ঢাকা     রোববার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৯ ||  ০৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের খবর পৌঁছে দিন’

রফিকুল ইসলাম মন্টু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:০৩, ৫ নভেম্বর ২০২২   আপডেট: ১৯:১০, ৫ নভেম্বর ২০২২
‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের খবর পৌঁছে দিন’

বিরাণ জেলেগ্রামে এখন কিছুই নাই। নিঃস্ব কাজলী জলদাস তাকিয়ে আছেন শূন্য ভিটের দিকে 

‘আমাদের খবরটা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দিন। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং আমাদের সারাজীবনের উপার্জিত সব সম্পদ কেড়ে নিয়েছে। মাছ ধরার জাল-নৌকা ভেসে গেছে। উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা বেড়িবাঁধের ধারে ঝুপড়ি বানিয়ে বসবাস করছি। এখন আমরা ছেলেমেয়ে নিয়ে কোথায় যাবো?’

জোছনা রানী জলদাস এভাবেই কষ্টের কথাগুলো বলছিলেন। ভর-দুপুরে তিনি ঘরের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। যেখানে তার ঘর ছিল, সেখানে এখন ঘরের চিহ্নও নাই; পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ। টিন, কাঠ, বাঁশ এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া অন্যান্য মালামালের স্তূপ এলাকাজুড়ে। জেলেগ্রামের পাশের পুকুর দুটোতেও ভাসছে ঘরের মালামাল। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সদস্যরা ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে তাদের প্রয়োজনীয় মালামাল খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলেন। জোছনা রানী তাদেরই একজন।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং যে রাতে আঘাত হানলো এর আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়েছিলেন জোছনা রানী। ঘরের সব মালামাল রেখে স্বামী নিখিল জলদাসসহ ঘরের ছয় সদস্য নিয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন অন্যত্র। প্রাণ বাঁচলেও তাদের মালামাল যে মোটেই রক্ষা করা সম্ভব হবে না কল্পনাও করেননি এই নারী। পরদিন ভোরে ঘরের সামনে এসে সেই দৃশ্যই তাদের দেখতে হয়েছে যা তারা কল্পনাও করেননি। সেদিন ভোরের দৃশ্য মনে করে জোছনা বলেন, ‘এখানে যে কোনো ঘর ছিল সেটা বোঝার উপায় ছিল না। সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।’

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় বেড়িবাঁধের বাইরে সমুদ্রের পাড়ে এই জেলেগ্রাম। এটি চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেড থানার আকমল আলী সড়ক এলাকায়। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এর রাতে এই জেলেগ্রামের প্রায় আড়াইশ’ ঘর পানিতে ভেসে গেছে। ঘরের আসবাবপত্রও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। পরিবারগুলো এখন খোলা আকশের নিচে বসবাস করছে। পুরো জেলেগ্রাম নিশ্চিহ্ন। যেখানে রাতদিন ছিল কোলাহল, প্রতিটি ভোর মুখর হতো সমুদ্র থেকে মাছের ঝুড়ি নিয়ে আসা জেলেদের পদচারণায়, সেই গ্রাম এখন নিথর। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে জেলেদের স্বপ্ন। 

বিরাণ জেলেগ্রাম। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এখানকার বাড়ি-ঘর ভাসিয়ে নিয়েছে  

খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় গ্রহণকারী শ্রীচরণ জলদাস বলেন, ‘সোমবার (২৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে আটটার দিকে ঝড়োহাওয়া শুরু হয়। ক্রমেই তীব্রতা বাড়তে থাকে। আমরা প্রাণ নিয়ে নিরাপদে গিয়েছি। কিন্তু সমুদ্রের প্রবল স্রোতে আমাদের বাড়িঘর ভেসে যায়। আমরা আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পেরেছি। এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছি। কোথায় যাবো, কি খেয়ে বাঁচবো, জানি না।’

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এর পরে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেগ্রামে সহায়তার পরিমাণ খুবই কম। দু’চার বেলা রান্না করা খাবার, কিছু চাউল, তাঁবুর জন্য কয়েকটি ত্রিপল আর থালাবাটির বাইরে খুব বেশি সহায়তা যায়নি সেখানে। এ কারণে ক্ষুব্ধ তারা। সেই ক্ষোভ ঝরে গলায় ক্যামেরা আর হাতে নোটবুকওয়ালা মানুষদের সামনে। অনেক কষ্টের মাঝে গলায় ক্যামেরা ঝোলানো মানুষ দেখলে জোছনা রানীর কষ্টটা যেন আরো কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ‘কী করবেন ছবি তুলে? কী করবেন আমাদের কথা লিখে? পারবেন আমাদের কথাটা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দিতে?’ প্রশ্নের পর প্রশ্ন জোছনা রানীর। দাবি তার একটাই, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেড়িবাঁধের ভেতরে সরকার আমাদের পুনর্বাসন করুক। শুধু জোছনা রানী নয়, এই দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত সব মানুষ।  

খোলা আকাশের নিচে বসবাস

চট্টগ্রাম নগরের আকমল আলী সড়কের নিকটে বেড়িবাঁধের বাইরে খোলা আকাশের নিচে এখন সারি সারি ঘর। কারো ঘরের ছাদ পলিথিনের, কারো শাড়ি কাপড়ের। আবার কারো ঘরে ছাদই নাই! শাড়ি কিংবা লম্বা কোনো কাপড়ের বেড়া দিয়ে মানুষগুলো বসবাস করছে। কেউবা দিয়েছেন জালের বেড়া। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এর সেই ভয়াল রাতে শেষ সম্বলটুকু হারানোর পরে সহস্রাধিক মানুষের ঠাঁই হয়েছে এই খোলা আকাশের নিচে। নিঃস্ব পরিবারগুলো এখন অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাচ্ছে।

সিত্রাং-এ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বেড়িবাঁধের ঢালে তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছে 

কিশোরীবালা জলদাসের বয়স ৬০ পেরিয়েছে। বেড়িবাঁধের ঢালে পলিথিনের নিচে তার ঘর। ঘরের কিছু মালামাল চারপাশ ঘিরে রেখেছে। নিজের এবং পুত্রবধূ রিতারানীর দু’খানা শাড়ি দিয়ে থাকার স্থানটা ঘিরে দেওয়া হয়েছে। কিশোরীবালা থাকেন ছেলে হরিধর জলদাসের সাথে। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। নোয়াখালীর দ্বীপ হাতিয়ার রামচরণ থেকে এই পরিবার এখানে এসেছিল প্রায় ৩০ বছর আগে। প্রাকৃতিক বিপদ যেন এদের পিছু ছাড়ছে না। নদী ভাঙনে সব হারানোর পরে কিশোরীবালা এবং তাদের প্রতিবেশী আরো অনেক পরিবার এখানে এসেছিল। এখানেও বিপদের শেষ নেই। 

বেড়িবাঁধের ঢালে রাতে ঘুমানো এবং মালামাল সংরক্ষণের এক টুকরো স্থান পেলেও কিশোরীবালার তিনবেলা খাবার, সুপেয় পানি, টয়লেট- এসবের ব্যবস্থা হয়নি। সব জোড়াতালি দিয়ে। রিতা রানী বলছিলেন, ঘরের থালাবাটি, রান্নার চুলা, কাপড় সব ভেসে গেছে জোয়ারের প্রবল পানির তোড়ে। থালাবাটি আর রান্নার চুলা একজনের কাছ থেকে পেয়েছেন। সিত্রাং-এর পরে দু’তিন দিন সহায়তা পেয়েছেন রান্না করা খাবার, পানি, চাল, বিভিন্ন আসবাবপত্র ইত্যাদি। কিন্তু একেবারেই শূন্যে নেমে যাওয়া পরিবারগুলোর অভাব তাতে কতটা পূরণ করতে পারে! কিশোরীবালার পরিবারের প্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে এই ঘূর্ণিঝড়ে।  

চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ, মাঝখানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা তাঁবু টাঙিয়ে কোনোমতে দিনগুলো পার করছেন। অনেকে ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠার স্বপ্ন দেখছেন। ধারদেনা করে আবার সংসার গোছানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু অনেকের পক্ষেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন! ৬৫ বছর বয়সী শ্রীচরণ জলদাস বসেছিলেন বেড়িবাঁধের ঢালে তার অস্থায়ী ঘরে। ঘরের চারদিকে সব মালামাল এলোমেলো করে রাখা। দুই স্ত্রী সতীরানী ও গীতারাণী পাশেই বসেছিলেন। দুপুর প্রায় হয়ে এসেছিল, তখনো তারা জানেন না কি খাওয়া হবে। এই আকস্মিক বিপর্যয়ে প্রায় দশ লাখ টাকার মালামাল হারিয়েছেন শ্রীচরণ। পেশা মাছধরা, অথচ জাল-নৌকা সবই হারিয়েছেন। অনেকের নৌকা রক্ষা পেলেও জাল হারিয়েছেন প্রায় সবাই। কারণ সাইক্লোনের সময় সমুদ্রে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। জালসহ মাছধরার অন্যান্য সব উপকরণ জেলেদের ঘরেই গোছানো ছিল।

বিরাণ জেলেগ্রাম

এখানে একটি জেলেগ্রাম ছিল। রাত-দিন এই গ্রামটি মুখর হয়ে উঠত মানুষের কোলাহলে। কিন্তু এখন নিশ্চিহ্ন-বিরাণ। কতগুলো বাঁশ-কাঠ-টিনের স্তূপ। গ্রামের গা ঘেঁষে আছে কয়েকটি বড় আকারের পুকুর। পুকুরের পাড় থেকে জেলেদের ঘরগুলো নিমিষে পুকুরে পড়ে যায়। সিত্রাং আঘাতের পরদিন ভোরে সেই কোলাহলে মুখর জেলেগ্রামকে যেন আর কেউ চিনতেই পারছিল না। যে ভোর আসে বড়দের কাজে যাওয়া আর শিশুদের স্কুলে যাওয়ার ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে, সে ভোর এসেছিল কান্না নিয়ে। পরিবারগুলোর সারাজীবনে গচ্ছিত সব সম্পদ ভেসে গেছে জোয়ারের পানিতে। 

সমুদ্রপাড়ের এই নাজুক বেড়িবাঁধ জেলেগ্রামের সুরক্ষা দিতে পারছে না 

ফুলমালা জলদাস, সুনীল জলদাস, প্রাণপতি জলদাস, বিশ্বম্ভর জলদাস, মনা জলদাস, সুখী রানী জলদাস, কাজল জলদাস, দূরপতি জলদাস, সুজনা জলদাস কিংবা বিক্রম মাঝি জলদাস- কেউ বাদ নেই। সবাইকেই নতুন করে সংগ্রহ করতে হবে জাল-নৌকা। বসবাসের জন্য তৈরি করতে হবে ঘর। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা এখনো পুকুরের পানিতে তাদের ঘরের মালামাল খুঁজছেন। বিরাণ জেলেগ্রামের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অনেককেই দেখা গেল ঘরের আসবাবপত্র খুঁজতে। 

ভর-দুপুরে বেড়িবাঁধে কাপড়-ঘেরা বসবাসের স্থানে বসেছিলেন বিশ্বম্ভর জলদাস। খানিক দূরে তাঁবুর ভেতরে মালামাল গোছানোর কাজ করছিলেন তার স্ত্রী অবলা রানী জলদাস। ঘূর্ণিঝড়ের পরদিন থেকে তারা এখানে বসবাস করছেন। প্রথমে চারদিকে কাপড় দিয়ে ঘেরা ছিল। পরে একজনের কাছ থেকে একটি তাঁবু পেয়েছেন। নিকট এলাকায় স্বজনদের বাড়ি থেকে কয়েক বেলা খাবার এসেছে। কিন্তু কতদিন আসবে অন্যের বাড়ি থেকে খাবার, দুশ্চিন্তায় বিশ্বম্ভর। মাঝে মাঝে বিশ্বম্ভর তার ঘরের স্থানে যান, মালামাল খোঁজেন। নতুন করে আবার কবে ঘর হবে জানেন না।

জেলেগ্রাম ঘিরে এখানে ব্যবসা বাণিজ্য চলে। মাছঘাটে বিভিন্ন কাজে থাকেন এখানকার জেলেরা কিন্তু এখন অনেক জেলের বিপদ। অধিকাংশ পরিবারে উপার্জন নাই। বেড়িবাঁধের ধারে অনেকগুলো মাছধরার বিধ্বস্ত নৌকা পড়ে আছে। মা-ইলিশ ধরা নিষিদ্ধের সময়টুকু পেরুলেই অনেকেই আশা করেছিলেন জাল-নৌকা নিয়ে সমুদ্রে নামবেন। কিন্তু সেই সুযোগ এখনো অনেকের হয়নি। অথচ মাছধরা বন্ধ থাকলে জেলেদের পরিবারে খাবার জোটে না। আড়তদারের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়েছেন তারা। এই ঋণ তাদের সমুদ্রের দিকে টেনে রাখে। ঋণের জালে বছরের পর বছর আটকা পড়ে থাকে জেলে পরিবারগুলো। তাই তো প্রাকৃতিক বিপদে এত বড় ধ্বংসের পরেও বিরাণ জেলেগ্রামে আড়তদারের কড়া নজর।         

ঝুঁকি কেবল বাড়ছে

বাংলাদেশের উপকূলের সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র সম্প্রদায়গুলোর জীবন ও জীবিকায় ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক বিপদের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এই ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। নিরাপদ আশ্রয় ও জীবিকা নির্বাহের জন্য এরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়। কিন্তু সেখানেও নতুন সংকটের মুখোমুখি হদে হচ্ছে তাদের। মাছধরার উপর নির্ভরশীল উপকূলীয় জলদাস সম্প্রদায় তেমনই একটি সম্প্রদায়। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায়, বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ৫ লক্ষাধিক বলে বিভিন্ন গবেষণা সূত্র বলছে।

ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘরের উপকরণ সংগ্রহ করছেন এক জেলে     

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এ ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রামের এই জলদাস সম্প্রদায় এর আগেও অনেকবার প্রাকৃতিক বিপদের মুখে পড়েছে। আট বছর আগে এই জেলেগ্রামে আগুন লেগে সব বাড়ি পুড়ে গিয়েছিল। তখন বাড়িগুলো ছিল বেড়িবাঁধের উপরে। তখনও মেরিন ড্রাইভ হয়নি। মেরিন ড্রাইভ হবে, শহরের উন্নয়ন ঘটবে- এই অজুহাতে জেলে পরিবারগুলোকে বেড়িবাঁধ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় সমুদ্র পাড়ে। তখন কথা ছিল এই জেলেদের বেড়িবাঁধের ভেতরে পুনর্বাসন করা হবে। কিন্তু পুনর্বাসনের জন্য স্থান বরাদ্দ হলেও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া আর এগোয়নি। 

সমুদ্র পাড়ে বিধ্বস্ত জেলেগ্রামটি আগে অনেকটা নিরাপদে ছিল। সমুদ্র ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। সমুদ্রের ধারে ছিল বন। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপদের কারণে ধীরে ধীরে সমুদ্র জেলেগ্রামের নিকটে চলে আসে। বনগুলো অনেক আগেই বিলীন হয়ে গেছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে জেলেগ্রামটি। গ্রামের নিকটে সমুদ্রের পাড়ে আছে নাজুক বেড়িবাঁধ। জোড়াতালি দিয়ে এই বেড়িবাঁধ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এই বেড়িবাঁধ জেলেগ্রামের সুরক্ষা দিতে পারছে না। স্বাভাবিক জোয়ারের পানিতেও পানি ওঠে গ্রামের বাড়িঘরে।

পুনর্বাসনের দাবি

প্রত্যেকবার প্রাকৃতিক বিপদের পরে চাল-ডাল কিংবা রান্না করা খাদ্য সহায়তা পেতে চান না জেলেগ্রামের মানুষেরা। তাদের দাবি একটাই- পুনর্বাসন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বসবাসের স্থান করে দিলে তাদের কোনো সমস্যা থাকবে না। একথাই বলছিলেন জেলেগ্রামের নারী-পুরুষেরা। 

বিক্রম মাঝি ক্ষোভের সঙ্গে বলছিলেন, আমাদের পুনর্বাসনের প্রলোভন দেখিয়ে বেড়িবাঁধ থেকে সরিয়ে সমুদ্রের পাড়ে ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে। বেড়িবাঁধের উপরে থাকলে আমরা আজ এভাবে নিঃস্ব হতাম না। আমরা সরকারের কাছে কিছু চাই নাই। মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই। সাতদিনের বেশি আমরা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছি। দুইবেলা খাবার দিয়ে আমরা কি করবো? আমাদের মাথার উপরে চালা নাই। রাতে কুয়াশায় ভিজে যাই। শীতের আগে আমরা কাঁথা-কম্বল হারিয়ে ফেলেছি। 

জোছনা রানী দাঁড়িয়ে আছেন তার ঘরের ভিটেতে। কিন্তু তার ঘরের চিহ্নও নাই 

তেজেন্দ্র জলদাসের স্ত্রী আলো রানী বলেন, আমরা তো এই দেশের নাগরিক। ইলেকশন আসলে আমরা ভোট দেই। কিন্তু আমরা সুষ্ঠুভাবে বাঁচার অধিকারটুকু পাচ্ছি না। কার কাছে বলব কষ্টের কথা? আমরা তো রোহিঙ্গাদের চেয়েও খারাপ। রোহিঙ্গারা বসবাসের জন্য দালান পায়, আমরা এই দেশের নাগরিক হইয়া সমুদ্রের পাড়ে পরে আছি। আমাদের দিকে আপনারা একটু নজর দিন।   

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এর আঘাতে কাঁদছে জেলেগ্রাম। হাহাকার গ্রামের মানুষদের। সব চিন্তা তাদের একসঙ্গে। সংকটের কাল অতিক্রম এবং নতুনভাবে জীবন শুরু। এর উপরে আড়তদারদের দেনা শোধ তো করতেই হবে।    

ছবি: প্রতিবেদক

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়