ঢাকা, শুক্রবার, ১১ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
Risingbd
অমর একুশে
সর্বশেষ:

এবার তবে লাংকাউয়ি

হাসান জ্যোতি : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০২-১৪ ৪:০৭:০৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০২-১৪ ৪:১১:১৯ পিএম

হাসান জ্যোতি : মানুষের আকাশ ছোঁয়ার ইচ্ছে বহুদিনের। আর আকাশের বুকে স্থির কিংবা চলমান অবস্থায় আপেক্ষিক স্থির পৃথিবীকে দেখা অদ্ভুত সুন্দর! এবারে আমার গন্তব্য আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়ার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত দ্বীপ লাংকাউয়ি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আমাকে বহনকারী বিমান এয়ার এশিয়া একে-৭১ ছেড়ে যাবে রাত বারোটা পঞ্চাশ মিনিটে। বর্তমানের নিয়ম অনুযায়ী এয়ারপোর্টে আসতে হবে বিমান ছাড়ার চার ঘণ্টা আগে। এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন শেষে অপেক্ষা ফ্লাইটের। আগে খুব একটা সুযোগ হয়নি তাই এবার হাতে সময় থাকায় ঘুরে দেখলাম হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থিত উিউটি ফ্রি দোকানগুলো। রাত তখন সোয়া বারোটা, ঘোষণা এলো বোর্ডিং লাউঞ্জে যাওয়ার। এখানে যাওয়ার আগে আপনাকে ফাইনাল সিকিউরিটি চেকিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আপনার কাছে থাকা মানিব্যাগ, চাবি, বেল্ট- সব রকমের ধাতব বস্তু সরবরাহকৃত ট্রেতে রেখে স্ক্যানিংয়ে দিতে হবে।

এয়ার এশিয়া যেহেতু বাজেট এয়ারলাইন্স তাই তাদের বিজনেস ক্লাস বলে কিছু নেই। তবে আছে হট সিট ব্যবস্থা। একদম সামনের দিকের তিন সারি আর মাঝখানের ইমার্জেন্সি এক্সিটের সাথের তিন সারি সিট হলো হট সিট। এগুলো অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে বুকিং দিতে হয়। একটু আরামে ভ্রমণের জন্য আমি আগে থেকেই ব্যবস্থা করে নিয়েছি হট সিটের। বোর্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও এখানে হট সিট যাদের, তাদের আগে ডাকা হয় বিমানে আরোহণের জন্য। তাই নিয়ম অনুযায়ী তাদের ডাকা শুরু হলে আমি এগিয়ে গেলাম এবং নির্ধারিত আসন গ্রহণ করলাম। বাকি যাত্রী সবার ওঠা শেষে লাগিয়ে দেয়া হলো বিমানের দরজা। টারমাকে গড়াতে শুরু করল এয়ার এশিয়া একে-৭১; প্রথম গন্তব্য কুয়ালালামপুর। ক্যাপ্টেনের অর্ভ্যথনা জানানো শেষ হতেই, মূল কেবিন ক্রু অভ্যর্থনা জানালেন। তারপর পরই স্বংয়ক্রিয় সেফটি সংক্রান্ত নিয়ম জানানো শুরু হলো সাথে এয়ার হোস্টেসদের ডেমোনেস্ট্রেশন। এরই মাঝে আমাদের ফ্লাইট মূল রানওয়েতে এসে পৌঁছেছে, সবাইকে এবং ক্রুদেরকেও ফ্লাইট টেক-অফের প্রস্তুতি নিতে বলে আস্তে আস্তে রানওয়ের বুকে গড়াতে শুরু করল বিমানের চাকা। ডানা মেলল আকাশে ফ্লাইট একে- ৭১। 

 


আইল্যান্ড হপিং ট্যুর

 

আকাশের বুক থেকে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র হতে লাগল ঢাকা শহর। কুড়িল ফ্লাইওভার, বারিধারা-বসুন্ধরা, মিরপুর সব এলাকা ছাড়িয়ে একসময় আমাদের ফ্লাইট পার হয়ে গেল কক্সবাজারের ওপর দিয়ে বাংলাদেশের সীমানা। নিচে তখন মিটমিট করে জ্বলছে বার্মার কোনো শহরের আলো। সিটবেল্ট খুলে ফেলার নির্দেশ এলো স্বল্প সময়েই। এয়ার ক্রুরা সবাই প্রস্তুত যাত্রীদের আপ্যায়ন করতে রাতের খাবার দিয়ে। আমাদের গ্রুপের জন্য নির্ধারিত মেন্যু বুখারা চিকেন বিরিয়ানি আর সাথে এককাপ পানি। অতিরিক্ত পানি চাইলে কিনে নিতে হবে। তিন রিঙ্গিতে মিলবে আধ লিটার স্প্রিৎজার মিনারেল ওয়াটার। আর এ ছাড়াও অতিরিক্ত খাবার চাইলে পনেরো রিঙ্গিতে মিলবে আঙ্কেল চিনস্ চিকেন রাইস অথবা অশোকস্ বাটার চিকেন মাশালা রাইস। এ ছাড়া ম্যাগি হট কাপ নুডলস মিলবে দশ রিঙ্গিতে সাথে ফ্রি গরম পানি। আর আছে কফি, চা, নাচোস, সমুচা ইত্যাদি যার সব কিছু দশ থেকে ছয় রিঙ্গিতের মধ্যে পাওয়া যাবে।

আকাশের বুক চিড়ে মেঘের দল পাশ কাঁটিয়ে এগিয়ে চলছে আমাদের ফ্লাইট। নিচে তখন থাইল্যান্ডের ভূমি, চিয়াংমাই, ব্যাংকক, পাতায়ার আকাশ সীমা পার হয়ে ফ্লাইট এগিয়ে চলল ফুকেটের আকাশ সীমার দিকে।  ভূমি থেকে আমাদের উচ্চতা তখন ৩৮,০০০ ফুট। এক পাশে মোহময় চাঁদও এগিয়ে চলছে আমাদের সাথে।  নিচে সমুদ্রের বুকে বিন্দু বিন্দু আলো সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে চলছে। ফুকেটের আকাশ সীমা পার হয়ে কিছুদূর এগোতেই আমাদের ফ্লাইট ঢুকে পড়ল মালয়েশিয়ার আকাশ সীমার ভেতর। ক্রমে লাংকাউয়ি আর পেনাং পেছনে ফেলে এসে কুয়ালালামপুরের আকাশ সীমায় প্রবেশ করল এয়ার এশিয়া একে-৭১। ধীরে ধীরে পুরো কুয়ালালামপুর শহরকে এক চক্কর লাগিয়ে নামতে লাগল আমাদের ফ্লাইট কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট ২ (কেএলআইএ-২) তে। ভোরের আলো তখনো ফুটতে শুরু করেনি। ধীরে ধীরে রানওয়ের মাটি ছুঁলো ফ্লাইট একে-৭১। টারমাক ধরে এগিয়ে এসে দাঁড়াল ডিসএমবার্ক পয়েন্টে। দরজা খুলে দিতেই নেমে এলাম। কুয়ালালামপুর-২ এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন শেষে অপেক্ষা পরবর্তী ফ্লাইটে লাংকাউয়ি যাওয়ার জন্য। অপেক্ষার অবসান ঘটল। ঘোষণা এলো প্লেনে আরোহণের। ওঠার ঠিক আগে ফোন দিয়ে দিলাম লাংকাউয়ি এয়ারপোর্টে আমার জন্য অপেক্ষারত গাইড সাবরীকে। আসন গ্রহণের পর দরজা বন্ধ হতেই সিটবেল্ট বাঁধার অনুরোধ জানিয়ে ফ্লাইট ক্যাপ্টেন এগিয়ে নিয়ে চললেন প্লেনটিকে টারমাক থেকে মূল রানওয়ের দিকে। মূল রানওয়েতে উঠেই একছুটে ডানা মেলল ফ্লাইট এয়ার এশিয়া একে-৬৩০৬। গন্তব্য যেহেতু লাংকাউয়ি তাই কিছুটা জেনে নেয়া যেতে পারে লাংকাউয়ি সর্ম্পকে।

আনুষ্ঠানিকভাবে কেদাহর রত নামে পরিচিত লাংকাউয়ির, অবস্থান মালয়েশিয়ার উত্তর-পশ্চিম উপকূলের ৩০ কিলোমিটার দূরে। আন্দামান সাগরে অবস্থিত ১০৪টি দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপপুঞ্জ। দ্বীপগুলো থাইল্যান্ডের সীমান্ত সংলগ্ন মালয়েশিয়ার কেদাহ রাজ্যের একটি অংশ। দ্বীপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় লাংকাউয়ি দ্বীপে মোটামুটি ৯৪,৭৭৭ (২০১০) জন লোকের বসবাস। একমাত্র অন্য জনপদের নিকটবর্তী দ্বীপটি হলো টুবা দ্বীপ। লাংকাউয়ি একটি প্রশাসনিক জেলা যার মাঝে কুয়াহ শহরটি বৃহত্তম এবং যারা ডিউটি ফ্রি শপিং করার ব্যাপারে আগ্রহী, তাদের জন্য লাংকাউয়ি স্বর্গরাজ্য বলা যায়। কারণ লাংকাউয়ি একটি ডিউটি ফ্রি দ্বীপ।

 


লাঙ্কাউয়ি স্কাই ব্রিজ

 

সিটবেল্ট বাঁধার নির্দেশসূচক বাতিটি নিভে গিয়েছে। চারপাশে সবার সিটবেল্ট খোলার শব্দ। দিনের আলোয় রাতের ঝলমলে মালয়েশিয়ার রূপ এখন সবুজ। কিছুদূর পর পর পাম গাছের সারি। সবুজের সীমা ছাড়িয়ে প্লেনটি এসে পড়ল আন্দামান সাগরের ওপর। স্ট্রেইট অব মালাক্কার ওপর দিয়ে উড়ে চলছে সুন্দর দ্বীপ লাংকাউয়ির পথে। নিচে অথই জলরাশি। দূরে ক্ষুদ্রাকৃতির দ্বীপ লাংকাউয়ি ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করেছে চোখের মণিকোঠরে। অনেকগুলো ছোট ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত লাংকাউয়ি (৯৯টি)। কিছু সময়ের মাঝেই ঘোষণা এলো অবতরণের। কুয়ালালামপুর থেকে লাংকাউয়ি আসার মূল মাধ্যম হলো বিমান এবং সময় লাগে ৪৫ মিনিট। আর আসা যায় ফেরী (দ্রুতগতির বড় আকারের স্পীডবোট বা লঞ্চ), এতে সময় লাগে ৫-৬ ঘণ্টা। এসব ফেরীতে করে থাইল্যান্ডও যাওয়া যায় এবং প্রচুর মানুষ এভাবে লাংকাউয়ি থেকে আসা-যাওয়া করে থাইল্যান্ডের ফুকেট, ক্রাবী অথবা নিকটবর্তী দ্বীপগুলোতে। অনেকটা সমুদ্রের জল ছুঁয়ে নামতে শুরু করল প্লেন। নিচে জলরাশি চারপাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ। তিন বছর আগে স্টার ক্রুজে করে স্বল্প সময়ের জন্য আসা লাংকাউয়ি আর আকাশ থেকে দেখা লাংকাউয়ির মাঝে বিস্তর ফারাক আছে। তবে বলতে হয় দুটোই খুব সুন্দর অবলোকনযোগ্য।

প্রথমবার আসার সময় সমুদ্রের মাঝখানে দ্বীপের আড়াল থেকে উঠে আসা সূর্যোদয় দেখেছিলাম। ঘণ্টাখানেক আগে এখানে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে, আমার গাইড সাবরী  জানালেন, কিন্তু তার কোনো ছিঁটেফোঁটা নেই। প্লেন অবতরণের পর নেমে আসতেই দেখা মিলল আমার গাইড সাবরী ইসমাইলের সঙ্গে। সদাহাস্য মধ্যবয়স্ক মানুষ তিনি। এগিয়ে এসে অভ্যর্থনা জানালেন। প্রথম গন্তব্য আতমা আলম বাটিক সেন্টার। খুব কাছেই। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম সেখানে। মালয়েশিয়ান ট্রেডিশনাল বাটিক কীভাবে করে তা এখানে দেখানো হয়। খুব সুন্দর করে ফুল লতা-পাতা আঁকা একেকটি কাপড় সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ছবি তোলার অনুমতি নেই, তাই এসবের ছবি তোলা হলো না। মালয়েশিয়ায় বাটিকের ক্ষেত্রে প্রকৃতিই বেশি প্রাধান্য পায়। পাশেই বাটিক কাপড়ের শো-রুম। সবাই ঘুরে দেখতে লাগল। আছে গহনা, রুপা কিংবা স্টিলের, আর সবগুলোই মুক্তোর। এখানে ঘোরাঘুরি শেষ।

এবার গন্তব্য গামার ফ্যাক্টরি। গামার বা সি-কিউকাম্বার কিংবা সামুদ্রিক শসা, একধরণের প্রাণী যা রান্না করে খাওয়া হয়। কিন্তু এখানে এসে জানলাম এই সামুদ্রিক শসা দিয়ে তেল বানানো হয় যা ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সামনেই বড় বড় ডেকে সেদ্ধ করে বানানো হচ্ছে এই তেল। মজার ব্যাপার হলো, এই গরম তেলে আঙ্গুল ডুবিয়ে তুলে আনলেও আঙ্গুলের বা হাতের কোন ক্ষতি হয় না বরং ত্বকের সুরক্ষা করে। পাশেই বিক্রয় কেন্দ্রে বিক্রি হচ্ছে গামারের তেল দিয়ে বানানো মলম, মালিশের তেল ইত্যাদি। এখন যাব, আন্ডারওয়াটার ওয়ার্ল্ড। পানির নিচের এবং ওপরের সমুদ্র তীরবর্তী প্রাণীদের অ্যাকুরিয়াম। এটি লাংকাউয়ির চেনাং সমুদ্র সৈকতের কাছে অবস্থিত এবং এখানেই আছে লাংকাউয়ির একটি বড় ডিউটি ফ্রি মার্কেট কোকো ভ্যালি। মনে রাখবেন, লাংকাউয়িতে ডিউটি ফ্রি যা কিছু কিনবেন আপনাকে পাসপোর্ট দেখাতে হবে। আমাদের গাইড এরই মধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে আমাদের জন্য কেটে রাখা টিকিট নিয়ে। সবাই একে একে ঢুকে পড়লাম আন্ডারওয়াটার ওয়ার্ল্ডে। দেখা হলো পাখি, বানর, বিভিন্নরকমের মাছ, পেঙ্গুইন। কথাও হলো, সীল, হাঙ্গর, ডলফিন, লবস্টার, স্ট্রিং রে, ক্রাব, স্পাইডার ক্রাব, জেলি ফিশ, ইলসহ অনেকের সাথে। সবার সাথে দেখা করে বের হয়ে এলাম। এখানেই দুপুরের খাবার খেয়ে নেব। আর সেজন্যে আছে আশেপাশে অনেক রকমের রেস্টুরেন্ট এবং স্ট্রিট ফুড। সাধ্যের মধ্যে সবরকম খাবার। সবাই ভাবছেন এসেই কেনো এত ঘুরছি? মনে রাখবেন, সব দেশেই হোটেলে চেকইন করার সময় দুপুর দুটোর পরে, যেহেতু এসেছি স্বল্প সময়ের জন্যে তাই এক মুহূর্ত অপচয় করা ঠিক হবে না।

 


প্রেগন্যান্ট মাইদিন আইল্যান্ড

 

এবারে গন্তব্য লাংকাউয়ির প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত ঈগল স্কয়ার। যেখানে একটি বৃহৎ ঈগল সবসময় নিজের তীক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে পাহাড়ারত লাংকাউয়ির প্রবেশপথ। এই ঈগল হলো লাংকাউয়ির প্রতীক। এখানে পৌঁছেই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম ছবি তুলতে। পেছনে ঈগল সামনে অথই সামুদ্রিক জলরাশি। বিকেল গড়িয়ে ধীরে ধীরে সন্ধ্যে নামতে শুরু করেছে। এখন ঘরে মানে হোটেলে ফেরার পালা। গাড়িতে উঠে এগিয়ে চললাম হোটেলের পথে। মাঝে সামান্য ব্রেক নিলাম লাংকাউয়ি মলে, কিছুটা শপিং সেরে নেয়া। দ্রুত শপিং সেরে চলে এলাম অপেক্ষমান গাড়িতে। এগিয়ে চললাম হোটেলের পথে। লাংকাউয়ির মূল শহর কুয়াহতে অবস্থিত আমার জন্য নির্ধারিত হোটেল, বেলা ভিস্তা ওয়াটার ফ্রন্ট অ্যান্ড রিসোর্ট। হোটেলের একদম সামনেই সমূদ্র। ক্লান্ত থাকায় গাইডের কাছ থেকে আজকের মতো বিদায় নিয়ে চলে এলাম হোটেল কক্ষে। (আগামী পর্বে  সমাপ্য)



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/শান্ত/তারা

Walton
 
   
Marcel