বিএডিসির ধান বীজ সরবরাহে ক্ষতির মুখে সাড়ে ৩ হাজার চাষি
নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর || রাইজিংবিডি.কম
পূর্বদর নির্ধারণ ছাড়াই বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনে (বিএডিসি) বোরো ধানের বীজ সরবরাহ করে ক্ষতির মুখে পড়েছেন যশোর অঞ্চলের ৩ হাজার ৫৯১ জন চাষি। বিএডিসি থেকে বীজের যে দাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাতে উৎপাদন খরচই উঠবে না বলে দাবি তাদের।
ধান বীজ সংগ্রহে দর নিম্নমুখী করায় চুক্তিভিত্তিক চাষিরা ক্ষোভ প্রকাশ ও হতাশ হয়েছেন। এতে করে দেশে ধান বীজ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশংকা রয়েছে।
চুক্তিভিত্তিক চাষিরা জানান, বীজ ধান সরবরাহের কমপক্ষে ৩ থেকে ৭ মাস পর তাদের পাওনা টাকা দেওয়া হয়। চুক্তিকালীন ধানের দর নির্ধারণ করা হয় না। বর্তমানে জমি লিজ, সেচ, সার, কীটনাশক, শ্রমিক মজুরী উর্ধ্বমুখী রয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান বীজ উৎপাদন খরচের তুলনায় চুক্তিভিক্তিক চাষিদের কম মূল্য দেওয়া হচ্ছে।
বিএডিসির যশোর কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স জোন ও বীজের আপৎকালীন মজুদ কর্মসূচি সূত্র জানিয়েছে, মৌসুম শেষে চুক্তিবদ্ধ চাষিদের কাছ থেকে ধান বীজ সংগ্রহ করা হয়। এবার বিএডিসির যশোর কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স জোনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ৩ হাজার ৫৯১ জন কৃষক ১ হাজার ৬২০ একর জমিতে ও ১ হাজার ৬ একর জমিতে আপৎকালীন বোরো ধানের বীজ উৎপাদন করে তা সরবরাহ করেছেন।
বিএডিসি যশোরাঞ্চলের সূত্র জানায়, কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স জোন কর্মসূচির আওতায় উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের বোরো ধান বীজ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৫৮৩ টন, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ১৪০০ টন। অন্যদিকে, বীজের আপৎকালীন মজুদ কর্মসূচির আওতায় উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের বোরো ধান বীজ সংগ্রহরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার টন, সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ৯০০ টন। এখনও বীজ ধান সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।
২৫ এপ্রিল থেকে বোরো ধানের বীজ সংগ্রহ শুরু করে বিএডিসি। জুলাই মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত তা সংগ্রহ করা হবে। এবার মোটা বীজ ৪৩ টাকা কেজি, চিকন বীজ ৪৪ টাকা কেজি, ভিত্তি বীজ ৪৭ টাকা কেজি এবং সুগন্ধি বাসমতি ধানের বীজ ৪৯ টাকা দর নির্ধারণ করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
গত ২৫ জুন বীজ ধান সরবরাহে, বিএডিসি নির্ধারিত দরে প্রাপ্ত মূল্য গ্রহণের জন্য চুক্তিবদ্ধ চাষিদের ডাকা হলে তারা ওই দর জেনে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি বিএডিসি চেয়ারম্যান, কৃষি মন্ত্রনালয়ের সচিব, বিএডিসি‘র সদস্য পরিচালক (বীজ ও উদ্যান) মহাব্যবস্থাপক ও অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (কঃ গ্রোঃ), কর্মসূচি পরিচালক (বীআমক), বিএডিসি খুলনা অঞ্চলের যুগ্ম পরিচালক (বীজ বিপনন) বরাবরে গত ২ জুলাই বোরো ধান বীজের দর পুনঃনির্ধারণ (সংশোধন) আবেদন করেছেন। কিন্তু চাষিরা এখনও পর্যন্ত সুরাহ না পেয়ে আশাহত হচ্ছেন।
অভিযোগকারী চাষিরা জানান, চুক্তিপত্রে বীজের দর উল্লেখ ছিল না। বাজারে সাধারণ ধানের সর্বোচ্চ যে খুচরা মূল্য থাকে, তার সঙ্গে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করে বিএডিসি থেকে বীজের মূল্য পরিশোধ করা হয়। বর্তমান সময়ে উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ধার্য্যকৃত ৩০ শতাংশ থেকে তা বৃদ্ধি করে ৫০ শতাংশ করাও সময়ের দাবি চুক্তিবদ্ধ চাষিদের।
চুক্তিবদ্ধ চাষি ঝিনাইদহের সদরের আব্দুস সালাম জানান, ভালো ফসলের জন্য ভালো বীজ প্রয়োজন। আর ভালো বীজের জন্য প্রয়োজন বাড়তি পরিচর্যা। বাড়তি পরিচর্যা করে বীজের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বর্তমান নির্ধারিত দামের সঙ্গে অন্তত কেজি প্রতি ৫ টাকা বৃদ্ধি করার জোর দাবি জানাচ্ছি। তা না হলে বীজ উৎপাদনকারী চুক্তিবদ্ধ চাষিরা নিরুৎসাহিত হবেন। দেশে ধান বীজ উৎপাদন কমবে। ধান চাল আমদানি নির্ভরতা বাড়বে। এত দেশে চালের দাম বৃদ্ধি পাবে।
যশোরের ঝিকরগাছার চাষি আশানুর রহমান ধান বীজ সরবরাহের দরের ব্যাপারে বলেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচিত অন্তত ৫২ থেকে ৫৪ টাকা দর নির্ধারণ করা।
খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার মৃত হারুন অর রশিদের ছেলে চাষি আব্দুল হালিম বলেন, অন্তত বীজ ধানের দাম কেজি ৫০ থেকে ৫২ টাকা হওয়া উচিত। অন্যথায় বীজ ধান উৎপাদন কমবে। দেশের খাদ্য ঘাটতি হবার আশংকা দেখা দেবে। একই কথা বলেন, যশোরাঞ্চলের বিএডিসি‘র একাধিক চুক্তিবদ্ধ বীজ উৎপাদনকারী কৃষক।
চাষিদের অভিযোগ সরকার কর্তৃক ধান/চাল সংগ্রহের দাম বাড়ানো হল, বীজ ধান সংগ্রহে দাম কমানো হয়েছে। এবিষয়ে বিএডিসি‘র যশোরাঞ্চলের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কাছে জানতে চাইলে তিনি নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, বাস্তবতায় বাজার দরে দাম ঠিক থাকলেও চাষিদের উৎপাদন খরচ পর্যাপ্ত বেড়েছে। এটা বিবেচনায় তাদেরও কিছুটা দাম বৃদ্ধি করে মূল্য নির্ধারণ করা বাঞ্চনীয়। বর্তমান দরে চাষিরা কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে বিএডিসির এই কর্মকর্তা স্বীকার করেন।
বিএডিসির অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাজারে ধানের মূল্য কত সেটা আমরা কৃষি বিপণন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জেনে নিই। তার সঙ্গে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করে বীজের মূল্য নির্ধারণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাই। সেখান থেকেই মূল্য নির্ধারণ হয়ে আসে। বিএডিসির সারা দেশের জোনের জন্য বীজের মূল্য ঠিক হয়ে যায়।’
রিটন/বকুল
সীমান্তে ৭ পাসপোর্টসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক ডিজি সাব্বির আটক