‘মা এখন বহুদূরে, হয়তো রাতের আকাশে তারা হয়ে জ্বলছেন’
ফারুক আহমেদ || রাইজিংবিডি.কম
মায়ের সঙ্গে ফারুক আহমেদ
আজ মা দিবস। আজ থেকে ৫৮ বছর আগের ঘটনা। আমার বয়স তখন ৮/৯ বছর। মা বললেন, ‘যা বাবা কেনুর মায়ের বাড়ি থেকে এক সের বেগুন নিয়ে আয়। এই নে পয়সা।’ আমি মায়ের দেওয়া এক আনা পয়সা নিয়ে, আমাদের বাড়ির পিছনে সুতালড়ি গ্রামের দিকে জমির আল ধরে দৌড় দিলাম।
কেনুর মা বৃদ্ধা। স্বামী মারা গেছে কেনুর জন্মের পরপর। লাউ পাতা, শাক-সবজি বিক্রি করে সংসার চালাতো। আমি কেনুর মায়ের হাতে এক আানা পয়সা দিয়ে বললাম, ‘মা বলছে এক সের বেগুন দিতে।’ তিনি মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন, ‘খাড়াও দিতেছি।’ কেনুর মা বেগুন গাছ থেকে তাজা বেগুন ছিঁড়ে ছিঁড়ে চটের ছোট থলিতে রাখলেন। বললেন, ‘যাও নিয়া যাও। মাপুনের কাম নাই। আন্দাজ কইরা দিছি। এক সেরের বেশি হইবো।’
আমি থলি নিয়ে দৌড়। রান্না ঘরে গিয়ে মাকে বললাম, ‘মা বেগুন।’ মা বেগুনের থলি হাতে নিয়ে বললেন, ‘এত বেগুন কেন? এইখানে এক সেরের বেশি আছে।’ মা পাল্লা নিয়ে সব বেগুন মাপ দিলেন। মাপ দিয়ে দেখলেন বেগুন দুই সের। মা বললেন, ‘আমি তোমারে এক সেরের পয়সা দিছি। তুমি দুই সের আনলা কীভাবে?’ কেনুর মা ওজন দেয় নাই। আন্দাজ করে দিছে। বলছে, ‘এক সেরের একটু বেশি হইতে পারে। গাছের জিনিস। নিয়া যাও।’ আমি নিয়া আসছি।
মা আমার দিকে নির্বিকার তাকিয়ে থেকে এক আনা পয়সা দিয়ে বললেন, ‘যাও বাবা কেনুর মায়েরে দিয়া আসো। বলবা, বেগুন ছিল দুই সের। মা আরো এক সেরের দাম এক আনা পাঠাইছে। রাখেন।’ এক আনা পয়সা কেনুর মায়ের হাতে গুঁজে দিয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দিলাম। মা আমাকে দেখে বললেন, ‘কেনুর মায়েরে পয়সা দিছো?’ আমি মাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘দিছি মা।’ মা বললেন, ‘শোন বাবা, নিজে ঠকবে আন্যকে ঠকাবে না।’
আমি মাকে কি করে বুঝাই, মা আমি কেনুর মাকে ঠকাই নাই। সে নিজে আমাকে ইচ্ছা করে বেশি বেগুন দিয়েছে। তারপরও মা আমি আজীবন তোমার কথার খেলাপ করব না। মা এখন দূর, বহুদূরে। হয়তো রাতের আকাশে তারা হয়ে জ্বলছেন। মা হয়তো আমাকে বলছে, ‘ভালো আছিস বাবা?’
লেখক: জনপ্রিয় অভিনেতা, নাট্যকার
ঢাকা/শান্ত