ঢাকা     শুক্রবার   ১৫ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১ ১৪৩৩ || ২৭ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

মহাকাশে নভোচারীদের অবাক করা জীবনযাপন

গোবিন্দ তরফদার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:২৮, ২৪ অক্টোবর ২০১৬   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
মহাকাশে নভোচারীদের অবাক করা জীবনযাপন

গোবিন্দ তরফদার : নভোচারী বা মহাকাশচারী সেই ব্যক্তিকে বলা হয় যিনি মহাশূন্যে ভ্রমণ করেন। আমরা পৃথিবীতে যেভাবে খুশি জীবনযাপন করতে পারি, কিন্তু মহাকাশে নভোচারীদের ঠিক তার উল্টো জীবনযাপন করতে হয়।

মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সেখানে শূন্য, জনমানব শূন্য জায়গা, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না, প্রচুর চাপ থাকে, সেই সঙ্গে থাকে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ।

আসুন জেনে নেই, নভোচারীরা কিভাবে জীবনযাপন করে থাকেন মহাকাশে।
 

পিরিয়ড নিয়ে দুশ্চিন্তা
মহাকাশে প্রথম নারী নভোচারী পাঠানোর আগে পর্যন্ত নাসার বিজ্ঞানীরা আসলে কখনো এটা নিয়ে ভাবেনি, মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অভাব নারীর পিরিয়ডে কি ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ১৯৮৩ সালে ৩২ বছর বয়সে যখন প্রথম নারী নভোচারী হিসেবে স্যারি রাইড অনেক দিনের জন্য মহাকাশ ভ্রমণে যান, ইঞ্জিনিয়াররা ১০০ তুলার প্যাকেট সঙ্গে করে নিয়েছিলেন যাতে করে কোনো সমস্যার মুখে না পরতে হয়। নাসার চিকিৎসকরা অনেক চিন্তিত ছিলেন পিরিয়ডের বিষয়টি নিয়ে, কারণ এটার ফলে তাকে ফিরে আসতে হয় নাকি অভিযানের মাঝামাঝি সময়ে। কিন্তু তাদের চিন্তা সম্পূর্ণ বিপরীত একটা ফলাফল দিয়েছিল সেসময়ে। পিরিয়ড তার জন্যে পজিটিভ হয়েছিল, কারণ কক্ষপথে মহাকাশযানে ভ্রমণকালে নভোচারীদের আয়রনের লেভেল অনেক বেড়ে যায়, আর পিরিয়ডের ফলে শরীরের আয়রনের লেভেল কমে যায়।
 

শারীরিক সম্পর্ক
আপনি যদি মহাকাশে শোবার চেষ্টা করেন তাহলে আপনি নিউটনের তৃতীয় সূত্র গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী, মহাকাশে একটি কাপল কখনই বেগ প্রয়োগ করতে পারবেনা আর এর ফলে তারা কেউই একে অন্যের প্রতি যে চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষা সেটা পূরণ করতে পারবেনা। সৌভাগ্যক্রমে রাশিয়ার দুজন বিজ্ঞানী পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণ বিরোধী চেম্বারের মধ্যে সেক্স করেছিলেন পরীক্ষামূলকভাবে। বহুল ব্যবহৃত ২০টি পজিশনের মধ্যে ৪টি পজিশনে কোনো ধরনের মেডিকেল সহায়তা অথবা বেল্ট এর সহযোগিতা ছাড়াই তারা মিলিত হতে পেরেছিলেন। তাদের মতে, বহুল প্রচলিত মিশনারি পজিশনে কখনোই সম্ভব নয়।
 

ঘুমানো
বাসার মতো বিশাল বড় আরামদায়ক কোনো বিছানার ব্যবস্থা থাকে না মহাশুন্যে নভোচারীদের, তাদের দেহকে তারা স্পেস ক্রাফটের একটি সাইডে নিজেদের বেঁধে নেন, যাতে করে তারা এদিক ওদিক ভেসে না বেড়ান। এমনকি তারা নিজেদের দুই হাত বুকে জড়িয়ে ঘুমাতে পারেন না। তাদের দুই হাত তাদের সামনে সোজা হয়ে ভাসতে থাকে। ঘুমন্ত নভোযাত্রীদের ভেন্টিলেশনের ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হয়, না হলে তো তারা কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে ফেলবেন।
 

বিষন্নতার সঙ্গে লড়াই
পৃথিবীর কক্ষপথে ভ্রমণ অত্যন্ত একটি রোমাঞ্চকর ব্যাপার, কিন্তু এটা অনেক সময় মানসিক একটি শ্রমে পরিণত হতে পারে এবং নভোচারীদের মনকে অবসাদে আচ্ছন্য করে দিতে পারে। অনেক নভোচারী এটা স্বীকার করছেন যে, দীর্ঘ সময় কাল ধরে মহাকাশ যান চালনা এবং যে সকল অভিযান চলে মহাকাশে সেই অভিযানগুলোতে মনের মধ্যে একটা ভয় ও সংশয় কাজ করে কারণ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ হয় সেসব অভিযানে। আর এর থেকে তারা একাকিত্ব, বিষন্নতা ও মানসিক চাপে থাকেন। এসবের সঙ্গে লড়াই করার জন্য বর্তমানে বিজ্ঞানীরা বিশেষ কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছেন।
 

খাওয়া-দাওয়া
যখন একজন নভোচারী নভোযানে উঠেন তখন তার পছন্দনীয় সকল খাবার-দাবার খাওয়ার শখ পৃথিবীতে রেখে যেতে হয় কয়েক মাসের জন্য। মজাদার ডিনার তো নয়ই, তাদের খেতে হয় ইউএস, জাপান, রাশিয়াতে প্রস্তুতকরা প্যাকেটজাত ডিহাইড্রেটেড খাবার। বাসনপত্র অনেক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, এমনকি ছুরি বা কাটাচামচের খোঁচায় যন্ত্রাংশের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই এগুলো পৃথিবীতেই রেখে যেতে হয়।
 

নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা  সহজ নয়
আমাদের সাধারণভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার মতো সহজ কোনো উপায় মহাকাশে থাকে না। অত্যন্ত নিপুণভাবে নভোচারীদের ওয়াটার ব্যাগ এবং শ্যাম্পুর প্যাকেট খুলতে হয়, যাতে করে প্যাকেটের উপাদানগুলো বাইরে বেরিয়ে না যায়। নিজেদের পরিষ্কার করার জন্য নভোচারীরা কাপড় কিংবা স্পঞ্জ ব্যবহার করে, যাতে সাবান ও পানি তাদের শরীরে ছোয়াতে পারেন। দাঁত ব্রাশ করার পর তারা টুথপেস্ট এর পিক ফেলতে পারেন না, হয় গিলে ফেলতে হবে নয়তো বর্জ্য কাপড়ে তরল মুছে ফেলতে হবে।
 

টয়লেট ব্যবহারেও সতর্কতা
ঘুমানো এবং সেক্স এর মতোই, মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অভাবে টয়লেট ব্যবহার করা খুবই ঝামেলাকর একটি কাজ। বাঁধার ফিতা নভোচারীদের নির্দিষ্ট স্থানে ধরে রাখতে সহায়তা করে, আর বায়ুপ্রবাহ মল ত্যাগ করতে সাহায্য করে। কিন্তু এটা ব্যক্তিগতভাবে নিজেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে মলমূত্র যাতে ভেসে না বেড়ায় এদিক সেদিক। পৃথিবীতে তাদের এটার প্রশিক্ষণ নিতে হয় এবং প্রশিক্ষণে তাদের লক্ষ্য পূরণ ঠিকমত হচ্ছে কিনা দেখার জন্য টয়লেট ক্যামেরা ব্যবহার করেন।
 

ব্যায়াম জরুরি
মহাকাশ যানে কিংবা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মধ্যে চলাফেরায় যেহেতু নভোচারীদের তেমন পরিশ্রম করতে হয় না, তাই পেশি ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হারাতে পারে ও হাড় ক্ষয় হতে পারে। তাই নভোচারীদের প্রতিদিন ব্যায়াম করতে হয় কমপক্ষে দুই ঘণ্টা। নাসার তথ্যানুযায়ী, তিন ধরনের ব্যায়ামের যন্ত্র ব্যবহৃত হয়। সাইকেল এরগোমিটার নভোচারীর ব্লাড প্রেসার চেক করার জন্য ব্যবহার করা হয় এবং রেজিসট্যান্স এক্সারসাইজ ডিভাইস পায়ের ব্যায়াম, হাতের ব্যায়াম, পায়ের গোড়ালি উঁচু করানো ব্যায়াম করতে সহায়তা করে থাকে। ট্রেডমিল মেশিনটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যায়াম করার মেশিন, হাঁটলে যে রকম হাড় ও পেশি মজবুত হয়, এটা ঠিক সেই কাজটাই করে এবং পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য শক্তি যোগাতে সহায়তা করে।
 

বর্জ্য পরিত্রাণ
যেহেতু মহাকাশ যানে একসঙ্গে কয়েকজন নভোচারী থাকে, তাই বর্জ্য অপসারণে কার্যকর ব্যবস্থা সবসময়ই গুরুত্বের বিষয় ছিল নাসার কাছে। একবিংশ শতাব্দীর আগে প্রস্রাব মহাকাশে বের করে দেয়া হতো, কিন্তু পরে দেখা গেল প্রস্রাবগুলো জমাট বেধে নভোযান এর ক্ষতি করে, সেই সঙ্গে সোলার প্যানেলেরও ক্ষতি করতে থাকে। বর্তমানে প্রস্রাব পরিশোধন করে খাবার পানিতে রূপান্তর করা হয়ে থাকে এবং অন্যান্য বর্জ্যগুলোকে বস্তাবন্দী করে আবহাওয়ার এমন জায়গায় ছেড়ে দেওয়া হয়, যেখানে তা নিজে নিজে জ্বলে যায়।

 


নভোচারীদের দৈনন্দিন কাজ
মহাকাশে নভোচারীদের শুধু খাওয়া বা ঘুমানোর জন্য পাঠানো হয়না। নভোচারীদের ১২ ঘণ্টা করে প্রতিদিন কাজ করতে হয় নভোযানের রক্ষণাবেক্ষণ, রোবোটিক অপারেশন, গবেষণা সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে।

 

 

 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ অক্টোবর ২০১৬/ফিরোজ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়