কার্লো আনচেলত্তি যে কারণে সবার থেকে আলাদা
কার্লো আনচেলত্তি
আধুনিক ফুটবলে অধিকাংশ কোচই আসেন একগাদা ছক আর কঠিন সব ট্যাকটিক্স পকেটে নিয়ে। খেলোয়াড়দের তারা রোবটের মতো ব্যবহার করতে চান। কিন্তু, কার্লো আনচেলত্তি এখানে পুরো উল্টো স্রোতের মানুষ। তিনি মাঠের রণকৌশল সাজানোর আগে মানুষের মন পড়তে ভালোবাসেন। ঠিক এই চাবিকাঠি দিয়েই তিনি ফুটবলারদের ভেতরের সেরাটা বের করে আনেন।
সর্বশেষ ম্যাচেই দেখা যাক— মরক্কোর জমাট রক্ষণ আর ক্ষিপ্রতার সামনে ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে দিশেহারা তখন ব্রাজিল। ঠিক সেই ক্রান্তিলগ্নে রেফারি দিলেন ছোট্ট একটা কুলিং ব্রেক। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা ডন কার্লোর মুখে কোনো বাড়তি উত্তেজনা নেই, শান্ত চোখে ফুটবলারদের দিলেন জাদুকরী কিছু টোটকা। মাঠে ফিরেই যেন খোলস ছেড়ে বের হলো এক নতুন ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুসের সেই দুর্দান্ত ফিনিশিং আর নিমিষেই পাল্টে গেল পুরো ম্যাচের গল্প।
কোচিং ক্যারিয়ারে এটাই আনচেলত্তির সিগনেচার স্টাইল। যেখানে বড় বড় ট্যাকটিশিয়ানরা নিজেদের জেদ বজায় রাখতে গিয়ে দলকে ডোবান, সেখানে আনচেলত্তি তার রণকৌশলটা সাজান ড্রেসিংরুমে থাকা খেলোয়াড়দের শক্তি বুঝে। তার কাছে ছকের চেয়ে ফুটবলারদের স্বাচ্ছন্দ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে একটা অদ্ভুত পরিসংখ্যান চোখে পড়বে। আজ পর্যন্ত কোনো দলই কোনো বিদেশি কোচের হাত ধরে বিশ্বজয়ের স্বাদ পায়নি। শত বছরের এই অলিখিত মিথ ভাঙার চ্যালেঞ্জ নিয়েই ব্রাজিলের এই ক্রান্তিকালে হাল ধরেছেন তিনি। মাঠের লড়াই তো বটেই, মাঠের বাইরেও ভিনিসিয়ুস কিংবা রদ্রিগোদের ওপর ওঠা সমালোচনার তিরগুলো তিনি নিজের বুকে পেতে নেন, আগলে রাখেন ঢাল হয়ে।
ট্যাকটিক্যাল জাঁকজমকের চেয়েও আনচেলত্তির আসল জোর তার 'ম্যান ম্যানেজমেন্ট'। মহাতারকাদের ইগোর লড়াই সামলে ড্রেসিংরুমকে একটা সুখী পরিবারে রূপ দেওয়াটা তার চেয়ে ভালো আর কেউ পারে না। তিনি কোচের চেয়েও ফুটবলারদের কাছে একজন পরম অভিভাবক।
ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে রূপ বদলাতে তার জুড়ি মেলা ভার। কখনো ৪-৩-৩ এর আগ্রাসন, কখনো ৪-৪-২ এর জমাট পারফরম্যান্স, আবার কখনো ডায়মন্ড মিডফিল্ডের চমক। মরক্কো ম্যাচে যে ব্রাজিল ৪-৩-৩ ফর্মেশনে খেলে কিছুটা ভুগেছে, হাইতির বিপক্ষে তারা হয়তো নামতে পারে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মানসিকতা নিয়ে।
তার দল কখনো পজিশনাল ফুটবলে প্রতিপক্ষকে বোকা বানায়, আবার কখনো চোখের পলকে কাউন্টার অ্যাটাকে গিয়ে তছনছ করে দেয় প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ। বিশেষ করে, নকআউট পর্বের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে আনচেলত্তি যেন এক অতিমানবীয় চরিত্রে রূপ নেন।
ঠান্ডা মাথায় সঠিক সময়ে সেরা পরিবর্তন আনা এবং খাদের কিনারা থেকে ম্যাচ বের করে আনার যে সহজাত দক্ষতা তার আছে, সেটাই তাকে এনে দিয়েছে ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসের সফলতম কোচের মর্যাদা।
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সেই সোনালী দিন আর জোগা বোনিতোর আনন্দ ফিরিয়ে আনার এই রোমাঞ্চকর যাত্রায় পুরো লাতিন আমেরিকার কোটি ভক্তের ভরসার শেষ আশ্রয় এখন শুধুই কার্লো আনচেলত্তি।
ঢাকা/নাভিদ/রফিক
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত