ঢাকা     সোমবার   ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ১৯ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

স্বশিক্ষিত শিল্পী শশীভূষণ পাল

শরীফ আতিক উজ জামান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৫২, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  
স্বশিক্ষিত শিল্পী শশীভূষণ পাল

শিল্পী শশীভূষণ পাল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পাদে তিন বছর ধরে (১৮৭৬-১৮৭৮) ভারতজুড়ে যে মহামন্বন্তর চলছিল তার শেষ বছর অর্থাৎ ১৮৭৮ সালে খুলনার মহেশ্বরপাশায় জন্মেছিলেন শিল্পী শশীভূষণ পাল। এই বছর বিশ্বে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল; আর তা হলো, থমাস এডিসন কর্তৃক ফনোগ্রাফ  আবিষ্কার, যা পরবর্তীকালে গ্রামফোন বা রেকর্ড প্লেয়ারে রূপান্তরিত হয়েছিল। শশীভূষেণর পিতার কোনো স্বীকৃত পেশা ছিল না, তবে ভালো গান গাইতেন এবং চারণকবি হিসেবে  খ্যাতি ছিল। আর্থিক দৈন্যের কারণে শশীভূষণ বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি। বাড়িতে থেকেই মাটির পুতুল, বাশি, বেহালা, ইত্যাদি তৈরি করতেন।

অক্ষরজ্ঞান না থাকলেও বাংলা ও ইংরেজি লেখা দেখে লিখতে পারতেন। প্রকৃতিপ্রদত্ত এই প্রতিভা দেখে তাদের কুলপুরোহিত তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। দৌলতপুর এন্ট্রান্স স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তিনি পড়ালেখা করেন, কিন্তু এরপরই পিতার মৃত্যুর কারণে তাকে অর্থ উপার্জনে মনোনিবেশ করতে হয়। তবে শিল্পের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহে এতোটুকু ভাটা পড়ে না। নিজ উদ্যোগে কলকাতা আর্ট স্কুল থেকে শিল্পচর্চার শিক্ষায়তনিক পদ্ধতি ও নিয়মাবলী নিয়ে এসে শিল্পকলা চর্চায় মনোনিবেশ করেন।  প্রকৃত প্রদত্ত প্রতিভার গুণে অচিরেই তিনি ছবি আঁকায় নৈপুণ্যলাভে সক্ষম হন। দ্রুতই তার শিল্প নৈপুণ্যের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রদর্শনীতে তাঁর আঁকা ছবি উচ্চপ্রশংসা লাভ করে। সাঁওতাল পরগনার পাকুড় রাজার হাইস্কুলে ড্রয়িং মাস্টারের চাকরিও জুটে যায়। দু’বছর সেখানে  থাকার পর তিনি খুলনায় ফিরে এসে একই সাথে দৌলতপুর ও সেনহাটি স্কুলের ড্রয়িং মাস্টারের পদে নিযুক্ত হন। সপ্তাহে তিন দিন করে দুই স্কুলে তিনি শিল্প শিক্ষা দিতে থাকেন। পাশাপাশি চালিয়ে যান নিজস্ব শিল্পচর্চা। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রদর্শনীতে শিল্পকলা প্রদর্শন করে তিনি খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। বরোদা মহারাজার মিউজিয়াম ও লন্ডন মিউজিয়ামে তাঁর চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। 

এ রকম কীর্তিমান একজন শিল্পী আজ স্বদেশে বিস্মৃতপ্রায়।  তাঁর নাম সেভাবে কেউ জানেন না এবং তাঁর খ্যাতি সম্পর্কেও এ দেশের শিল্প সমঝদাররা খুব অবগত নন। কিন্তু পূর্ব বাংলায় তিনি প্রথম ১৯০৪ সালে শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। ১৯১৮ সাল থেকে যা সরকার  ও জেলা বোর্ড কর্তৃক ২০০ টাকা আর্থিক সহযোগিতা পেয়ে এসেছে। ১৯২৮ সালে সরকার স্কুলের পাকা ভবন নির্মাণ করে দেয়। বাংলার একাধিক ইংরেজ গভর্নর, ম্যাজিস্ট্রেট, লাটবাহাদুরের চিফ সেক্রেটারি, আন্ডার সেক্রেটারিসহ বহু উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা তাঁর স্কুল ও বাড়িতে এসে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের অনেকে ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে পুরস্কৃত করেছেন যে তালিকাটি যথেষ্ট দীর্ঘ। ১৯২৫ সালে বড়লাট লর্ড লিটন কর্তৃক ‘রায়সাহেব’ উপাধি প্রাপ্তি তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

দীর্ঘকাল তাঁর চিত্রকর্ম অযত্ন-অবহেলায় থাকার ফলে  অনেকগুলোই আংশিক বা পরিপূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। বাকিগুলি বর্তমানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা স্কুলের ‘শিল্পী শশীভূষণ পাল আর্ট গ্যালারি’তে সংরক্ষিত রয়েছে। সেই চিত্রকর্মগুলো থেকে শশীভূষণ পালের শিল্পনৈপুণ্য ও বিষয়-ভাবনার একটি ধারণা পাওয়া যায়। সংগৃহীত চিত্রকর্মের মধ্যে  ক্ষুদ্র সংস্করণের চিত্রকর্মই বেশি। তেলরঙে আঁকা চিত্রকর্মগুলো কাহিনিনির্ভর। কিন্তু সমস্যা হলো, চিত্রকলাগুলোর কোনো শিরোনাম নেই। শিরোনাম থাকা না-থাকার সুবিধা ও অসুবিধা দুই-ই রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের বেশিরভাগ চিত্রকর্মেরই কোনো শিরোনাম নেই। শিল্পী যোগেন চৌধুরী এটিকে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তিনি মনে করেন শিরোনাম না থাকার কারণে দর্শক নিজের মতো করে ছবিটির ব্যাখ্যা করে নিতে পারেন। তবে সবসময়ই শিল্পীর উদ্দেশ্য ও দর্শকের উপলব্ধির মধ্যে একটি পার্থক্য থাকে। শিল্পী যা বোঝাতে চেয়েছেন দর্শকের জন্য সেই উপলব্ধি বাধ্যতামূলক নয়। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি তার একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেন যা অবজ্ঞা করার মতো নয়। শিল্পী ও দর্শকের উপলব্ধির এই পার্থক্য আদি ও চিরন্তন। আর বিমূর্ত শিল্পকলার ক্ষেত্রে তা অবশ্যম্ভাবী এক প্রতিক্রিয়া বা নান্দনিক বিচার। 

শিল্পীর আঁকা চিত্রকর্ম

তবে কাহিনিনির্ভর চিত্রকলার ক্ষেত্রে শিরোনাম না-থাকায় তার মর্ম উপলব্ধি কখনো কখনো বিভ্রান্তির চোরাবালিতে আটকে যেতে পারে। সাধারণত শিল্পের মূল্য নিরূপিত হয় দুইভাবে। ‘হিউম্যান ভ্যালু’ ও ‘প্লাস্টিক ভ্যালু’র উৎকর্ষের ভিত্তিতে একটি শিল্পকর্মকে নান্দনিকভাবে সফলতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু শশীভূষণ পালের চিত্রকর্মে আমরা যে কাহিনি নির্ভরতা দেখতে পাই শিরোনাম না থাকায় তার সূত্র অনুসন্ধান করে নির্দিষ্ট কোনো উপসংহারে পৌঁছানো কঠিন। হয়তো ঐতিহাসিক গবেষণায় তাঁর কোনো সুরাহা হতে পারে।  একমাত্র পরিশ্রমী গবেষকের অভিনিবিষ্ট  গবেষণায় কোনো ফল আসতে পারে। 

বিষয়বস্তু হিসেবে তাঁর ছবিতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ভারতীয় রাজাদের প্রতিরোধ যুদ্ধের একাধিক চিত্রকর্ম দেখা যায়। সভাসদ পরিবেষ্টিত রাজদরবারে রাজা, ঘোড়সওয়ার ইংরেজ রাজন্যেকের শহর প্রদক্ষিণ, ইংরেজ ও ভারতীয় সৈন্যের খন্ডযুদ্ধ, যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের ভূপতিত মৃতদেহ, মুখোমুখি ঘোড়সওয়ার যোদ্ধা, বিচারালয়ের দৃশ্য, যুদ্ধ প্রস্তুতিতে সারি সারি ঘোড়সওয়ার ও পদাতিক সৈন্য, গ্রামের কৃষক কৃষাণী ও আটপৌরে জীবন ছাড়াও প্রচুর মানুষের অবয়ব এঁকেছেন তিনি। শিরোনাম না থাকায় তার ঐতিহাসিক সূত্র আমরা ব্যাখ্যা করতে না পারলেও ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের সঙ্গে স্বদেশ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে সার্বক্ষণিক বিরোধের একটি চিত্র তাঁর শিল্পকর্মে স্থান পেয়েছে।  

এখানে একটি বিষয় খুব উল্লেখযোগ্য তা হলো,  ইংরেজদের দ্বারা তিনি প্রচুর সুবিধা ও সম্মাননা লাভ করা সত্ত্বেও তাঁর জাতীয়সত্তাকে তাদের কাছে বিক্রি করে দেননি। তাই তাঁর ছবিতে সর্বক্ষণিক আমরা একটি বিদ্রোহের চিত্র দেখতে পাই। তাঁর চৈতন্যে পরাধীনতার বেদনা সার্বক্ষণিক পীড়া দিত তা তাঁর ছবিতে প্রতিফলিত হয়েছে। 

শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, শশীভূষণ পাল শিক্ষায়তনিকভাবে প্রশিক্ষিত কোনো শিল্পী নন। তিনি একেবারেই স্বশিক্ষিত শিল্পী, যেমন রবীন্দ্রনাথ, চিত্তপ্রসাদ প্রমূখ। চিত্র সমালোচকরা তাদের ছবিতে মুনশিয়ানার ঘাটতি দেখতে পেলেও চিত্রশিল্পে তাদের অবদানকে নতশিরে স্বীকার করতে বাধ্য হন। ১৯২৮ সালে যখন শশীভূষণ পালের শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি অনুদানে পাকা ভবন নির্মিত হচ্ছে তার দু’বছর পর বিদেশের মাটিতে রবীন্দ্রনাথের প্রথম চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নতুনধারার এই চিত্র কর্ম বিদেশে ভূয়শী প্রশংসা অর্জন করলেও দেশের মানুষের কাছে তা তেমন আবেদন সৃষ্টি করতে পারে নি।

কারণ বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে প্রতীচ্যে ঘটে যাওয়া ফভ (১৯০৫), কিউবিক (১৯০৭), ফিউচারিস্ট (১৯০৯), ডাডাইস্ট (১৯১৬) বা সারিয়ালিস্ট (১৯২৪) বিমূর্ত শিল্প আন্দোলন সম্পর্কে তারা রীতিমতো অজ্ঞ ছিলেন। বিদেশ ভ্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথের এই সমস্ত চিত্রকর্ম দেখার অভিজ্ঞতা এবং ভিন্ন এক ধরনের চিত্রশৈলী নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি বিশেষ এক বৈশিষ্ট্যের চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। আজকের দিনে তাঁর চিত্রকর্মকেই ভারতে ইউরোকেন্দ্রিক আধুনিকতার প্রথম ও সফল প্রয়োগ বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শশিভূষণের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি। তিনি বিমূর্ত শিল্পকর্ম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন কি না সেই প্রশ্নটিকে গুরুত্বপূর্ণ না মেনেও বলা যায় তিনি বাস্তবধর্মী চিত্রকলার অনুগত ছিলেন যা ছিল তখনকার ভারতীয় চিত্রকলার পরম্পরা। তিনি যত্নের সাথে এ্যানাটমির পাঠ নিয়েছিলেন যা তাঁর ছবি দেখে বোঝা যায়। কখনো কখনো পরিপ্রেক্ষিতের ছোটখাটো ত্রুটি নজরে পড়ে বটে, তবে তা তাঁর চিত্রকর্মকে বিকলাঙ্গ করেনি।

গড়নের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা চলে। ছোটখাটো ত্রুটিকে ধর্তব্যের মধ্যে না নিলেও চলে। চিত্রকলায় রঙের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাদী-বিবাদী-সম্বাদি রংয়ের সফল প্রয়োগেই একটি চিত্রকলা সামগ্রিকভাবে সুন্দর হয়ে ওঠে। শশীভূষণ বাস্তবানুগ রং ব্যবহার করেছেন। দীর্ঘদিনের অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকার কারণে ব্যবহৃত রঙের ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হয়েছে। তারপরও কয়েকটি চিত্রকলায়, শিরোনাম থাকলে সঠিক ভাবে উল্লেখ করা সম্ভব হতো, যেখানে রংয়ের সুসামঞ্জস্যতা নির্মিত হয়নি। ফলে তা চোখে খুব তৃপ্তি দেয় না। তবে কয়েকটি ছবিকে খুব অসাধারণ মনে হয়েছে। বেহালা বাদনরত বৃদ্ধ, লাঙ্গল কাঁধে কৃষক, মাথায় কাঠের বোঝা নিয়ে দণ্ডায়মান গ্রামীণ রমণী ইত্যাদি ছবিগুলো মনকে টানে। তবে এর মধ্যে অসাধারণ চিত্রকর্মটি হলো, শিশুপুত্র কোলে বসিয়ে হুক্কা পানরত মাঝবয়সী পুরুষ যার পেছনে দণ্ডায়মান তাঁর স্ত্রী। চিত্রের উপরিতলে গড়ন, পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণ ও রঙের ব্যবহার বিশেষ এক মাত্রা দান করেছে। ক্ষুদ্র সংস্করণের চিত্রকর্মেও যে স্পেস ডিভিশনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এই চিত্রকর্মটি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। 

মূল কথা হলো, সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা যাকে তাড়িত করে সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে তিনি তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে যান। তাঁর উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত শিল্পী শশীভূষণ পাল। 

ঢাকা/তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়