ঢাকা, বুধবার, ৯ ফাল্গুন ১৪২৪, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
Risingbd
অমর একুশে
সর্বশেষ:

আট বছর আগের একদিন: লোকটি আত্মহত্যা করে কেন?

মোহাম্মদ আজম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১০-২২ ১১:৩৭:০৬ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১১-২৪ ৫:০৯:৫৮ পিএম

মোহাম্মদ আজম: জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত কবিতা ‘আট বছর আগের একদিন’-এ একটি গল্প আছে। গল্পটি এমন এক ব্যক্তির, যে আত্মহত্যা করেছে আট বছর আগে। কবিতায় তার আত্মহত্যার কারণ খুঁজেছেন কবি। খুব সরল স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মনে হয় না। বস্তুত তাঁর খোঁজাখুঁজির প্রক্রিয়া একদিকে দার্শনিক মেজাজের, আরেকদিকে কাব্যময় মাধুর্যের। সম্ভাব্য নিপুণতম কাব্যিক কেতায় কবি আত্মহত্যার দার্শনিক-মনস্তাত্ত্বিক তদন্তে নেমেছেন।

আত্মহত্যার প্রতি এই কথক-কবির দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? এক কথায় বলা মুশকিল। আত্মহন্তার পরিণতি প্রকাশের জন্য যে শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়েছে, আলঙ্কারিকতার যে ধরনের এনতেজাম করা হয়েছে, তাতে অনুমোদনের চিহ্ন নাই। এই বিবরণীতে প্রাধান্য পেয়েছে ‘লাশকাটা ঘর’। বিবরণীটিকে ‘বাস্তববাদী’ বলা যায় না। যদি ওই ব্যক্তির পরিবার-পরিজন থেকেই থাকে, এবং পরিজনের সাথে সে ‘প্রেম’ বা ‘আশা’র মতো স্বাভাবিক সম্পর্কে সম্পর্কিত থাকে, তাহলে মৃত্যুর পর আবেগ-অনুভূতির কিছু প্রকাশ হওয়ার কথা। কবি তার ধারে-কাছেও যান নাই। লাশটিকে সোজা নিয়ে তুলেছেন লাশকাটা ঘরে। কবিতাটি যে শুরু হয়েছে লাশকাটা ঘরে, তা দৈবচয়ন নয়। অর্থাৎ এমন নয় যে, শুরু করার অনেকগুলো বিকল্প থেকে কবি যাচ্ছেতাইভাবে একটিকে বেছে নিয়েছেন। বরং এই মৃতের পরিণতিবাচক যে ইমেজ অন্তত বার দুয়েক ব্যবহৃত হয়ে কবিতাটির ভাবগত কাঠামোর একাংশ নির্মাণ করেছে, এ নির্বাচন তার সাথেই সঙ্গতিপূর্ণ। ইমেজটিতে কবি প্লেগগ্রস্ত ইঁদুরের উপমা এনেছেন:

রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি

আঁধার ঘুজির বুকে ঘুমায় এবার;

কোনোদিন জাগিবে না আর।

বোঝাই যাচ্ছে, এ বিবরণ লাশকাটা ঘরে রাখা লাশের ‘বাস্তব’ বিবরণ নয়। বরং গভীর বাস্তবতা প্রকাশক এক্সপ্রেশনিস্ট ছবি। আত্মহত্যার পরিণতি সম্পর্কে কবির অনুমোদনহীন মনোভাবের বিকট প্রকাশ ঘটেছে এই ছবিতে। অন্যত্র এ ছবিটিই একটু অন্যভাবে ব্যবহৃত হয়েছে:

মর্গে কি হৃদয় জুড়োলো

মর্গে - গুমোটে

থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে!

ততক্ষণে প্রকৃতি আর মনুষ্যত্বের প্রাণীর গভীর জীবনতৃষ্ণার একরাশ উদাহরণ দেয়া হয়ে গেছে। বিপরীতে স্থাপিত হয়েছে এক জীবনবিমুখ ব্যক্তি। তার উদ্দেশ্য ছিল- হয়ত, মরে গিয়ে বাঁচা। কিন্তু উপরের বাঁকাহাসিমাখা ছোট্ট পঙ্‌ক্তি তিনটি পরিষ্কার সাক্ষ্য দেয়- অন্তত কথক-কবির বিবেচনায়- সে লক্ষ্য হাসিল হয় নাই।

তার মানে এ নয়, এই নিপুণ কথক লোকটির মুক্তিলাভের উদ্যম তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন। বরং ঘটেছে তার উল্টো। এই শোচনীয় পরিণতির কথা লোকটির অজানা ছিল না। তবু একগাছা দড়ি হাতে সে এগিয়ে যায় মরণের দিকে। তার মানেই হলো, তার ‘মানবীয় পরিস্থিতি’ জীবন চালিয়ে নেয়ার উপযোগী ছিল না। পরম যত্নে ও কুশলতায় কবি এই পরিস্থিতির ভাষ্য তৈয়ার করেছেন।

তিন দফায়। প্রথমাংশের বর্ণনা কতকটা অনিশ্চিত মেজাজের, আর রহস্যময়। বলা হয়েছে, লোকটি হয় বহুদিন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছিল, অথবা এইমাত্র ঘুম থেকে জেগে পঞ্চমীর চাঁদের আলোয় ‘ভূতে’র মন্ত্রণায় আত্মহত্যার প্ররোচনা পেয়েছে। যে মন্ত্রণা বস্তু-পৃথিবী অথবা যুক্তির দুনিয়া থেকে পাওয়া নয়, যে অনুভবের জন্ম ব্যক্তির বোধ-বোধির অতল গভীরে, সেই বিমূর্ততা ছবিতে মূর্তিমান হয়েছে ভূতের কারসাজিতে। ভূত আছে এবং নাই; ভূত দেখা যায় এবং দেখা যায় না। যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে, এবং দৃশ্যত- আমরা পরে দেখব- কোনো কারণ ছাড়াই, তার মন ভূতগ্রস্ত তো বটেই। কিন্তু জীবনানন্দ কথাটা বলেন ছবি বানিয়ে। ছবিতে বস্ত-দুনিয়ার কায়দা-কানুন অক্ষুণ্ন রাখেন। বাস্তবের যুক্তি অনাহত রেখেই ছাড়িয়ে যান চেনাজানা বাস্তবের সীমানা। যেমন ভূত দেখার ইনতেজাম করলেন তিনি জ্যোৎস্নায়, যাকে রহস্যময় আলোজনিত বিভ্রম ভাবার যথেষ্ট সুযোগ আছে; আর জ্যোৎস্না মিলিয়ে যাবার পর আমদানি করলেন নতুন বিস্ময়:

চাঁদ ডুবে চলে গেলে- অদ্ভুত আঁধারে

যেন তার জানালার ধারে

উটের গ্রীবার মতো কোনো-এক নিস্তব্ধতা এসে।

‘অদ্ভুত’ কথাটা কর্তার মনোভঙ্গির দিক থেকে পাঠযোগ্য, কিন্তু এর বস্তু ও বাস্তব গুণও উপেক্ষণীয় নয়। এইমাত্র জ্যোৎস্নাগত হয়েছে, রেশ এখনো মিলিয়ে যায়নি; সে রেশের অবশেষ আঁধারের রূপকে করে তুলতে পারে বিভ্রমময়। এই বিভ্রমে মূর্তিমান হতে পারে বিমূর্ত ‘নিস্তব্ধতা’- উটের গ্রীবার বেশে। জীবনানন্দের এই বিখ্যাত উপমা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। এখানে শুধু নিস্তব্ধতায় প্রাণযোগের কথা বলতে চাই। সশব্দ হয়ে ওঠার কথা বলতে চাই। [তুলনীয়: শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে] এই নিস্তব্ধতা চলে এবং বলে। লোকটির অন্তরের সপ্রাণ অস্তিত্ব মরণের বার্তা নিয়ে আসে।

দ্বিতীয় অংশে লোকটির আত্মহত্যাকালীন পরিস্থিতির যে পরিচয় আছে তা মেজাজের দিক থেকে নিশ্চিত, কিন্তু খুব যে স্পষ্ট তা বলা যাবে না। বিবরণীটিতে সাধারণীকরণের ঝোঁক পরিষ্কার:

অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়-

আরো এক বিপন্ন বিস্ময়

আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে

খেলা করে;

আমাদের ক্লান্ত করে;

এ ব্যক্তি, দেখা যাচ্ছে, সে গোত্রের যারা অস্তিত্বের গভীরে বিপন্নতা বোধ করে, যাদের অপ্রতিরোধ্য ক্লান্তির ভার বইতে হয়। কবিতার তৃতীয় অংশ সাক্ষ্য দেয়, মানুষমাত্রই এ বিপন্নতা, এ ক্লান্তির অংশীদার নয়। কেউ কেউ এই দুর্বহ নিয়তির ভাগিদার হয়। ওই নিয়তির দায় মেটাতে গিয়েই অর্থহীন পরিণতি মেনে নিতে বাধ্য হয়। লাশকাটা ঘরে প্লেগগ্রস্ত ইঁদুরের পরিণতি মেনে নিয়ে সে হয়ত অধিকতর শোচনীয় জীবিতদশার সাথে আপসরফা করে। তার আত্মহনন তখন শুধু বৈধই হয় না, প্রয়োজনীয়ও হয়ে ওঠে।

ঘটনা ঘটার বহুদিন পর কবি এই আত্মহত্যা-বিষয়ক সন্দর্ভ রচনা করেছেন। রচনাভঙ্গি থেকে বোঝা যায়, তিনি ভাবনাচিন্তার জন্য যথেষ্ট সময় নিয়েছেন। বিচিত্র সম্ভাব্য দিক খতিয়ে দেখেছেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন- এ সম্পর্কে কোনো স্থির সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। খুবই মার্জিত চৌকস এক ভঙ্গিতে তিনি তাঁর কথাগুলো উপস্থাপন করেছেন। বস্তুত, উপস্থাপনার বিশিষ্ট ভঙ্গির কারণেই কেবল কথাগুলো কার্যকরভাবে বলা গেছে।

বিবরণীটি আছে কবিতার দ্বিতীয় অংশে। দুই স্তবকে। প্রথম স্তবকে বলা হয়েছে, এই ব্যক্তি জাগতিক প্রাপ্তির বর্ণাঢ্যতায় জীবনযাপন করছিল। তার জাগতিক অভাব-অনটন ছিল না। আবেগ ও মননের অভাবজনিত সঙ্কটও ছিল না। সবকিছুর পরও সে আত্মহত্যা করেছে। এ স্তবকের সিদ্ধান্তটি খুব মজার। বলা হচ্ছে, তার কোনো সমস্যা নাই বলেই সে আত্মহত্যা করেছে: ‘তাই/ লাশকাটা ঘরে/ চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের’পরে।’ পরের স্তবকে কারণ ব্যাখ্যার চেষ্টা আছে। স্তবকটি কথা বলেছে সাধারণ সূত্রের মতো করে। বলেছে, মানুষের জাগতিক প্রাপ্তিকে তার চূড়ান্ত মোক্ষ ভাবার কোনো কারণ নাই। সব থাকার পরও এক ‘বিপন্ন বিস্ময়’ তাকে অভিভূত করতে পারে। সব থাকা যেমন ক্লান্তির জন্ম দিতে পারে, তেমনি ওই বিপন্নতাও ঘাতক ক্লান্তির জন্ম দিতে পারে। পরিণতি একই- আত্মহত্যা। আগের স্তবকের কথাগুলো এ স্তবকেও সিদ্ধান্ত-বাক্য হিসাবে বলা হয়েছে। ‘তাই’ অব্যয়টি প্রমাণ করে, কবি যৌক্তিক সিদ্ধান্তই নিতে চেয়েছেন। কিন্তু দুই কার্যকারণের একই পরিণতি প্রমাণ করে, কোনো একাট্টা সিদ্ধান্ত নেয়া মোটেই সম্ভবপর নয়।

কারণ অনুসন্ধানের স্তবক দুটিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য হলো, কী কারণে লোকটি আত্মহত্যা করে নাই, তা সাড়ম্বরে বলা হয়েছে; কিন্তু কী কারণে করেছে তার স্থিরনির্দিষ্ট নির্দেশনা নাই। দ্বিতীয় স্তবকের ‘বিপন্ন বিস্ময়’কে এবং তজ্জনিত ক্লান্তিকে যদি কারণ হিসেবে ধরি, তাহলে কারণটি এতই অনির্দিষ্ট এবং বিমূর্ত হয় যে, একে ঠিক কারণ বলা যায় না। বরং কারণ নির্ণয় করা যে দুরূহ, সে বোধই প্রবল হয়ে ওঠে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র বিখ্যাত ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনী’ গল্পে এ ধরনের কৌশল পাওয়া যায়। তুলসী গাছটি কেন উপড়ে ফেলা হলো না, কিংবা গোপনে কে এর যত্ন নিচ্ছে, তার তদন্ত গল্পের এক পর্যায়ে জরুরি হয়ে উঠেছিল। তখন বলা হলো, কারণটি এরকম নয়, ওরকম নয়, সেরকমও নয়। কিন্তু কী রকম তা আর বলা হলো না। তাতে করে ওই না-বলা কারণটাই হয়ে উঠল গল্পের গভীরতর মূল। ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার ক্ষেত্রেও এ ধরনের কাব্যকৌশলের কারণে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, মানুষের আত্মহত্যার যতগুলো কারণ কল্পনা করা যায়, যতগুলো কারণ অতীত ইতিবৃত্ত বা বাস্তব তথ্য-উপাত্ত থেকে শনাক্ত করা যায়, এ লোকটি তার বাইরের কোনো কারণে আত্মহত্যা করেছে। ঠিক এখানে এসে কবিতাটি আর বিশুদ্ধ আত্মহত্যার কবিতা থাকছে না। বরং হয়ে উঠছে মানুষ-বিষয়ক এক নিগূঢ় সন্দর্ভ। কারণ আত্মহত্যার কারণজনিত এই অনির্দিষ্টতা স্পষ্টতই প্রমাণ করে, মানুষ সম্পর্কে বস্তু বা যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে নেয়া সম্ভব নয়। ইতর প্রাণী সম্পর্কে নেয়া যায়। প্রকৃতি সম্পর্কে নেয়া যায়। মানুষ সম্পর্কে নয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। এ মানুষ কোন মানুষ? কী তার ভাব-স্বভাব?

কবিতাটিতে মানুষ সম্পর্কে একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা আছে। ‘আমরা’, ‘মানুষ’ ইত্যাদি শব্দের বিচিত্র ব্যবহারের মধ্যে তা স্পষ্ট। কিন্তু এই ‘মানুষে’র  মধ্যে সব মানুষ সম্ভবত অন্তর্ভুক্ত নয়। কবি সরাসরি মানুষকে ইতর প্রাণী থেকে আলাদা করে নিয়েছেন। ঠিক তেমনি ‘বিপন্ন বিস্ময়’ বোধ-করা মানুষদের থেকেও বিপুল আম-জনতাকে আলাদা করেছেন। ব্যাপারটি বিশেষভাবে ঘটেছে কবিতার শেষ-অংশে।

কবিতার তৃতীয় অংশের জটিলতা আর দ্ব্যর্থকতার মূলে আছে ‘আমি’। এ ‘আমি’ পেঁচার সাথে একাত্ম হয়ে ‘দুজন’ তৈরি করলে হিসাবটা আরো জটিল হয়ে যায়। ফলে ভিন্ন রকম পাঠ তৈরি করা ছাড়া উপায় থাকে না। প্রাথমিকভাবে এ ‘আমি’ কথক ‘আমি’ই বটে। কবিতার তিন পর্বে কথক-কবির অবস্থান তিন রকমের। প্রথমে একজন অনুসন্ধানী তৃতীয় পক্ষ- আম-জনতার একজন হয়েও সক্রিয়তায়-লিপ্ততায় আলাদা, কিন্তু কর্তৃত্বপূর্ণ নয়। দ্বিতীয় ‘আমি’ এ স্তর ছাড়িয়ে উঠে গেছে অনেকদূর- ঠিক কবি অথবা নবির মতো। সিদ্ধান্ত জানিয়েছে কোনো রাখ-ঢাক ছাড়া, নিশ্চিন্ত মেজাজে। মনে রাখা দরকার, ওই সিদ্ধান্তের যে রহস্যময়তা, তা কিন্তু বলা হয়েছে রহস্য না-রেখেই; যে অস্পষ্টতা, তা বলা হয়েছে স্পষ্ট করে। তৃতীয় অংশের ‘আমি’ আসলে নেমে গেছে জনতার কাতারে। মানুষের স্বাভাবিক-সাধারণ জীবনস্পৃহা ও চৈতন্য প্রকাশ পেয়েছে এই ‘আমি’র সংক্ষিপ্ত তীর্যক জবানিতে। পেঁচা-প্রসঙ্গের নিপুণ ব্যবহারই এই ‘আমি’র সংজ্ঞায়ন ঠিক করে দিয়েছে।

পেঁচা প্রথমবার এসেছে ইতর প্রাণীগুচ্ছের একটি হয়ে। ব্যাঙ, মশা, মাছি ও ফড়িঙের সহযাত্রী হয়ে। কিন্তু প্রথম উল্লেখেই পেঁচা আলাদা অস্তিত্বেরও জানান দিয়েছে। বলা হয়েছে, ‘তবুও তো পেঁচা জাগে’। এ উল্লেখ স্বয়ং কোনো অর্থ প্রকাশ করে না, যেখানে মশা বা মাছির প্রসঙ্গগুলো বিস্তারিত বিবরণীর সুবাদে নিজেরাই অর্থবহ হয়ে ওঠে। পেঁচা-সম্পর্কিত এই সংক্ষিপ্ত পঙ্‌ক্তিটি কেবল তখনই অর্থবহ হয়, যখন আগের চাঁদ-ডোবা প্রসঙ্গটিকে মিলিয়ে পড়া হয়। দ্বিতীয় উল্লেখে সে কথাটিই স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। চাঁদ ডুবে অন্ধকার হলেই কেবল পেঁচার জীবন শুরু হয়। তার মানেই হলো, অন্ধকার কোনো সর্বজনীন অর্থ বহন করে না, যেমন করে না আলো। দ্বিতীয় উল্লেখে ‘বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনো জলে ভেসে’ পঙ্‌ক্তিতে দুটি নিরীহ কিন্তু কার্যকর বিশেষণ ‘বুড়ি’ আর ‘বেনো’ পেঁচার প্রচণ্ড জীবনতৃষ্ণাই প্রকাশ করে এবং পেঁচাকে তাৎপর্যপূর্ণ চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। কবিতার শেষাংশে এই প্রতিষ্ঠিত চরিত্রের সুবিধাই নিয়েছেন কবি। শেষ অংশে পেঁচা প্রসঙ্গে ‘চোখ পালটায়ে কয়’ ইত্যাদি উল্লেখ চরিত্রটিকে আরো দৃঢ় ভিত্তি দেয়। কী সেই ভিত্তি? নিঃশর্ত জীবনতৃষ্ণা। মন ও মনন-নিরপেক্ষভাবে অভ্যস্ত পুনরাবৃত্তি আর জৈবিক চাহিদার পরিপূরণই সে জীবনতৃষ্ণার মূলকথা। এ চরিত্রের সমতলে নেমে এসে ‘আমি’ চরিত্রটি আসলে মানুষের মধ্যেও সমধর্মী জীবনতৃষ্ণার প্রতিনিধিত্ব করেছে। আর এভাবে আলাদা হয়ে গেছে ওইসব মানুষ থেকে, যারা অন্তর্গত রক্তের ভিতর বিপন্ন বিস্ময় অনুভব করে।

‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার যেসব পাঠক একে ‘আত্মঘাতী ক্লান্তি’র কবিতা বলেছেন, তাঁরা আসলে খুব বাড়িয়ে বলেননি। বস্তুত ক্লান্তিজনিত সঙ্কটের কারণে আত্মহত্যা যদি বৈধ হয়, তাহলে খোদ ক্লান্তিরই মহিমায়ন ঘটে। আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতর যদি এক বিপন্ন বিস্ময় খেলা করেই থাকে, তবে তা থেকে শুধু ক্লান্তি নয়, অন্য নানা রস জন্মানোরও সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু জীবনানন্দ বিশেষভাবে ক্লান্তি আবিষ্কার করেছেন- বিপন্ন বিস্ময় থেকে ‘বিপন্নতর’ ক্লান্তির উদগমের কথা বলেছেন। সমধর্মী উপলব্ধির পরিচয় আছে জীবনানন্দের বিপুল কবিতায়, যেমন ‘বনলতা সেনে’, যেখানে দীর্ঘ মানব-অভিজ্ঞতার উত্তরসূরি হিসেবে কবি-কথক কেবল ক্লান্তিরই ভাগিদার হয়েছিলেন।

কিন্তু মনে রাখা দরকার, এ কবিতায় আত্মহত্যাকে বিশেষ পরিস্থিতিতে যতই অনিবার্য করে দেখানো হোক, মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থার প্রতি কিন্তু কোনো অনুরাগ বা পক্ষপাত দেখা যায়নি। বরং জীবনদায়িনী সংবাদকে ‘তুমুল গাঢ় সমাচার’ বলে সংবর্ধিত করা হয়েছে। অর্থাৎ মানবিক পরিস্থিতি হিসেবে আত্মহত্যার পরিস্থিতি আর প্রচণ্ড জীবনতৃষ্ণার চাঞ্চল্য- এ দুই ছবিকে পাশাপাশি স্থাপন করা চলে। এর মধ্যে কবির প্রত্যক্ষ টান প্রথম দলের দিকে। কিন্তু দ্বিতীয় বিপুল দলটিও ন্যায্যভাবে হাজির থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া অসম্ভব নয় যে, মানুষ জীবনবাদী সত্তা, কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে জীবন নাশ করাও মানবিক পরিস্থিতিই বটে। অন্তর্নিহিত এই বৈশিষ্ট্যই মানুষকে ‘বস্তু’ বা ‘যুক্তি’র স্তরে নিঃশেষ করে দেয় না।
 

 

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ঢাবি


 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ অক্টোবর ২০১৭/তারা

Walton
 
   

সংশ্লিষ্ট খবর:

Marcel