‘মা রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে না গিয়ে, স্কুলে আসে আমাকে নিতে’
তৌসিফ মাহবুব || রাইজিংবিডি.কম
মায়ের সঙ্গে তৌসিফ মাহবুব
১৯৯৮-৯৯ সালের এক শীতের সন্ধ্যা। আমি তখন অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ি। আমার স্কুল ছুটি হতো সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায়। আমাকে প্রতিদিন ৫টা ৪০ মিনিট থেকে ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে আমার আব্বু বা খালু স্কুল থেকে নিতে আসতো। কিন্তু যেদিনের কথা বলছি, সেদিন ৬টা পেরিয়ে গেলেও কেউ আমাকে নিতে আসেনি।
স্কুলের সব ছাত্র-ছাত্রী চলে গেছে, আমি একা বসেছিলাম দারোয়ানের রুমে। সেই সময়ে সন্ধ্যার পর থেকে ধানমন্ডিতে ছিনতাইকারী ও ডাকাতদের উপদ্রব ভয়ংকর হয়ে উঠতো। আস্তে আস্তে ৭টা পার হয়ে গেল, আমার মনে তখন প্রচন্ড রাগ জমতেছিল। হঠাৎ একটা রিকশার বেল! দারোয়ান বললো যে, ‘আমার মা আমাকে নিতে এসেছে।’ আমি মাকে দেখে প্রচন্ড অবাক হলাম আর কোনো কিছু খেয়াল না করেই মায়ের ওপর রাগও ঝাড়তে শুরু করে দিলাম।
আমরা যখন রেগে থাকি, তখন যেমনটা হয় আর কি! তখন রিকশাওয়ালা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, ‘আমার মায়ের পেটে ছিনতাইকারীরা ছুরি মেরে তার কাছে যা ছিল সবই নিয়ে গেছে! কিন্তু আমার মা এমন রক্তাক্ত অবস্থায়ও কাউকে সাহায্যের জন্য না ডেকে, কোনো হাসপাতালে না গিয়ে বরং আমার স্কুলে চলে আসলো এটা ভেবে যে, আমার স্কুল ছুটি হয়েছে ইতিমধ্যেই অনেক্ষণ হয়ে গেছে এবং আমি বাচ্চা একটা ছেলে স্কুলে এতক্ষণ একা কীভাবে থাকব এসব ভেবে। আমি থ হয়ে রইলাম!
এটাই হচ্ছে আমার মা। আমার ছোটবেলা থেকে এমন অসংখ্য অসংখ্য ত্যাগের, যত্নের, ভালোবাসার ছোট ছোট গল্প আছে, আমাকে নিয়ে আমার মায়ের। আমার মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অবদানের ফলেই আপনারা যে আমাকে চেনেন, সেই আজকের আমি হয়ে উঠতে পেরেছি।
আমি জানি না, এসবের প্রতিদান আমি কীভাবে দিবো, তবে আমি এটুকু জানি—আমি আমার মাকে প্রচন্ড ভালোবাসি। আর আমি এটাও জানি পৃথিবীর সকল মায়েরাই তাদের সন্তানদের জন্য আমার মায়ের মতোই। পৃথিবীর প্রতিটা মা-ই তাদের সন্তানদের লালন-পালন করতে ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে নিয়মিত কত যে পরিশ্রম করছেন, ত্যাগ স্বীকার করছেন ও নীরবে কষ্ট সয়ে যাচ্ছেন তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
আল্লাহ আমাদের সকলের মাকে সুস্থ রাখুক, দীর্ঘায়ু করুক যাতে আমরা সন্তানরা আজীবন মায়েদের আঁচলে পরম মমতায় আমাদের জীবনটা কাটাতে পারি। আর আল্লাহ আমাদের সকল সন্তানদের তৌফিক দিক, যাতে আমরা আমাদের মায়েদের সবসময় সুখে-শান্তিতে রাখতে পারি ও তাদের সকল আবদার পূরণ করতে পারি। আর যে মায়েরা ইতিমধ্যে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন, তাদের মাগফিরাত কামনা করি। আজকের এই বিশেষ দিনে আমার মাসহ পৃথিবীর সকল মাকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর সালাম জানাই।
লেখক: জনপ্রিয় অভিনেতা
ঢাকা/শান্ত