ঢাকা     শুক্রবার   ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ১৬ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

তৃতীয় পর্ব  

নেপালের সর্বোচ্চ ট্রেকিং পিক মেরা পর্বতে অভিযান

হোমায়েদ ইসহাক মুন  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৫৩, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬  
নেপালের সর্বোচ্চ ট্রেকিং পিক মেরা পর্বতে অভিযান

পর্বতে রাতগুলো ভয়ঙ্কর, প্রায় নির্ঘুম, কনকনে ঠান্ডা, অস্থিরতা। স্লিপিং ব্যাগের ভেতর মোবাইল, পানির বোতল, ক্যমেরা জমে যাবার ভয়ে আরো কত কি রাখতে হয়। শরীরের উঞ্চতায় কিছুটা যেনো স্বাভাবিক তাপমাত্রায় থাকে সে কারণে এই সতর্কতা। শরীরে পানিশূন্যতা যেন না হয় তাই বেশি বেশি পানি এবং সুপ খেতে হয় পর্বতে।

সারাদিন এতো চড়াইউৎরাই করে শরীর ক্লান্ত থাকে। রাতে এক লিটার পানি পান করে রাত পার করেছি। স্লিপিং ব্যাগে যেই না শরীর গরম হয় তখনই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হয় ৷ স্লিপিং ব্যাগ থেকে বের হও, গরম টুপি পরো, জ্যাকেট পরো,  এরপর রুম থেকে বের হও। 

আরো পড়ুন:

গরম জামাকাপড় পরে স্লিপিং ব্যাগে বেশিক্ষণ থাকাও যায় না। হাস-ফাশ করতে থাকে, একবার এপাশ আবার অন্যপাশ। কখনো ক্লান্ত শরীর ঝিমিয়ে পড়ে আবার হঠাৎ জেগে ওঠে। যত উচ্চতা বাড়ে তত মাথা ভনভন করে। ইমতিয়াজ ভাই আর শাহনাজ কি সুন্দর ঘুমাচ্ছে! আর আমি রাত জেগে কত কিছু ভাবছি। লুকলা ছাড়ার পর নেটওয়ার্ক বিছিন্ন। ইন্টারনেট ১৫ ঘণ্টায় ১৫০০ রুপি। সোশ্যাল মিডিয়া টক্সিসিটি মুক্ত বলা যায় এখন। ফোনে ছবি তুলছি, রাতে ডায়েরি লিখেছি, গল্প করছি নানা দেশের মানুষের সাথে। পর্বতে এবারই এতো আরাম আয়েশ করে ব্রেকফাস্ট-লাঞ্চ-ডিনার করছি ৷ পিজ্জা, স্যান্ডউইচ, স্পেগেটি, একেকদিন একেক জিনিস অর্ডার করছি। সবসময় যে খাবার খুব সুস্বাদু তাও না। আবার কোথাও পথের মাঝখানে একটাই মাত্র টি-হাট, এক বয়স্ক মহিলা একা কি সুন্দর করে ফ্রাইড রাইস বানিয়ে দিলো! খেয়ে দিব্যি নিচে নেমে গেলাম সন্ধ্যা পর্যন্ত। আজকে আমাদের অনেক লম্বা পথ হাঁটতে হয়েছে। পথে যে হাঁটে সে বুঝতে পারে পথের ব্যথা।

সকালে নাস্তা করে ৮টার মধ্যে রওনা হলাম। গল্প করতে করতে আজকের কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে দিলাম। আজ শরীর ঠিকঠাক আছে। লজে বসে চিমনির গরম তাপে, শরীর গরম করতে করতে লিখছি। ৪৬১০ মিটার জাতরালা পাস উঠে এরপর নিচে থুলিখাড়কা পর্যন্ত এলাম। এই পাস পার করতে আমাদের সবারই বেশ কষ্ট হয়েছে। পাসে যাবার আগে মাইক্রোস্পাইকস বা রাবার লাগানো ক্র‍্যাম্পন পরে নিতে হয়েছে। মাঝখানে একটা লজে এগ অ্যান্ড ভেজিটেবল দিয়ে ফ্রাইড রাইস খেয়েছিলাম। স্বাদ হয়েছিল এবং এনার্জিও পেয়েছিলাম বেশ। একটানে থুলিখাড়কা নেমে এলাম। রাস্তা খাড়া নিচের দিকে নেমে গেছে। এর মধ্যে একজনকে দেখলাম ট্রেইল রানিং করে সাইসাই করে নিচের দিকে নেমে গেলো। পথ এখনো অনেক বাকি, সাথে অনেক গল্প।

আজকের পথ বেশ লম্বা, তবে দারুণ সুন্দর! তেমন ওঠানামাও করতে হয়নি। গ্লেসিয়ার গলা জলের ধারা পাশ কাটিয়ে সারা পথ হেঁটেছি। পাথরের বড় বড় বোল্ডার তার মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ চলে গিয়েছে। উপর থেকে গাছ বা মাটি আলগা হয়ে পাথর গড়িয়ে পড়ছিল। কিছু জায়গায় দ্রুত পার হয়েছি, কিছুটা আতঙ্কও কাজ করেছিল। একবার মাথার উপর পাথর গড়িয়ে পড়লে রক্ষে নেই। আজকে দুপুরেও এক জায়গায় থেমেছিলাম। আবারও ফ্রাইড রাইস অর্ডার করলাম। তবে গতকালের মতো মজা হলো না। কি আর করা, পর্বতে নাক মুখ বন্ধ করে খেয়ে ফেলতে হয়। উচ্চতার কারণে রুচি চলে যায়। কিছু খেতে ভালো লাগে না। এজন্য আমরা মেনু দেখে যখন যা মন চায় অর্ডার করেছি। সাথে গারলিক সুপ, মাশরুম সুপ, জিনজার হানি লেমন টি। 

আজকের আকাশ ছিলো ঝকঝকে তকতকে। তবে মাথায় ভনভন, ঠাণ্ডায় হাত-পা শিনশিন আর ব্যথায় পা টনটন করছে। এত লম্বা পথ যে ‘খারে’ পৌঁছাতেই আমাদের কাঠমান্ডু থেকে নয়দিন লেগে যাচ্ছে। থাংনাগে আমরা কালকের দিন রেস্ট করবো। লজ থেকে পর্বতগুলো এতো দারুণ দেখা যাচ্ছে! গোধূলি লগ্নে পর্বতের চূড়ায় রক্তিম যে মায়াবি আলোছায়ার খেলা হয়, তা দেখে জীবনের পূর্ণতা নিয়ে ঘুমাতে যাওয়ার পরম শান্তি হয়ত হিমালয় ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যাবে না।

ইন্টারনেট নেই, প্রিয়জনরা কাছে নেই তবুও এই হিমালয়ের প্রেম যেন সব কিছু ছাপিয়ে যায়। অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে যেন বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া যাবে। হিমালয়ের পরিষ্কার আকাশে অগুনতি তারা দেখে ঘুমাতে গেলাম। 

আজকের সকাল ভারী সুন্দর। আজ আমাদের বিশ্রামের দিন। আমাদের আইটিনারিতে এমনটা ছিল না। গতকাল আসার পথে তাশির সাথে দেখা হলো, সে আমাদের আজ থাংনাগ থাকতে বলে দিলো। মেরা গ্রামেও আমরা দুইদিন থাকবো। সকালে দেরিতে ঘুম থেকে উঠলাম। তখনো রোদের আলো এসে পৌঁছায়নি ‘অক্সিজেন’ লজে ৷ রাতে মাইনাস ৫ তাপমাত্রা ছিল, ধীরে ধীরে আরো কমেছে। এখনো ঠান্ডায় সব জমে যাচ্ছে। নাস্তা করে রোদ পোহাতে সবাই মিলে একটু উপরের দিকে হেঁটে গেলাম। চারপাশে সুউচ্চ পর্বতমালা, মাঝখানে বেসিনের মতো থাংনাগ গ্রাম। আমি শাহনাজ আর ইমতিয়াজ ভাই মাটির উপর বসে ব্রিদিং এক্সারসাইজ করলাম, আড্ডা দিলাম, ছবি তুললাম। তিনজনে মিলে বেশ ভালো সময় কেটে যাচ্ছে আমাদের। একসাথে পথ চলা, থাকা-খাওয়া। এখানে তেমন কিছু করারও নেই। সারাদিন হাঁটা, খাওয়া-দাওয়া আর ঘুম, সঙ্গে সামিটের অপেক্ষা, জল্পনা-কল্পনা। সামিটের আগে পরে কত ভাবনা। 

প্রায় ছয় মাস আগে থেকে আমি আর ইমতিয়াজ ভাই মেরা পর্বতের পরিকল্পনা শুরু করি। কালকে তাশি আমাদের সাথে যুক্ত হবে। ক্লায়েন্টসহ তাশি ‘কোথে’ গ্রামে নেমে গেছে। আজ সকালে নর্থএন্ড এর কফি বানালাম, সাথে ছিল বাদাম, আপেল। দুপুরে ইমতিয়াজ ভাইয়ের পছন্দে পিজ্জা অর্ডার করা হলো। লজের ডায়নিংয়ে চিমনির পাশে বসে পড়লাম। বেশ সরগরম জায়গাটা।। কত দেশের মানুষ এখানে। কেউ কাল খারের দিকে যাবে কিংবা কোথের দিকে। কাল প্রায় ৫-৬ ঘণ্টার পথ হাঁটতে হবে। একবারে ৫০০০ মিটার উঠে যাব। গোধূলী বেলায় রক্তিম আভা, পাহাড়ের চূড়া আরো দ্বিগুণ সুন্দর বানিয়ে আমাদের উপহার দিয়েছে। হাত-পা কাঁপতে কাঁপতে ছবি তুললাম। আমার কাছে এই যাত্রাটাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সামিট হলো বোনাস। পর্বতের কাছে এতদিন পরে আসতে পেরেছি এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কি হতে পারে! 

বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ অনেক কম, তারপরও এখন পর্যন্ত তেমন অসুবিধা হয়নি। জাতরালা পাস পার করার সময় বেশ মাথা ব্যথা হয়েছিল। ওয়েদার এখনো বেশ ভালো বলা চলে।

আজ হাঁটা শুরু করলাম সকাল ৮টায়। খারের পথ ধরলাম। হাঁটা শুরু হলে পাথুরে পথ পার হয়ে বরফের পথ শুরু হলো। প্রত্যেকের কাছে রাবারের ক্র‍্যাম্পন আছে। শক্ত বরফ শুরু হলে যার যার সুবিধামত জুতায় লাগিয়ে নেব। কিছু দূর ওঠার পর নদীর পথ শুরু হলো। মেরা পর্বত সামিট করে বেশিরভাগ পর্বতারোহীরা ফিরছেন। বেশ সরু পথ। চারদিকে সাদা ধবধবে। জলের ধারার কুলকুল ধ্বনি। শুভ্রতা আমাদের মোহিত করছে। ইমতিয়াজ ভাইয়ের সাথে প্রথমে আমি ছিলাম। পরে ক্ষানিকটা এগিয়ে গেলাম। শাহনাজ সামনে চলতে চলতে চোখের সীমানা ছাড়িয়ে গেলো। ওর গতি আমাদের সবার থেকে ভালো। বরাবর আমাদের আগেই থাকে। ব্যাগের পেছনে বাংলাদেশের পতাকা ঝুলিয়েছে, দূর থেকে দেখলে ঠাওর করা যায়। বাহারি রঙ্গের জ্যাকেট পরে পর্বতারোহীরা আমাদের অতিক্রম করে যাচ্ছে। আমি আরো এগিয়ে গেলাম। ইমতিয়াজ ভাইয়ের সাথে গাইড ও পোর্টার দুজনই আছে। 

শাহনাজ আমার থেকে আরো দূরে। আমি বরফ মাড়িয়ে খুব সহজেই এগিয়ে যাচ্ছি। একবার ভেবেও পায়ে আর ক্র‍্যাম্পন পরলাম না। বরফের সাথে মাটি আর জুনিপার গুল্মলতা আছে। নিচের দিকে অরো অনেক অজানা গুল্মের দেখা পেয়েছিলাম। বেশ কিছু দূর গিয়ে শাহনাজের দেখা পেলাম। আমরা ছবি তুললাম, কোক, পিনাট বার খেলাম। ফিরতি আসা ট্রেকারদের জিজ্ঞেস করলাম খারে কতদূর? সবাই জানালো, মাত্র দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে যাব। আমরা বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম ৷ ইমতিয়াজ ভাই বেশ দূরেই মনে হলো। এখনো যেহেতু আসছে না আমরা অপেক্ষা না করে সামনের দিকে রওনা হলাম। (চলবে) 

ঢাকা/লিপি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়