Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ১৩ জুন ২০২১ ||  জ্যৈষ্ঠ ৩০ ১৪২৮ ||  ০১ জিলক্বদ ১৪৪২

করোনার ভারতীয় ধরন সম্পর্কে যা জানা গেছে

এস এম ইকবাল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:২৫, ৯ মে ২০২১   আপডেট: ১০:৩২, ৯ মে ২০২১
করোনার ভারতীয় ধরন সম্পর্কে যা জানা গেছে

বর্তমানে ভারতে করোনাভাইরাসের যে ধরনটি ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে ও মৃত্যু ঘটাচ্ছে তা হলো বি ১৬১৭। এটা ২০২০ সালের অক্টোবরে ভারতের মহারাষ্ট্রে প্রথম শনাক্ত হয়। ভারতীয় এই ধরনটি 'ডাবল মিউট্যান্ট' ভ্যারিয়েন্ট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ধরনটির সংক্রমণে ভারতে প্রায় প্রতিদিনই শনাক্ত ও মৃত্যুতে নতুন রেকর্ড হচ্ছে। অনেক চিকিৎসক এই ডাবল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ধরনটি কেবল ভারতের প্রতিবেশী দেশ নয়, দূরবর্তী দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও ধরনটিতে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। গতকাল (৮ মে) বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এই তথ্য জানিয়েছে। করোনার ভারতীয় ধরন সম্পর্কে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে। চলুন এ সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন কেমন প্রভাব ফেলতে পারে?

কিছু বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন যে, করোনার ভারতীয় ধরনটি ‘সুপার মিউট্যান্ট’ ভ্যারিয়েন্টে রূপান্তরিত হয়ে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাতে পারে। ভারতের ডাবল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টুইটারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইতোমধ্যে জার্মানি, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, নেপাল ও অন্যান্য দেশে ধরনটি ছড়িয়ে পড়েছে। আপাতদৃষ্টি মনে হচ্ছে, এই ডাবল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট করোনাভাইরাসের অন্যান্য ধরনের তুলনায় বেশি সংক্রামক ও বিপজ্জনক।

ভাইরাসের মিউটেশন বা পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভাইরাস প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে নতুন বা ভিন্ন ধরন সৃষ্টি করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব মিউটেশন উদ্বেগজনক নয়। অনেকসময় মিউটেশন ঘটার ফলে ভাইরাস আরো দুর্বল হয়ে যায়। কিছুক্ষেত্রে মিউটেশনের কারণে ভাইরাস আরো বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তখন ইতোমধ্যে আবিষ্কৃত টিকা অথবা ভাইরাসের মূল ধরনে সৃষ্ট সংক্রমণে অর্জিত অ্যান্টিবডি অকার্যকর হয়ে পড়ে।

করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন এতটা বিপজ্জনক কেন?

গবেষকরা জানিয়েছেন, ভারতীয় ধরনটির স্পাইক প্রোটিনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মিউটেশন হয়েছে। স্পাইক প্রোটিন কোনো ভাইরাসকে মানব শরীরে প্রবেশ করাতে ও সংক্রমণ ঘটাতে ভূমিকা রাখে। শরীরে অ্যান্টিবডি না থাকলে অথবা টিকা গ্রহণে উৎপন্ন অ্যান্টিবডি কার্যকর না হলে ভাইরাসটি মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। গবেষকরা জানান যে, যারা মূল কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের অন্যান্য ধরন থেকে সুস্থ হয়েছেন অথবা টিকা নিয়েছেন তারাও ভারতের ডাবল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্টের ঝুঁকিতে আছেন। এর কারণ হলো, ধরনটিতে এত বেশি পরিবর্তন ঘটেছে যে শরীরের পক্ষে পূর্বেকার সংক্রমণ বা টিকা গ্রহণে উৎপন্ন অ্যান্টিবডি দিয়ে এটাকে পরাস্ত করা অসম্ভব হতে পারে।

করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরনের বিশেষত্ব কী?

করোনাভাইরাসের ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের (ডাবল মিউট্যান্ট) বিশেষত্ব রয়েছে। ধরনটিতে যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মিউটেশন পাওয়া গেছে তা হলো E484Q এবং L452R। এগুলো সম্পূর্ণরূপে নতুন নয়। E484Q হলো E484K এর অনুরূপ- মিউটেশনটি করোনাভাইরাসের দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন বি১৩৫৩ এবং ব্রাজিলের ধরন পি১-এ দেখা গেছে। অন্যদিকে করোনাভাইরাসের ক্যালিফোর্নিয়ান ভ্যারিয়েন্টে L452R শনাক্ত হয়েছে। একটি জার্মানি ভ্যারিয়েন্টেও এটা পাওয়া গেছে।

জিসিএস হাসপাতালের প্যাথলজির অধ্যাপক উর্বেশ শাহ করোনাভাইরাসের ডাবল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে বলেন, 'বি১৬১৭ ধরনটিতে ১৭টিরও বেশি মিউটেশন রয়েছে, যেখানে ছয়টি হলো স্পাইক জিনে। এর মধ্যে দুটি মিউটেশন (L452R এবং E484Q) আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি (L452R) পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্রের ধরনে এবং দ্বিতীয়টি (E484Q) পাওয়া গেছে ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনে। এখানে (ভারতে) একসঙ্গে উভয় মিউটেশনই রয়েছে। উভয় মিউটেশনই উচ্চ সংক্রামক। এগুলো ইমিউন সিস্টেমকে ফাঁকি দিতে পারে বলে সংক্রমণে বা টিকায় অর্জিত অ্যান্টিবডি ব্যর্থ হতে পারে।’

করোনাভাইরাসের চলতি টিকা কি ভাইরাসটির ভারতীয় ধরন থেকে সুরক্ষা দেবে?

এই বিষয়ে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। নেচারে প্রকাশিত একটি গবেষণা মতে, ভাইরাসের কিছু ধরন চলতি টিকাকে ফাঁকি দিতে পারে। একারণে টিকাকে অধিক কার্যকর করতে ভাইরাসের নতুন ধরনে দৃষ্ট পরিবর্তনের আলোকে টিকা তৈরি করতে হয়। চলতি টিকা গ্রহণে করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন সম্পূর্ণরূপে দমিত হবে কিনা তা এখনো নিশ্চিত না হলেও বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন যে সংক্রমণটি কিছুটা হলেও দুর্বল হবে।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অন্তর্গত ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহকারী অধ্যাপক আমেশ আদলজিয়া বলেন, ‘আমরা করোনাভাইরাসের যত ধরনই দেখি না কেন, চলতি টিকা গ্রহণের প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত। এতে সংক্রমণের ভয়াবহতা, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুহার কমতে পারে। টিকা শুধুমাত্র অ্যান্টিবডি উৎপাদনে প্ররোচনা যোগায় না, এটি টি সেল ইমিউনিটিকেও উদ্দীপ্ত করে। এটাও করোনাভাইরাসের নতুন নতুন ধরন থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।’ তাই টিকা পাওয়া গেলে টিকা নেয়ার কথা বিবেচনা করতে পারেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিকর খাবার খান ও সক্রিয় থাকুন।

ঢাকা/ফিরোজ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়