ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||  আশ্বিন ১২ ১৪২৯ ||  ০১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বাড়াচ্ছে ডেন-৪ ভ্যারিয়েন্ট

মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩৫, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২  
ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বাড়াচ্ছে ডেন-৪ ভ্যারিয়েন্ট

ফাইল ফটো

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর নতুন ভ্যারিয়েন্ট ডেন-৪ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সারা দেশেই টাইপ-৪ ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ডেঙ্গু আক্রান্তদের ৩০ জনের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দেখা গেছে, এদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ডেন-৪ ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত।

বর্তমানে বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বাড়ছে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৮১ জন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি থাকা ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৯৩ জনে। গত ৬ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এটি এ বছর এক দিনে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু।

জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে ছিল ডেঙ্গু পরিস্থিতি। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে আক্রান্ত হন ৩৫২ জন। মাসে গড় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭০.৪ জন। জুন মাসে হঠাৎ করেই বেড়ে যায় দ্বিগুণেরও বেশি। জুনে আক্রান্ত হন ৭৩৭ জন। জুলাই মাসে রোগীর সংখ্যা আরও ‍দ্বিগুণ হয়। এ মাসে আক্রান্ত হন ১ হাজার ৫৭১ জন। আগস্ট মাসে সারা দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫২১ জনে। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাতে পারে।

ডেঙ্গুর জিনোম সিকোয়েন্সিং নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের (বিসিএসআইআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সেলিম খান জানিয়েছেন, ডেঙ্গুর চারটি ভ্যারিয়েন্ট আছে। সেগুলো হলো—ডেন-১, ২, ৩ ও ৪। তুলনামূলক মারাত্মক হচ্ছে ডেন-৩। ২০১৯ সালে এ ভ্যারিয়েন্টের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১৭৯ জন মারা যান।

বাংলাদেশে ডেন-১, ২ ও ৩ এ তিন ধরনের ডেঙ্গু আগে থেকেই ছিল। এবার যুক্ত হয়েছে ভ্যারিয়েন্ট ডেন-৪। এডিস মশা স্থির পানিতে, যেমন: পরিত্যক্ত টায়ার, পানির বোতল, কনটেইনার, ফুলের টব, এয়ারকুলারের পানি ইত্যাদির মধ্যে বংশবৃদ্ধি করে। সাধারণত শহরাঞ্চলে রোগটি বেশি হয় বলে রাজধানীতে এ রোগীর সংখ্যা বেশি। এক রোগী থেকে অন্য মানুষের শরীরে সরাসরি ডেঙ্গু ছড়াতে পারে না। তাই রোগীর সংস্পর্শে গেলেই ডেঙ্গুও হয় না।

ডেঙ্গুর বিষয়ে মানুষ জানলেও এর যে গতি-প্রকৃতিতে পরিবর্তন হচ্ছে, সে সম্পর্কে জানা নেই অনেকের। ফলে, সবাইকে এ ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক থাকা উচিত। ডেঙ্গু রোগের চারটি সেরোটাইপের যেকোনো একটিতে আক্রান্ত হলে পরবর্তী সময় আরেকটি দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কারো ডেঙ্গু শনাক্ত হলেও কোন টাইপের, তা শনাক্ত করা হচ্ছে না। ফলে, ডেঙ্গু পরীক্ষার পাশাপাশি টাইপিং বের করাটাও জরুরি। সাধারণত তিন ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় মানুষ।

সাধারণ ডেঙ্গু: এই ডেঙ্গুতে প্রচণ্ড জ্বর হয়, যা ১০৪ থেকে ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্তও হতে পারে। জ্বর দুই থেকে সাত দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। সঙ্গে মাথাব্যথা, পেটব্যথা, বমি বমি ভাব, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি বা গিঁটে ব্যথা, শরীরে র‌্যাশ হতে পারে। এই ধরনের ডেঙ্গু হলে সমস্যা নেই। এতে সাধারণত মৃত্যু ঘটে না।

হেমোরেজিক: ডেঙ্গু হেমোরেজিকে জ্বর কমে যাওয়ার দু-তিন দিনের মধ্যে শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাল লাল র‌্যাশ বা রক্তবিন্দুর মতো দাগ দেখা যায়। এছাড়া, অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে মাড়ি বা নাক দিয়ে আপনা-আপনি রক্তক্ষরণ, রক্তবমি, কালো রঙের পায়খানা, ফুসফুসে বা পেটে পানি জমা ইত্যাদি। এই হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম: ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে হেমোরেজিক ফিভারের উপসর্গগুলোর পাশাপাশি রোগীর রক্তচাপ হঠাৎ কমে যায়, নাড়ির গতি বৃদ্ধি পায়, হাত-পা শীতল হয়ে আসে, রোগী নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এমনকি রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের জ্বর হলে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

জ্বর হলে করণীয় কী: যেকোনো জ্বরে আক্রান্ত রোগী যত বেশি বিশ্রামে থাকবে, যত বেশি তরল খাবার খাবে, তত দ্রুত জ্বর নিয়ন্ত্রণে আসবে। তাই, ডেঙ্গুর মূল চিকিৎসা প্রচুর তরল বা পানি গ্রহণ করা, পর্যাপ্ত বিশ্রামে থাকা ইত্যাদি। কোনো অবস্থায়ই শরীরে যেন তরলের ঘাটতি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যেকোনো জ্বরে ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপর তাপমাত্রা গেলেই তা কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে সাপোজিটরি ব্যবহার করতে হবে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ফরহাদ মনজুর বলেছেন, ‘জ্বর হলে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ খাবেন না। যেকোনো জ্বর তিন দিনের বেশি থাকলে, শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগ। তাই, এতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। আরেকটি ব্যাপার মনে রাখতে হবে—চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ব্যথার ওষুধ সেবন করা যাবে না। কেন না, হেমোরেজিক ডেঙ্গু হলে ব্যথার ওষুধ রক্তক্ষরণ বাড়িয়ে বিপদ ঘটাতে পারে।’

কখন হাসপাতালে নিতে হবে: ডেঙ্গুর চিকিৎসা বাড়িতেও সম্ভব। তবে রোগী বেশি দুর্বল বা শরীরের কোথাও রক্তবিন্দুর মতো দাগ, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, নাক বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার মতো যেকোনো লক্ষণ দেখা গেলে দেরি না করে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. সিয়াম চৌধুরী।

তিনি বলেছেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্তদের কারো পেটব্যথা বা ডায়রিয়া হলে সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে ভর্তি করানো উচিত। ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে দ্বিতীয়বার আক্রান্তরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন বলে সঙ্গে সঙ্গেই তাদের হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. গোলাম মোস্তফা সারওয়ার বলেছেন, ‘ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগ হলেও এর কার্যকর কোনো টিকা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই, রোগটি প্রতিরোধ করতে হলে যেকোনোভাবেই হোক, নিজেকে মশার কামড়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। এডিস মশা সাধারণত অল্প পানিতে, যেমন: টবের পানি, ফ্রিজের পেছনে জমে থাকা পানি ইত্যাদিতে ডিম পাড়ে। তাই, ফুলের টবসহ বাসার বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি নিয়মিত অপসারণ করুন। অন্তত তিন-চার দিন পর পর করা ভালো।’

শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. তাহমিনা বেগম বলেন, ‘এডিস মশা সাধারণত খুব সকালে ও বিকেলে বেশি কামড়ায়। এজন্য সব সময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করা উচিত। শিশুদের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখুন। কেননা, তারা মশা তাড়াতে পারে না বলে মশা তাদেরকে সহজেই কামড়ায়। এডিস মশা গাঢ় রঙের কাপড়ে বেশি আকৃষ্ট হয়। তাই শিশুদের হালকা রঙের কাপড় পরান। সম্ভব হলে ফুলহাতা জামা এবং হাত ও পায়ে মোজা পরান।’

ডেঙ্গু চিকিৎসায় নতুন গাইডলাইন: ডেঙ্গু চিকিৎসায় ইতোমধ্যে নতুন গাইডলাইন তৈরি করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। ডেঙ্গুর ধরন এবং প্রাথমিক আলামতের পরিবর্তনের কারণে চিকিৎসা গাইডলাইনেও বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, ডেঙ্গু রোগীকে কোনো অবস্থাতেই নতুন প্রটোকলের বাইরে অন্য কোনো চিকিৎসা দেওয়া যাবে না। নতুন গাইডলাইনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ডেঙ্গু রোগের ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনাই প্রধান চিকিৎসা। এ ক্ষেত্রে সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা অবশ্যই জাতীয় গাইডলাইন ২০১৮ অনুসরণ করে দিতে হবে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস ডেঙ্গুর পিক সিজন। সিটি করপোরেশনের তরফ থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। কিন্তু, আমাদের এই কার্যক্রমের পাশাপাশি নগরবাসী সচেতন না হলে, সহযোগিতা না করলে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া একটু কঠিনই হবে। ময়লা আবর্জনাযুক্ত ড্রেনের পানিতে এডিস মশা জন্মায় না। বরং এই মশা জন্মায় অল্প ও স্বচ্ছ পানিতে। তাই, প্রত্যেকে নিজের বাসা-বাড়ির জমে থাকা পানি পরিষ্কার করে ফেললে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কম হবেন। এ ব্যাপারে প্রত্যেক নগরবাসীকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটির সেন্ট্রাল রোডের স্থায়ী বাসিন্দা ইফতেখার আলম বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে সাধারণত ওষুধ স্প্রে করে বিকেল বা সন্ধ্যায়। কিন্তু যতদূর জানি, ডেঙ্গু মশা সকালে কামড়ায়। আর ম্যালেরিয়া মশা কামড়ায় বিকেলে বা সন্ধ্যার পর। তাই, ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমানোর জন্য সকালবেলা স্প্রে করা দরকার। এছাড়া, চার পাশে অসংখ্য ভবন তৈরি হচ্ছে। যেখানে সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো তদারকি নেই। সেসব ভবনের মালিকরাও উদ্যোগী হয়ে ঠিকমতো জমে থাকা পানি ফেলে দেন না। ফলে, এসব পানিতে মশার জন্ম বাড়ছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেছেন, ‘ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ছে। এটা যেমন উদ্বেগের, তেমনই এটাও ঠিক যে, গত বছরের তুলনায় এবছর সংক্রমণের হার কম। এ বছর (১৭ সেপ্টেম্বর) ডেঙ্গুতে ৪৪ জন মারা গেছেন। আমরা চাই না, একটি মানুষও ডেঙ্গুতে প্রাণ হারাক। ডেঙ্গু আক্রান্ত সবার খবর আমরা পাই না। আমরা সেসব রোগীদের খবর পাই, যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাই, কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ভালো। হাসপাতালে থাকলে একটা সেবার মধ্যে থাকে এবং তার মৃত্যু ঝুঁকিটা কমে যায়।’

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ১২৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, ফেব্রুয়ারি মাসে ২০ জন, মার্চ মাসেও ২০ জন, এপ্রিল মাসে ২৩ জন। এরপর মে মাস থেকে আবারও সংক্রমণ কিছুটা ঊর্ধ্বগামী হতে থাকে। ওই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৬৩ জন, জুন মাসে ৭৩৭ জন, জুলাই মাসে ১ হাজার ৫৭১ জন এবং আগস্ট মাসে ৩ হাজার ৫২১ জন। সেপ্টেম্বর মাসের ৬ তারিখ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৮৫০ জন। এ পর্যন্ত (১৭ সেপ্টেম্বর) মারা গেছেন ৪৪ জন। ২০১৯ সালে সারাদেশে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে মারা যান ১৭৯ জন।

মেয়া/রফিক

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়