গাইবান্ধা-৫: কঠিন সমীকরণে বিএনপি-জাতীয় পার্টি, সংযোগে ব্যস্ত জামায়াত
গাইবান্ধা প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
গাইবান্ধা-৫ আসনের বিএনপি প্রার্থী ফারুক আলম সরকার, স্বতন্ত্র প্রার্থী নাহিদুজ্জামান নিশাদ, জাতীয় পার্টির প্রার্থী শামিম হায়দার পাটোয়ারী, স্বতন্ত্র প্রার্থী এ এইচ এম গোলাম শহীদ রঞ্জু, জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল ওয়ারেছ
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধার ৫টি আসনের সবকটি আসনে দ্বিমুখী লড়াই থাকলেও গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনের নির্বাচনে কঠিন সমীকরণ দেখা দিয়েছে। এই আসনে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির সাবেক নেতা। আবার জাতীয় পার্টিকে লড়তে হবে তাদেরই দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিরুদ্ধে।
গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসন থেকে ৯ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ফারুক আলম সরকার, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে আব্দুল ওয়ারেছ, জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকে শামীম হায়দার পাটোয়ারী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকে আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) কাঁচি প্রতীকে রাহেলা খাতুন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে প্রতীকে শ্রী নির্মল, স্বতন্ত্র হাঁস প্রতীকে নাহিদুজ্জামান নিশাদ, মোটরসাইকেল প্রতীকে এ এইচ এম গোলাম শহীদ রঞ্জু ও ঘোড়া প্রতীকে মেহেদী হাসান বিদ্যুৎ।
স্থানীয় ভোটার, কর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই আসন থেকে বিএনপির মনোনিত প্রার্থী ফারুক আলম সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি নাহিদুজ্জামান নিশাদ। ২০০০ সালের পর থেকে ফুলছড়ি-সাঘাটা এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন মূলক কর্মকাণ্ড ও তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কারণে এখানকার ভোটারের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য, দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি তৃণমূল পর্যন্ত নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। আবার ফারুক আলম সরকারও নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত। বিএনপির একটি অংশ গোপনে নিশাদের হয়ে কাজ করতে পারে বলেও ধারণা স্থানীয় ভোটারদের। এসব কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিশাদ নির্বাচন করায় বিএনপির ভোট দুটি ভাগে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী নাহিদুজ্জামান নিশাদ বলেন, “আমাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, যেটা দুঃখজনক। আমি আশাবাদী, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও দলমত নির্বিশেষে ফুলছড়ি-সাঘাটার মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে।”
অন্যদিকে, ফারুক আলম সরকারের পক্ষেও বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বেশিরভাগ নেতাকর্মী কাজ করছেন। যদিও মনোনয়ন পাওয়ার পর ফুলছড়ি উপজেলা বিএনপির সভাপতি নান্নু মিয়া এর বিরোধিতা করে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে হাইকমান্ড বরাবর লিখিত আবেদন করেছিলেন। ফারুক আলম সম্পর্কে স্থানীয় কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের ভাষ্য, এলাকায় ফারুক আলমের ব্যক্তি গ্রহণযোগ্যতাও আছে। তবে, দলীয় কোন্দল ঠিক করে দুই উপজেলার সব নেতাকর্মীকে ধানের শীষের পক্ষে মাঠে রাখাটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার আগেও নিশাদ মাঠে সক্রিয় ছিলেন।
বিএনপি মনোনিত প্রার্থী ফারুক আলম সরকার জানান, নিশাদ এখন বিএনপির কেউ নয়। দেশের নাগরিক হিসেবে তিনি স্বতন্ত্র ভোট করতেই পারেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “দলে বর্তমানে আর কোনো মতপার্থক্য নেই। নিশাদের কারণে ভোটের হিসেব নিকেশে তেমন প্রভাব পড়বেনা।”
এদিকে এক সময়ের জাতীয় পার্টির দুর্গ খ্যাত এই আসনে লাঙল প্রতীকে দুবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ এইচ এম গোলাম শহীদ রঞ্জুও ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারেন। দল থেকে এবার রঞ্জুকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এখানে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট শামিম হায়দার পাটোয়ারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। যেকারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রঞ্জু নির্বাচন করায় জাতীয় পার্টির ভোটেও বিভক্তি সৃষ্টি হবে। এসব কারণে এই আসনে জাতীয় পার্টিও নিজেরাই নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী।
এ ব্যাপারে জানতে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী শামিম হায়দার পাটোয়ারী এবং অ্যাড. এ এইচ এম গোলাম শহীদ রঞ্জুর সঙ্গে যোগাযোগ করেও কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই জটিল পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল ওয়ারেছ অনেকটাই নির্ভার। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির ভোট টানাটানির সুযোগকে কাজে লাগাতে চাইছেন তারা। এই দলটি তুলনামূলকভাবে সু-সংগঠিত ও একক অবস্থান ধরে রেখে মাঠে সক্রিয় রয়েছে। দলটির নৈতিক রাজনীতি, সু-শৃঙ্খল কর্মী এবং চরাঞ্চলের মৌলিক সমস্যা সমাধানের কথা বলে প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াত।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল ওয়ারেছ বলেন, “ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার কিছু কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। কিছু কিছু এলাকায় টাকার লেনদেনের কথা শোনা যাচ্ছে। যদিও লোকমুখে শোনা কথা। এছাড়া বিএনপি বা জাতীয় পার্টির ভোটার নিয়ে ভাবছি না। আমাদের গণসংযোগ চলছে। ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।”
সব মিলিয়ে গাইবান্ধা-৫ আসনের নির্বাচন এবার এক জটিল সমীকরণ সৃষ্টি করেছে। এখানে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির লড়াই, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং শেষ পর্যন্ত যিনি কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন, তিনিই এই আসনে নির্বাচিত হতে পারবেন বলে ধারণা স্থানীয় ভোটার ও নেতাকর্মীদের।
গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৬০ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ২৭৫ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ৯৮২ জন। এই আসনেও পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটার ব্যবধান বেশি। হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৩ জন।
ঢাকা/মাসুম/ফিরোজ