ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||  ফাল্গুন ৯ ১৪৩০

রোহিঙ্গা শিশুরা আলো দেখছে মক্তব-মাদরাসা-হেফজখানায়

হাসান মাহামুদ, উখিয়ার শরণার্থী শিবির থেকে ফিরে || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৫০, ৩০ নভেম্বর ২০২৩  
রোহিঙ্গা শিশুরা আলো দেখছে মক্তব-মাদরাসা-হেফজখানায়

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রোহিঙ্গা শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে

যুগ যুগ ধরে দমন-পীড়নের কারণে জাগতিক শিক্ষা-দীক্ষা থেকে পিছিয়ে ছিলো মিয়ানমারের আরকান রাজ্যের মানুষগুলো। সেনাবাহিনীর নিপীড়নের মুখে দেশটি থেকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে এই ছয় বছরে অনেকটাই থিতু হয়েছেন। এরই মধ্যে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নিজেদের প্রচেষ্টা, বিভিন্ন রোহিঙ্গা সংগঠন ও ইসলামী গোষ্ঠী তৈরি করেছে হাজারেরও বেশি মক্তব, মাদরাসা এবং হেফজখানা। কিছু মক্তব, মাদরাসা তারা তৈরি করেছেন নিজেদের উদ্যোগেই। এসব ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে রোহিঙ্গা শিশুদের মধ্যে। 

তবে সংখ্যা না বাড়িয়ে বিদ্যমান মাদরাসাগুলোতে তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি সুযোগ-সুযোগ নিশ্চিতের পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। 

রোহিঙ্গা শিশুদের স্থানীয় স্কুলে ভর্তি হওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের। একাধিক ক্যাম্পে ৩ হাজার ৪০০টি লার্নিং সেন্টার রয়েছে, যার মধ্যে ২ হাজার ৮০০টি ইউনিসেফের সমর্থিত। তবে এসব স্কুল বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গা শিশুর জন্য পর্যাপ্ত নয়। এক্ষেত্রে নির্ভরতার শিক্ষা মাধ্যমে পরিণত হয়েছে মক্তব, মাদরাসা ও হেফজখানাগুলো। 

নিজস্ব উদ্যোগে মক্তব-মাদরাসা

ব্লকভিত্তিক মাদরাসা বা হেফজখানা থাকলেও নিজেরা দলবদ্ধ হয়ে গড়ে তুলেছেন মসজিদ, শিশুদের পড়ালেখার জন্য ফুরকানিয়া মাদরাসা ও হেফজখানা। অনেকে নিজের ঘরে গড়ে তুলেছে ছোটখাটো মাদরাসা। আরবি শিক্ষার পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ওয়াজ নসিহতেরও ব্যবস্থা করা হয়।

তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, যেসব মক্তব-মাদরাসা ব্লকভিত্তিক বা ইউনিটভিত্তিক নিজেদের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে, সেগুলোতে সুযোগ-সুবিধা খুবই কম। সংশ্লিষ্টরা এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাহায্য করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত শরণার্থী কমিশনারের ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর জারি করা নির্দেশনা মেনে চলে কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শও দেন তারা। 

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদরাসার সংখ্যা পাঁচ হাজার ৪৯৫টি। সে হিসাবে প্রতি ক্যাম্পে প্রায় ১৬২টি মাদরাসা রয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, মাদরাসার সংখ্যা দ্বিগুণ। ক্যাম্পে লার্নিং সেন্টার বা মাদরাসার সংখ্যা কয়টি তা অনেকটা ধোঁয়াশা রয়েছে। 

অভিযোগ রয়েছে, গুটিকয়েক মাদরাসার কার্যক্রমের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে আন্তরিক এসব উদ্যোগ। তাই তদারকি বাড়িয়ে এই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ অব্যাহত রাখার তাগিদ দেন সংশ্লিষ্টরা। 

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) বলছে, মাদরাসাগুলো সহিংসতা কিংবা সন্ত্রাসবাদ ছড়াচ্ছে না। রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা অসামান্য অবদান রাখছে। একই সঙ্গে সংস্থাটির পক্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যবেক্ষণে রাখারও সুপারিশ করা হয়েছে। না হলে সংস্থাটির দাবি, মাদরাসাগুলোতে জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এমনই একটি মাদরাসার একজন শিক্ষক নিজের নাম প্রকাশ না করে রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘লেখাপড়া শিখতে রোহিঙ্গা শিশুদের অধিকাংশই মাদরাসা শিক্ষার উপর নির্ভর করছে। এর অন্যতম কারণ, রোহিঙ্গারা জাতিগতভাবেই ধর্মপ্রাণ। আবার অনেক শিশু স্কুলে পড়লেও মাদরাসায় আসে’। 

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষা মৌলিক চাহিদা হলেও আরাকানে রোহিঙ্গারা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। এখানে বাসস্থানের নিরাপত্তা রয়েছে, শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। তাই রোহিঙ্গারা নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে যে যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন, আরাম আয়েশের দিকে নজর না দিয়ে সেখানেই গড়ে তুলছেন মক্তব- মাদরাসা। এসব মক্তব ও মাদরাসায় সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন’। 

ধর্মীয় শিক্ষার প্রভাব জনগোষ্ঠীর জীবনেও

ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব পড়ছে রোহিঙ্গাদের জীবনেও। আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গা নারী পুরুষের মাঝে দেখা যায় ধর্মীয় শিক্ষার চাপ ও প্রভাব। অনেকটা উৎসবমুখর পরিবেশেই এসব মক্তব-মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিত হতে দেখা যায়। জানা গেছে, এসব মক্তব-মাদরাসায় নৈতিক শিক্ষাও দেওয়া হয়। অভাব-অনটন ও দুঃখ-দুর্দশার সুযোগ নিয়ে কারও উস্কানিতে যাতে অনৈতিক কোনও কাজে, মাদক বেচা-বিক্রির সাথে জড়িয়ে না পড়ে, কোনও গোষ্ঠীর ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির উস্কানিতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের সাথে যেন জড়িয়ে না পড়ে- এসব বিষয়ে জ্ঞান দেওয়া হয় এই স্থানে। এমনকি, আশ্রয়দাতা বাংলাদেশের ভাব-মর্যাদা নষ্ট হয় এমন কোনও কাজ থেকে বিরত থাকার জন্যও বয়ান দেওয়া হয় এসব মক্তব-মাদরাসায়। 

মক্তব-মাদরাসা ঘিরে আরসার তৎপরতা বন্ধে পদক্ষেপ চান সাধারণ রোহিঙ্গারা

জানা গেছে, ৩৪টি ক্যাম্পে গড়ে ওঠা মাদরাসাগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া আরকান সলভেশন আর্মির (আরসা) বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ। এ নিয়ে প্রায়ই ক্যাম্পে সংঘটিত হয় গুম-খুনের মত অপরাধ কর্মকাণ্ড। এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পগুলোতে নতুন করে আর মাদরাসা তৈরি না করাসহ ১৯টি নির্দেশনা দেয় শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার।

২০২১ সালের ২২ অক্টোবর ১৮ নম্বর ময়নারঘোনা ক্যাম্পে ‘দারুল উলুম নাদওয়াতুল ওলামা আল ইসলামিয়া মাদ্রাসায়’ গুলিবর্ষণ ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ছয় জনকে হত্যা করা হয়। সেই সময় মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা দীন মোহাম্মদ বলেছিল, ইসলামিক মাহাস নামে একটি সংগঠন মাদ্রাসাটির নিয়ন্ত্রক। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসহ বিভিন্ন স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে সংগঠনটি কাজ করে। আরকান সালভেশন আর্মি (আরসা) মাদ্রাসাটি নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছিল। সূত্র মতে, আরসার চারটি উপ-শাখা রয়েছে। এর মধ্যে ‘উলামা কাউন্সিল’ গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা। উলামা কাউন্সিল মূলত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে থাকা মাদ্রাসাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজ করে থাকে।

তবে সাধারণ রোহিঙ্গা নাগরিকদের অনেকেই নিজেদের নাম প্রকাশ না করে রাইজিংবিডিকে জানান, অনেকেই কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সব ধরনের তথ্য জমা দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠানের কারণে সব মক্তব-মাদরাসা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না। বাংলাদেশ সরকার আরও তদারকি বাড়িয়ে হলেও ধর্মীয় শিক্ষার এসব কার্যক্রম চালু রাখা দরকার। 

রয়েছে আলাদাভাবে প্রাইভেট পড়ার ব্যবস্থা

স্কুল ও মাদরাসার শিক্ষাক্রমের বাইরে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব উদ্যোগে প্রাইভেট পড়ারও ব্যবস্থা রয়েছে। অধিকাংশ ক্যাম্পেই এই ব্যবস্থা রয়েছে। এসব স্থানে বিষয় পছন্দ করে প্রাইভেট পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। নির্দিষ্ট করা আছে বিষয় ও বয়সভিত্তিক নির্ধারিত বেতন বা ফিসও। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। আরবি ও বাংলা বিষয়ে পড়ানোর পাশাপাশি বাংলা ভাষা শেখার জন্যও প্রাইভেট পড়ানো হয় বলে জানা গেছে। 

বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার পর এই প্রাইভেট পড়ানোর কার্যক্রম শুরু হয়। তাই বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন অনেক স্থানীয় কর্মীরা। তারা বলছেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার প্রতি আগ্রহের বিষয়টি ইতিবাচক। কিন্তু সব ধরনের কার্যক্রম সরকারি তদারকির আওতায় থাকা উচিত। সাধারণত বেসরকারি বিভিন্ন কার্যক্রমের কর্মীরা সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টায় ক্যাম্প এলাকায় অবস্থান করেন। আর প্রাইভেট শিক্ষার কার্যক্রমগুলো শুরু হয় বিকেল ৫টার পর থেকে। 

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘বাংলাদেশ শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ প্রয়োজনীয় সব বিষয়ে সতর্কতার সাথে সহযোগিতা করছে। ক্যাম্পে শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর বাইরে তাদের নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের’। 

তিনি বলেন, ‘শিক্ষা-কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে আমরা সবসময়ই উৎসাহ প্রদান করে আসছি। এর সঙ্গে অনেক বিষয় জড়িত। তাই আমরা বরাবরই নির্দেশনা মেনে কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দিচ্ছি’। 

উল্লেখ্য, ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিপীড়নের মুখে দেশটি থেকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। আগেরসহ প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে বাস করছেন। ওই বছরের নভেম্বরে কক্সবাজার থেকে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। আশ্রয়ণ-৩ নামের প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে। জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে। আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গাকে সেখানে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। 

ঢাকা/এনএইচ

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়