Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ২১ জুন ২০২১ ||  আষাঢ় ৯ ১৪২৮ ||  ০৯ জিলক্বদ ১৪৪২

কারাগারে বসেই স্বাধীন বাংলার পরিকল্পনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:২৪, ১৭ মার্চ ২০২১  
কারাগারে বসেই স্বাধীন বাংলার পরিকল্পনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ঠিক তখন ১টা ৩০ মিনিট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে সামরিক জিপে তুলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। সেই রাতে তাকে আটক রাখা হয় তৎকালীন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল, বর্তমান শহীদ আনোয়ার উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে। পরদিন তাকে নেওয়া হয় ফ্ল্যাগস্টাফ হাউসে, সেখান থেকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে বিমানে করাচি নেওয়া হয়।

করাচি থেকে কালবিলম্ব না করে কঠোর গোপনীয়তায় বঙ্গবন্ধুকে নেওয়া হয় লাহোরের ৮০ মাইল দূরের লায়ালপুর শহরের কারাগারে। একাধিক কেন্দ্রীয় কারাগার থাকা সত্ত্বেও শেখ মুজিবকে দূরবর্তী জেলা শহরের কারাগারে আটক করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তাকে মানসিকভাবে পিষ্ট করা। সেদিক দিয়ে লায়ালপুর, বর্তমান ফয়সলাবাদ, যোগ্য স্থানই বটে; কেননা লায়ালপুর পাকিস্তানের উষ্ণতম স্থান, গ্রীষ্মে এখানে তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ছাপিয়ে যায়, বন্দিদের জীবন হয়ে ওঠে দূর্বিষহ।তদুপরি বঙ্গবন্ধুকে আটক রাখা হয়েছিল নিঃসঙ্গ সেলে, গরমে তেতে ওঠা সেই কারাকক্ষে কোনো পাখাও ছিল না। আর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলার পরিকল্পনা করেছিলেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাত দিন কারা ভোগ করেন। বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তিনি কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে।

জাতির পিতার জীবনে কারাবাসের স্মৃতিচারণ করে তারই ঘনিষ্ঠসহচর বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলার পরিকল্পনা করেছিলেন।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু তার জীবনের ১৪টি বছর কারাগারে ছিলেন। তিনি ১৯৩৮ সালে প্রথম কারাগারে যান। এরপর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি পাঁচ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর আটক হয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন কারাভোগ করে মুক্তি পান ২৮ জুন। ওই দফায় তিনি ২৭ দিন কারাভোগ করেন। একই বছরের ১৯৪৯ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন এবং ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭ দিন কারাগারে ছিলেন।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে জানিয়ে তোফায়েল আহমেদ বলেন, সে সময়ে বঙ্গবন্ধু ২০৬ দিন কারা ভোগ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির পর বঙ্গবন্ধু ১১ অক্টোবর গ্রেপ্তার হন। এ সময়ে টানা ১ হাজার ১৫৩ দিন তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। এরপর ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি আবারও গ্রেপ্তার হয়ে মুক্তি পান ওই বছরের ১৮ জুন। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন। এরপর ’৬৪ ও ’৬৫ সালে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। ছয় দফা দেওয়ার পর জাতির পিতা যেখানে সমাবেশ করতে গেছেন, সেখানেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। ওই সময়ে তিনি ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ৬৬ সালের ৮ মে আবারও গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। এ সময় তিনি ১ হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে। এ দফায় তিনি কারাগারে ছিলেন ২৮৮ দিন।

পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে কমান্ডো স্টাইলে গ্রেপ্তার করে লায়ালপুরের মিয়ানওয়ালী কারাগারে নেয়ার পর একটি অতি ক্ষুদ্র সেলে রাখা হয়। যেখানে লোহার শিক দ্বারা বেষ্টিত ছোট্ট ফাঁকা জায়গা থেকে এই বিশ্বজগৎ প্রায় আবছা; প্রচণ্ড গরম অথচ কোনো বৈদ্যুতিক পাখা ছিল না। পরবর্তী সময়ে একটি পুরনো বৈদ্যুতিক পাখা লাগানো হল- যা মূলত ঘরের গরমকে আরও ছড়িয়ে দেবার জন্যই। এছাড়াও আরও নানা রকমের অত্যাচার ছিল সেখানে। পর্বতমালায় ঘেরা মিয়ানওয়ালী কারাগার। সেখানে প্রায়ই শিলাবৃষ্টি নেমে আসত। ধূসর মেঘগুলো পাহাড়ের গায়ে মিশে থাকত। ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে পাতলা বিবর্ণ একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে বন্দি বঙ্গবন্ধুর দিন কাটত। একদিন প্রচণ্ড বেগে নেমে এলো ঝড়। সঙ্গে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত। আকাশজুড়ে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। বৃষ্টির জল বাতাসে ধাক্কা খেয়ে জানালা দিয়ে আছড়ে পড়ছিল। কনকনে ঠাণ্ডা প্রতিরোধে একটা কম্বল মোটেই সহায়ক ছিল না। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা কাঁটার মতো বঙ্গবন্ধুর মুখে বিঁধতে লাগল। পরের দিন দুপুরবেলা বঙ্গবন্ধু হঠাৎ বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেলেন তার সেলের দশ গজ সামনে কাঁটাতারের বেড়া ঘেঁষে কয়েকজন কয়েদি একটি বড় গর্ত খুঁড়ছে। বঙ্গবন্ধু কিছুটা অবাক হলেন। কাছে এসে ভালো করে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, কবর খোঁড়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর বুঝতে অসুবিধা হল না, ওটা তার জন্যই তৈরি করা হচ্ছে; সম্ভবত দু-একদিনের মধ্যেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে চলেছে।

পাকিস্তানে নেওয়ার পর কোথায় বঙ্গবন্ধুকে আটক রাখা হয়েছে, তাকে নিয়ে কী করা হবে, এসব বিষয়ে পাকিস্তান সরকার সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করে। বঙ্গবন্ধুকে বাংলার মাটি থেকে হাজার মাইল দূরের কারাকুঠরিতে বন্দী করে বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনকে নাবিকবিহীন হালভাঙা নৌকায় পরিণত করতে চেয়েছিল পাকিস্তানিরা। কিন্তু লাখ মানুষের অন্তরে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি প্রথম মুহূর্ত থেকেই হয়ে উঠেছিল বিপুল বরং বাঙালিরা প্রতিজ্ঞা করে তারা শেখ মুজিবকে মুক্ত করবে, বাংলাদেশ স্বাধীন করবে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করার পর পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সামরিক অভিযানের সাফাই গেয়ে জানালেন, ‘তিনি (শেখ মুজিব) এ-দেশের ঐক্য ও সংহতির ওপর আঘাত হেনেছেন—এই অপরাধের শাস্তি তাঁকে পেতেই হবে। ১২ কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে ক্ষমতালোলুপ দেশপ্রেমবর্জিত কতক মানুষ, সেটা আমরা হতে দিতে পারি না। আমি সেনাবাহিনীকে আদেশ দিয়েছি তাদের কর্তব্য পালন এবং পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য। আর রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো।’

পাকিস্তানি কারাগারে বঙ্গবন্ধুর আটক থাকার প্রথম স্বীকৃতি মেলে ১৯ জুলাই ফিন্যান্সিয়াল টাইমস–এ প্রকাশিত ছোট্ট খবরে। এরপর ৮ আগস্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান সানডে টাইমসকে জানান যে, পশ্চিম পাকিস্তানের সর্বোচ্চ শ্রেণির কারাগারে আটক শেখ মুজিব জীবিত ও সুস্থ আছেন। ধৃষ্টতাপূর্ণভাবে জেনারেল ইয়াহিয়া আরও বলেন যে আজকের পর শেখ মুজিবের জীবনে কী হবে, সে বিষয়ে তিনি ওয়াদা করে কিছু বলতে পারেন না।

ইয়াহিয়া খান আরও বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানি খাবারের কারণে শেখ মুজিবের স্বাস্থ্য সাময়িকভাবে খারাপ হয়েছিল, তবে এখন তাঁকে বাঙালি খাবার দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁর ওজন আবার বেড়েছে। তিনি হররোজ গালগপ্পো করেন, কথার তুবড়ি ছোটান। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আরও জানান, ‘বিছানা, পাখা ও গরম পানির ব্যবস্থাসমেত ছোট ঘর তাঁর রয়েছে। দেখাশোনার জন্য একজন ডাক্তারও রয়েছে।’

কয়েক দিন আগে ১ আগস্ট পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্রদেশ ইরানের কায়হান ইন্টারন্যাশনাল পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন নিয়ে বড় আকারে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ইরানি সংবাদদাতা আমির তাহিরি রাওয়ালপিন্ডির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর ঢাকা সফরের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। রিপোর্টে বিচার যে অত্যাসন্ন, সেই ইঙ্গিত দিয়ে বলা হয়, ‘আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশদ্রোহের অভিযোগে শেখ মুজিবের বিচার শুরু হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এতে সর্বোচ্চ শাস্তি ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড।

আমির তাহিরির রিপোর্টে আরও বলা হয়, ‘গুজব রয়েছে যে তিনি “উন্মাদ” হয়ে গেছেন এবং দিনে কয়েক ঘণ্টা ধরে অবোধ্য “ভাষণ” দিয়ে চলেন। তবে আমাদের কাছে প্রত্যক্ষ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য রয়েছে যে এটা সত্য নয়। আওয়ামী লীগ নেতা সুস্থ আছেন এবং তাঁর ওপর অত্যাচার করা হয়নি।

আসল কথা হলো-ইয়াহিয়া খানের বক্তব্য এবং আমির তাহিরির রিপোর্ট, উভয়ের মধ্যে সাযুজ্য রয়েছে। তাঁরা উভয়ে প্রত্যাশা করছিলেন শেখ মুজিব যেন পাগল হয়ে যান। কারাগারের বিরূপ পরিবেশ, দুঃসহ গরম ও সর্বোপরি নির্জন কারাবাস কারও মনোবল গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু বঙ্গবন্ধু সবকিছুই মোকাবিলা করলেন মনের অপরিসীম জোর এবং আপন ভাগ্য বিষয়ে নিস্পৃহতা নিয়ে। নির্জন কারাবাসের অভিজ্ঞতা বঙ্গবন্ধুর আগেও হয়েছিল। তবে তখন পূর্ব পাকিস্তানের কারাগারে নির্জন কারাবন্দীর পত্রিকা পাওয়া কিংবা মাসে এক-দুবার আত্মীয়-পরিজনের সাক্ষাৎ পাওয়ার সুযোগ ছিল। সেই সময়ের কষ্টকর অভিজ্ঞতার সামান্য ছায়াপাত মেলে বঙ্গবন্ধুর কারাগারে লেখা ডায়েরিতে, কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে তিনি লিখেছিলেন, ‘লেখাপড়া করতে ইচ্ছা হয় না। সময়ও কাটে না, জেলে রাতটাই বেশি কষ্টের। আবার যারা আমার মতো একাকী নির্জন স্থানে থাকতে বাধ্য হয়—যাকে ইংরেজিতে বলে সলিটারি কনফাইনমেন্ট—তাদের অবস্থা কল্পনা করা যায় না।

১৯ জুলাই যে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ সামরিক আদালতে বঙ্গবন্ধুর আসন্ন বিচারের বার্তা প্রকাশ করল, তার নেপথ্যে ছিল একটি বড় আন্তর্জাতিক ঘটনা। ৬-৮ জুলাই মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার নয়াদিল্লি সফর করেন। এরপর পাকিস্তানে এসে অসুস্থতার ভণিতা করে পাকিস্তানি জেনারেলের দূতিয়ালিতে অত্যন্ত গোপনে হেনরি কিসিঞ্জার চীনে যান এবং মাও সে তুংয়ের সঙ্গে দেখা ও সলা-পরামর্শ করেন। চীন-মার্কিন ঐতিহাসিক আঁতাত নির্মাণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছিল মার্কিন প্রশাসন। পাকিস্তান-মার্কিন কূটনীতির বিপুল এই সাফল্য ইয়াহিয়া খানকে শেখ মুজিবের বিচারের প্রহসন ঘটাতে সবুজ সংকেত দিয়েছিল। ১৭ জুলাই মার্কিন প্রশাসন হেনরি কিসিঞ্জারের গোপন চীন সফরের বিবরণ প্রকাশ করে। এর দুই দিন পরই ইয়াহিয়া খান বার্তা দেন বঙ্গবন্ধুর বিচার অনুষ্ঠানের।

গোড়াতে সরকারের দিক থেকে প্রবীণ আইনজীবী এ কে ব্রোহিকে অভিযুক্তের পক্ষে মামলা পরিচালনায় নিয়োগ দেওয়া হয়। আদালতের কার্যক্রমের শুরুতে ১২ দফা অভিযোগনামা পড়ে শোনানো হয়। এর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রদ্রোহ, সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ইত্যাদি বিভিন্ন অভিযোগ। ছয়টি অপরাধের জন্য শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। আদালতে ইয়াহিয়া খানের ২৬ মার্চ প্রদত্ত ভাষণের টেপ বাজিয়ে শোনানো হয়। সেই বক্তব্য শোনার পর বঙ্গবন্ধু আদালতের কোনো কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এবং তাঁর পক্ষে কৌঁসুলি নিয়োগে অস্বীকৃতি জানান।

সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি (বঙ্গবন্ধু) বলেছিলেন, ‘সরকারের তরফ থেকে গোড়ায় এক উকিল দিয়েছিল। কিন্তু আমি যখন দেখলাম, অবস্থাটা এমন যে, যুক্তির কোনো দাম নেই, দেখলাম এ-হচ্ছে বিচারের এক প্রহসন মাত্র। তখন আমি কোর্টে নিজে দাঁড়িয়ে বললাম: জনাব বিচারপতি, দয়া করে আমাকে সমর্থনকারী উকিল সাহেবদের যেতে বলুন। আপনারা বিলক্ষণ জানেন, এ-হচ্ছে এক গোপন বিচার। আমি বেসামরিক লোক। আমি সামরিক লোক নই। আর এরা করছে আমার কোর্ট মার্শাল। ইয়াহিয়া খান কেবল যে প্রেসিডেন্ট তাই নয়, তিনি প্রধান সামরিক শাসকও। এ-বিচারের রায় অনুমোদনের কর্তা তিনি। এই আদালত গঠন করেছেন তিনি।’

গোটা বিচারকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কার্যত আদালতের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসে ছিলেন। আদালত কক্ষে যা কিছু ঘটেছে, তা তিনি নিস্পৃহতা দিয়ে বরণ করেছিলেন, বিচারপ্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থন তো দূরের কথা, কোনো কার্যক্রমেই অংশ নেননি। এ ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রতিবাদী প্রত্যাখ্যানের লড়াইয়ের আরেক প্রকাশ।

৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের কতক সামরিক বিমানঘাঁটি আক্রমণ করলে শুরু হয় সর্বাত্মক যুদ্ধ। পরদিন ৪ ডিসেম্বর সামরিক আদালত বিচারের রায় ঘোষণা করে, মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। আদালতের কার্যক্রম শেষে তাঁকে নেওয়া হয় মিয়ানওয়ালি জেলে। সেখানে দণ্ডাদেশ কার্যকর করার ব্যবস্থা নেওয়া হতে থাকে। যে সেলে তিনি ছিলেন, তার পাশে কবরও খোঁড়া হয়, তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ করে।

বঙ্গবন্ধু যখন মিয়ানওয়ালী কারাগারের ক্ষুদ্র কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন; তিনি জানতেন না- তার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে; বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তিনি শুধু জানতেন, মৃত্যু দুয়ারে করাঘাত করছে। সময়ের চাকা ঘুরে ঘুরতে সেদিন ২৬ ডিসেম্বর। গভীর রাত। প্রচণ্ড শীত। একটি মাত্র কম্বলে শীতে বঙ্গবন্ধু ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলেন। হঠাৎ কানে এলো একটা চলন্ত গাড়ির আওয়াজ।

জানালা দিয়ে তাকাতেই লক্ষ করলেন- একটা ট্রাক আসছে ধীরে ধীরে। ট্রাকটা সেলের সঙ্গে লাগোয়া গার্ড হাউসের সামনে এসে দাঁড়াল। বাইরে ছুটোছুটি, হাঁকডাক ও ফিসফিসানির শব্দ। হঠাৎ ঝন ঝন করে লৌহকপাট খুলে গেল। চারজন সৈন্য ভেতরে ঢুকে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে দাঁড়াল।

সামনে এসে দাঁড়ালেন বেঁটে-খাটো শ্মশ্রুমণ্ডিত জেল গভর্নর হাবিব আলী। মাথায় মিলিটারি ক্যাপ; গায়ে রেইনকোট জড়ানো। হাবিব আলী পরিচিত কর্কশ স্বরে বললেন, আপনি আমাকে বিশ্বাস করুন; আমি আপনাকে একটা নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে এসেছি...

চলতে চলতে বঙ্গবন্ধু ভাবলেন- ওরা তাহলে এখনই আমাকে এই অন্ধকারের মধ্যে গুলি করে মেরে ফেলবে! কিন্তু এতসবের কী প্রয়োজন ছিল! সেলের সামনের গর্তের পাশে নিয়েও তো গোপনে মেরে ফেলতে পারত। এত দূরে নিয়ে এলো কেন? কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধু দেখলেন- পাহাড়ের গা ঘেঁষেই সুন্দর নিম্নভূমি; সেখানে সুরম্য বাংলোর সামনে সাজানো বাগান। বাগানের পিচঢালা পথ ধরে তার দিকে একজন চেনা মানুষ এগিয়ে আসছেন। তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টো।

৮ জানুয়ারি, ১৯৭২। রাওয়ালপিণ্ডি বিমানবন্দর। সময় রাত এগারোটা। এয়ারপোর্ট তখন ব্ল্যাক আউট। থমথমে ভাব। পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমান রানওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে। পাইলট, স্টুয়ার্ড, এয়ারহোস্টেস যার যার জায়গায় অন্ধকারে বসে আছে। গোপনীয়তা রক্ষার তাগিদ আসছে ঘন ঘন।

সৈন্যরা যার যার সীমানায় টহল দিচ্ছে। রাত ২টায় রানওয়েতে অপেক্ষমাণ একমাত্র বিমানযাত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ রাতেই তাকে নিয়ে বিশেষ এই বিমানটি উড়ে যাবে। আর সেইসঙ্গে পরিসমাপ্তি ঘটবে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ জীবনব্যাপী নিঃসঙ্গ, একাকী, দুঃসহ কারাজীবনের।

৯ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী পাকিস্তানের বিমানটি কুয়াশাসিক্ত শীতার্ত ভোরে হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর পুলিশ প্রহরায় একটা রোলসরয়েস গাড়ি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেল ক্লারিজ হোটেলে। প্রবাসীদের মুখেই বঙ্গবন্ধু প্রথম শুনতে পেলেন, স্বদেশে পাকিস্তান বাহিনীর নিষ্ঠুর গণহত্যার সংবাদ।

খুন, ধর্ষণ, আগুনের বিভীষিকাময় ছবি; রক্তে রক্তে নদী বয়ে যাওয়ার কাহিনী। এসব শুনে দু’হাতে মুখ ঢেকে বঙ্গবন্ধু শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। কান্নাজড়িত গলায় বারবার কেবল একটা কথাই বলছিলেন- আহ! আমার দুঃখিনী বাংলা মা।

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। বেলা ১টা ৪১ মিনিটে জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার স্বপ্নের মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে বিজয়ীর বেশে এলেন ইতিহাসের মহানায়ক, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিকাল ৫টায় তিনি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে ভাষণ দেন।

সশ্রদ্ধচিত্তে বঙ্গবন্ধু সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন, সবাইকে দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। রাজনীতির এই ধ্রপদী কবি বলেন- যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালোবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালোবাসি; আমি জানতাম না, সে বাংলায় আমি যেতে পারব কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।

 

 

নঈমুদ্দীন/সাইফ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়