ঢাকা, মঙ্গলবার, ৯ কার্তিক ১৪২৪, ২৪ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:
ফিল্ম রিভিউ

‘পোস্ত’ দেখে খেতে চাওয়া অতঃপর গিলে ফেলে পুনর্বিবেচনা

জেনিস আক্তার : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-২৭ ৫:৪৫:৩৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-২৭ ৭:৫৭:১৫ পিএম

|| জেনিস আক্তার || 


‘‘শ্যামলী সিনেমা হলে আসছি ‘পোস্ত’ খেতে’’- এমন একটি স্ট্যাটাস দিয়েই সিনেমা দেখতে বসে গেছি। পোস্ত আফিম থেকে পাওয়া এক ধরনের তৈলবীজ খাবার হলেও এই পোস্ত শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় পরিচালিত বাংলা চলচ্চিত্রের নাম। সিনেমাটা খাওয়ার কথা থাকলেও আমি সিনেমাটা গিলেছি বলা যায়! আড়াই ঘণ্টা সময়জুড়ে স্ক্রীনের দিকে চোখ আমার আটকে ছিল, অনেকটাই নেশার মতো পোস্ত!

১২ মে, ২০১৭। এদিন বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাওয়া ছবিটি প্রথম চার সপ্তাহে আয় করেছে ৭ কোটি (US$১.৪ মিলিয়ন) টাকা। ১০০ দিন সফলভাবে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়েছে। এখন এসেছে বাংলাদেশে। কলকাতার কৃষ্টি-সংস্কৃতি আমার কাছে অনেকটা সমৃদ্ধ মনে হয় বলেই আমি কোনো আর্ট ফিল্ম বাদ দেই না (যদিও সব ফিল্মই একটা আর্ট। তবুও আমরা দুটোকে আলাদা করার জন্য সহজ নাম দিয়েছি- বাণিজ্যিক আর আর্ট ফিল্ম)। ‘পোস্ত’ যেহেতু ‘বেলাশেষে’ আর ‘প্রাক্তন’র হাত ধরে আসা সফল ছবি, সেহেতু বেলাশেষে আর প্রাক্তনের দর্শক হয়ে নিশ্চয়ই পোস্ত বাদ দিতে পারি না। তাও আবার আমার দেশে আমার বাসার কাছের প্রেক্ষাগৃহে চলছে এমন সফল ছবি! 

আমি সিনেমার রিভিউ যখন লিখি, সব সময় বলি- এটা পর্যালোচনার কাতারে ফেলা যাবে না, এটি আমার সিনেমা দেখার ভেতরের অনুভূতিমাত্র। আমার কাছে রিভিউ মানেই পুনর্বিচার নয়। এটি একটি পরিদর্শনের ব্যক্ত অনুভূতি। আমরা সব সময় বলি, সাহিত্য-সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনের দর্পণ। আসলে যে সাহিত্য কিংবা সংস্কৃতির মাঝে জীবনের নিখুঁত বোধ, জ্ঞান কিংবা জীবনের সমসাময়িক সমস্যা এবং সমস্যা বাতলে দেওয়ার পথ দেখা যায় সেটাই আমাদের মনে দাগ কাটে। আমরা সেটাকেই বলি ভালো কাজ, সমৃদ্ধ কাজ। এই যে বেলাশেষে, প্রাক্তন কিংবা পোস্ত কেন এতো দর্শকপ্রিয়তা পেল? কারণ একটাই, এগুলো জীবনের কথা বলে, জীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতির সাথে লড়াই করে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে আমাদের ভাবতে শেখায়, আমরা সহজে গ্রহণ করি। সংস্কৃতির ধারাটাই হয়তো জীবনের বহমান স্রোতের সাক্ষীস্বরূপ। তাই এতটা ঢেউ দিয়ে যায় মনে প্রাণে আর অন্তরে।

সিনেমাটির গল্পে আটপৌরে ছন্দে আন্তর্জাতিক আবেদন এতোটাই প্রখর যে, এখানে ভৌগোলিক সীমানা, ভাষা, অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। শ্যামলী হলের দর্শকশ্রোতা ছিল ফ্যামিলি প্যাকেজে। এখানে যেমন মা-বাবা তাদের বাচ্চাদের নিয়ে এসেছে, তেমনি দাদা দাদু নানা নানুদের নিয়ে এসেছে। এ যেন তাদের জন্যই ছবি। তবুও আমার মতো মেয়ের ছবিটি যে মন কাড়েনি সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। গোগ্রাসে তো গিললাম গেলার মতো একটি সিনেমা। অনেক সিনেমাপ্রেমী যারা হলে গিয়ে সুস্থ সুন্দর সিনেমা দেখার চিন্তা করেন, ভাবতে চান জীবন আর জীবনবোধ নিয়ে- তাদের জন্যও এই সিনেমা। অপূর্বভাবে পারিবারিক গল্পকথাগুলো তুলে ধরা হয়েছে যা একেবারে মন ছুঁয়ে যায়! মধ্যবিত্ত বাঙালির ঘরোয়া সেন্টিমেন্ট কীভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে দর্শকের কাছে পরিবেশন করতে হয় তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় এঁদের ছবিগুলো।

‘পোস্ত’ শুরু হয় ঘণ্টাধ্বনি দিয়ে, এবং পরবর্তীতে ছবিজুড়েই থেকে যায় এর রেশ- অর্থাৎ ঘণ্টা! মেটাফরকে এত বাস্তব হয়ে উঠতে আগে কোনো বাংলা সিনেমায় দেখা যায়নি। ছোট্ট ‘পোস্ত’র ওপর কার অধিকার বেশি? বায়োলজিক্যাল বাবা-মায়ের, নাকি ‘পোস্ত’কে গড়ে তোলার কারিগর দাদু-ঠাকুমার? লড়াই গড়ায় আদালতের দরজায়। তার বাবা-মা ও দাদু-ঠাকুমার মধ্যেকার মনোমালিন্য, অতঃপর আদালতের রায়ে কার কাছে থাকবে ‘পোস্ত’- এমনই এক কঠিন বাস্তবতা নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটির গল্প। দর্শক, গল্প ও সততা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া এক ছবি। সব সময় দর্শক কী চায় তার দিকে নজর দিতে পারে না নির্মাতা। তবে সফল সিনেমা তৈরিতে নির্মাতা কী দেখাতে চায় সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে দর্শক কী দেখতে চায় তারও মূল্য দিয়ে এগিয়ে নিতে হয় সিনেমা- এখানে পরিচালক সেই দক্ষতা দেখিয়েছেন।

তবে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের অন্যান্য সিনেমায় ডায়ালগে চিন্তার যে গভীরতা থাকে এখানে ততোটা মুন্সিয়ানা তারা দেখাতে পারেননি বলেই আমার মনে হয়েছে। আর অনুপমের গান কিংবা আরো কিছু রবীন্দ্রসংগীত ভালোভাবে শুনতে পারিনি। আমার কাছে মনে হয়েছে শ্যামলী সিনেপ্লেক্সের সাউন্ড সিস্টেম ততটা ভালো না, শুধু ভয়েজটাই ভালো। কারণ সিনেমার ট্রেইলারে গান স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তবে আমি গানগুলোও খুব বেশি উন্নত কাজ বলতে পারব না, আমার কাছে মনে হয়েছে গানগুলো দায়সারা কাজ। গানের উপর অবশ্য ছাড়িয়ে গেছে এর নির্মাণশৈলী আর কাহিনি। ফলে সিনেমার গানের ভিডিওগ্রাফি দেখলে গান শোনার অতটা প্রয়োজন পড়ে না।

শীতের সকাল দিয়ে শুরু করলেও রাতের নিশুতিতে বনের মাঝে জোনাকী পোকা আর চাঁদের আলোয় ফিনফিনে সাদা পাঞ্জাবি পরে সাইকেল চালানো আদৌ সম্ভব কিনা জানা নেই। নাকি শীত উঠেই গেল? জোনাকী পোকা কিংবা চাঁদের যে গ্রাফিক্স তা মুগ্ধ হবার মতো। অবাক নয়নে দেখে যাওয়া , এখানে টেকনোলজি স্বীকার করতেই হয়। কৃত্রিম বলার সুযোগ সুকৌশলী চোখ ছাড়া সাধারণ চোখ এড়িয়ে যাবে।  

সিনেমার বেশ কিছু জায়গা উল্লেখযোগ্য। তার মধ্যে একটা বলা যেতে পারে যখন ছোট্ট পোস্ত তার মা-বাবা, দাদু-দিদার হাত ধরে প্রথমবারের জন্য পা রাখছে কোর্ট চত্ত্বরে এবং তার মনের অবস্থা বোঝানোর জন্য আখের রস তৈরির যন্ত্রের প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি বুঝিয়ে দিচ্ছিল অধিকারের লড়াইতে এভাবেই দমবন্ধ হচ্ছে পোস্ত’র্ সরল মন। এরকম বেশ কিছু ট্রিটমেন্ট সিনেমাটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে!

এখানে আরো কিছু ব্যাপার আছে। ধরুন প্রোগ্রেসিভ সমাজে বাচ্চাকে সঠিক শিক্ষা কে দিতে পারে- দাদু-দিদা না বাবা-মা? সোহিনী সেনগুপ্তের কথা, ইনি এই পরিচালক জুটির লাকি ম্যাসকট বলা যেতে পারে। আর সেটা হবেই তো, কারণ ওনার পার্টটা দেখার সময় আপনার চোখের পলক পড়বে না। এবং অবশ্যই ছোট্ট ‘পোস্ত’ ওরফে অর্ঘ্য বসু রায়, বলা যেতে পারে সেরা আবিষ্কার, এতো সাবলীল অভিনয় লজ্জায় ফেলতে পারে অনেক বড় অভিনেতাদেরও!

‘গুরুজি’ মানে দীনেন লাহিড়ী (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) যুক্ত ছিলেন শান্তিনিকেতনের স্কুল টিচার হিসেবে। তিনি এত ভীষণ শুদ্ধাচারী যে নাতির মুখে ‘শিট’ শুনে শোকে-দুঃখে বলতে গেলে মর্মাহত হন! বড় ছেলে অপু গুণী, তার গুণের বিকাশ ঘটাতে নিজের ইচ্ছে চাপিয়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের সুইসাইড নোট আর অপুর মৃত্যুর পর অনুকে ঘৃণা করা তাকে বার বার তার অপারগতার জন্য দায়ী করা সে আমাদের বর্তমান সমাজের স্বাভাবিক চিত্র। তারপরও সব শেষে মিলেমিশে থেকে সুখী সুন্দর ভবিষ্যৎ একটা শিশুকে দেওয়া, কোয়ালিটি আর কোয়ান্টিটি টাইমের একটা বিশাল জট খুলে যায়। ঝকঝকে আড়াই ঘণ্টার বিজ্ঞাপনী ফিল্ম বলা যায়! গল্পের মাঝে মাঝে মিশে থাকে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী ব্র্যান্ডের সুন্দর প্রচার। উকিল অলোকরঞ্জন চ্যাটার্জি (পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়) এর কিছু কথা, সময়ে আর আবহাওয়ার মিলমিশ বাদ দিলে নিখুঁতই বলা যায়। কারণ এসব ভুল সিনেমার গল্প আবেগভাব ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।   

সিনেমাটি ১৪ বছর আগে প্রকাশিত সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘মোহনবিল’ গল্পের আদলে তৈরি। এর আগে যে সাহিত্য থেকে ছবি তৈরি হয়নি তা নয়। বিশ্বের প্রায় সমস্ত ভাষার সিনেমাতেই এটা হয়ে থাকে। তবে সেক্ষেত্রে অন্তত সেই সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ করাটাই উচিত ছিল। সব শেষে সবার জন্য বলতে চাই একটাই কথা- তাড়াতাড়ি চেখে আসুন এই ‘পোস্ত’র স্বাদ । বাবা-ছেলে-নাতি, তিন প্রজন্মের গল্প। বাচ্চাকে কতটা সময় দেয়া, কতটা ভালোবাসা- এগুলোই সামাজিক বার্তা নিয়ে এগিয়ে গিয়েছে ছবি। এই গল্পে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, লিলি চক্রবর্তী, যীশু সেনগুপ্ত, মিমি চক্রবর্তী, বাবুল সুপ্রিয়, সোহিনী সেনগুপ্ত, পরাণ বন্দোপাধ্যায়সহ আরো অনেকে। পোস্ত পরিবেশনও হয়েছে রসিয়ে। সেটা সিনেমাটা দেখলেই নির্দ্বিধায় বলা যায় ।

লেখিকা: কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও প্রকৌশলী  



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel