ঢাকা     রোববার   ২৯ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪২৯ ||  ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩

‘আইসিসিকেই জিজ্ঞেস করব, কেন এলিট প্যানেলে বাংলাদেশি আম্পায়ার নেই’

ইয়াসিন হাসান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৩১, ১৬ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৯:৫১, ১৬ জানুয়ারি ২০২২
‘আইসিসিকেই জিজ্ঞেস করব, কেন এলিট প্যানেলে বাংলাদেশি আম্পায়ার নেই’

২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আম্পায়ারিংয়ে ৯ দেশের যে ১৬ জন আম্পায়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাদের ১২ জন এলিট প্যানেলের। বাকি চারজন আইসিসির ইমার্জিং প্যানেল থেকে। বরাবরের মতো এবারো তাদের মধ্যে ছিলেন না বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি।

দেশের আম্পায়ার ও আম্পায়ারিংয়ের হতশ্রী চিত্রটাই যেন বারবার ফুটে ওঠে আইসিসির ইভেন্টে। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোতে প্রাধান্য থাকে বিদেশি আম্পায়ারদেরই। অনফিল্ডে বাংলাদেশের হয়ে এনামুল হক মনি একমাত্র নিরপেক্ষ আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। করোনার কারণে নিরপেক্ষ আম্পায়ার নিয়োগে নমনীয় হওয়ায় বাংলাদেশের আরেক আম্পায়ার শরফউদ্দৌলা সৈকতের টেস্টে অভিষেক হয়।

সীমিত পরিসরে আইসিসি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্যানেলের আম্পায়ারদের ওপর ভরসা রাখলেও টেস্টে উল্টো চিত্র। প্রশ্নটা আরো বড়, আইসিসির এলিট প্যানেলে কেন নেই বাংলাদেশের আম্পায়ার, কেনই বা আইসিসি ইভেন্টে সুযোগ পান না বাংলাদেশের আম্পায়ার? 

বিসিবির আম্পায়ারিং বিভাগের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ মিঠুও উত্তরটা জানেন না। তবে বসে থাকতে নারাজ তিনি। রাইজিংবিডিকে বললেন, ‘কেন এলিট প্যানেলে আমাদের আম্পায়ার নেই সেটা বের করার জন্য আমাদের ভেতরে ঢুকতে হবে। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যদি জোর দেওয়া লাগে তাহলে সেভাবেই এগোব। আইসিসিকেই জিজ্ঞেস করব, তোমরা কেন আমাদের আম্পায়ার নিচ্ছ না? আমাদের কি মান কম? যদি বলে, ‘হ্যাঁ, কম।’ তাহলে তাদের কাছ থেকেই জানতে চাইব, কোথায় সেটা। উন্নতির জন্য কী করতে হবে সেটা বলো। রিপোর্ট দাও। তাহলে সেই মোতাবেক আমরা তাদের ট্রেনার দিয়ে ট্রেনিং করাবো নয়তো বাইরে পাঠিয়ে মান বাড়াব। মুখে মুখে কোনো কথা বললে হবে না।‘

ক্রিকেটে ইফতেফার আহমেদের পথ চলা শুরু ৩০ বছরেরও বেশি আগে। নিজে একটা সময় ক্রিকেট খেলেছেন। পরবর্তীতে সংগঠক হয়েছেন। বড় ভাইয়ের সুবাদে প্রিন্স অব ক্যালকাটা সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে তার মাখামাখি সম্পর্ক। ঢাকায় সৌরভের বন্ধু হিসেবে মিঠুর বেশ পরিচিতি রয়েছে। এশিয়া কাপের দুইবারের সফল টুর্নামেন্ট ডিরেক্টর ছিলেন তিনি। হাই প্রোফাইল ব্যক্তিকেই এবার বিসিবিতে পরিচালক করে এনেছেন নাজমুল হাসান পাপন। সঙ্গে তার কাছে দেওয়া হয়েছে বিসিবির ‘গলার কাঁটা’ আম্পায়ারিং বিভাগের দায়িত্ব।

দায়িত্ব পেয়েছেন প্রায় এক মাস হতে চলল। নিজের দায়িত্ব নিয়ে বেশ সচেতনই মনে হলো তাকে, ‘ক্রিকেটের সঙ্গে আমার ওঠাবসা অনেক যুগের। এই জায়গায় ভালোবাসা থেকে এসেছিলাম। এখন সেবা দিয়ে যাচ্ছি। একটা কথা, আপনার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে আপনি কতটা কাজ করতে পারবেন। আপনার যদি কাজ করার ইচ্ছা থাকে তাহলে ‘বাই হুক ওর কুক’ পারবেন।’

আম্পায়ারিং নিয়ে যেসব অভিযোগ তার গভীরে যেতে চান তিনি, ‘শেষ কয়েক বছরের আম্পায়ারিং নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। অনেক রিপোর্ট হয়েছে। হৈ হুল্লোড় হয়েছে। তাতে মনে হয়েছে এখানে সমস্যা আছে। রকেট সায়েন্স বলতে কিছু নেই। আমাদের ধাপে ধাপে উন্নতি করতে হবে। আমি যেহেতু এখন দায়িত্ব পেয়েছি, আমি ভেতরে ঢুকব। ঢুকে সমস্যাটা খুঁজে বের করব। নিশ্চিতভাবেই সমস্যা আছে।’

সমস্যা সমাধানের উপায়ও তার জানা আছে বলে দাবি করলেন ইফতেখার আহমেদ, ‘একটা আম্পায়ার যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করে, আরেক আম্পায়ার যদি হিউমান এরর করে তাহলে দুই সমস্যার জন্য কিন্তু দুই ওষুধ। যে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করছে তাকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে। তাকে একদম কোনো ম্যাচে আম্পায়ারিং করানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। যে আসলেই ভুল করছে তাকে তার ভুল শুধরে দিতে হবে। এজন্য তার ট্রেনিং বাড়াতে হবে।’

আম্পায়ারিংকে ইফতেখার আহমেদ দেখছেন দেশের ক্রিকেটের আয়না হিসেবে, ‘আম্পায়ারিংয়ে উন্নতি না হলে বাংলাদেশের ক্রিকেটেরও উন্নতি কিন্তু হবে না। আপনি একজন ব্যাটসম্যান। কিন্তু তিন ম্যাচে বাজে আম্পায়ারিং ও পক্ষপাতমূলক আম্পায়ারিংয়ের কারণে আউট হয়ে গেলেন। তাহলে কিন্তু আপনার ক্যারিয়ারটাই নষ্ট হয়ে যাবে। আবার বোলাররা বল করছে, উইকেট পাচ্ছে কিন্তু আম্পায়ার আউট দিলো না। তাহলে কী করার থাকবে।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে মিঠু এরই মধ্যে কিছু কাজ শুরু করেছেন। বিট্রিশ আম্পায়ারের পরামর্শে আম্পায়ারদের কান ও চোখের পরীক্ষা করানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। এরপর তাদের ফিজিক্যাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করছেন। কারণ জানাতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘চোখ এবং কান দুটোই তো আম্পায়ারদের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। সে হয়তো নিজে জানে না, চোখে কোনো সমস্যা আছে! এজন্য সিদ্ধান্ত দিতে সমস্যা হচ্ছে। কিংবা স্টেডিয়ামে অনেক হৈ হুল্লোড়। এ সময় একটা কট বিহাইন্ড আওয়াজ কানে নাও শুনতে পারে।এজন্য পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন। আবার ফিজিক্যাল ফিটনেস। একজন টেস্ট আম্পায়ার দিনে ৯০ ওভার দাঁড়িয়ে আম্পায়ারিং করে। কতটা ফিটনেস তার দরকার হতে পারে! তাদের নিয়মিত ব্যয়াম করত হবে। শক্তি বাড়াতে হবে। পরের ধাপে যেতে হলে এগুলো করতে হবে। আউট অফ দ্য বক্স চিন্তা করতে হবে।’

এছাড়া আম্পায়ারিংয়ে মান বাড়ানোর জন্য তিনটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ইফতেখার আহমেদ। প্রথমটি হলো, দেশের বাইরে থেকে ট্রেনার এনে আম্পায়ারদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত আম্পায়ারদের ‘রিফ্রেশার কোর্স’ করানো ও পরীক্ষার ব্যবস্থা করা। তৃতীয়টি আম্পায়ার এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম পুনরায় চালু করা। দেশের বাইরে ঘরোয়া ক্রিকেটে আম্পায়ার পাঠানো এবং বাইরের দেশের আম্পায়ার দেশে নিয়ে আসা।

বিসিবির বেতনভুক্ত আম্পায়ার আছেন ৩০ জন। তাদের মধ্যে আইসিসির চার আন্তর্জাতিক প্যানেল আম্পায়ার সর্বোচ্চ ৫০-৬০ হাজার টাকার বেতন পান। বাকিরা আরো কম। তবে তাদের আয়ের বড় অংশই আসে ম্যাচ ফি থেকে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আম্পায়ারদের ম্যাচ ফি দেয় ৩৫ হাজার টাকা। লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে দেয় ১০ হাজার টাকা। আম্পায়ারদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে আরো সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ইচ্ছা আছে এই বিভাগের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের।

ঢাকা/ফাহিম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়