সালাহ উদ্দিনের অভিযোগ: দ্বৈত বক্তব্যে মিথ্যাচার করেছেন আসিফ নজরুল
ক্রীড়া ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ১৯ দিনের ব্যবধানে দুই ধরণের বক্তব্য দিয়েছেন।
প্রথমে গত ২২ জানুয়ারি তিনি বলেছিলেন, ‘‘আপনাদেরকে আমি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেই, সিকিউরিটি রিস্কের কথা বিবেচনা করে ভারতে বিশ্বকাপ না খেলা—এটা আমাদের সরকারের সিদ্ধান্ত।’’
পরে গত ১১ ফেব্রুয়ারি নিজের কার্যদিবসের শেষ দিনে গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশের ক্রিকেট… আমাদের (সরকার) কী সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলোয়াড়রা, ক্রিকেট বোর্ড। তারা নিজেরা স্যাক্রিফাইস করে, দেশের ক্রিকেটারদের নিরাপত্তার জন্য, দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য, বাংলাদেশের মর্যাদার প্রশ্নে যে ভূমিকা রেখেছে, আমার মনে হয়, এটা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”
দুই রকমের বক্তব্য দিয়ে ড. আসিফ নজরুল চরম মিথ্যাচার করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন। তার মতে, সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা ক্রিকেটারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া স্রেফ ‘খাড়ার ওপর মিথ্যা বলা।’
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অন্তবর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব ছাড়ার শেষ দিনে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন আসিফ নজরুল। বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার কোনো আক্ষেপ আছে কিনা জানতে চাইলে ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেছেন, ‘‘কোনো রিগ্রেট? প্রশ্নই আসে না।’’ সঙ্গে ক্রিকেটারদের ওপর সমস্ত দায় চাপিয়ে দেন তিনি।
সেদিনের পর বিসিবির কোনো পরিচালক, কর্মকর্তা, কিংবা জাতীয় দলের খেলোয়াড় বা কোচ গণমাধ্যমের সামনে আসেননি। ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে বিসিএল। ওয়ানডে ফরম্যাটের এই প্রতিযোগিতাকে সামনে রেখে গতকাল মিরপুর থেকে বাসে বগুড়া গিয়েছেন ক্রিকেটাররা। সেখানে ছিলেন সালাহউদ্দিন।
প্রথমবার গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের রাগ, ক্ষোভ উগড়ে দেন, “উনি একেবারে মানে এমন মিথ্যা কথা বলেছেন, আমার আমি তো নিজেও শিক্ষক মানুষ, শিক্ষকরা তো একটু মিথ্যা কম বলে। কারণ উনি খাড়ার ওপর এরকম মিথ্যা কথা বলবে, এটা আসলে আমি ভাবতেই পারছি না। আমি কীভাবে ছেলেদের সামনে আসলে মুখ দেখাব! ছেলেরা উনি এভাবে ইউ-টার্ন নেবেন!
“উনি একটা শিক্ষক মানুষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উনি। মানে আমার দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের একজন মানুষ, উনি এভাবে মিথ্যা কথা বলবেন, এটা আসলে আমরা মানতে পারছি না। মানাটা আসলে… মানে কীভাবে মানব এটা…আসলে আমার বলার মতো নয় যে, উনি কী বলে আসলেন আর এসে কীভাবে ইউ-টার্ন নিলেন।” – যোগ করেন তিনি।
নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশ দলকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যেতে অনুমতি দেয়নি বাংলাদেশ সরকার। গ্রুপ পর্বের বাংলাদেশের চার ম্যাচ ছিল ভারতে। তিনটি কলকাতায় ও একটি মুম্বাই। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকায় বাংলাদেশ আইসিসিকে ভেন্যু সরানোর অনুরোধ করে। আইসিসি বাংলাদেশের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করায় দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ সরকার। বিসিবিও তা মেনে নিতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যখন আইসিসিকে প্রথম ভেনু্য পরিবর্তনের অনুরোধ করে চিঠি পাঠায় সেখানেও উল্লেখ ছিল, সরকার থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামও বারবার গণমাধ্যমে বলেছেন, সরকার থেকেই সাড়া পাওয়া যায়নি ভারত সফরের জন্য। দেশের বাইরে যেতে হলে দলগুলোকে জিও নিতে হয় সেসব নিয়মনীতির কথাও বলেছিলেন আমিনুল। কিন্তু যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা নিজের কার্য দিবসের শেষ দিনে বিসিবি এবং ক্রিকেটারদের ওপরই সব ‘দায়’ চাপিয়ে দিলেন।
তার এই মন্তব্য নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠার পর অবশ্য তিনি সামাজিক মাধ্যমে বলেছিলেন, তার কথার “প্রেক্ষিত ও অন্তর্গত বার্তাকে উপলব্ধি না করে উপস্থাপিত হওয়ার কারণে কিছুটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। সিদ্ধান্তটি সরকারের ছিল বলেই আবার জানান তিনি। তবে ক্রিকেটারদের মধ্যে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েই গেছে, তা সালাহউদ্দিনের কথাতেই স্পষ্ট।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব শেষ। এসেছে নতুন সরকার। ক্ষমতার পালাবদলের পর সালাহউদ্দিন প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রকাশ্যে সমালোচনা করলেন। বোর্ডের চুক্তিভুক্ত কর্মকর্তা হয়ে অনেকসময় নিজেদের মত দেওয়ার সুযোগ থাকে না। তবে ক্রিকেটারদের কথা বিবেচনা করে সেই শেকলটা ভাঙার চেষ্টা করলেন সালাহউদ্দিন। ক্রিকেটারদের কথা বলতেও পিছু না হননি তিনি, “একটা ছেলে যখন বিশ্বকাপ খেলবে… সে তার ২৭ বছরের স্বপ্ন এখানে নিয়ে এসেছে। স্বপ্নটা আপনি এক সেকেন্ডে নষ্ট করে দেবেন! ঠিক আছে দেশের সিদ্ধান্ত যদি দেশের কারণে হয় তখন সেটা তারা ত্যাগ (স্বীকার) করবে। কিন্তু যদি বলেন ক্ষতির কথা… ব্যক্তিগত ক্ষতির কথা আমি বলব… একটা ছেলের, একটা মানুষের স্বপ্ন আমি সম্পূর্ণ শেষ করে দিচ্ছি।”
“আমি তো জানি আমার দুইটা ক্রিকেটার কোমাতে চলে গিয়েছিল। পাঁচ দিন ধরে কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল। তাকে যে আমরা ওই যে টুর্নামেন্টে মাঠে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি, ওইটাই বেশি। আমার মনে হয় এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য আমার কোচিং জীবনে যে, সে মাঠে এসে আবার রান করেছে।”
বিশ্বকাপ খেলতে না পারারা হতাশা থেকে বের হয়ে আসা ক্রিকেটারদের জন্য সহজ হবে না বলেই মনে করেন সালাহউদ্দিন, “স্রেফ চিন্তা করেন, বিশ্বকাপে খেলব আমরা, এক বছর আগে থেকেই আমরা স্বপ্ন দেখছি। আমি নাহয় কোচিং স্টাফ, আমি কোনো ফ্যাক্টর না। ঠিক আছে। কিন্তু যে ক্রিকেটার, যে অধিনায়ক…এক-দেড় বছর ধরে সে কিন্তু বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার জন্য এটা আসলে কতটা বেদনাদায়ক, সেটা সে-ই ভালো জানে। আমরা যতই তাকে সান্ত্বনা দেই, যতই অনুপ্রেরণা দেই, যতই বকাঝকা করি, আসলে দিনশেষে তার জন্য তো এটা অনেক বড় ক্ষতি।”
“তবে আমার মনে হয় যে, এটাও আসলে ওভারকাম করতে হবে। এটাও কাটিয়ে ওটা তাদের শিখতে হবে। মাঝে মাঝে আপনাকে চরম সত্যি থেকে আসলে বাধ্য হবে। মেনে নিতে হবে, একটু মেনে নিতে হবে।”
ঢাকা/ইয়াসিন