ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ পৌষ ১৪২৫, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:
উপকূলে নারী-৭

নারী জেলের সুদিন ফেরে না

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৯-২৬ ৮:১৬:৩৬ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-২৬ ১২:৫৪:৪২ পিএম

উপকূলে নারী- অবহেলা, বৈষম্য আর নির্যাতনের শিকার ভাগ্য বিড়ম্বিত এক জীবন। যে জীবনে সংকট নিত্যদিনের, নেই সমাধান। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারের বোঝা চাপে নারীর ওপর। পুরুষবিহীন সংসারে নারী হয়ে ওঠেন পরিবারের প্রধান। অথচ কোথাও নেই এতটুকু স্বীকৃতি। তবুও টিকে থাকার লড়াইয়ে সে শামিল হয়। উপকূলে নারীর সংগ্রামের ইতিবৃত্ত নিয়ে প্রকাশিত হলো ‘উপকূলে নারী’ শীর্ষক ধারাবাহিকের সপ্তম পর্ব। লিখেছেন রফিকুল ইসলাম মন্টু

নারী মাছ ধরে। উত্তাল নদী পাড়ি দিয়ে জাল ফেলে। অনেক আশা নিয়ে জাল টানে। কখনো মাছ মেলে, কখনো মেলে না। স্বামী ফেলে চলে গেছে; অথবা ঘরের পুরুষটি নিতান্তই কর্মক্ষম। হাল ধরতে হয় নারীকে। কখনো তার সহযোগী শিশু কন্যা কিংবা স্বামীর কাছ থেকে বিতাড়িত হয়ে মায়ের কাছে আসা কোন মেয়ে। ভূখণ্ডে এদের নেই থাকার স্থান। বংশ পরম্পরায় ঠাঁই মিলেছে নৌকায়। মাছ ধরা হয়ে উঠেছে জীবিকার প্রধান অবলম্বন। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস কিংবা অন্যকোন দুর্ঘটনায় পড়েও নারী নদী ছাড়তে পারেন না। ভয় উপেক্ষা করে তাকে নামতে হয় রোজগারের তাগিদে।

নৌকার পেছনে নারী বৈঠা ধরে আছেন, আর নৌকার গলুইয়ে খেলছে শিশুরা। নৌকা চলছে কখনো মাছ ধরার উদ্দেশ্যে, আবার কখনো কিনার পানে। এমন দৃশ্য উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় চোখে পড়ে। বহু নারী সংসারের চালিকা শক্তি। পুরুষ নেই, অথবা থাকলেও নামেমাত্র। রোজগারের তাগিদে দিনরাত পরিশ্রম, এরপর রান্নাবান্না, সন্তান লালন-পালন, আসবাবপত্র গোছানো ইত্যাদি সব কাজ করেন জেলে নারী। তবুও আশায় বুক বাঁধেন- হয়তো ফিরবে সুদিন। কিন্তু সুদিনের দেখা মেলে না। 

আছমা বেগম, বয়স ৪২। জন্ম হয়েছে নৌকায়, বিয়ে হয়েছে নৌকায়, সারাজীবন মাছধরা পেশায় রোজগার করেছেন। এখন থাকেন পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজের স্লুইজ বাজারের মাছঘাটে। নদীতে মাছধরা শেষে নৌকা ভেরে এই ঘাটে। হাটবাজার, রান্না, খাওয়া-দাওয়া, অবশেষে আবার মাছধরার পালা শুরু। স্বামী দানেশ সরদারের সঙ্গে আছমা বেগমের বিচ্ছেদ হয়ে যায় অনেক আগেই। ফলে ১ মেয়ে আর ৩ ছেলেকে নিয়ে সারাজীবন মাছধরা পেশায় থেকেছেন, এখনও আছেন। ছেলেরা বিয়ে করে পৃথক নৌকা করেছেন। বিয়ে দেওয়ার পর মেয়ে লিপিও স্বামীর সঙ্গে পৃথক নৌকায়। মায়ের মতোই লিপি বেগমেরও একই অবস্থা। জন্ম হয়েছে নৌকায়, বড় হয়েছেন নৌকায়, বিয়ে হয়েছে নৌকায়। নিজে মাছধরা পেশায় আছেন, তাকে আবার সহযোগিতা করছেন ছেলেমেয়েরা। লিপি বেগমের তিন ছেলেমেয়ে জুলিয়া, সুমাইয়া আর আসলাম। বড় দুটো স্কুলে যাচ্ছে দাবি করলেও তারা প্রকৃতপক্ষে নৌকায় বাবা মাকেই সহায়তা করে। নৌকায় জাল টানা, রান্নায় সহযোগিতা করা আবার বনের কাছে নৌকা ভিড়লে লাকড়ি সংগ্রহের কাজও কিশোরীদের। এভাবেই ওরাও একদিন জেলে হয়ে ওঠে। লিপি বলছিলেন, নদী আমাদের বাঁচাইয়া রাখে। মাছ পাইলে আমরা বেশ ভালো থাকি, মাছ না পাইলে দেনায় জড়িয়ে পড়ি। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের নামে যে সহায়তা আসে, তা আমরা পাই না। নৌকায় থাকি বলে আমাদের নাম তালিকায় ওঠে না। আমরা কী এদেশের নাগরিক না? একই আক্ষেপ লিপির মা আছমা বেগমের। বললেন, সব জায়গায় আমাদের মাছ ধরতে বাঁধা। আমরা কোথায় জাল ফেলবো। এদেশের নাগরিক হয়ে আমরা ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছি। আমাগো কথা শোনার কেউ নাই। আমাগো সমস্যা কে সমাধান করবে?
 


উপকূলের বিভিন্ন স্থানে ভাসমান জেলে সম্প্রদায়ের দেখা মেলে। ভোলা সদরের ইলিশা, মনপুরার কলাতলী, তজুমদ্দিনের মাছঘাট, পটুয়াখালীর গলাচিপা, চরমোন্তাজ, লক্ষ্মীপুরের রামগতি, কমলননগর, মতিরহাট, মজুচৌধুরীর হাট, বরিশালের লাহারহাট, মেহেন্দিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাসমান জেলেরা দলবেঁধে বসবাস করে। নদীতে বিভিন্ন এলাকায় মাছধরা শেষে এরা আবার নিজেদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে ফিরে আসে। এই পরিবারগুলো পুরোপুরি জেলে পরিবার। স্থায়ী ঠিকানা বলে এদের কিছু নেই। তাই নারী-পুরুষ এবং শিশু সকলেই একসঙ্গে নদীতে মাছ ধরতে যায়। এই সমাজে বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের মাছধরায় দক্ষতাকে বিশেষ গুন হিসাবে দেখা হয়। মাছ ধরার অভিজ্ঞতা থেকে আছমা বেগম বলেন, জীবনভর নৌকায় থেকেছি, মাছ ধরেই জীবন চালাচ্ছি। মাছ ধরতে গিয়ে বহুবার ঝড়ের কবলে পড়েছি। আল্লায় বাঁচাইয়া রাখছে। কিন্তু আমাদের মত নারী জেলেদের নিরাপত্তায় নেই কোন ব্যবস্থা। ভূখণ্ডের মানুষের কাছে আমরা সমাজের বাইরের লোক। সে কারণে তাদের কোন সহায়তাও পাওয়া যায় না। সরকারের সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত। আশ্রয়ণ প্রকল্প হলে আগে তালিকায় নাম ওঠে ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের। নৌকায় যারা মাছ ধরে তাদের অনেকেই দেনার দায়ে জর্জরিত। কেউ টাকা আনে মহাজনের কাছ থেকে, কেউবা এনজিওগুলো থেকে।

চরমোন্তাজ স্লুইজ বাজারের গা ঘেঁষে সরু খাল। অনেক মাছধরার ট্রলার ভেড়ে এখানে। এই খালের তীর ধরে খানিক পশ্চিমে এগোলেই ভাসমান জেলেদের নৌকা বহর। এখানে প্রায় শ’খানেক নৌকা রয়েছে। মাছ ধরার মৌসুমে নৌকার সংখ্যা বাড়ে, অন্য মৌসুমে নৌকার সংখ্যা কমে। তবে অধিকাংশ পরিবার চরমোন্তাজেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। ভর দুপুরে নৌকা বহরের কাছে গিয়ে দেখা যায়, অনেকেই কাজে ব্যস্ত। কাজের তালিকা দেখে মনে হলো, পুরুষের চেয়ে নারীই বেশি কাজ করছেন। নদীতে নৌকা চালাতে গিয়ে ভোগান্তিটা তাদের ওপরই বেশি পড়ে। ছয় ছেলেমেয়ের পর নারী জেলে রাবেয়ার ঘরে এসেছে নবজাতক, বয়স তার মাত্র দু’মাস। দুপুরে নিজের নৌকায় রান্নাবান্নার পাশাপাশি ফাঁকে ফাঁকে নবজাতকের পরিচর্যা করছিলেন। পাশে বসে থাকা স্বামী উজ্জল মিয়া অবসরে। এসব কাজে তার কোন সহযোগিতা নেই। ঘরের এইসব কাজ করে রাবেয়াকে মাছ ধরার কাজও করতে হয়। রাবেয়ার রান্না শেষ হওয়ার আগেই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নৌকাখানি ভেরে তার নৌকার সঙ্গে। বৈঠা হাতে বাবা রুস্তুম আলী সরদার আর ছইয়ের ভেতরে অবসরে মা মতিজান বিবি। সারাজীবন তারা নৌকায় ছিলেন, এখনও নৌকায়। হাস্যোজ্জ্বল মতিজান পান চিবোতে চিবোতে বললেন, ‘ভালো আছি!’ আসলেই তারা ভালো আছেন কি না জানা নেই।

লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর হাটে ভাসমান জেলেদের অনেকগুলো নৌকা চোখে পড়ে। এখানে আলাপ হলো কয়েকজন নারীর সঙ্গে, শিশুকাল থেকে যারা মাছ ধরার পাঠ শিখেছেন। এদের একজন বকুলজান বিবি, বয়স ৮০ বছর। শরীর ন্যূয়ে পড়েছে। তবুও স্বামী হানিফ সরদারের সঙ্গে নৌকায় আছেন। যতটা পারেন সাহায্য করেন। বললেন, মাত্র ১২ বছর বয়সে নৌকায়ই বিয়ে হয়েছে তার। জালনৌকার কাজ শিখেছেন বাবা মায়ের কাছে। আরেকজন ৭০ বছর বয়সী বকুল বিবি। অসুস্থতাজনিত কারণে স্বামী শামসুল হক মারা গেছেন। এখন ছেলেমেয়েদের সঙ্গে থাকেন। সারাজীবন জেলে পেশায় থেকে এখন তার শূন্য হাত। সহযোগিতার কেউ নেই। নারী জেলে আম্বিয়া খাতুন, ৪৫ বছর। থাকেন কমলনগরের কালকিনি ইউনিয়নের মতিরহাটে। সারাজীবন জেলে পেশায় থেকে সংসারের ভার বহন করে এসেছেন। অসুস্থতার কারণে স্বামী আনোয়ার হোসেন এখন আর তেমনটা নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারেন না। সে কারণে দুই মেয়ে জুলহাস ও কোহিনূরকে নিয়ে মাছ ধরতে যান মা আম্বিয়া বেগম। মাঝির দায়িত্বে থাকেন আম্বিয়া, দুই মেয়ে দাঁড় টানে। ছোটবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে কাজ করতে করতে দুই মেয়েও দক্ষ জেলে হয়ে উঠেছে। আম্বিয়া জানালেন, মাত্র ১২ বছর বয়সে বৈঠা ধরেছেন তিনি। মাঝির দায়িত্ব পালন করেন ১৫-১৬ বছর বয়স থেকে। জীবনে ৪-৫বার ঝড়ের কবলে পড়লেও আম্বিয়া পিছপা হননি। কারণ, এটাই তার জীবিকার অবলম্বন। নদীতে না গেলে না খেয়ে থাকতে হয়।
 


ভাসমান জেলে সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের হার অনেক বেশি। এ বিষয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। আম্বিয়া বেগমের বড় মেয়ে কোহিনূর বেগমকে এক সন্তানসহ ফেলে রেখে গেছে তার স্বামী। কোহিনূর এখন তার বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে। জীবনযুদ্ধে হেরে গেছেন চরমোন্তাজের চন্দনী বেগম। সাত সন্তানের মা চন্দনী এখন আর স্বামী ছালাম দালালের যোগ্য নন। তাই হয়তো রাশেদা বেগম নামের একজনকে দ্বিতীয় বিয়ে করে চলে যান তিনি। চন্দনীর নৌকার জীবন চলে ষষ্ঠ সন্তান ১৫ বছর বয়সী মেঘনা আর সপ্তম সন্তান ১০ বছর বয়সী সোহেলকে নিয়ে। নৌকায় থাকে; নৌকায়ই তাদের বসবাস। মাছধরায় মাকে সাহায্য করে ওই দুই কিশোর-কিশোরী। চন্দনীর প্রথম সন্তান আছিয়া ও চতুর্থ সন্তান ভিমুকে বিয়ে দিয়েছেন নৌকায়। দ্বিতীয় সন্তান জসিম, তৃতীয় সন্তান তসলিম ও পঞ্চম সন্তান জুয়েলেরও একইভাবে বিয়ে হয়েছে। এরই এক ফাঁকে স্বামীও চলে গেছেন। এখন পরাজিত জীবন চন্দনী বেগমের। সরেজমিনে পাওয়া তথ্যসূত্র বলছে, ভাসমান জেলেরা সব ধরণের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সংবিধানে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও এদের ক্ষেত্রে তা কতটা প্রযোজ্য, এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। নৌকাগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, অত্যন্ত মানবেতর পরিবেশে তারা সেখানে বসবাস করেন। বেঁচে থাকার ন্যুনতম অধিকারটুকু সেখানে নেই। নদীতে থাকার কারণে সরকারি-বেসরকারি কর্মসূচির সঙ্গে তারা যুক্ত হতে পারছে না।

লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলার কালকিনি ইউনিয়নের মেম্বার মেহেদি হাসান লিটন বলেন, ভাসমান জীবনযাপনের কারণে সরকারি-বেসরকারি সহায়তা এদের কাছে পৌঁছায় না। তবে সংকটাপন্ন জনগোষ্ঠী হিসেবে এদের জন্য সরকারের বিশেষ কোন প্রকল্প নেই। এদের জীবন জীবিকার নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা বিধানে সরকারের বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া উচিত। কারণ ভূমিহীন এই জনগোষ্ঠী চরম অবহেলার মধ্যে জীবিকা নির্বাহ করছেন।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC