Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||  আশ্বিন ১০ ১৪২৮ ||  ১৬ সফর ১৪৪৩

ভিয়েতনামের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের চূড়ায় 

ফেরদৌস জামান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪৫, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৭:১০, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
ভিয়েতনামের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের চূড়ায় 

বিজন দ্বীপের স্বরলিপি: ১২তম পর্ব

সুন্দর কাটিং করা মসৃণ কালো পাথরের চওড়া সিঁড়ি। উভয় পাশের রেলিংও কালো পাথরের তৈরি। বৃষ্টির কারণে অসুবিধা হলেও উঠে যেতে তেমন একটা কষ্ট হলো না। তাছাড়া বিশ্রাম করার জন্য পথিমধ্যে একাধিক বসার জায়গা আছে। অবশেষে সকাল নয়টা সাতান্ন মিনিটে ফান্সিপান শীর্ষে পা রাখতে সক্ষম হলাম। ৩,১৪৩ মিটার উচ্চতার এই পর্বতশৃঙ্গ শুধু ভিয়েতনামের নয় বরং পুরো ইন্দোচীন পেনিসুলার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ।

ফান্সিপানকে সুদৃশ্য করে উপস্থাপনের জন্য সর্বোচ্চ বিন্দু পাথরটির উপর স্থাপন করা আছে চারকোণা গোড়ালীবিশিষ্ট ছোট্ট একটা স্থাপনা, যার চারটি কোণা তিন থেকে চার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত উঠে একটি বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। ফলে চোখা একটা শৃঙ্গের রূপ ধারণ করেছে। ঠিক তার পাশে লম্বা খুঁটির মাথায় লাল জমিনে হলুদ তারকা খচিত ভিয়েতনামের জাতীয় পতাকা। সম্পূর্ণ শীর্ষদেশ কাঠের মজবুত নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘেরা এবং মেঝের উপরেও সমতল করে কাঠের পাটাতন বিছানো। নিকটেই সামান্য নিচুতে চূড়া সদৃশ্য অবিকল আরও দুই-তিনটি স্থাপনা নির্মাণ করা আছে আরোহী বা আভিযাত্রীদের স্মৃতিস্বরূপ ছবি তোলার সুবিধার্থে।

আরোহী সমাগম নেহায়েত কম নয়। আরোহণের সুব্যবস্থা থাকার কারণে মাউন্ট ফান্সিপান শীর্ষ আরোহণ আর শতভাগ অভিযাত্রীদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চাইলে সৌখিনরাও অনায়াসে ঘুরে যাচ্ছে। আমার মধ্যে খুব একটা উত্তেজনা কাজ করল না। প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলাম অভিযাত্রীর বেশে পাহাড়-পর্বত ট্রেকিং করে ফান্সিপান স্পর্শ করবো! অথচ, বাস্তবে হলো কি! সময়জুড়ে অনড় মেঘের এক সমুদ্র ফান্সিপানকে গ্রাস করে রাখলো। সম্মুখের দশহাত দূরেও ঠিক মতো দেখা গেল না। সকলেই ছবি তোলায় ব্যস্ত। তা থেকে আমি বাদ যাব কোন দুঃখে? হতাশাকে প্রশ্রয় না দিয়ে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বাকি সময়টুকু পরিপূর্ণ আনন্দের সাথে পার করে দিলাম। 

প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থানের পর মাউন্ট ফান্সিপানকে বিদায় জানিয়ে ফিরতি পথে পা বাড়ালাম। কিছুটা নামার পর বেছে নিলাম ভিন্ন পথ। ভাবলাম খানিক বাদে একই পথে গিয়ে মিলিত হবে। না, তা হলো না। কারণ ফান্সিপানের দুটি আলাদা সিঁড়ি পথ আছে। প্রায় এক তৃতীয়াংশ নামার পর পদার্পণ করলাম চৈনিক আদলের বেশ কিছু ছোট-বড় ভবন সমৃদ্ধ এক প্রাঙ্গণে। সব থেকে বড় ভবনের সামনে ঝুলছে প্রকাণ্ড এক ঘণ্টা। ভবনের ভেতর গিয়ে জনমানুষের চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। ঘর ভর্তি বিভিন্ন আঙ্গিকের মূর্তি। 

বিশ-ত্রিশ হাতের মূর্তিও আছে। প্রতিটি মূর্তির শরীরের রং গাঢ় সোনালি। স্তরে স্তরে সাজানো সমস্ত মূর্তির শীর্ষে অবস্থান করছে গৌতম বুদ্ধের মূর্তি। মূর্তিগুলোর সামনে আপেল, জাম্বুরা, মাল্টা, টিনজাত বিভিন্ন খাবার, কোমল পানীয়’র ক্যান, পানির বোতল এমনকি টিসু বক্স পর্যন্ত থরে থরে সাজানো। একপাশ ঘুরে অন্য পাশে গেলে দেখা মিললো একজন মাত্র মানুষের। গেরুয়া পোশাক পড়া ভিক্ষু মহাশয় নিবিষ্ট মনে বসে আছেন। অন্য আর এক কক্ষের প্রধান মূর্তি দেখে বোঝা দায় তা আসলে কোন ধর্মের? গড়নে, গঠনে মনে হয় হিন্দু ধর্মের কিন্তু এখানে তা আশা করা যায় না। 

ভবনের বাইরে খোলা আকাশে দণ্ডায়মান মূর্তিগুলো সাদা এবং ধূসর মার্বেল পাথরের। প্রতিটি মূর্তিই একেকটি বেদির উপর দণ্ডায়মান। বেদি থেকে শুরু করে মাথার চূড়া পর্যন্ত এতটাই সূক্ষ্ম করে খোদাই করা যে সূচের মাথা দিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েও একটা খুঁত বের করা সম্বব নয়। এমন শান্ত সৌম্য আবহের মধ্যে নিজের অস্তিত্বের কথা ভাবতে শরীরের ভিতর দিয়ে বারবার প্রবাহিত হয়ে গেল এক শীতল অনুভূতি। এত চমৎকার শিল্পকর্ম আর প্রকৃতির এই অভাবনীয় সাজের মুগ্ধ দর্শনার্থী হিসেবে নিজের অনুভূতির কথা তৎক্ষণাৎ প্রিয় কারও সাথে ভাগাভাগি করতে মন ব্যাকুল হয়ে উঠল। এতক্ষণ পথে কোনো গাছপালা চোখে পাড়েনি। সিঁড়ির একটা অংশে এসে ছোট ছোট গাছ সিঁড়ির উপর ঝুকে পড়েছে। তার নিচে একটার পর একটা বেশ কিছু ভিক্ষু মূর্তি।

এবার সত্যি সত্যিই মেঘের দোর্দান্ত প্রতাপের কাছে হার মানতে হলো। ভেজা সিঁড়িগুলো কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই সুযোগে সামান্য বিরতি দিলাম। একাকি ছাউনিটা আমার জন্য সুন্দর আশ্রয়স্থল হিসেবে আবির্ভূত হলো। আরও কিছুটা পথ নামার পর দূর থেকে মেঘের পড়তের মাঝে একটা বিরাট ছায়ার মতো কিছু দৃশ্যমান হলো। কাছে যেতে যেতে তা আবিষ্কৃত হলো বুদ্ধের সুউচ্চ এক মূর্তি রূপে। তিন/চার তলা একটা দালানসম অবয়ব নিয়ে একাকি বসে আছে মহামতি গৌতম বুদ্ধ। মাঝামাঝি পথ নেমে আসার পর শুরু হলো বৃষ্টি। এবার শরীর আর সুরক্ষিত রাখা গেল না। আধভেজা হয়ে ফিরে এলাম স্টেশনে। 

স্টেশনে গমগমে আবহ সদা বিরাজমান। এক কাপ কফি পান করতে যতটুকু সময় লাগে তারপরই ফুডকোর্ট ত্যাগ করে ক্যাবলকারের দিকে এগিয়ে যেতে নিয়ে হঠাৎ কারও ডাক শুনে থেমে গেলাম। ফিরে দেখি হ্যাঁ, আমাকেই ডাকা হচ্ছে। হ্যানয় থেকে একই বাসে যাত্রা করেছিলাম। তারপর মধ্য বিরতিতে মাত্র কয়েকটা কথার আদান-প্রদান হয়েছিল। তারাও যে একই হোস্টেলে উঠেছে তা জানার পর আলোচনাকে আর পথ দেখাতে হলো না; জমে উঠল। 

চারজনের দলে নারী-পুরুষের সংখ্যা আধাআধি। তাদেরও পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। বেগতিক আমার মতো সহজ পন্থায় ফান্সিপান আরোহণ করেছেন। কথার প্রসঙ্গ ওই একটাই, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করা। আমার একা একা ভ্রমণের বিষয়টা তাদের কাছে রেমাঞ্চকর হিসেবে বিবেচিত হলো। তাতে অবশ্য নিজের মধ্যে খানিকটা গর্বও হলো। গত ছয় বছরে তারা নিয়ম করে ইয়োরোপের যাবতীয় পার্বত্য অঞ্চল চষে বেড়িয়েছে কিন্তু হিমালয় কন্যা নেপালে এখনও পা পড়েনি। তারা আশা করছেন বছর খানেকের মধ্যে সেটাও সেরে ফেলবেন। 

গল্পে গল্পে কেমন করে এক-দেড় ঘণ্টা সময় পেরিয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। রাতে হেস্টেলের সেই খোলা বারান্দায় পার্টির দাওয়াত গ্রহণপূর্বক তাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে হলো। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একটার পর একটা কার এসে আরোহীদের তুলে নিয়েই বিদায় হচ্ছে। স্টেশনের ভিতরেও মেঘ এসে লুটোপুটি খাচ্ছে। নিচের দিকে পৌঁছলে মেঘমালা অপসারিত হয়ে খানিকটা রোদের দেখা মিলল। চারদিকের প্রকৃতি ছবির মতো দৃশ্যমান হয়ে উঠল। নিচের জুম, নদী এবং ছিটে ফোটার মতো ঘরবাড়িগুলোর উপর দিয়ে ক্যাবলকার ছুটে চললো তার ফিরতি গন্তব্যের দিকে। মনে হলো পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোনো জগত থেকে একটা সুদীর্ঘ পরিভ্রমণ দিয়ে এলাম!

কোনো তাড়াহুড়া নেই, তাই হেঁটেই ফিরতি পথ ধরলাম। মন যেখানে চাইল সেখানেই বিরতি নিলাম। লাঞ্চ, সেটাও পথে। মাংশের বারবিকিউ-এর চুলা থেকে উড়ে আসা ধোঁয়া এমনভাবে নাক ছুঁয়ে গেল যে, লোভ আর সামলাতে পারলাম না। ভিতরে ঢুকে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর খাবার পরিবেশিত হলো, গভীর গর্তের ইয়া বড় এক বাটি নুডুলস। উপরে ছড়িয়ে দেয়া পাতলা করে কাটা এক পড়ত ঝলসানো মাংশ। বাঁশের ঝাকিতে করে রাখা কয়েক প্রকারের কাঁচা শাকপাতা। কিছু শাক পাতায় ছিটিয়ে দিলাম মশলাপাতি। ব্যাস, পেট ভরে খেয়ে একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। 

হোটেলে ফিরে আবারও দেখা পতুর্গিজ অর্থনীতিবিদ ম্যারিলিয়ার সাথে। সকালবেলা নাস্তার টেবিলে দেয়া আন্তরিক পরামর্শের জন্য তার যে কৃতজ্ঞতা পাওনা, সে কথা বলতেই আগ্রহের সাথে শুনতে চাইল আমার অর্জিত অভিজ্ঞতার অংশবিশেষ। তারপর জানতে চাইল আমার পরবর্তী পরিকল্পনার কথা। কয়েক মুহূর্ত নিরুত্তর থেকে আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাসটা দেখে নিলাম, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে তার দেয়া তথ্যে মাথার মধ্যে নতুন চিন্তা ঢুকে গেল। সে নিজে যে পথে সা পা এসেছে ঠিক সে পথেই আমাকে যাওয়ার পরামর্শ দিলো। অর্থাৎ সে ’হা লং বে’ হয়ে এসেছে। পৃথিবীর অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হা লং বে। নামটা শোনার পর চোখের সামনে ভেসে উঠল, সমুদ্রের বুকে সরু পাহাড়গুলো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। এমন দৃষ্টিনন্দন জায়গা পৃথিবীতে খুব কমই আছে। সত্য কথা বলতে তা আমাকে খুব একটা টানল না। ম্যারিলিয়ার কথায় বুঝতে পারলাম, সে যেন হা লং বে যাওয়ার জন্য প্রচ্ছন্নভাবে আমাকে উদ্বুদ্ধ করছে। বলে, গিয়ে দেখ তুমি তোমার মনের মতো কোনো না কোনো বিষয় ঠিকই আবিষ্কার করে নিতে পারবে। (চলবে)

পড়ুন ১১ তম পর্ব: একটি পোড়া আলুর দাম দুই ডলার 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়