ঢাকা     শনিবার   ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

পঞ্চম পর্ব

নেপালের সর্বোচ্চ ট্রেকিং পিক মেরা পর্বতে অভিযান

হোমায়েদ ইসহাক মুন  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:১৩, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৬:১৫, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নেপালের সর্বোচ্চ ট্রেকিং পিক মেরা পর্বতে অভিযান

সকালে নাস্তা করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যাগে নিয়ে রওনা হলাম। পাসাং আর তাসি আমাদের ক্র‍্যাম্পন পরিয়ে দিল। আমার জুতাটা তুলনামূলক ওজনে হালকা। লা স্পোটিভা ব্র্যান্ডের এই জুতা দেখতেও সুন্দর এবং মজবুত। ইমতিয়াজ ভাইও একই ব্র্যান্ডের সুন্দর একজোড়া জুতা নিলেন। শাহনাজের জুতা পায়ের মাপমত হয় না, তাই তাকে নিতে হলো স্কারপা পুরোনো মডেলের সাদা স্নো বুট। এই জুতা শক্ত এবং ভারী। ওজনে প্রায় ৩ কেজি হবে। এই জুতা পরেই আমি পর্বতারোহণের কোর্স করেছিলাম সিকিমে।

‘খারে’ গ্রাম থেকে বরফের পথ উঁচু হয়ে উঠে গেছে। শুধু চড়াই ভেঙে উপরে উঠে যাওয়া। রাস্তা শেষ হবার কোনো নামই নেই। একটু থামি এইটু হাঁটি। প্রতিটা কদম গুনেগুনে এগিয়ে যাই, আবার থেমে যাই, আবার হাঁটি। হাঁটি-হাঁটি পা-পা করি। রাস্তা সরু হতে থাকে। খুব সাবধানে চলতে হচ্ছে। মেরা বেইজ ক্যাম্পে চলে এলাম ঘণ্টাদুয়েক পরে। এখানে কয়েকটা তাবু আছে, টয়লেট আছে। কিন্তু কেউ থাকে না এখানে। বিশ্রাম নিয়ে হাই ক্যাম্পের দিকে চলে যায়।

আরো পড়ুন:

আমরা বসে পানি, চকলেট, বাদাম খেলাম। এরপর আবার চলা শুরু। শাহনাজ সবার সামনে, আমি মাঝে, ইমতিয়াজ ভাই কচ্ছপের গতিতে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। তার এক হাতে স্লিং পরা, অন্য হাতে একটা ট্রেকিং পোল ধরে ব্যালেন্স করে হাঁটতে হচ্ছে। কিন্তু তিনি ‘স্লোলি বাট স্টেডি’ এই নীতি বরাবর মেনে চলেছেন। সুতরাং খুব ভালোভাবে তিনি এগিয়ে চলেছেন। দুইটা পর্বত অতিক্রম করে একটা খোলা জায়গায় আমরা বসলাম। এখান থেকে এভারেস্টসহ আরো আট হাজারি পর্বতগুলো দেখা যায়। তখন প্রায় ১২টা বেজে গেছে। লাঞ্চের জন্য আমাদের প্যাকেট দেওয়া হয়েছে। একটা স্যান্ডউইচ এবং দুইটা সেদ্ধ ডিম। 

‘খারে’ থেকে উচ্চতা আরো বেড়েছে, দম নিতেও কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। ডিম খেয়ে নিলাম। স্যান্ডউইচ গলা দিয়ে নামছে না। বোতলের পানিও ঠান্ডা হয়ে গেছে। ফ্ল্যাক্স এর পানি কিছুটা গরম আছে, তাই দিয়ে খেতে চেষ্টা করলাম। ইমতিয়াজ ভাই এর মধ্যে রওনা দিয়ে দিয়েছে। শাহনাজ এগিয়ে যাচ্ছে। আমি সবার পেছনে। তাসি আমার সঙ্গে আছে। মনে হচ্ছে যত উপরের দিকে যাচ্ছি শরীরের শক্তি শেষ হয়ে আসছে। খাওয়া ঘুম ঠিকমত হচ্ছে না। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই পথও যেনো শেষ হয় না। খাড়া উপরের দিকে তাকাতে গিয়ে ঘাড় ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। ওদিকে তাসি তাগাদা দিয়েই যাচ্ছে। সকাল ৮টায় হাঁটা শুরু করে এখন ১টা বেজে গেলো, হাই ক্যাম্পে পৌঁছাতে পারলাম না! আরো এক ঘণ্টা উপরে ওঠার পর তাসি দেখালো বড় একটা পাথর দেখা যায়, তার পাশেই হাই ক্যাম্প। 

ইমতিয়াজ ভাই, শাহনাজ এর মধ্যে পৌঁছে গেছে। হাই ক্যাম্পে অনেক তাবু খাটানো আছে। বেশিরভাগ হলুদ রঙয়ের তাবু। সাদা বরফে হলুদ তাবুগুলো জ্বলজ্বল করছিল। দুইটা কিচেন আছে হাই ক্যম্পে। এজেন্সিগুলো সব ব্যবস্থা করে রেখেছে পর্বতারোহীদের জন্য। কিচেনে বসে গরম পানি, চা, ডাল-ভাত খেলাম। আমাদের তাবুতে চলে যেতে হবে, রাত ১টার সময় ওয়েকআপ কল। রাত ২টায় সামিট পুশের জন্য বের হতে হবে। হাই ক্যাম্প থেকে বিকেলের অস্তমিত সূর্যটাকে বেশ মোহনীয় লাগলো। পাহাড়ে সন্ধ্যা নামে খুব দ্রুত। দেখতে দেখতে লাল আভা পাহাড়ের চূড়ায় ঢেকে গেলো। আকাশে জ্বলজ্বল তারা চমকালো। কি পরিষ্কার! আকাশ ভরা তারা। কনকনে ঠান্ডায় তাবুর দরজা আটকাতে হলো। সান্ধ্যকালীন নাস্তা হিসেবে আমাদের তাবুতে এক বাটি গারলিক সুপ এবং পপকর্ন  দিয়ে গেলো পাসাং। খেতে বেশ ভালই লাগলো। গারলিক সুপ এমনিতেও পাহাড়ে খেতে বলে সবাই। শক্তি এবং মুখে রোচে, কিন্তু বিপত্তি হলো এই সুপ আর পপকর্ন শেষ না হতেই রাতের খাবার দিয়ে গেলো। ডাল, ভাত, সবজি।

এই জমে যাওয়া ঠান্ডাতে নিজেরাই ফ্রিজ হচ্ছি, খাবার পাঁচ মিনিটেই ঠান্ডা হয়ে যায়। এতো দূর হেঁটে শরীরের শক্তি সঞ্চয়ের জন্য খাবার এখন জরুরি। জোর করেও খেতে হবে। কিন্তু এখনই দিয়ে গেলো কেনো? সুপ আর পপকর্ন খেলাম মাত্র। ইমতিয়াজ ভাই বলল, খেয়ে নাও।  সামিট পুশে কাজে দেবে। হাইঅল্টিচুডে খাওয়ার রুচি এমনিতেই কমে যায়। তারপরও জোর করেই খেলাম যতটুকু পারলাম। কিন্তু আর পেটে রাখতে পারলাম না। তাবুর দরজা খুলে সব উগড়ে দিলাম।

এরপর স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে একটু ঘুমানোর জন্য যুদ্ধ। মাথা ভনভন পা টনটন, এগুলার মধ্যে পাথরের এমন জায়গায় বিছানা যে, ঠিকমতো শোয়াও যায় না। আমি আর ইমতিয়াজ ভাই পাশাপাশি, তার ডান হাতে ব্যথা। আমি তার ডান দিকে, একটু ঘুম এলে আমি গড়িয়ে তার হাতের কাছেই এসে পড়ি। তিনি একটু ধাক্কা দেয় আমি ধড়ফড়িয়ে উঠি, ভাইয়ের হাতে আবার ব্যথা দিয়ে দিলাম কিনা! সরে যাই আবার গড়িয়ে পড়ি। এভাবে আধো ঘুম আধো জাগরণে সন্ধ্যা থেকে কখন রাত ১টা বেজে গেলো টেরই পেলাম না। এর মধ্যে একবার বাইরে বের হলাম। ওয়েকআপ কলে উঠে সব কিছু গোছালাম। কিচেনে বসে কফি খেলাম, এরপর গরম পরিচ দিলো, একটু চিনি মিশিয়ে এই অখাদ্য খেলাম, তাও বাটির আর্ধেক। সামিটের জামা-কাপড়, হারনেস ক্র্যাম্পন সব পরার পরে পেটে চাপ দিলো। 

এবার আরেক যুদ্ধ কারণ বাথরুম কিছুটা নিচে। এখন গভীর রাতে মাইনাস ডিগ্রিতে, কনকনে ঠান্ডায় আরো কাবু হয়ে যাচ্ছি। ভারি বুট আর ক্র‍্যাম্পন পরে বাথরুম শেষে উপরে উঠে মনে হলো, যেটুকু শক্তি অবশিষ্ট ছিল তাও যেনো নিঃশেষ হয়ে গেল। তাশি আমাদের রোপআপ করে দিলো। আড়াইটার দিকে হাই ক্যাম্প থেকে চলা শুরু করলাম। ক্যাম্প থেকে বের হবার পরেই মনে হলো আমার হাত-পা ঠান্ডায় ফ্রস বাইটের মতো হয়েছে। মাথাটা প্রচন্ড ব্যথা করছে। অক্সিজেন লেভেলও কমে গেলো। হুট করে মাথা চক্কর দিয়ে পড়ে গেলাম। হাইপোথারমিয়ার লক্ষণ মনে হচ্ছে। তাশিও একটু ভয় পেয়ে গেলো। আমাকে নাম জিজ্ঞেস করলো, ঠিক আছি কিনা জিজ্ঞেস করছে। সবই ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারলাম। এদিকে ইমতিয়াজ ভাই ও শাহনাজ এগিয়ে গেছে কিছু দূর। তাশি আমাকে ‘খারে’ নামিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলো। আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম আমি ঠিক আছি। হাই ক্যাম্পে আমি বিশ্রাম নেই, তুমি ওদের নিয়ে সামিট করে এসো। আমার টিম সামিট করলেই আমরা সাকসেসফুল হবো। 

আমাকে তাশি তাবুতে রেখে কিচেনের কুককে জানিয়ে এলো আমার ব্যাপারে। আমি তাবুতে ঢুকে জলদি করে ফ্লাস্কের গরম পানিতে আঙুল চুবালাম। সাথে থাকা ইমারজেন্সি ওয়ারমার প্যাকেট থেকে খুলে হাত মোজার মধ্যে ঢুকালাম। স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। খুব আরাম লাগলো চোখ জোড়া বন্ধ করে। চোখ বন্ধ করেই দেখতে পাচ্ছিলাম সামিটে পথে হেঁটে যাচ্ছি। ইমতিয়াজ ভাই আর শাহনাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো। তাশি শাহনাজের সাথে আর পাসাং ইমতিয়াজ ভাইয়ের সাথে রোপআপ হলো। হাই ক্যাম্প থেকে সামিটের দূরত্ব প্রায় চার ঘণ্টা। শরীরের সব শক্তি দিয়ে তারা সামিট পর্যন্ত পৌঁছে গেলো। ১৯শে নভেম্বর ভোর ৬.১৫ মিনিটে ইমতিয়াজ ভাই আর পাসাং সামিট করেন মেরা পর্বত, এরপর তাশি আর শাহানাজ।

অনেক অনেক অভিনন্দন তোমাদের। আমরা দলগতভাবে সামিট করেছি। পর্বতারোহণের জন্য শুধু সামিট জরুরি না, সুস্থভাবে সবাইকে নিয়ে ফিরে আসাটা জরুরি। পর্বতারোহণের এটাই শিক্ষা। কঠিন অবস্থায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারাও অনেক বড় ব্যাপার। সামিট টিম নেমে এলে আমার সিদ্ধান্তের জন্য তারা সাধুবাদ জানায় ৷ আমি ঘুম ভাঙার পরে সুন্দর একটা সকাল দেখলাম। সুসংবাদ শোনার অপেক্ষা করছিলাম। প্রায় সাড়ে ৯টায় সবাই ফিরে এলো সামিট থেকে। খুব আনন্দ হলো তাদের দেখে। কনগ্রাচুলেশন জানালাম। সবাই বিদ্ধস্ত, ক্লান্ত-শ্রান্ত। খাওয়া-দাওয়া করে রেস্ট নিয়ে আমরা ‘খারে’র পথে আবার ফিরতি যাত্রা শুরু করলাম। 

দুপুরের মধ্যে আমরা ‘খারে’ পৌঁছে গেলাম। ভরপেট খাওয়া-দাওয়া হলো। রাতে সবাইকে সামিটের খবর জানিয়ে দিলো ইমতিয়াজ ভাই। পরদিন সকালে আমাদের জন্য হেলিকপ্টার আসবে। বাকেটলিস্টের এই অভিজ্ঞতাতেও একটা টিক চিহ্ন পড়তে যাচ্ছে। কিছুটা আনন্দ আর বিরহে ‘খারে’তে শেষ রাতটা কাটালাম। লুকলা হেঁটে গেলে আমাদের চারদিন লেগে যেতো। এর মধ্যে জাত্রালা পাস পার হবার কথা মনে পড়লেই মন কেমন কেমন করে উঠে। সকালে নাস্তা করে ব্যাগপত্তর নিয়ে হেলিকপ্টারের অপেক্ষায় বসে রইলাম। একটু দেরি করেই এলো হেলি। দরজার পাশেই বসার সুযোগ পেলাম। মনে হলো খেলনা কিছুতে চড়ে বসেছি। পাইলট সাহেবও চুইংগাম চিবুতে চিবুতে খেলনা হেলিকপ্টার চালাচ্ছেন। ‘খারে’ গ্রাম চোখের আড়াল হলেই পাহাড়ের গা বেয়ে এমনভাবে বাঁক নিলো, মনে হলো এখনই পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খাবে। কয়েকটা পাহাড়ের বাঁক পার হয়েই লুকলার ঘর-বাড়ি দৃশ্যমান হলো। মাত্র সাত মিনিটে চার দিনের রাস্তা পার করেছি, ভাবতেই অবাক লাগে। যদিও তার জন্য গুনতে হয়েছে বড় অঙ্কের ডলার। নিরাপদে হেলিকপ্টার ল্যন্ড করলো লুকলা এয়ারপোর্টে। 

এরপর ইমতিয়াজ ভাইয়ের কাঠমান্ডুর ফ্লাইট টিকিটের সময় এগিয়ে আনা হলো। আমি আর শাহনাজ লুকলা থেকে যথারীতি জীপে করে কাঠমান্ডুতে ফেরত এলাম। পর্বত অভিযানের যাত্রা শেষ হলো। তবে সারা জীবনের জন্য একটা অনন্য গল্প তৈরি হলো। আমাদের তিন জনের জন্যই এই যাত্রাপথ অনবদ্য আর চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। (শেষ)

ঢাকা/তারা//

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়