ঢাকা     শুক্রবার   ১২ এপ্রিল ২০২৪ ||  চৈত্র ৩০ ১৪৩০

নোবেলজয়ী আনি এরনোর উপন্যাস: ১১তম পর্ব

মুম রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৫৯, ২২ ডিসেম্বর ২০২২   আপডেট: ১৭:০১, ২২ ডিসেম্বর ২০২২
নোবেলজয়ী আনি এরনোর উপন্যাস: ১১তম পর্ব

আমি কখনোই আমার বাবা মা কিংবা আমার বাড়ি নিয়ে কথা বলতাম না। ‘তোমার ছেলেবেলার স্মৃতি লেখো, তোমার গ্রীস্মের ছুটির বর্ণনা দাও, তোমার রান্নাঘর কিংবা রসিক মামা-কাকাকে নিয়ে লেখো।’ আমার শৈশব ছিলো নোংরা আর সব কিছু ছিলো কুটিল। আমাদের কোন ছুটির ভ্রমণ ছিলো না। নেহাত প্রত্যেক আগস্ট মাসে উত্তর উপকূলের দিকে একদিনের বাস যাত্রা করতাম আমরা। মা আর আমি ঝিনুক সংগ্রহ করতাম,  সে কিছু কেক কিনতো যা আমরা সৈকতে বসে খেতাম আর বিদ্বেষ প্রকাশ করতাম সৈকতে থাকা সেই সব বালিকাদের যারা সাঁতার কাটছে, বল খেলছে, যাদের চামড়ায় সান-ট্যান লোশনের ঝিলিক দিচ্ছি। আমরা একটা পাথরের আড়ালে হিসু করতে বসতাম। আমরা ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরতাম, এইটুকুই সারা বছরের জন্য যথেষ্ট। সেটা নিয়ে একটা রচনা লেখা যায় না। যেমন ধরো মামা, কাকা, আমি জানি ব্যাপারটা কেমন, তিনি এমন একজন যে আমাদের সবাইকে আমোদ দেবে, খালি বাদাম দেবে না, আনন্দদায়ক হবে তারা, শ্রদ্ধার উপযুক্ত, আমার কাকার মতো মাতাল নয়, কেবল সুন্দর বাচ্চাদের রসিক মামা-কাকা থাকে।

আমি বুঝতে পারি লেখকরা কেন ড্রয়িং রুম, পার্ক, আব্বু যে কিনা একজন শিক্ষক এবং বৃদ্ধ এক খালার কথা লেখে যে সব সময়ে তোমাকে চা বা কেক খেতে ডাকে। সেটা ছিলো সুন্দর আর পরিষ্কার, সুরুচিকর, যার স্বপ্ন আমি দেখতাম। আমি লিখতে পারতাম না: আমার আছে একটা জরাজীর্ণ ছোট্ট বাড়ি আর আমার বাবা একটা সাধারণ লোক রুক্ষ ব্যবহার তার তবে হৃদয়টা সোনার, উপন্যাসে দরিদ্রদের সম্পর্কে যেভাবে লেখে সেভাবে আমি আমার পরিবারের বর্ণনা দিতে পারতাম না, নিম্নবর্গের মানুষ হিসেবে। আমাকে বানিয়ে লিখতে হতো, বই থেকে, ক্যাটালগ থেকে, আমার নিজের কল্পনা থেকে... চেষ্টা করতে হতো রুচিসম্পন্ন, কাব্যিক, সুরেলা হওয়ার... গমের ক্ষেত, সিন নদীতে নৌকা ভাসানো, আল্পস পর্বতের নিকটে একটা ছাউনি দেয়া কুড়ে ঘর, একটা উজ্জ্বল পিয়ানো এবং একজন কাকার কথা যে পেশায় ডেন্টিস্ট।

আর তারপরও আমাকে ছেড়ে যায় কিছুই। আমি কেবল নিজেকে ছেলেখেলার মতো বোঝাচ্ছিলাম যে এগুলোকে আমি অস্বীকার করতে পারি, নিজের ঘরে নিজের বই নিয়ে নির্জনবাস করতে পারি, নিচতলার মাতাল ঝগড়াটে লোকগুলোকে খেয়াল না করেই। সত্যিই আমি এই সব কিছুকে নিজের ভেতরে নিতে পারতাম। নিজেকে দেখতাম আয়নার সামনে, মুঠো করা হাত, কাঁদছি, আমি আর নিতে পারি না। আমি তের, পনের। আমি সামান্য শব্দে জেগে উঠি, সেখানে কেউ ক্যাফে ছাড়ছে উঁচু চিৎকার করে, আমার মা চিৎকার করেছ, ‘মুখ দেখানোর মতো সাহসও তোমার নাই, মূল্যহীন আকাইম্মা লোক! তোমর উপরে ভরসা করে থাকলে আমাদের দোকান বন্ধ করতে হতো!’ একদল খরিদ্দার জানালা পেরিয়ে মিছিলের মতো আসে আর কৌতূহল নিয়ে ভেতরের দিকে তাকাতে থাকে। তারা ঠিক কাল সকালে এটা নিয়ে গপ্প করবে... আমি এ সব নিতে পারি না। আমি এইসব কিছুকে ঘৃণা করি। ফাঁদে আটকা, ডেনি লেস্যু, দোকান মালিকের কন্যা, একদিকে সারি সারি শস্তা খাবার, অন্যদিকে এক ঘর ভর্তি ফালতু লোক টেবিলের উপর অপেক্ষা করছে চো  খাওয়ার জন্য, এর মাঝখানে আমি বন্দী। লেস্যুদের এলাকায় আবার মাতাল! 

ওইসব বিবমিষাকারী চাহনি, রাস্তার ওইসব মন্তব্য, ওরা আমার উপরে দাগ রেখে গেছে... এইসব ভয়ঙ্কর বিশ্রি সব ব্যাপারের পর, নিজেকে কোমল করে ঘষে দেয়া, হাল্কা চালে নিজের হাত দিয়ে নিজেকে উত্তেজিত করা, রাত্রিতে, বিছানার চাদরের নিচে, মনে হতো এ এক নির্দোষ খেলা। কেন তাদেরকে এমন বিশ্রি কাজ নিতে হলো... তারা তো ঝলমলে ফার্নিচার বিক্রি করতে পারতো, সেগুলো বার্ণিশ করা, ফর্মিকার টেবিল, সেইসব বড় , সমৃদ্ধ দোকানগুলোর মতো, যেগুলো আমি দেখেছি... কিংবা হার্ডওয়ারের দোকান হতে পারতো তাদের, ঠাসঠুস, ধুরুম ধারুম, একটা অদ্ভূত জানালা দিয়ে দেখা যেতো চকচকে স্টিল, ক্লিনার তখন সেগুলো পরিস্কার করতো। কিংবা বইয়ের দোকান, কিন্তু সেটা বড় কষ্টকল্পিত হতো, কারণ আমার বাবা কেবল মাত্র স্থানীয় পত্রিকা পড়তো আর মা ধারাবাহিক গালগপ্পো। কিংবা সুস্বাদু বিস্কুট, কুকিজ মাপা হতো কেকের দোকানে। টেবিল ভর্তি ওয়াইনের বোতল আর বস্তা ভর্তি আলু ছড়িয়ে পরা তুলনায়... এমনকি একটা সুন্দর ক্যাফেই হতে পারতো আমাদের শহরের একদম কেন্দ্রে, যেখানে বাস ভরে ওঠে টুরিস্ট স্টপে, যেখানে তরুণ কলেজযাত্রী বালক অথবা সেক্রেটারিরা হাতে কোমল পানীয় কিংবা কফি নিয়ে বসতো, বেঞ্চে, আইসক্রিম খেতে, কফির মেশিন। 

লোকে আসতো এক কাপ কফি নিয়ে গল্প করতো মাতাল হতো না। কিংবা একটা যথার্থ সুপারমার্কেট ফিক কো-অপের মতো কিংবা ফ্যামিলস্টেরের মতো, পরিস্কার, থরে থরে সাজানো নানা পণ্য, ঝিলিমিল করছে সাদা কাউন্টার, দুধ আর দই ভরে আছে ফ্রিজে... তাহলে আমি হয়তো আমার বাবা-মাকে নিয়ে গর্বিত হতে পারতাম, ঠিক জেনির মতো আর তার চশমার দোকানের মতো কিংবা ম্যানিকের মতো তাদের মার্জিত ডামিগুলো হাল ফ্যাশানের পোশাক পরে আছে। আমার দোকানে আমরা কেবল খাবার আর পানিয় দেখি, এক স্তুপ আবর্জনার মতো, এক কোণায় স্তুপ করে রাখা। কার্ডবোর্ডের টুকরার উপরে শস্তা পারফিউম, ফাদার ক্রিসমাসের কুকুরের উপর দুটো রুমাল, শেভিং ক্রিম, স্কুলের খাতা, এইসব। যা কিছু আমরা বিক্রি করি তা যতোটা সম্ভব সাধারণ, আলজেরিয়ার শস্তা মদ, বড় পাত্রের মাংসের কিমা, খোলা বিস্কুট, একটা দুইটা ব্র্যান্ডের, আমাদের ক্রেতারা মোটেই খুঁতখুঁতে নয়। বারে, তারা হুইস্কি চায় না, নেহাত এক গ্লাস রেড ওয়াইন, এক চিমটি এলকোহল আর পেছনে একটা লাথি, এক গ্লাস সাদা ওয়াইন। তারা শহরের ক্যাফেতে যাবে না, তখন তাদের মনে হবে কোথায় এসেছে, তারা কেবল আকস্মিক যায় না কোথাও, তারা ঘড়িধরা নিয়মিত কাজের মতো এখানে আসে, একই সময়ে, প্রতিদিন। তারা চিন্তিত হয়ে যায় যদি নির্দিষ্ট কেউ একজন না থাকে নির্দিষ্ট সময়ে। তারা আমার বাবার সদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল ‘কয়টা হলো গো?’ ‘তুমি তিন নম্বর গিলছো!’ ‘আহা, আরেকটু দাও!’ আমার বাবা গ্লাসগুলো গুণে রাখে, সন্ধ্যায় এগুলোকে হিসাবে মেলায়। একদম যথার্থ মেলা, ওদের বকবক শুনতে শুনতেই, এর মধ্যে তেমন কোন আনন্দ নেই। যখন ওরা বাড়ি ফিরে যায়, ওদের আরো খারাপ লাগে, কোনভাবে চলতে দেয় সব, ওরা ছুড়ে ফেলতে চায় সব, বলার অযোগ্য সব বিষয়, আমাদের শিক্ষককে মূর্ছায় যাওয়ানোর জন্য যথেষ্ট এ সব। আমি শুনতাম না তবুও আমি ওদের চলে যাওয়া শুনতাম, সবসময়ই অভিশাপ দিচ্ছে, অশ্লীল গালিগালাজ করছে, এমনটা নিশ্চয়ই তোমার পছন্দ নয়, সেই বুড়ি নারী আর তার কুকুর পিটপিট করে, চুপ করো, একটা ছোট্ট মেয়ে আছে ওখানে... কিংবা সে এক তরুণী নারী... বিরাট খোলাহীন শামুক লালাময়। আমি জানি ওরা কী বোঝাতে চায়, চেষ্টা করে আমার সাদা আন্ডারপ্যান্ট দেখতে, নোংরা বুড়ো হাবড়া, আমি তাড়াতাড়ি চেন টেনে দেই, সোজা তাকাই, যাতে করে তার আড় চোখে দেখার একটা সুযোগও না পায়। সেটা তাদেরকে পোকা বানায়। 

তাদের কেউ কেউ কিছুই বলে না, তেরছা হয়ে ওদের চেয়ারে বসে, বুড়া মাংসের দলা, পেটের মধ্যে কেবল মদ পাক খাচ্ছে, আমার মনে হয় যেন মাংস ভাসছে তরলের মধ্যে। এক সমুদ্র লোক, মুখাবয়বহীন, নামহীন, একটা তালে বাঁধা, সেই একই চাওয়া, আঙিনায় গিয়ে হিসু করা, মাতালদের গন্ধ, কর্মহীন আঙুল, বোতাম খুলতেও অনেক সময় লেগে যায়, তাদের আনন্দ হয় যতোক্ষণ পারে যতোক্ষণ টিকে থাকে তরলের শেষ রেখা দেখে, বোধহীন, গুজে দেয় তাদের অলস যন্ত্র, মদের মধ্যেই যেন তারা আচার হয়ে আছে, মেরামতের অযোগ্য লোক, জর্জরিত, এক বুড়ো ভেড়ার মতো নির্বীষ। তারপর আঙিনা থেকে ওদের থেকে বাইরে থাকাই উচিত, গোপন একটা চাহনি কেবল, আমি জানি না এ সবের মানে কি, আমি এমন বুড়োদের বুঝতেও পারি না। এইসব কিছুই আমার বাবা মায়ের দোষ, আমি তো ওদের দেখতে চাইনি, জঘন্য, তাদের পাজামার বোতাম লাগাচ্ছে, চুলকাচ্ছে, নাকে আঙুল আবার, মুখে, স্যাঁতস্যাঁতে চামড়ার জ্যাকেট, উষ্ণতা তাদের দুর্গন্ধ আরো বের করে আনছে। অর্ধেক সময়, তাদের একজন উঠে দাঁড়াবে, ঘুরান দেবেন চারপাশে এবং আকস্মিক বাড়ি খাবে ওয়ালপেপারে। সে হাসবে, কাঁদবে, বমি করবে। আমার বাবা তাকে ঘণ্টাভর কুঠুরিতে আটকে রাখবে যতোক্ষণ না সে ভদ্রস্থ হয়। আমি যেখানে থাকি তার থেকে মাত্র দশ গজ দূরে সে ঘুমায়। আমি আমার ওয়াড্রোবের আয়নায় আমার মুখটা চেপে ধরি যতোক্ষণ না তা সাদা আর সবুজ হয়ে ওঠে। আমি কী ঘৃণাই না করি ওদের। ওদের অবশ্যই দোকানটা বন্ধ করে দেয়া উচিত এবং অন্য কিছু করা উচিত। আমাদের নিজেদের আয়ত্বের বাড়ি, এইসব ময়লার বাইরে কোন জায়গা। আমি আমার পড়ায় ফিরে যাই, আমি প্রাইভেট স্কুলে পড়ি, তারা বুঝতে পারে না আমি কি ভাবছি।

মুদির দোকানের অংশটা আমি অতো অপছন্দ করি না। শস্তা মদ, পারনড  আর এক চুমুক ব্রান্ডি মানেই টলমলে পা, বমি, প্রস্রাব আর নড়বড়ে ঠুকঠাক। আমার মা যে সব জিনিস বিক্রি করে সেগুলো আমার বিতৃষ্ণা জাগায় না, তারা অনেক বৈচিত্রময়, অনেক সর্বজনিন, চিনির দানা, সার্ডিন মাছ, মাখনের টুকরা, শত গ্রাম পোর্ট দ্যু সাল্যু চীজ, এক জোড়া আঠারো সাইজের মোজা। সব সময়ই পরিমাণে কম, গাড়ি ভোজাই করে কেনা খাদ্যের মতো করে নয়। আমাদের ক্রেতামার একদম খাওয়ার আগ মুহূর্তে আসে, দেখে তারা আজকে পরিবারকে কী খাওয়াতে পারবে। তারা খালি বোতল নিয়ে আসে, আমরা সেইসব খালি বোতলে ভরাট হয়ে উঠি। তারা ধৈর্য ধরে পরিবেশনার অপেক্ষা করে। আমার মা ধীর গতির, সে জিনিসপত্র খুঁজে পাওয় না, সে অনুসন্ধান চালিয়ে যায়, মই বেয়ে কুকিজ খুঁজতে থাকে, সে ওগুলো উপরে রাখে, উঁচুতে, খামের সাথে, যাতে শুকনো থাকে ওগুলো। কখনো কোন ক্রেতা ক্যামেমবার্ট চীজের টুকরা চুরি করার সুযোগ পায়। প্রত্যেক সন্ধ্যায় ক্রেতারা তাদের দুধের পাত্র নিয়ে আসে, শুকনা, সরের একটা আস্তরণ সহ, তারা ওগুলো ঠিকমতো পরিস্কারও করে না, একই অবস্থা আমার বাবা মায়েরও, আমাদের থালাগুলোতে সব সময় ডিম কিংবা সসের একটা আস্তরণ থাকেই। ‘এটা তোমার পাছার ফুটো বন্ধ করে দেবে না, বুঝছো!’ তারা নিশ্চিত না তারা কী চায়, ‘ওইখান থেকে একটু আর এইগুলার থেকে আরেকটু’ আর তারপর, হঠাৎ, তারা টিনের ভেতরে থাকা দ্যুয়ারনেনে ম্যাকারেল মাছ কিংবা লাস্তুক নুডুলস চায়। ‘আশঙ্কা করছি যে আমাদের ওগুলো নেই, আজকাল ওগুলোর ডেলিভারি আসে না!’ 

আমি লজ্জায় লাল হই, যখন রান্নাঘর থেকে এটা শুনি। আমাদের তেমন কিছুই ছিলো না কখনো। অস্বাস্থ্যকর খাবার নয়, মা সব সময় বলতো, ভাবটা এমন যেন বহুত পুরাতন ক্যামেমবার্ট খুব স্বাস্থ্যকর, দইগুলো     হলদে হয়ে যাওয়া, আর টমেটোগুলো ছাতা পড়া। সে একটা পাস্তা কিংবা চিনির প্যাকেটের পেছনে বিল লিখতে থাকে। ‘এরপর কে আছেন?’ মাসের শেষে যখন ওরা পারিবারিক ভাতা পায় তখন তারা বাকী শোধ করতে আসে আর পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হতে থাকে... আমার মা তিনবার হিসাব মিলাতে থাকে, প্রত্যেক পাতাতেই গণ্ডগোল করে। আর যদি বিলটা বড় হয়, সে বাচ্চাদের দিকে এক প্যাকেট মিষ্টি ছুঁড়ে দেয়। ওরা আমাদের উপর ভরসা করে বাঁচে, তারা ঘ্যানঘ্যান করে, কাকুতি মিনতি করে। ‘আমি একদম মাসের শেষ দিনে এটা দিয়ে দিবো, আমি কথা দিলে কথা রাখি! আমাদের বাড়িতে হাম হয়েছিলো সবার, তুমি জানো সেটা!’ আমার মায়ের মুখে কোন প্রভাব পড়ে না, সে আবার সব কিছু হিসাব করতে থাকে।

‘ওহ, আচ্ছা, তা তোমরা যে লা রুঁদো থেকে কাপড় অর্ডার করলা সেটার টাকা কই পেলা!’ তার জন্য টাকা ফেরত পাওয়া সহজ নয়, সে খুঁজে খুঁজে ক্রেতাদের বাড়িতে চলে যায়, আর তারপর তারা একসাথে চা বা কফি খায় যেন পুরনো বন্ধু। তাতে করে ক্রেতারা শহরতলীর সুপারমার্কেটে যাওয়া বন্ধ করে না, পরের দিনই, অবশ্য যতোক্ষণ তাদের পকেটে টাকা থাকে। তারা আমাদের বোকা বানাতে পারে না, তারা আমাদের এখানে কেনাকাটা করে কারণ তাদের এটা করতে হবে। কদাচ তারা ‘শুভ সকাল’ বলতে মুখ খোলে। আমার মা তাদের বলে, ‘ভদ্র হতে পয়সা লাগে না।’ আমি এটা তাকে বোঝাতে পারিনি, ওরা তো সব সময়ই ওখানে আছে, আমি নিশ্চিত ওরা ‘লেস্যু বালিকা’ নিয়ে সব সময় কথা বলে, তারা স্টোর থেকে কিচেনকে আলাদা করতে যে দরজা সেটা দিয়ে সব সময়ই তাকিয়ে থাকে, ওরা জানে আমাদের কী খেতে হবে, ওরা নিশ্চয়ই মাথার উপরে বালতিতে যখন আমরা হিসু করি তার শব্দও পায়। কখনোবা ওরা দুপুরের দিকে আসে আর তাদের ভয়ঙ্কর সব গল্প বলে। রক্তাক্ত, উষ্ণ ঝলকানি। আমি জীবনের সব বদল সম্পর্কে জেনে গিয়েছিলাম ঋতুমতী হওয়া আগেই।

ওরা জানতো প্রত্যেক বাড়িতে কী কী ঘটে, বাবাদের ছিলো পোয়াতি কন্যা, তাদের মাতাল স্বামী, ঢিলা চরিত্রে নারীরা। তারা কখনো তাদের নির্মম বাজে, আশাহীন গল্প ছড়ানো বন্ধ করতো না। গল্পরা শুয়ে থাকতো আমার জন্য, তারা আমাকে সতর্ক করতো আমার ভবিষ্যত কী হতে পারে সে বিষয়ে : একটা আকাইম্মা লোককে বিয়ে করা, মুটকি একটা মেয়ে একদল শিশু দ্বারা ঘিরে থাকা যাদের ডায়পার বদলানো জরুরি... যদি আমি ওদের কথা শুনতাম, যদি আমি নিজেকে না দেখতাম, যদি আমি বাড়ির ঘটনাগুলো নিজের উপর চাপাতে দিতাম, যেমন একদা দিতাম, তাহলে আমি হয়তো ওদের মতোই হয়ে যেতাম এতোদিনে... ওরা সব আমার জন্য অপেক্ষায় আছে, বুড়ো লোকগুলো, প্রতিবেশীদের চ্যাংড়া ছেলেগুলো, ‘হ্যালো, নিনিস,’ ওরা চেচায়। ক্রেতারাও আমার দিকে চোখ রাখে, তারা আমার বাবা মা’র সামনে তেমন কিছু বলে না : ‘ওর কাঁধের উপর মাথাটা ভালো, তাতেই লড়াইয়ে অর্ধেক বিজয় আসে!’ কিন্তু সত্যিকার অর্থে এটা ওদের পছন্দ না, মনে করো এই সব বই পড়া তার মগজে গেছে, যে সব বালক বালিকারা এমন করতে পারেনি, পড়ালেখাও করতে পারেনি, সেই সব উদাহরণের কথা তারা ভাবতেও পারে না। তারা সব সময়ই উপযুক্ত কারণ খুঁজতে চায়, অজুহাত বের করতে চায় যাতে তুমি ধূলা আর অন্ধকার থেকে ওঠে আসতে না পারো। 

ওদের ভয় ছিলো সংক্রামক। আমি ওদের মধ্যেই জন্মেছি, আবার ওদের মতো হয়ে যাওয়াও আমার জন্য যথেষ্ট সহজ নয়... অন্য যে কোন কিছু, কিন্তু আমি বরং একটা বেশ্যাই হবো এইখানে প্যারিসে। আমি হয়তো সেই মেয়েদের হিসাব পাঠ করবো যারা এই পেশায় গেছে। অন্তত তারা তো স্বাধীন ছিলো। আমি বরং অন্য কোথাও গিয়ে লাসুসের অভিধানে স্বেচ্ছাচার, গণিকালয়, কামনা ইত্যাদি শব্দ ও তার সংজ্ঞা খুঁজতে থাকবো এবং তা আমাকে উষ্ণ করে তুলবো,  শ্বেত ও স্বর্ণের দৃষ্টিভঙ্গি দেয়, প্রাচ্যদেশীয় স্নানাগারের কথা মনে করিয়ে দেয় যেখানে আমি হয়তো সুগন্ধী হাত ও বায়ের বন্ধনে ডুবে থাকবো। দোকানের ঘণ্টাধ্বণি, জ্যামের কৌটার আঠালোর বৃত্তের বাইরে এইখানে তো সৌন্দর্য বিরাজমান। ‘ভালোত্ব’ আমার মধ্যে দ্বিধা তৈরি করেছিলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা আর সৌন্দর্য, ভালো ব্যবহার, সুন্দর কথা দিয়ে, ‘সত্যই সুন্দর, সুন্দরই সত্য’; শয়তান ছিলো সব বিশ্রি, নোংরা, অশিক্ষিত লোকেরা। কিন্তু এসব কথা বলার জন্য আমার স্কুলকে দরকার পড়েনি, এটা আমার চোখের সামনে ঘটেছে, আমাদের ক্রেতারা ছিলো নোংরা বুড়ো লোক আর আধা বুদ্ধির মেয়েমানুষ সব: আমি যতোটুকু বুঝতাম, সুন্দর পোশাক পরা লম্পট নারীরা জীবন যাপন করতেন ক্লিন সেভ পুরুষদের সাথে, দারুণ ড্রেসিং গাউনসহ, তারা তবুও অন্যায় করতে পারে বলে আমি করতাম না। সত্যিকারের কলঙ্ক হলো পেছনের আঙিনায় থুতু ফেলা, পাদ দেয়া, ঠিক মতো পরিষ্কার  পরিচ্ছন্ন না করা, বাইরের টিশার্ট পরেই ঘরে ঘুমানো, মুখ খোলা রেখে খাবার চাবানো। এতো এতো ব্যাপার ক্লাসের অন্য মেয়েদের সামনে আমাদেরকে শ্রদ্ধার উপযুক্ত ব্যক্তি হতে বাধা দিচ্ছিলো যে সেটার হিসাব করাও আমার জন্য কঠিন ছিলো। 

কতো কতো ছোট জিনিস ছিলো, সিঁড়িগুলো রঙ পর্দাগুলো বদলানো দরকার, গুরুত্বহীন ছোট্ট ছোট্ট রুচি থেকে আমাদের খালাস হওয়া দরকার ছিলো, তুচ্ছ জিনিসগুলো অযথার্থ ছিলো, আদতে একদম সবকিছুরই বদল দরকার ছিলো, বেডরুমে ক্যানারি হলুদ রঙা মেঝের আচ্ছাদন থেকে শুরু করে লবণ, পুরনো কাগজ, পেন্সিলে ভরা কাউন্টারে পর্দা, সব কিছুর ক;ল দরকার। আমি বুঝতে পারতাম না, কেন আমার অভিভাবকরা ভুলগুলো দেখতে পেতো না চোখ, তাদের কেবল রু দ্য লা রিপাবলিকে কোন একটা বাড়ির দিকে এক নজর তাকালেই হতো কিংবা ডাক্তারের ওয়েটিংরুম, চামড়ার সোফা, গিল্টি করা ছোট্ট চেবিল কিংবা খবরের কাগজ দেখলেই তো তারা বুঝতে পারতো কোনটা করা সঠিক হতো। শহরতলীর সব দোকানের জানালাতেই সুন্দরভাবে, চকচকে করে সব কিছু প্রদর্শিত হতো।  এক বছর, আমার বাবা মাকে ক্যাফেটাকে নতুন করে রঙ করতে হয়েছিলো একটা হাস্যকর ফ্যাকাশে সবুজ আর লাল তামাটে রঙ, দুনিয়ায় এমন জিনিস আর দেখা যায় নাই। তারা দেয়ালে অসংখ্য পোস্টার লাগিয়ে দিলো, গোলাকার, ডিম্বাকার, জগের মতো, গ্লাসের আকারের মতো। আমার মায়ের পর্দা নিয়ে ঝামেলা আছে, সে সচারাচরন সুতির পর্দা কেনে, তারপর সেবার কিনলো ‘নিয়ন’ যেটাকে সে আসলে ‘নাইলন’-এর সাথে গুলিয়ে ফেলেছিলো। 

এটা ছিলো সমুদ্রে একটা ফোঁটা : কার ঠেকা পড়েছে সুন্দর পর্দার দিকে তাকানোর যখন কিনা রঙ খসে খসে পড়ছিলো, নিচু দরজার প্রবেশমুখ আর ক্যা ফে লেখা দুভাগ হয়ে গিয়েছিলো... যখন আমি এক বন্ধুর বাড়ি থেকে বই নিয়ে ফিরছিলাম, আমি খুব করে খুঁজতাম ওর বাড়িতে একটা ভাঙা প্লেট, একটা ভাঙাচোরা চুলা, আর আমি খুশি হতাম যদি তেমন একটা কিছু আবিষ্কার করতাম কারণ সেটা তাকে আমার মতো করে তুলতো। যেটা আমি বুঝতে পারি নাই একটা সাজানো গোছানো বাড়িতে একটা ময়লা কিংবা সামান্য ভাঙা জিনিস আসলে একটা ঘরোয়া ছোঁয়া এনে দেয়। যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত করতো সেটা হলো আমাদের কোন হলরুম বা ডাইনিংরুম নাই, লোকজনকে দাওয়াত দিয়ে বসতে দেয়ার একমাত্র জায়গাটি ছিলো স্টোর আর ক্যাফের মাঝখানের এক চিলতে রান্নাঘর, অহেতুকের চেয়েও বাজে।

টেবিলটা ঢাকা থাকতো একটা প্লাস্টিকের টেবিলক্লথে যেটা মা বছরে দুবার বদল করতো, একবার ক্রিসমাসের সময় আরেকবার গরম কালে, এর নকশার মধ্যেই একটা ম্লান ছাঁচ ছিলো যেটা যেন শুকিয়ে যাওয়া কামেমবার্টের মতো, সেখানে ছিলো তিনটি চেয়ার আর ধোঁয়ার জন্য অপেক্ষমান নোংরা প্লেটে ভরপুর একটা বেসিন... আমি স্বপ্ন দেখতাম সেই দিনের যখন আমাদের একটা ফ্রিজ আছে আর আমি বন্ধুদের দাওয়াত করে তাদের পানীয়তে বরফ দিতে পারছি কিংবা তাদের ঠান্ডা দই খেতে দিতে পারছি। যা হওয়ার তাই, আমি কখনোই কাউকে দাওয়াত করতে পারিনি। আর সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার ছিলো আমাদের একটা যথার্থ টয়লেটও ছিলো না। বেডরুমে একটা বালতি ছিলো কেবল আর পেছনের আঙিনায় একটা পায়খানার প্যান, খোলা আকাশের নিচে সেটা একদম উপচে যাচ্ছিলো সদাই। দোকানটা ছিলো ময়লা আর এক কোণায় ছাতা পড়ে থাকতো... একটা সাদা ফ্রিজ, ওয়াইনের তাক, পরিষ্কার আর চকচকে, একদম আরোগ্যের মতো, যা থাকলে আমি পছন্দ করতাম, যাতে করে তুমি ভুলতে পারো তুমি নেহায়েত লবণ আর কফি বিক্রি করো। এদিকে তুমি ভাবছো আমি খুব সৌভাগ্যবতী পিপারমেন্টের বোতলের ঘ্রাণ কিংবা ভেনিলা সুগারের প্যাকেট হাতে। আমার মা সব কিছু আওলা ঝাওলা করে স্তূপ বানিয়ে রাখতো, যে কোন পুরনো পন্থায়, আর ফলের ক্যানগুলো দিনে তিনবার পড়ে যেতো একটার উপর থেকে আরেকটা। 

দরকার মনে না-করলেই সে যে কোন কিছুকে ধাক্কা দিয়ে কাউন্টারের নিচে ফেলে দিতো, পুরনো বাক্স, আবর্জনার, বাতিল প্যাকেট যা ফেরত দিতে হবে, শীতের জিনিসপত্র ন্যাপথলিনে মোড়ানো, থেতলে যাওয়া ফল, সব কিছু সে লাথি দিয়ে পথ থেকে সরিয়ে দিতো। বিজ্ঞান ক্লাসে আমি হাইজিনের কথা শিখেছি, জীবাণুর সাথে লড়াই করা, পাস্তুরাইজেশন, ক্লোরিনাইজেশন ইত্যাদি শিখেছি, আর আমি দেখতে পাচ্ছি মাছি ঘুরে বেড়াচ্ছে মাংসের কিমা আর চীজের উপরে, আমার মা সিগারেটের বাতিল অংশ হাত দিয়ে তুলছে, মাতাল যক্ষা রোগী কাশি ফেলছে, সিগারেট ফুকছে, এইসবই আবার ক্যাফে, কিচেন হয়ে চলে যাচ্ছে জলের ধারায় আমাদের প্লেটের উপর দিয়ে... পরিষ্কার করাটা একটা ঘোরের মতো হয়ে গেছে আমার, বিশাল বাথটাব ভরে তুলছি সাবানের ফেনায়। সৌভাগ্য। আঠারো বছর বয়সে কলেজে আমার প্রথম স্নান সৌভাগ্যময়। যদিও তা আমি উপভোগ করিনি, এটা লন্ড্রি দিবসের কথা মনে করিয়ে দিতো আর আমি আমার পাশের মেয়েটির গা ঘষার শব্দ শুনতে পেতাম। আমার একটু অস্বস্তি লাগতো। 

আমি সব সময়ই তাদেরকে দেখতে যাওয়াকে ঘৃণা করতাম। যেই মুহূর্তে আমি ট্রেন থেকে নামতাম তখন থেকেই এটা শুরু হতো। কেবল যদি আমি অন্য কোনখানে থাকতাম। আমি শত গজ দূরের হলুদ দালানটা দেখতে পাই, আমি নিচে তাকাই, এটা নিয়তির মতো, আমি তার দিকে তাকাতে পারি না। বহু বছর, আমি স্বপ্ন দেখেছি, তারা হয়তো এ জায়ঘা থেকে সরে যাবে, তারা চলে যাবো অন্য কোথাও অন্য কোন কাজ করবে, এমনকি একটা কারখানাতে গেলেও ভালো হতো। দরজার সামনে কাঠের বাক্সের স্তূপ, আমি গন্ধ শুকেই বলে দিতে পারতাম ওগুলোর ভেতরে কী আছে, তেল, ডিটারজেন্ট, চিনি, কোন ভুল হতো না আমার। ক্রেতারা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো। তারা দশ বছরের অধিক সময় হলো খোলা লবণ বিক্রি করছে না কিন্তু এখনও তুমি লবণের গন্ধ পাবে। সে বেমানানভাবেই ক্রেতাদের সামনে আমাকে জড়িয়ে ধরে, তার বিস্ময় যে আমি দূরের কলেজে পড়ি... আর বাবা ঝুঁকে আছে প্যারিস-নর্মান্ডি পত্রিকার উপরে, রান্নাঘরেই, কোন কিছুই আর কোন গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে আলু ছিলছে, খাবার বানাচ্ছে, খানিকটা ডোমিনো খেলছে, তারা খুব কম কথাই বলে, কিন্তু আমাকে দেখে তারা খুশি, তারা আশা করি আমি যেন মাসে অন্তত একবার আসি। আমার যা দরকার আমি নেই, কফি, ডুমুর, কুকজি। তারা খেয়ালও করে না। ভালো লোক, এমন ভালো লোক... হা, ওরা নোংরা, বদমেজাজী, ওরা আমার বিতৃষ্ণা জাগায়... সূর্যের তলায় যতো নাম আছে আমি সবগুলো ধরে তাদের ডাকি। এই সবই তাদের দোষ, যদি... আমি পাত্তা দেই না শিক্ষকরা পিতামাতা নিয়ে কী বলে সে সব নিয়ে... আমি তাদের দুজনকেই ঘৃণা করি। আমি তাদের ভিন্ন রকম দেখতে চেয়েছিলাম, শ্রদ্ধেয় মানুষ হিসেবে, যাদেরকে আমি বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারতাম।   

‘সবকিছু আমার সংবেদনশীলতাকে আঘাত করে,’ সম্ভবত এমন একটা বাকধারা ছিলো যতোদূর ল্যাগার্দে এবং মিকার্ডে থেকে মনে করতে পারি। শব্দরা আমাকে অনুসরণ করে, তাদের বিচার্য ক্ষমতা সহ, তাদের তুলনামূলক দিক সহ, অন্তত পেনশন ভেক্যুরের একটি ডাইনিং রুম ছিলো, আমার বাড়িতে সেটাই নেই। ‘এইটার কী দরকার? আমাদের বরং ক্রেতাদের জন্য আরো জায়গার দরকার?’ তারা যেন আমাদের উপরে হামলে পড়ে, আমাদের উপরে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘোরে, বালজাক কিংবা উপন্যাসের গল্পের চেয়ে দশগুণ বিশ্রি পরিবেশ। যখন ক্যাফেতে পর্যাপ্ত চেয়ার থাকে না, তারা কিচেন থেকে নিয়ে ব্যবহার করে আর আমাদের নিজেদের বসার জন্য কিচ্ছু থাকে না... আমার বাবা মা এটা হতে দেয়, তারা ক্রেতাদের পছন্দ করে, তারা আমার দিকে পাত্তা দেয় না, যতোক্ষণ না আমি আমি ‘আমার পড়ায় মগ্ন থাকি...’ চেয়ারগুলো ফিরে আসে, ঢাকা থাকে তামাকের টুকরা, উষ্ণ হয়ে থাকে ওয়াই আর লাঞ্চের পরের পানীয়ের গন্ধে। ‘এগুলোতো ছোঁয়াচে রোগ নয়, তোমার পছন্দ না হলে তুমি অন্য কোথাও গিয়ে বসতে পারো!’ বরং চুপ থাকাই ভালো, যদি আমি যখন মাত্র পনের বছর বয়সের ছিলাম, তখন প্রাণপণে চাইতাম তাদের চোখদুটো খুলে দিতে আর তাদেরকে বলতে যে সত্যিকারের পৃথিবীটা হলো ভদ্র, মার্জিত পোশাক পরিহিত এবং পরিচ্ছন্ন। আমি এটা নিতে পারতাম না, আমিই একমাত্র যে এগুলোকে ঘৃণা করতাম। তারা আমার চোখ দিয়ে ক্রেতাগুলো দেখতো যদি আর যদি আমাদের বাড়িটাও দেখতো, যদি বলা যেতো যে এটা ভীষণ বিশ্রি আর ভীষণ অবমাননাকর জায়গা... যদি তারা অন্য কিছু করতে পারবো, আমরা সবাই এটা ছেড়ে যেতে পারতাম আর শহরে লিফট শহ একটা এপার্টম্যান্ডে থাকতে পারতাম। কোন আশা নাই, তারা কেবল জানে এইটা একটু বিক্রি করতে আর ওইখানে সেইখানে সামান্য নগদ বেচাবিক্রি করতে। 

‘আমাদেরকে এই নরকে একা রেখে চলে যাও! তুমি কেবল তোমার পড়ালেখা নিয়ে ভাবো!’ আর ‘তুমি ভবিষ্যতে যা খুশি করতে পারো, এখন তুমি অনেক পরিশ্রম করো পরে অনেক ভালো চাকরি পাবে!’  বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, লেস্যুর স্টোর থেকে আমি চামড়ার আরাম চেয়ারে গিয়ে বসবো একদিন, ওই ডেন্টিস্টের চেয়ারের মতো, জানালা দিয়ে টালমাটাল ফলের ক্যানগুলো দূর থেকে রট আয়রনের গেট পেরিয়ে দেখা যাবে... যে কোন ভাবেই, আমার বাবা মা আমার সাথেই থাকবে। তাদের বিরাট মুখ, বাজে রুচি আর সাধারণ বক্তৃতা... তারা আমাকে বাইরে যাওয়া থেকে আটকাবে, আমাকে উত্তমতর হওয়া থেকে আটকাবে। আমি অন্য মেয়েদের মতো না, যারা তাদের পরিবার ও মুরব্বীস্বজনদের নিয়ে সুখের আলাপ করে। যখন লোকে আমার পরিবার নিয়ে কথা বলতে নেয়, আমি ভাব করি তারা অন্যদের মতোই, ‘তোমার বাবা মা’ শিক্ষক বলে, ‘জিজ্ঞেস করো আম্মু আর আব্বুকে’ অভিভাবকদের দাওয়াত দেয়া হবে, ‘পরিবারের বলয় সবচেয়ে জোরে হাততালি দেয়’ বলেছেন ভিক্টর হুগো... আমার পরিবার সত্যিকারের পরিবার না, আমি জানি একটা সত্যিকারের পরিবার কেমন, একটা দাদা, দাদী, যাদের আছে দারূণ শুভ্র কেশগুচ্ছ আর তারা জ্যাম জেলি বানায় ও শিশুদের নিয়ে পার্কে বেড়াতে যায়। আমার দাদা একটা বাড়িতে মারা গেছে, আমার দাদী লোকের কাপড় চোপড় সেলাই করে, ধোঁয় আর এখন সে আমার ফুপুর সাথে থাকে আর কখনোই নিজের ঘর থেকে বের হয় না, সে পর্যাপ্ত গালি দেয় আর ডিম ও নুডুলস ছাড়া সে কিছুই বানাতে জানে না। আমার ফুপা, ফুপু ভোজের দিন আসে কেবল, নিজেদের উদর পূর্তি করতেই আসে, তারা পারলে দোকানটা খালি করে ফেলতো খেতে খেতে। ‘তুমি যথার্থ ভালো আছো, যা কিছু তোমার দরকার তুমি একদম দরজার সামনে পেয়ে যাচ্ছে।’ সব অদক্ষ, হাতে কাজ করা লোক। ‘আচ্ছা, তারপর নিনিস?’ নিজের উপর চোখ রাখতে হবে তোমার। মোটা হয়ে যাচ্ছো কিন্তু!’ আমার বাবা ওদেরকে একদম লাইন মতো রাখতে পারে, ‘ওকে ওর মতো থাকতে দাও! ও পড়তে যাবে!’ ওদের চিন্তার বাইরে। ওরা জানে না এরপর আমাকে কী বলতে হবে। আমরা টেবিলে অপেক্ষা করে অনেক দেরী করে। আমার বাবা এই সময়ের মধ্যে ক্রেতাদের খাবার পরিবেশন করে। আমার মা খরগোশের ঝোল ফেলে দেয়া তার ব্লাউজে, আমি বাদে সবাই হেসে দেয়। হাসে গ্লাস, সে ভাঁড়ামির চেষ্টা করে, সে তার চোখ বন্ধ করে আর গায়, ‘লে গ্রান্ডে ফ্রিস’।

আজ রাতে সে অসুস্থ হয়ে যাবে। একজন বিনীত, হাসিখুমি মা আর বাবা। মা হয়তো চারটা বাজে কেক বেক করবে, আর বাবা অফিস থেকে সন্ধ্যায় ফিরবে। এটাই তো ডারটন পরিবার। রবিবারে আমরা পিকনিকে যাবো দফিনে। আমরা হয়তো মাছ ধরতে যাবো স্বপরিবারে কিংবা মাশরুম তুলতে যাবো যেমন লেখা আছে ‘ব্রিজেট কাম অব এইজ’ বইতে। এখানে তেমন কিছুই নেই। সব সময় একে অপরের প্রতি চিৎকার চলছে। তুমি আকাইম্মা মুর্খ! বাবা চুপ থাকে। তুমি উচা গলার খানকি! এইবার তার সুযোগ। সে রান্না করে। আর মা দেখে বিলগুলো, ডেলিভারি দেখে, সেলসম্যানদের দেখে। তারা কেন অন্য লোকদের মতো হতে পারে না? আমি কাঁদতে কাঁদতে চোখ ভাসিয়ে ফেলতাম। আমারে এতো কষ্ট দিও না, আমি এইখানে কতো কিছু করি, আমি চলে গেলে তোমার কী হবে... আমি ওদের চিৎকার শুনতে চাই না। 

তারা আমাকে পরীক্ষায় ফেল করাবে... কাঁপতে থাকে আর কসম কাটতে থাকে, মা দৌঁড়ে চলে যায় যখন দোকানের ঘণ্টা বাজে, একটি মনোরম সকাল ম্যাম, আর বাবা ডোমিনো খেলায় ফিরে যায়, দাম্ভিক আর উদ্ধ্যত্বপূর্ণ, ‘তুমি হারাতে চাও?’ আর আমি... সন্ধ্যায়, তারা একটা মাতালের সাথে ধ্বস্তাধস্তি করে আর তাকে রাস্তার পাশে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। সারা সন্ধ্যা তাদের মুখ ভরপুর হয়ে থাকে, তারা মতাল হওয়া না-হওয়া নিয়ে আলোচনা করতে থাকে। আমার কিচ্ছু বলার নেই, আমার খাবার থালায় নাক ডুবিয়ে রেখেছি, ভাব করছি ওরা যেন একটা বিদেশি ভাষায় কথা বলছে। হয়তো ইংরেজি ভাষায়, আমি অনুভব করি যে ষূর্যের তলার যে কোন নামে আমি তাদের ডাকতে পারি। আমার মা ‘নোংরা, উন্মাদ, ওরা শুকোর তুল্য!’  আমি ঘৃণা করি তাদের যেভাবে তারা হাত নাড়ায়, নিচুর চেয়ে নিচু মতো, সেইসব লোকদের মতো যাদের কোন ধারণাই নেই কেমন সুন্দর ব্যবহার করতে হয়, ঠিকঠাক কথা বলতে হয়। এর থেকে বের হওয়ার কোন উপায় নেই। তারা পাত্তাও দেয় না, তারচেয়ে বড় কথা, তারা ভালো হওয়ার চেষ্টাও করে না। আমি ভাবি, আমি যদি কখনো তাদের খেতে না দেখতাম, বিশেষত যখন একটা সুন্দর ভোজের আয়োজন করা হয়, মুরগীর মাংস, ক্রিম কেক, ওরা ঝাপিয়ে পড়ে, কনুই বাইরের দিকে, গবগব করে খাওয়ার শব্দ, ওরা তখন কথা বলে না।

ঠেলাঠেলি করে সব খায় আর শব্দ করে চাবায়, একটু যদি শ্বাস নেয়ার আরাম পাওয়া যেতো, প্রতিটি ঝোলের ফোটায় রুটির টুকরা ভেজায়, শুষে নেয়, আবার নেয়, আদ্র, তখন শব্দ কম হয়... আমার মা আঙুল দিয়ে মাড়িতে খোঁচায়... কেমন করে পারে! আমার বাবা মা! একটা পূর্ণাঙ্গ বিপর্যয় যেন! যদি তোমার বাবা মা এমন না হয় তাহলে এটা কোন ব্যাপার না, কেবল দেখে যাওয়ার অভ্যস্ততা হলেই হয়। কিন্তু তারা আমার পিতা মাতা, আর আমি তাদের সব সময় দেখি, তারা তাদের বর্বরতা সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ, তাদের জন্য তাদের ক্রেতারা যেমন জীবনের খাওয়াটাকে পূর্ণ আনন্দ মনে করে ব্যাপারটা তেমনি। কোন সংযম নেই, তারা এমনই, তারা গবগব করে খায়, কুলকুচু করে জোরে, হাই তোলে, আড়মোড়া ভাঙে। তারা দেখতে পায় না তারা কী করছে, তারা সব কিছু দেখিয়ে বেড়ায়, নোংলা আন্ডারওয়ার ঝুলানো থাকে মাচা থেকে, বাটির মধ্যে বাঁধানো দাঁতের পাটি। ভদ্রমহিলারা চায়ের দোকানে আদা খাচ্ছে কী পরিশীলিত ভঙ্গিতে... আমি ব্যাকুল ছিলাম বিচক্ষণতা, বিনয় আর ধৈর্যের জন্য। বদলে তারা মাথার উপরে পুরো জায়গা জুড়ে ছোটাছুটি করে, ময়লা ফেলে, সশব্দে চিবুতে থাকে। আমার এতো কড়া ভাবে উনাদের বিচার করা উচিত ছিলো না কিন্তু আমার জন্য এটা ছিলো সামগ্রিক পার্থক্য। (চলবে)   

নোবেলজয়ী আনি এরনোর উপন্যাস: ১০ম পর্ব

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়