ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১১ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ২৮ ১৪৩৩ || ২৫ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ফুটবল বিশ্বকাপ: গোলের সঙ্গে গানের তাল

জান্নাতুল ফেরদৌস || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৪৬, ১১ জুন ২০২৬   আপডেট: ০৮:৫৭, ১১ জুন ২০২৬
ফুটবল বিশ্বকাপ: গোলের সঙ্গে গানের তাল

ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াই নয়। এটি সুর, সংস্কৃতি, পরিচয় ও বৈশ্বিক আবেগেরও সবচেয়ে বড় মঞ্চ। প্রতি চার বছর পরপর একটি গান কোটি মানুষের স্মৃতিতে জায়গা করে নেয়। কোনোটি হয়ে ওঠে একটি প্রজন্মের সংগীত, কোনোটি হারিয়ে যায় বিতর্কের ভিড়ে। কিন্তু বিশ্বকাপের গল্প লিখতে গেলে গোল, ট্রফি কিংবা তারকাদের পাশাপাশি জায়গা করে নেয় থিম সং-ও। একটি ভালো বিশ্বকাপে গান শুধু টুর্নামেন্টের প্রচার নয়; এটি সময়ের দলিল। কখনো তা একটি দেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরে, কখনো আবার পুরো পৃথিবীকে এক সুরে গাইতে শেখায়।

আরো পড়ুন:

সুরের উৎসব
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকে। দল ঘোষণা, জার্সি উন্মোচন কিংবা সূচি প্রকাশের মতোই আলোচনায় আসে থিম সং। ফিফা প্রতিটি আসরেই এমন একটি গান খোঁজে, যা ফুটবল, উৎসব, বৈচিত্র্য ও বৈশ্বিক ঐক্যের ভাষা হয়ে উঠবে। সব গান অবশ্য সমান জনপ্রিয়তা পায় না। কিছু গান বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হারিয়ে যায়, আবার কিছু গান টুর্নামেন্টের চেয়েও দীর্ঘ জীবন লাভ করে।

চিলি থেকে কাতার: থিম সংয়ের বিবর্তনের গল্প
বিশ্বকাপের প্রথম অফিসিয়াল থিম সং প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে। ‘এল রক দেল মুন্ডিয়াল’ গেয়েছিল জনপ্রিয় ব্যান্ড লস র‍্যাম্বলার্স। ১৯৬৬ সালে আসে ‘ওয়ার্ল্ড কাপ উইলি’, যা ছিল বিশ্বকাপের প্রথম মাসকটকে কেন্দ্র করে নির্মিত গান। ১৯৭০ সালে ‘ফুটবল মেক্সিকো ৭০’, ১৯৭৪ সালে বহুভাষিক ‘ফুটবল’, ১৯৭৮ সালে ‘এল মুন্ডিয়াল’, ১৯৮২ সালে ‘মুন্ডিয়াল’ এবং ১৯৮৬ সালে ‘অ্যা স্পেশাল কাইন্ড অব হিরো’—এসব গান বিশ্বকাপের সংগীত ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করলেও তখনো বিশ্বকাপের গান বৈশ্বিক পপ সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছায়নি। সেই সময়ের গানগুলো ছিল মূলত আয়োজক দেশের সংস্কৃতি, ভাষা ও সংগীত ঐতিহ্যের প্রতিফলন।

উন’এস্তাতে ইতালিয়ানা: নস্টালজিয়ার চিরসবুজ সুর
বিশ্বকাপের সেরা গান নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের ‘উন-এস্তাতে ইতালিয়ানা’ বা ‘টু বি নাম্বার ওয়ান’-কে বাদ দিয়ে কোনো তালিকা তৈরি করা কঠিন। এ গানে ছিল অপেরার গাম্ভীর্য, ইতালীয় সুরের আবেগ এবং এক ধরনের নস্টালজিক বিষণ্নতা। ফুটবলের রোমান্টিক যুগের প্রতীক হয়ে ওঠা এই গান এখনো বিশ্বকাপপ্রেমীদের কাছে আবেগের আরেক নাম। তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিশ্বকাপ এলেই গানটি ফিরে আসে নতুন করে। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি থিম সং নয়, ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গ্রীষ্মের স্মৃতি।

দ্য কাপ অব লাইফ: বিশ্বকাপ যখন পপ সংস্কৃতির নায়ক
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ বিশ্বকে উপহার দেয় এমন একটি গান, যা বিশ্বকাপকে স্টেডিয়ামের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক বিনোদন অঙ্গনে নিয়ে যায়। রিকি মার্টিনের ‘দ্য কাপ অব লাইফ’ বা ‘লা কোপা দে লা ভিদা’ প্রকাশের পর ‘আলে, আলে, আলে’ ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। বিশ্বকাপের গান যে নিজস্ব শক্তিতে আন্তর্জাতিক পপ হিট হতে পারে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এই গান। অনেক সংগীত বিশ্লেষকের মতে, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল স্টেডিয়াম অ্যান্থেম এখনো ‘দ্য কাপ অব লাইফ’।

ওয়াকা ওয়াকা: গানের চেয়েও বেশি কিছু
বিশ্বকাপের গান নিয়ে যত আলোচনা, তার বড় অংশজুড়ে আছেন শাকিরা। ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের ‘ওয়াকা ওয়াকা’ (দিস টাইম ফর আফ্রিকা) শুধু একটি থিম সং ছিল না; এটি ছিল বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ঘটনা। আফ্রিকান ছন্দ, পপ সংগীত এবং বিশ্বকাপের আবেগকে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছিল গানটি। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিয়ের নাচ, ইউটিউব, টিকটক—সবখানেই জায়গা করে নেয় ‘ওয়াকা ওয়াকা’। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্বাধিক শোনা থিম সং হিসেবে আজও এর অবস্থান অনন্য। যদিও আফ্রিকান লোকসুর ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল, তবু জনপ্রিয়তার দৌড়ে সে বিতর্ক কখনই গানটির পথ রোধ করতে পারেনি।

অফিসিয়াল নয়, তবু বিশ্বকাপের হৃদয়ে ‘ওয়েভিন ফ্ল্যাগ’
২০১০ সালের বিশ্বকাপের আরেক বিস্ময় ছিল কেনানের ‘ওয়েভিন ফ্ল্যাগ’। অফিশিয়াল থিম সং না হয়েও এটি বিশ্বকাপের আবেগের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে। আফ্রিকার আশা, সংগ্রাম ও উদযাপনের গল্প ছিল গানটির প্রতিটি স্তবকে। অনেক ভক্তের কাছে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ মানেই ‘ওয়াকা ওয়াকা’ ও ‘ওয়েভিন ফ্ল্যাগ’-এর যুগল স্মৃতি।

ব্রাজিল, রাশিয়া এবং হারিয়ে যাওয়া প্রত্যাশা
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের অফিসিয়াল গান ছিল ‘উই আর ওয়ান (ওলে ওলা)’। পিটবুল, জেনিফার লোপেজ ও ক্লডিয়া লেইতের মতো তারকা শিল্পীরা থাকলেও গানটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, ব্রাজিলের সাম্বা সংস্কৃতি ও স্থানীয় সংগীতের প্রতিফলন সেখানে খুব কম। বরং একই আসরে শাকিরার ‘লা লা লা’ অনেকের কাছে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের ‘লিভ ইট আপ’-এর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। উইল স্মিথ, নিকি জ্যাম ও এরা ইস্ত্রেফির উপস্থিতি গানটিকে আলোচনায় আনলেও অনেকের কাছে এটি বিশ্বকাপের গানের চেয়ে সাধারণ পপ ট্র্যাক হিসেবেই বেশি গ্রহণযোগ্য ছিল।

ড্রিমার্স: বিশ্বকাপে কে-পপের আগমন
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে থিম সংয়ের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে ‘ড্রিমার্স’। বিটিএস তারকা জংকুকের কণ্ঠে গানটি ফুটবলপ্রেমীদের পাশাপাশি কে-পপ ভক্তদেরও বিশ্বকাপের আলোচনায় নিয়ে আসে। ফলে প্রথমবারের মতো ফুটবল ও কে-পপ—দুটি বিশাল বৈশ্বিক সংস্কৃতি একই মঞ্চে মিলিত হয়। একই আসরে ‘হাইয়া হাইয়া’ প্রশংসা পেলেও জনপ্রিয়তার বিচারে ‘ড্রিমার্স’ অনেকটাই এগিয়ে ছিল।

ছাব্বিশের বিশ্বকাপ, নতুন উন্মাদনা
ছাব্বিশের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই গান নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। শাকিরা ও বার্না বয়ের ‘ডাই ডাই’ প্রকাশের পর ভক্তদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও অনেকেই মনে করছেন, এটি ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গানের জাদুর কাছাকাছিও যেতে পারেনি। অন্যদিকে, লিসা, আনিতা ও রেমার ‘গোলস’ নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তর্ক। কেউ বলছেন এটি আধুনিক বিশ্বকাপের প্রতিচ্ছবি, আবার কেউ মনে করছেন এতে ফুটবলের আবেগের চেয়ে পপ তারকাদের উপস্থিতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু সুর কখনো শেষ হয় না
বিশ্বকাপে ট্রফি জেতে একটি দল। ইতিহাসে লেখা থাকে কোনো এক অধিনায়কের নাম। কিন্তু একটি সফল থিম সং জিতে নেয় প্রজন্মের পর প্রজন্মের হৃদয়। আজও ‘উন-এস্তাতে ইতালিয়ানা’ শুনলে ফিরে আসে ইতালির সেই আবেগঘন গ্রীষ্ম। ‘দ্য কাপ অব লাইফ’ মনে করিয়ে দেয় নব্বইয়ের ফুটবল উন্মাদনা। ‘ওয়াকা ওয়াকা’ কানে বাজিয়ে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকার ভুভুজেলার শব্দ। আর ‘ড্রিমার্স’ ফিরিয়ে নিয়ে যায় কাতারের ঝলমলে উদ্বোধনী রাতে। অনেক সময় মানুষ ম্যাচের ফল ভুলে যায়, স্কোরলাইনও ঝাপসা হয়ে যায় স্মৃতিতে। কিন্তু থেকে যায় একটি সুর। কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোল যেমন অমর, তেমনই কিছু গানও জীবন্ত।

ঢাকা/জান্নাত/শান্ত

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়