ঢাকা     সোমবার   ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ১৯ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

চতুর্থ পর্ব

নেপালের সর্বোচ্চ ট্রেকিং পিক মেরা পর্বতে অভিযান

হোমায়েদ ইসহাক মুন  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:১৭, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৫:২১, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নেপালের সর্বোচ্চ ট্রেকিং পিক মেরা পর্বতে অভিযান

একটু এগুতেই টি হাউজ চোখে পড়লো। আমরা সেখানে গিয়ে বসলাম। ইমতিয়াজ ভাইয়ের অপেক্ষা করছিলাম ৷ শাহনাজ হাত দিয়ে আমাকে দেখালো ঐ দূরে ওদের তিনজনকে দেখা যাচ্ছে। অনেক্ষণ পরে ভাই কাছাকাছি এলে স্পষ্ট দেখলাম, ভাইয়ের পিঠে ব্যাগপ্যাক নেই। পাসাং ভাই ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে আসছে। কাছাকাছি এলে বুঝলাম ঘটনা অন্যরকম। 

ইমতিয়াজ ভাই বরফে পিছলে পড়ে গিয়ে তার ডান হাতের বাহুতে আঘাত পেয়েছেন। শোল্ডারের জয়েন্ট ছুটে গেছে। যখন এই ঘটনা ঘটে তখন পাসাংরা কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। ইমতিয়াজ ভাই বরফে শুয়ে ছিল অনেক্ষণ, ব্যথায় কষ্ট নিয়ে। তাকে ক্রস করে অন্যান্য ট্রেকাররা চলে যাচ্ছিল। ভাই তাদের মধ্যে অনেক জনের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি। এমন অবস্থায় একজন ইউরোপীয় মহিলা এগিয়ে আসেন। ইমতিয়াজ ভাই বরফের স্লোপে শুয়ে পড়েন। উপর থেকে তার হাত তাকে টেনে ধরতে বলেন। সেই মহিলা আর পাসাংরা মিলে ভাইয়ের হাত টেনে কিছুটা জায়গামত আনতে সক্ষম হন। এরপর কোনো রকমে ইমতিয়াজ ভাই হঁটে এ পর্যন্ত এসেছেন। 

আরো পড়ুন:

টি হাউজে আসার পর একজন প্যরামেডিক ছিলেন বিদেশী একটা টিমের সাথে। তার সাথে ফাস্ট এইড বক্স ছিল। পাসাং তাকে অনুরোধ করলো ভাইয়ের হাতটা দেখার জন্য। সে আদৌ প্যারামেডিক কিনা সন্দেহ আছে! ভাইয়ের হাতটা দেখতে দেখতে তার আঙুল দিয়ে হাতের বলটা যতটুকু জায়গামতো ছিলো তা চাপ দিয়ে সরিয়ে দিলো আমাদের সবার সামনেই। সেখানে মুভ স্প্রে করলো। এরপর আস্তে করে উপরের দিকে চলে গেলো। এদিকে ভাই তখন ব্যথায় কোঁকাচ্ছে আর বলছে, ‘আমার হাতের অবস্থা আরো খারাপ করে দিলো। আগেই ঠিক ছিল, আমি হেঁটে  আসতে পারলাম। তোমরা আমার হাত ধরে আবার টানো। বলটা জায়গামত বসাও।'

আমরা সবাই একটু ভড়কে গেলাম। মুভ স্প্রে আমাদের কাছেও ছিল। এই ব্যাটা কি সর্বনাশ করে দিলো। এই দুর্গম জায়গায় এখন কীভাবে রেস্কিউ হবে? ‘খারে’ই কীভাবে তিনি পৌঁছাবেন। ডাক্তার শাহনাজ বুঝতে পারলো হাতের ডানার বলটা বাহুর পেছনের দিকে সরে এসেছে। হাতটা সামনের দিকে টান দিয়ে বলের জায়গায় বসাতে হবে। কিন্তু এর একটা টেকনিক আছে। আমরা তিনজন মিলে টেনেও বলটা জায়গামতো বসাতে পারলাম না। শাহনাজও শক্তি দিয়ে ভাইয়ের হাতের জয়েন্টে কিছু করতে পারলো না। এদিকে সময় চলে যাচ্ছে, দিনের আলো থাকতে থাকতে আমাদের খারে পৌঁছাতে হবে।

পাসাং জানালো খারেতে একটা হসপিটাল আছে এবং ডাক্তারও আছেন। সেখানে পৌঁছাতে পারলে কিছু একটা হবে। এখন টি হাউজে আমাদের সবার রেস্ট করার কথা, কিছু খাওয়ার কথা, সব কিছু বাদ দিয়ে আমরা এখন প্যানিক অবস্থায় আছি। ডান হাত সোজা করে, আমার ঘাড়ে হাত রেখে ইমতিয়াজ ভাই উপরের দিকে রওনা দিতে চাইলেন। জলদি করে নুডলস সুপ এনে ভাইকে কয়েক চামচ খাওয়ানো হলো। চকলেট বার খাওয়ালাম, পানি খাওয়ালাম। তিনি হাত নামাতে পারছেন না। আমরা আর কিছু খেলাম না, যত দ্রুত সম্ভব আমাদের হসপিটাল পৌঁছাতে হবে। এখান থেকে চড়াই প্রায় এক ঘণ্টার পথ। 

আমি ইমতিয়াজ ভাইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিলাম, ভাই আমার ঘাড়ে হাত রাখলো। আমার ব্যাগ পাসাং নিলো ভারী ডাফল ব্যাগের ওপরে। ইমতিয়াজ ভাইয়ের মনোবল দেখে আমরা বেশ অবাক হলাম। আমি জানি তিনি ভেঙে পড়বেন না। এক হাত কাঁধে তুলে, এক পা এক পা করে চলতে শুরু করলাম খুব সাবধানে। বরফ, মাটি, কাদা, হাই অলটিচিউড, ঠান্ডা- সব কিছু ছাপিয়ে এই হাতের যন্ত্রণা নিয়ে একজন মানুষ পাহাড়ের এই উঁচু জায়গায় এগিয়ে যাওয়ার মনোবল রাখে, এটা সত্যিই অনন্য এবং ব্যতিক্রম। অসাধারণ মনোবলের অধিকারী না হলে এমনটা চিন্তা করা কঠিন ব্যাপার। এ জন্যই তিনি একাধিকবার আয়রনম্যান হতে পেরেছেন স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির পরেও। 

আগ-পিছ করে কাঁধে হাত রেখে চলা সত্যি কষ্টকর ব্যাপার। কিছুদূর যাওয়ার পরে ইমতিয়াজ ভাই কীভাবে যেনো হাত একটু বাঁকা করতে পারলো। আমার গলায় জড়ানো বড় রুমালটা তিন কোণা ভাঁজ করে তার গলায় বেঁধে হাত ঝুলিয়ে দিলাম। কোনো ভাবে সে বাম হাত দিয়ে ডান হাত ধরে ব্যালেন্স করে হাঁটতে শুরু করল। এবার আমরাও একটু স্বস্তি পেলাম। তিনি আমাদের আগেই চলতে শুরু করলেন। এ যেন জীবন মরণ যুদ্ধ। নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ। 'ইনটু দ্যা থিন এয়ার'-এর ঘটনা মনে পড়ল। এমন জায়গায় ইনজুরি হলে উদ্ধার করা খুব কঠিন কাজ। এরপর আছে উদ্ধার হেলিকপ্টার তলবে অনেক টাকার ব্যাপার। 

এক ঘণ্টার আগেই আমরা খারেতে লজ দেখতে পেলাম। মনে অন্যরকম এক আনন্দ হলো ৷ আস্তে আস্তে আমাদের অলটিচিউড বাড়ছে। মাথায় টের পাচ্ছি তা। অক্সিজেন লেভেল কমে আসছে। লজে ব্যাগ রেখে ভাইকে নিয়ে আমরা হসপিটালের দিকে রওনা হলাম। এখানে একজন এমবিবিএস ডাক্তার আছেন। সাধারণত এমন হাইঅলটিচুডে এমবিবিএস ডাক্তার থাকেন না। আমরা বলতে গেলে ভাগ্যবান। ইমতিয়াজ ভাইকে ডাক্তার ভালোভাবে পরখ করে হাতে আর্ম স্লিং পরিয়ে দিলো। এরপর ব্যথা নাশক ইনজেকশন পুশ করে দুইজন মিলে ভাইয়ের হাত ধরে টান দিয়ে জায়গা মতো বসিয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত আমরা একটু নিশ্চিত হলাম, এবার আশা করা যায় হাত ঠিকঠাক মতো থাকবে। ডাক্তার সেখানেই কিছুক্ষণ রেস্ট করতে বললেন। পাঁচ দিন মিনিমাম রেস্ট করতে হবে বলে দিলেন। 

দুপুরের খাবার খেতে ভাই আমাদের সবাইকে লজে পাঠিয়ে দিলো। আমাদেরও শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এক ঘণ্টা পরে পাসাংদের পাঠালাম ভাইকে লজে ফেরত আনতে। ভাইকে দেখে আমরা বেশ আনন্দিত হলাম। তারপর ভাই যা বললেন, তার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি বললেন, ‘আমি আস্তে আস্তে সামিটে যাবো, দুইদিন রেস্ট করলেই আমি পারবো।’

এর মধ্যে আমরা কত কিছু ভেবে রেখেছিলাম। ভাইকে ইমারজেন্সি হেলিকপ্টারে পাঠিয়ে দিতে হবে। আমরা সামিট করে ভাইকে তা উৎসর্গ করবো। ইমতিয়াজ ভাই আমাদের সাথে যাবে বলার পর আমরা আবার নতুনভাবে উদ্যমী হলাম। ডাক্তার পেইনকিলার ট্যাবলেট দিয়েছে কিন্তু ব্যথা হয়নি বলে ভাই আর খেলেন না। রাতে জামা পরিয়ে দিলাম, জিনিসপত্র গুছিয়ে দিলাম, বিছানা রেডি করে দিলাম। রাতে ভালো ঘুম হলো, আলহামদুলিল্লাহ।

সকালে দেরি করে উঠলাম। সকাল আটটায় ব্রেকফাস্টের সময় দিয়েছিল। আমরা কয়েকদিন থেকে টুনা স্যান্ডউইচ খাচ্ছি। আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না, সঙ্গে ফ্রাইড এগ। সাড়ে ৯টার দিকে আমি আর শাহনাজ হাইট গেইনের জন্য বের হলাম। খারে টপের দিকে উঠবো। এখন আছি ৪৯০০ মিটারে। ঝকঝকে আকাশ, আজকের আবহাওয়া খুব সুন্দর। মাটি পাথর এবং বরফে পা ফেলে আমরা ৫১২৫ মিটারে পৌঁছে গেলাম। পাসাংসহ আমরা অনেক ছবি তুললাম। উপর থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। আমাদের লজ এবং গ্রামটাকেও খুব ছোট্ট খেলনা ঘরবাড়ি মনে হচ্ছিল। কয়েকটা হেলিকপ্টারও চলে গেলো খারে গ্রাম থেকে। সকাল দিকেই আসে মূলত হেলিকপ্টারগুলো। উপরে আরো কয়েকটা গ্রুপ ছিল, তাদের সাথেও ছবি তুললাম। কিছুক্ষণ থেকে খুব উৎফুল্ল মন নিয়ে নামা শুরু করলাম বরফের মধ্যে দিয়ে। ইমতিয়াজ ভাই নিচে আজ রেস্টে আছেন। নিচে নেমে আমরা সবাই আড্ডায় মশগুল হলাম। 

তাসি গতকাল রাতেই চলে এসেছে ‘কোথে’ থেকে পায়ে হেঁটে। ওদের জন্য এই রাস্তা খুব সহজ ব্যাপার। আর আমাদের লেগে গেল দুই দিন। ইমতিয়াজ ভাইয়ের হাতে ব্যথার ব্যপারটা বাসায় এখনো জানানো হয়নি। খুব সুন্দর করে তিনি সামাল দিচ্ছেন সব কিছু। দুপুরে খাবারের পরে আমাদের ইকুইপমেন্ট চেক হলো। কার কি লাগবে সব দেখে নিলাম। আমাদের লজের নিচেই সব কিছু ভাড়া করার জন্য রাখা আছে। আমি নিলাম স্নোবুট, ক্র‍্যাম্পন, একটা সামিট প্যান্ট। ইমতিয়াজ ভাই মোটামুটি সব নিয়ে এসেছেন, বুট আর ক্র‍্যাম্পন নিলেন। শাহনাজ নিলো ট্রেকিং বুট। মেরা হাই ক্যাম্প পর্যন্ত আগামীকাল বরফের রাস্তায় লম্বা হাঁটা পথ, তারপর রাতেই সামিট পুশ। (চলবে) 

ঢাকা/তারা//

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়