয় গত ৭ ফেব্রুয়ারি। টিকা নিয়ে মানুষের মনে রয়েছে নানান প্রশ্ন। কারা এই টিকা নিতে পারবেন, কারা পারবেন না, টিকা নিলে কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে, টিকা নেওয়ার আগে কী করণীয়, পরে কী করণীয় ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ কার্ডিওভাস্কুলার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ডা. এস এম মোস্তফা জামানের সঙ্গে কথা হয় রাইজিংবিডির। উল্লেখ্য দেশে চিকিৎসক দম্পতি হিসেবে সর্বপ্রথম করোনার টিকা নেন ডা. এস এম মোস্তফা জামান এবং তার স্ত্রী ডা. কানিজ ফাতেমা।

রাইজিংবিডি: বাংলাদেশে কোন দেশের তৈরি করোনার টিকা দেওয়া হচ্ছে?

ডা. এস এম মোস্তফা জামান: আমাদের দেশে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রোজেনেকার তৈরি টিকা দেওয়া হচ্ছে। এটি উৎপাদন করেছে ভারতের বিখ্যাত সেরাম ইনস্টিটিউট।

রাইজিংবিডি: চিকিৎসক দম্পতি হিসেবে আপনারা সর্বপ্রথম করোনার টিকা নিয়েছেন। শুরুতে অনেকের মনে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির বিষয়টি কাজ করছিল। এক্ষেত্রে আপনাদের মনোভাব কী ছিল?

ডা. এস এম মোস্তফা জামান: চিকিৎসক হিসেবে করোনার এই টিকার ব্যাপারে আমাদের শুরু থেকেই বিশ্বাস ছিল। তাই কোনো ধরনের গুজবে আমরা বিচলিত হইনি। টিকা নিলে মুখ বাঁকা হয়ে যেতে পারে- এমন ভয়ের কথাও কেউ কেউ শুনিয়েছেন। কিন্তু আমরা জানি, এগুলো বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো তথ্য নয়। এ ছাড়া নতুন এই টিকায় শরীরে কেমন প্রতিক্রিয়া হয়- তা আগে দেখে এরপর আমাদের টিকা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য ছিল- নিরাপদ এই টিকা গ্রহণ করে অন্যদের মনের ভয় কাটানো, অন্যকে উব্ধুদ্ধ করা। টিকা নেওয়ার পর সারাদিনের স্বাভাবিক সব কাজ করেছি। রোগী দেখেছি, সার্জারি করেছি, কোনো সমস্যা হয়নি।

রাইজিংবিডি: করোনার টিকা কারা নিতে পারবেন? দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন রোগে যারা ভুগছেন তারা এই টিকা নিতে পারবেন কিনা?

ডা. এস এম মোস্তফা জামান: করোনার টিকা সবাই নিতে পারবেন। দীর্ঘমেয়াদী রোগে যারা ভুগছেন যেমন উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস, হার্টে রিং পরেছেন বা বাইপাস করেছেন তারাও নিতে পারবেন। অ্যাজমা রোগী টিকা নিতে পারবেন, এমনকি ক্যানসার রোগী যারা কেমোথেরাপি নিচ্ছেন কিন্তু স্বাভাবিক আছেন তারাও নিতে পারবেন। এসব রোগ থাকার পরও একজন রোগী যদি স্থিতিশীল থাকে তাহলে তার টিকা নিতে বাধা নেই। যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই কম, যেমন গুরুতর ক্যানসার রোগী বা শয্যাশায়ী রোগী, তারা বাদে সবাই টিকা নিতে পারবেন।

রাইজিংবিডি: করোনার টিকা নিতে পারবেন না কারা?

ডা. এস এম মোস্তফা জামান: যাদের বয়স ১৮ বছরের কম, গর্ভবতী নারী বা শিশুকে দুগ্ধপান করান এমন নারীদের করোনার টিকা দেওয়া হচ্ছে না। কারণ তাদের ওপর এই টিকার ট্রায়াল পরিচালিত হয়নি। তবে শিশুকে দুগ্ধ দান করছেন এমন নারী যাদের কোভিড-১৯ রোগীর সংস্পর্শে আসতে হয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে টিকা নিতে পারবেন। বাড়িতে অথবা হাসপাতালে শয্যাশায়ী রোগীরা করোনার টিকা নিতে পারবেন না। আবার যারা করোনায় আক্রান্ত আছেন তারাও আপাতত টিকা নিতে পারবেন না। আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টাইনের সময় শেষ হওয়ার পর তারা টিকা নিতে পারবেন।

রাইজিংবিডি: করোনার টিকায় শরীরে কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে?

ডা. এস এম মোস্তফা জামান: অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রোজেনেকার যে টিকা আমাদের দেশে এসেছে, সেটি নিলে খুব সামান্য কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। যেমন যে জায়গায় টিকা দেওয়া হয়েছে সেখানে কিছুটা ব্যথা হতে পারে। কারো জ্বর বা রাতে কাপুনি দেখা দিয়েছে, বমি বমি ভাব হয়েছে, শরীর ব্যথা হয়েছে। এর বাইরে আসলে বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। অনেকে ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে আতঙ্কে বুকব্যথা অনুভব করেন। কিন্তু আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ছোটখাটো যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়, সেগুলো যেকোনো টিকা নিলেই হয়ে থাকে।

রাইজিংবিডি: টিকা নেওয়ার জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে?

ডা. এস এম মোস্তফা জামান: মারাত্মক কোনো অ্যালার্জি না থাকলে, এর আগে টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে মারাত্মক কোনো জটিলতা না হয়ে থাকলে, ভয়ের কিছু নেই। তারপরও কিছু বিষয় মেনে চলা উচিত। যেমন:
কোনো খাবারে অ্যালার্জি থাকলে সে ধরনের খাবার টিকা নেওয়ার আগে খাওয়া থেকে বিরত থাকা ভালো।
নিবন্ধনপত্রে সঠিক মেডিকেল হিস্ট্রি দিতে হবে।
জ্বর থাকলে টিকা নেওয়া যাবে না।
টিকা নেওয়ার আগে থেকেই বেশি করে পানি পান করতে হবে।
যাদের ডায়াবেটিস আছে, তারা ডায়াবেটিসের খাদ্যতালিকা মেনে চলবেন। উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের যে ওষুধগুলো আছে সেগুলো যেন বাদ না যায়।
এছাড়া অন্যান্য যে ধরনের ওষুধ খাচ্ছেন সবই খাবেন। আলাদা কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না করোনার টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে। এই টিকা অনেক নিরাপদ।
টিকাকেন্দ্রে ঢিলেঢালা পোশাক পরে গেলে টিকা নিতে সুবিধা হবে।
টিকাকেন্দ্রে যাওয়ার সময় সঙ্গে কাউকে নিয়ে যেতে পারেন। কোনো স্বজন পাশে থাকলে মনে সাহসের একটা জায়গা থাকবে।

রাইজিংবিডি: টিকা গ্রহণের পর কোন ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে?

ডা. এস এম মোস্তফা জামান: টিকা নেওয়ার পর জ্বর বা ব্যথা হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করতে পারেন। বমির ক্ষেত্রে অমিডন জাতীয় ওষুধ খেতে পারেন। বেশি জ্বর, ডায়রিয়া বা রাতে কাপুনি যদি হয়, সেজন্য জরুরি কিছু ওষুধ বাসায় রাখতে হবে। তবে শারীরিক কোনো সমস্যা বোধ করলে চিকিৎসকের সঙ্গে অথবা স্বাস্থ্য বাতায়নের ১৬২৬৩ নম্বরে যোগাযোগ করলে পরামর্শ পাওয়া যাবে। মনে সাহস এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। তবে সবার মনোবল এক নয়। অনেকে একটু ভয়ে থাকেন। তাদেরকে বলবো, বেশি করে পানি পান করবেন, ফলের রস একটু বেশি পান করবেন, সুষম খাবার খাবেন, রাতের ঘুম যেন পর্যাপ্ত হয় সেটি নিশ্চিত করবেন। এছাড়া দৈনন্দিন রুটিনে কোনো ওষুধ থাকলে চালিয়ে যাবেন। যেমন ডায়াবেটিসের ওষুধ, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, কিডনি রোগের ওষুধ ইত্যাদি।

চা পানের অভ্যাস থাকলে চা পান করতে পারবেন। স্বাভাবিক সব কিছুই করতে পারবেন। পরিবার নিয়ে বাইরে যেতে চাইলে সেটাও যেতে পারেন, যদি মনোবল শক্ত থাকে। তবে টিকা গ্রহণের পর ২৪ ঘণ্টা বাসায় বিশ্রামে থাকা ভালো। ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার পর সাধারণত বড় কোনো সমস্যা আমরা কারো পাইনি।

রাইজিংবিডি: করোনার টিকা বাধ্যতামূলক করা উচিত কিনা?

ডা. এস এম মোস্তফা জামান: আমরা সবাই যদি করোনার টিকা গ্রহণ করি তাহলে আগামী দিনগুলোতে খুব ভালোভাবে করোনামুক্ত হতে পারব। নিজের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে পারব। নিজের দেশকে সুরক্ষা দিতে পারব। নতুন প্রজন্মকে একটা নতুন পৃথিবী উপহার দিতে পারব। করোনা অনেক ক্ষতি করলেও কিছু ক্ষেত্রে নতুন কিছু শিখিয়েছে। যেমন হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানতাম না। করোনা সেটা শিখিয়েছে। করোনা চলে যাওয়ার মানে এই না যে, আবার আসতে পারবে না। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার গুরুত্বের ব্যাপারে শিখিয়েছে। 

প্রতিবছর হাসপাতালগুলোতে ডায়রিয়া রোগীদের ভিড় লেগে থাকত। কিন্তু হাত ধোয়ার অভ্যাসের কারণে করোনাকালীন ডায়রিয়া রোগী ছিল না বললেই চলে। সুতরাং আমরা যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি এবং সবাই মিলে করোনার ভ্যাকসিন গ্রহণ করি তাহলে শুধু করোনা নয়, আরো অনেক রোগমুক্ত সুন্দর একটি পৃথিবীর দেখা পাবো।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ করোনার টিকা নিচ্ছে। অনেক দেশ এখনো টিকা পায়নি, মুখিয়ে আছে। কিন্তু আমাদের দেশে সময় মতো করোনার টিকা এসেছে। এটা আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। 

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়