ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ৩০ মার্চ ২০২৩ ||  চৈত্র ১৭ ১৪২৯

নভোনীল জলে, রংধনু আঁকা পাহাড়ের ঢালে 

আঁখি সিদ্দিকা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৪৫, ৯ ডিসেম্বর ২০২২   আপডেট: ১৪:৪৭, ৯ ডিসেম্বর ২০২২
নভোনীল জলে, রংধনু আঁকা পাহাড়ের ঢালে 

ভরা হেমন্তে সোমেশ্বরী’র হালকা স্বচ্ছ টলমটলে নীল জল পেরিয়ে হাঁটতে থাকি গারো পাহাড়ের কোলঘেঁষে। নদী দেখতে গিয়ে ওপারে দূর থেকে হাতছানি দিচ্ছিলো সীমান্তসংলগ্ন দুই দেশের পাহাড়! তাদের সৌন্দর্য নিমিষেই আন্দোলিত করে উঠলো সকলের হৃদয় ও মন। ট্রেনের কু ঝিকঝিক কান থেকে হাওয়া হয়ে কানে বাজলো ঝিরিঝিরি ঝরনার জলধারা। 

গারো পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ঢেউ খেলে কালো মেঘ। অনাবিল সৌন্দর্যের সুসং দুর্গাপুর পর্যটকদের লীলাভূমিতে রূপ নিয়েছে। যাতায়াতসহ ঘাটে ঘাটে বিপত্তি সত্ত্বেও পর্যটকরা আসেন সুসং দুর্গাপুরে সৌন্দর্য উপভোগে। তবে সড়ক যাতায়াত সুবিধা ও হোটেল মোটেল না থাকায় সমস্যা হয় পর্যটকদের। তবে সরকারী উদ্যোগ পেলে সড়ক ও পর্যটন কেন্দ্রস্থ জায়গাগুলো আরও উন্নত করা সম্ভব। 

সড়কপথে সুসং দুর্গাপুর যাওয়া নরক যন্ত্রণার শামিল বলেই সড়কের চাপ গিয়ে ঠেকেছে জারিয়া-ঝাঞ্জাইলগামী আলো-বাতিহীন লোকাল ট্রেন বলাকায়। তবুও দিনের আলোতে ট্রেন জার্নির রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আর সোমেশ্বরীর বুকে মন রাঙিয়ে নিতে টুরিস্ট ক্লাব বাংলাদেশের তরুণ গ্রুপ, রাইহান জো ও সাইফুলের নেতৃত্বে আমিও হয়েছিলাম ২২ জনের একজন।

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই কমলাপুর থেকে স্টেশন থেকে ছাড়লো বলাকা। আমরা ২২ জন উঠে পড়লাম একটি কামরাতে। আহ! চারপাশ কি সুন্দর। পরিচ্ছন্ন সকাল। ট্রেনের কু ঝিকঝিক শব্দ আর গ্রামের চারপাশের আবহ যেন সবার মন আরো বেশী তোলো ভাটিয়ালি গানে মাতিয়ে দিলো। সেই সঙ্গে একটু পরপর চা, সবাই মিলে গানে মেতে ছিল ট্রেনের কামরা। এ যেন আনন্দের মিছিল! 

শম্ভুগঞ্জ, বিশকা, গৌরীপুর, শ্যামগঞ্জ, জালশুকা, পূর্বধলা স্টেশন পার হয়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা ট্রেন ভ্রমণ শেষে আমরা নামলাম ঝারিয়া জান্জাইল স্টেশনে। তবে সড়ক পথের অবস্থা ভালো থাকলে এ পথে যাতায়াতের সময় অর্ধেকে নেমে আসতো। স্টেশন থেকে নেমে হেঁটে রওনা দেই আমরা কংস নদীর নৌকা ঘাটের দিকে। একসাথে হাঁটছেন সকলে যেনো কাফেলা। হাতে তাঁবু, কাঁধে ব্যাগ! খানিক পথ পেরিয়ে দুর্গাপুর সোমেশ্বরীর ঘাটে আগেই ঠিক করা ইঞ্জিনের নৌকায় উঠলাম। গন্তব্য সুসং দুর্গাপুর।

ডিম পোলাও দিয়ে নাস্তা আমরা আগেই সেরে নিয়েছিলাম। সোমেশ্বরি নদী এসে মিশেছে কংসের সাথে। মজার বিষয় হচ্ছে দুইটার পানি দুই রকম। একটা কালো আরেকটা স্বচ্ছ নীলাভ। খানিক যাওয়ার পর এবার সোমেশ্বরি নদীর ওপর দিয়ে আমাদের নৌকা চলছে। বর্ষায় এই নদীতে ভরা যৌবন ফিরে থাকলেও হেমন্তে সে দারুণ এক রূপ নিয়প অপেক্ষা করছিলো আমাদের জন্য! সোমেশ্বরী নদী স্বচ্ছ পানি আর ধুধু বালুচরের জন্য বিখ্যাত। 

এটি নেত্রকোনা জেলায় প্রবাহিত একটি নদী। মেঘালয় রাজ্যের বাগমারা বাজার হয়ে বাংলাদেশের রানীখং সীমান্ত দিয়ে সোমেশ্বরী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এদিকে নদী পথে ড্রেজিং করে লাল বালি, কয়লা পাথর উঠানো দেখলাম। নদীর মাঝে বালুচর দেখলাম। দেখতে দেখতে দুপুর সাড়ে বেলা ১২টার দিকে আমরা দুর্গাপুর পৌঁছে গেলাম।ছোট্ট একটি জায়গা অথচ যার পরতে পরতে জড়ানো সৌন্দর্য। পাহাড়ের উপত্যাকায় তাঁবু ক্যাম্প করার জন্য পর্যটন করপোরেশন থেকে অনুমতি নিয়ে ফেললে টুরিস্ট ক্লাব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা কামাল খান। ওদিকে দুপুরে খাবারের আয়োজন করে রেখেছেন স্থানীয় আলামিন ভাই। হাঁসের মাংস, দেশী চালের হালকা লাল রঙের ভাত, বেগুন ভাজা, টাকি মাছের ভর্তা, ডাল ও লেবু। আহ! প্রশান্তি। পাশের বাসার আমেনা খালা দিব্যি আপন করে নিলেন আমাদের। 

উপত্যকায় পৌঁছে চোখ মুহূর্তে জুড়িয়ে গেলো। শ্বেতশুভ্র চিনামাটির পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে গেছে অপরূপ নীলের উৎস সোমেশ্বরী নদী। এই নদীর নীল জলে সাদা চিনামাটির পাহাড়ের প্রতিবিম্ব যেন এক অলৌকিক সৌন্দর্যের প্রতীক। চিনামাটির পাহাড়ের পাদদেশেই রয়েছে নীল জলের অসংখ্য লেক। অনেক গভীরতা থাকায় লেকগুলো অবশ্য বেশ বিপজ্জনক ও লেকে গোসল না করতে টানানো রয়েছে সতর্কবাণী। তবে নীল জলের স্পর্শ নেয়ার লোভটা সামলানো দায় জানাতেই পর্যটন করপোরেশনের সাদেক ভাই ও আয়নাল ভাই লেকের নামার জায়গা দেখিয়ে দিলেন, কোথায় নামলে আমরা বিপদে পড়বো না। আমি, কামাল, উপমা, ইলা আপু, সূর্যফুলকে মাথার ওপর নিয়েই নেমে পড়লাম পাহাড়ের পাদদেশে নীল জলের লেকে। নীল জলও যেন মেতে উঠেছিলো আমাদের সাথে শৈশবের উচ্ছ্বাসে। 

এদিকে তাঁবু ক্যাম্প প্রস্তুত হচ্ছিল; অটো চালক আমজাদ ভাইয়ের তো তুলনা হয় না। ক্যাম্প করতে তার সহোযোগিতায় হাত লাগালেন মুরাদ, ইমরান, কামাল, সাইফুল ও রাইহান জো। আমরা এক এক করে যার যার মায়ার বিভ্রম তাঁবুতে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সূর্য ফুল ততক্ষণে তার গাঢ় রঙ ছড়িয়ে ডুবে যাবেন ভাবছেন; এমন সময় ক্যামেরার কবি সিফাতের ক্লিক ক্লিক। আটকে রাখলো নানান মুহূর্ত। 

গারো পাহাড়ে প্রচুর পরিমাণে মূল্যবান শালগাছ একাকী দাঁড়িয়ে আছে যেনো। সূর্যফুল না ডুবতেই তাদের সঙ্গ দিতে এগিয়ে এলো আকাশ ভরা তারা ও সিকি চাঁদ। সৌন্দর্যের আঁধার বাড়তে লাগলো, বারবিকিউ প্রস্তুতি, সাথে বাউল কাকুর গান, ক্যাম্প ফায়ার চলতেই শুরু হলো শৈবাল আদিত্য দাদা ও আঁখি আপা ভারসেস আনতাসারি খেলা। কামাল খান শুরু করলেন ৫ সেকেন্ডের খেলা, পুরস্কার আয়নাল ভাইয়ের বউয়ের হাতে বানানো মোয়া। কিছুক্ষণ বাদে ভাবী নিয়ে এলেন লাল চালের ভাত, সিম, কাঁচা টমেটো দিয়ে ছোট খলিশা মাছ রান্না। বারবিকিউ ও পরোটা চললো মধ্যরাতে।

প্রকৃতি তার ঝুলি উজাড় করে দিয়েছে গারো পাহাড়কে সাজাতে। সৌন্দর্য মেশা উঁচু-নিচু পথ দিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখার মজাই আলাদা। সবুজের অপার সমারোহ এই গারো পাহাড়। পাহাড়ের অসমতল উঁচু-নিচু টিলার মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ঝরনা। যার স্বচ্ছ জলরাশিতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পাওয়া যায়। চিনামাটির পাহাড় বা সাদা পাহাড়ের মাঝে সমতল ভূমি। সমতল ভূমিতে সবুজ শস্যক্ষেত। পাহাড়ে পায়ে চলার দুর্গমপথে চলাচল করে পাহাড়ি মানুষ। কোথাও কোথাও টিলার ওপর দেখা যাবে ছোটছোট কুঁড়েঘর। সবুজ গাছের ফাঁকে নীল আকাশ। অপার সৌন্দর্যের এ পাহাড় চোখ জুড়িয়ে দেয় যে কোনো পর্যটককেই। উপত্যকার ঢালেই আছে খনিজ তোলার গুহা! পাকিস্তান আমলে যেখান থেকে তোলা হতো খনিজ! সেটি পরিত্যক্ত হলেও গা ছমছমে একটা ব্যপার তো আছেই।

এ এলাকায় বাস করে বিভিন্ন শ্রেণীর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন। তার মধ্যে গারো, হাজং, কোচ, মুরং উল্লেখযোগ্য। আমরা সবাই মিলে বিজয়পুরের সীমান্তের দিকে হেঁটে রওনা দিয়েছি। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা আর চারপাশে সবুজ গাছপালা। নদীর ওপারের মেঘালয় রাজ্যের ঘন সবুজ গারো পাহাড় আর অপরূপ নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যের হাতছানি দেখে হৃদয়ে শিহরণ জাগে। যেতে যেতে কেউ সেলফি আবার কেউবা ক্যামেরায় ক্লিকবাজিতে ব্যস্ত। 

খানিক বাদে পৌঁছালাম বিজয়পুর শেষ সীমান্তে। পা বাড়ালেই ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্য। গেলাম রাণী খং মিশনে। এখানে একটা স্কুল ও খ্রিস্টানদের উপাসনালয় আছে। নেত্রকোনায় কাঠ পাচারের এক মজার গল্প শুনলাম এখানে বসবাসরত এক বাঙালির মুখে। সে জানালো, পাহাড় থেকে গাছ কেটে কাঠের গুড়ি পাহাড় থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। ঢাল বেয়ে সে গুড়ি এসে পড়ে। রাতে চোরাকারবারীরা এসে কাঠ নিয়ে যায়। এখানে দেখার মতো আছে গারো পাহাড়, সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি, টংক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ, সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী, হাজং মাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ, সাদা মাটির পাহাড়।

সুসং দুর্গাপুরের উত্তর সীমান্তে নলুয়াপাড়া, ফারংপাড়া, বাড়মাড়ি, ডাহাপাড়া, ভবানিপুর, বিজয়পুর ও রানিখংসহ বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এর বিস্তার।  সবশেষে আলামিন ভাইয়ের বাড়ি' নামক হোটেলে আলুভর্তা,ডাল, মলা মাছ, ভাত ও ডিম ভাজা খেয়ে রওনা হলাম ফেরার পথে। ময়মনসিংহ শহরে আসতেই শব্দজট খেলতে খেলতে ফেলে এলাম নভোনীল বাংলাদেশের সুইজারল্যান্ডখ্যাত সুসং দুর্গাপুরের পাহাড়ের ঢাল।

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়