ঢাকা, শুক্রবার, ২৬ আষাঢ় ১৪২৭, ১০ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

কান্তকবির অসামান্য সংগীতপ্রেম

তপন চক্রবর্তী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৬-০৩ ৪:৪০:০২ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-০৩ ৪:৪২:১৫ পিএম
রজনীকান্ত সেন

কবি রজনীকান্ত সেন ‘কান্তকবি’ নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। চার বছর আগে তাঁর জন্ম সার্ধশতবর্ষ নীরবে পার হয়ে গেছে। তেমনি মৃত্যুর শতবর্ষও পার হয়েছে প্রায় ১০ বছর আগে। একসময় তাঁর দেশপ্রেম জাগানিয়া সংগীত ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ভারতবাসীকে উজ্জীবিত করেছিল। তিনি বেশ কিছুসংখ্যক ভক্তিগীতিও রচনা করেছিলেন যা ঈশ্বর বিশ্বাসীদের অন্তর স্পর্শ করেছিল।

রজনীকান্ত বাংলাদেশের পাবনার ভাঙ্গাবাড়িতে ১৮৬৫ সালের ২৬ শে জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতা গুরুপ্রসাদ সেন ও মনোমোহিনী দেবীর তৃতীয় সন্তান। গুরুপ্রসাদ সাব-জজ পদে কাজ করতে গিয়ে অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন জেলায় বদলি হয়েছিলেন। তিনি চার শতাধিক বৈষ্ণব ব্রজবুলি সংগ্রহ করেন। ব্রজবুলি ‘পদচিন্তামনিম’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। রজনীকান্তের জন্মের সময় বাবা গুরুপ্রসাদ বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কাটোয়ায় কর্মরত ছিলেন। তবে তাঁদের পরিবারের বিত্ত-সম্পদ অবিবেচনাপ্রসূতভাবে বিনিয়োগের ফলে রজনীকান্তকে উত্তরোত্তর আর্থিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠতে হয়।

রজনীকান্ত বোয়ালিয়া জিলা স্কুলে (বর্তমান রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল) পড়াশোনা করেন। তিনি ছেলেবেলায় খুব চঞ্চল প্রকৃতির ছিলেন, সারাক্ষণ খেলাধুলায় মেতে থাকতেন। তাঁর ডায়েরি পাঠে জানা যায়, পড়াশোনায় মনোযোগ কম থাকলেও স্কুলের সকল শ্রেণির পরীক্ষায় তিনি সন্তোষজনক নম্বর পেতেন। তিনি লিখেছেন: ‘আমি কখনো গ্রন্থকীট ছিলাম না, কিন্তু ঈশ্বরের কৃপায় আমি মেধাবী ছিলাম।’

স্কুলের ছুটির সময় তিনি পাশের বঙ্গকুঠি গ্রামের রাজনাথ তর্করত্নের কাছে সংস্কৃত শাস্ত্র পাঠ করেন। রজনীকান্ত ১৮৮২ সালে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি কলিকাতা সিটি কলেজ থেকে ১৮৮৫, ১৮৮৯ ও ১৮৯১ সালে যথাক্রমে এফএ, স্নাতক কলা এবং স্নাতক আইন পরীক্ষায় পাস করেন। তিনি শরৎ কুমার রায়কে (ভারতের প্রথম নৃতত্ত্ববিদ) তাঁর সংগীতে আগ্রহ সৃষ্টির ব্যাপারে চিঠিতে জানান যে, তাঁর মা মোহিনী দেবী বাংলা সাহিত্যে উৎসাহী ছিলেন। মা শিশু রজনীর সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন। মায়ের উৎসাহে তিনি অনেক কবিতা ও গান রচনা করেন। বঙ্গকুঠি গ্রামের তারকেশ্বর চক্রবর্তী খুব ভালো গান করতেন। তারকেশ্বর রজনীকান্তের বন্ধু। এই বন্ধুই তাঁকে সংগীত রচনায় প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করেন।

রজনীকান্ত ছেলেবেলা থেকেই বাংলা ও সংস্কৃতে অনায়াসে কবিতা রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তিনি পরে বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে গাওয়ার উপযোগী সুরেলা কাব্য রচনা শুরু করেন। তাঁর কবিতা স্থানীয় ‘উৎসাহ’, ‘আশালতা’ ইত্যাদি সাময়িকীতে প্রকাশিত হতো। তিনি সাধারণত কোনো সভা-সমিতির উদ্বোধনী ও সমাপনী সংগীত রচনা করতেন। ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতা টাউন হলে বঙ্গভঙ্গবিরোধী সভার আয়োজন হয়। বাংলার প্রখ্যাত নেতৃবৃন্দ দেশবাসীকে ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে স্বদেশী পণ্য ব্যবহারের আহ্বান জানান। এই সময় বোম্বাই (বর্তমান মুম্বাই) ও আহমেদাবাদের মিলে তৈরি কাপড় মোটা ও খসখসে ছিল। কিন্তু ইংল্যান্ডের ডান্ডি থেকে আসা কাপড় ছিল মিহি ও মোলায়েম। এর পরিপ্রেক্ষিতে রজনীকান্ত লেখেন:  ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই, দীন দুঃখিনি মা যে তোদের তার বেশি আর সাধ্য নাই।’

এই গান ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে রজনীকান্তের নাম। এই গান স্বদেশী মুক্তি যোদ্ধাদের বড়সড় প্রেরণা যুগিয়েছিল। অনুরূপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তিনি অপর একটি সংগীত রচনা করেন:

‘আমরা নেহাত গরিব, আমরা নেহাত ছোট
তবু আছি ভাই সাতকোটি ভাই, জেগে ওঠো।’

গানের শেষে তিনি ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের আহ্বানও জানিয়েছিলেন। জীবদ্দশায় তাঁর ‘বাণী’(১৯০২), ‘কল্যাণী’ (১৯০৫) ও ‘অমৃতা’ (১৯১০) শীর্ষক তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। বাণী ও কল্যাণী সংগীত সংকলন। শিশু অধিকার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত ‘কণিকা’, রজনীকান্তকে ‘অমৃতা’ রচনায় অনুপ্রাণিত করেছিল। মৃত্যুর পর তাঁর রচিত অভয়া (১৯১০), আনন্দময়ী (১৯১০), বিশ্রাম (১৯১০), সদ্ভব-কুসুম (১৯১৩) ও শেষদান (১৯১৬) প্রকাশিত হয়। বাংলা সাহিত্যে কাব্যরচনা থেকে সংগীতেই তাঁর অবদান বেশি স্বীকৃতি পেয়েছে। সংগীত তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। তিনি কীর্তন, বাউল ও টপ্পা গানের মিশেল ঘটিয়ে অপূর্ব সুর মূর্ছনা সৃষ্টি করেছেন। কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে অনুসরণ করে তিনি অনেক ব্যাঙ্গাত্মক ও হাস্যোদ্দীপক ছড়া-কবিতাও লিখেছেন।

রজনীকান্ত সেন ১৮৯১ সালে রাজশাহী কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। অল্প দিনেই তিনি জাঁদরেল উকিল হয়ে উঠেন। যেহেতু কবি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি বেশি নিবেদিত ছিলেন যে কারণে কোর্টে সময় দিতে পারতেন না। ফলে তাঁর পসার কমতে থাকে। তিনি নাটোর এবং নওগাঁয় কিছুদিন মুন্সেফ পদেও কর্মরত ছিলেন। রজনীকান্তের বর্ধিষ্ণু পরিবার আকস্মিকভাবে অর্থনৈতিক দুর্দশায় নিমজ্জিত হলে সংসারের হাল ধরার জন্যই রজনীকান্ত আইন পেশায় এসেছিলেন। হিরন্ময়ী দেবীর সঙ্গে ১৮৮৩ সালে তাঁর বিয়ে হয়। স্ত্রী তাঁকে সাহিত্য ও সংগীত রচনায় উৎসাহিত করতেন এবং অনেক সময় বিষয়ও নির্বাচন করে দিতেন। তাঁদের চার ছেলে ও দুই মেয়ে। ছোট ছেলে মারা যাওয়ার পরদিনই ঈশ্বরে সমর্পিত রজনীকান্ত লেখেন:

‘তোমারি দেওয়া প্রাণে তোমারি দেওয়া দুখ,
তোমারি দেওয়া বুকে তোমারি অনুভব।
তোমারি দুনয়নে তোমারি শোক-বারি,
তোমারি ব্যাকুলতা তোমারি হা হা রব।’

রজনীকান্ত সেন শরীরচর্চা ও খেলাধুলায় উৎসাহী ছিলেন। তিনি নিজ খরচায় গ্রামে ফুটবল, ক্রিকেট খেলা চালু করেন। কবিতা, গান, খেলাধুলা, নাটক ইত্যাদি সব কিছুতে তাঁর আগ্রহের কারণে এলাকায় তিনি অনন্য জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তিনি নারী শিক্ষা প্রবর্তনেও কাজ করেছেন। তবে জীবনের শেষ দিনগুলো তাঁর মর্মান্তিক ও করুণভাবে কেটেছে। তিনি গলার কষ্টে ভুগছিলেন। প্রবল অর্থকষ্টের মধ্যেও চিকিৎসার জন্য পরিবার তাঁকে নিয়ে কলকাতা আসে। ব্রিটিশ চিকিৎসক তাঁর স্বরযন্ত্রে ক্যানসার শনাক্ত করেন। ফলে চিকিৎসায় বিশেষ কোনো উন্নতি হয়নি। শেষে তিনি বেনারস যান। উদ্দেশ্য, যদি ঈশ্বরের কৃপায় কোনো অলৌকিক কিছু ঘটে। পথ খরচের জন্য তিনি অর্থাভাবে ‘বাণী’ ও ‘কল্যাণী’ গ্রন্থদ্বয়ের স্বত্ব প্রকাশকদের কাছে বিক্রি করে দেন।

অবস্থার অবনতি হলে রজনীকান্তকে বেনারস থেকে কলকাতা ফিরিয়ে আনা হয়। ক্যাপ্টেন ডেনহ্যাম ১৯১০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে কবির স্বরযন্ত্র অপসারণ করেন। এতে তিনি বাঁচলেন ঠিকই তবে চিরকালের জন্য বাকহারা হয়ে গেলেন। জীবনের শেষ ক’দিন তাঁর হাসপাতালের ওয়ার্ডেই কেটেছে। হাসপাতালে বসে ডায়েরিতে অবিরাম লিখতেন। তিনি আত্মজীবনী লেখাও শুরু করেছিলেন কিন্তু শেষ করতে পারেননি।

১৯১০ সালের ১১ জুন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কান্ত কবিকে দেখতে হাসপাতালে আসেন। তখন রজনীকান্তের ছেলে ক্ষিতিন্দ্রনাথ ও মেয়ে শান্তিবালা রজনীকান্ত রচিত একটি গান রবীন্দ্রনাথকে শুনিয়েছিলেন। কান্ত কবির বিশ্বাস ছিল ঈশ্বর তাঁকে কষ্ট দিয়ে তাঁর আত্মাকে পরিশুদ্ধ করাচ্ছেন। এই বিশ্বাস তাঁর রোগকষ্ট ভুলে থাকার অন্যতম সহায়ক শক্তি ছিল এবং তিনি সংগীত রচনায় মগ্ন হয়ে যেতেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাঁর এই ভাবনা গানেও ফুটে ওঠে। তিনি লেখেন:

‘আমায় সকল রকমে কাঙ্গাল করেছে, গর্ব করিতে চূর,
তাই যশ, অর্থ, মান ও স্বাস্থ্য, সকলি করেছে দূর।
ঐ গুলো সব মায়াময় রূপে, ফেলেছিল মোরে অহমিকা-কূপে,
তাই সব বাধা সরায়ে দয়াল করেছে দীন আতুর।’

রজনীকান্ত সেন কবিতাটি বোলপুরে রবীন্দ্রনাথের কাছে পাঠান। কান্ত কবির বক্তব্য বিশ্বকবির হৃদয়কে স্পর্শ করে। রবীন্দ্রনাথ রজনীকান্তের সাহিত্য রচনায় অসাধারণ দক্ষতার প্রশংসা করেন এবং তিনি জানান যে, এতো দৈহিক অসহ্য কষ্টের মধ্যেও লেখার ক্ষেত্রে ধৈর্য ও মানসিক শক্তির যে স্বাক্ষর রজনীকান্ত রেখে যাচ্ছেন এ কারণে তিনি গৌরববোধ করছেন। এই সময়ে রজনীকান্ত কয়েকটি আগমনী ও বিজয়ার গানও লেখেন। ১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কান্তকবি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

ঢাকা/তারা