ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১৩ ১৪৩২ || ৮ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

লোকজ সুরের পালাকার ইসলাম উদ্দিন পাচ্ছেন একুশে পদক

রুমন চক্রবর্তী, কিশোরগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৩৩, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ০৯:৩৮, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
লোকজ সুরের পালাকার ইসলাম উদ্দিন পাচ্ছেন একুশে পদক

নিজের দোকানে বসে চা পান করছেন ইসলাম উদ্দিন পালাকার।

গ্রামের মঞ্চে মঞ্চে পালা করে বেড়িয়েছেন ইসলাম উদ্দিন। স্বপ্ন ছিল পালাকার হিসেবে এই সংস্কৃতির শিকড় মজবুত করা। তাই তো স্বপ্ন সারথীর খোঁজে কখনো পিছু হটেননি। দেশের নানা প্রান্তের গ্রামে মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে আছে তার শিল্প। এভাবেই তিনি নিজেকে আবিষ্কার করলেন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও। সেখানেও ছড়িয়েছেন সংস্কৃতির সুবাতাস। বড় মঞ্চের আলো নয়, মাটির গন্ধেই তার আসল ঠিকানা।

কিশোরগঞ্জ করিমগঞ্জ উপজেলার নোয়াবাদ গ্রামে বসবাস করেন ইসলাম উদ্দিন পালাকার। তিনি বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) পেতে যাচ্ছেন, দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা, ‘একুশে পদক ২০২৬’। লোকজ সংস্কৃতি আর পালাগানে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তার হাতে এ পদক তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আরো পড়ুন:

নোয়াবাদ গ্রামে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন ইসলাম উদ্দিন পালকার। সকালে উঠেই গ্রামের পথ ধরে হাঁটেন। চায়ের দোকানে বসেন, করেন সবার সঙ্গে গল্প।  কেউ এলে ফিরিয়ে দেন না, হাসিমুখে কথা বলেন।

গল্পের ছলে জানা যায়, বড় দুই ভাই যাত্রাদলে অভিনয় করতেন, ছোট ইসলাম উদ্দিন মুগ্ধ হয়ে দেখতেন। অভিনয়ের নেশা তখনই মাথায় চেপে বসে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মঞ্চে ওঠেন। কণ্ঠে ছিল আলাদা টান, কথায় ছিল প্রাণ।

তার গানের জাদু নজরে আসে আরেক বিখ্যাত লোকশিল্পী কুদ্দুস বয়াতির। তিনি ইসলাম উদ্দিনকে শিষ্য করে নেন। শুরু হয় কঠিন সাধনা। ওস্তাদের বাড়িতে থেকে কিচ্ছাগান রপ্ত করেন। গানই হয়ে ওঠে জীবন।

কোক স্টুডিওতে সম্প্রতি তার গাওয়া ‘দেওড়া’ গানটি জনপ্রিয়তা পায়


১৯৮৯ সালে নিজের পালাগানের দল গড়েন ইসলাম উদ্দিন। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম, এক জেলা থেকে আরেক জেলা ঘুরতেন। পালাগানের হাত ধরে আসে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। মাসে ৩০ থেকে ৩৫টি আসরেও গেয়েছেন এই শিল্পী। পালাগানই তার পেশা, ভালোবাসা।

এরপর দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ডাক পেয়েছেন বিদেশে। ১৯৯৯ সালে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালে পালাগান করেছেন। ফ্রান্স ও ভারতেও মঞ্চ কাঁপিয়েছেন। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি প্রশিক্ষক ছিলেন। সিনেমায় গান করেছেন।

সম্প্রতি কোক স্টুডিওতে তার কণ্ঠের যাদুতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ‘দেওড়া’ গানটি। গানটি গাওয়ার পর তিনি নতুন প্রজন্মের কাছেও হয়ে উঠেছেন পরিচিত মুখ। সর্বশেষ, গত ৫ ফেব্রুয়ারি লোকসংগীত ও পালাগানকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে একুশে পদক দেওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার।

নোয়াবাদ ইউনিয়নের দর্গাভিটা বাজারে ছোট একটি ছবি তোলার স্টুডিও আছে ইসলাম উদ্দিনের। এটি তার অবসরের বাণিজ্য। পুরস্কারের খবর জানাজানি হওয়ায় সেখানে প্রতিদিন ভিড় করছেন মানুষ। কেউ ফুল নিয়ে আসছেন, কেউ এসে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। ইসলাম উদ্দিন বলছেন, ‍“এই সম্মান আমার একার না। গ্রামের সবার।” 

ইসলাম উদ্দিনের পরিবেশিত পালাগানের মধ্যে রয়েছে, ‘কমলা রাণীর সাগর দিঘি’, ‘জাহাঙ্গীর বাদলা’, ‘মতিলাল’, ‘রূপকুমার’ ‘উথুলা সুন্দরী’, ‘কাকাধরের খেলা’, ‘আমির সাধু’, ‘সুন্দর মতি’, ‘রাম বিরাম’, ‘ফিরোজ খাঁ’সহ আরো অনেক।

পালাগান সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইসলাম উদ্দিন বলেন, “একেকটি পালাগান চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার হয়ে থাকে। এগুলোতে অনেক চরিত্র থাকে, সব চরিত্র আমি একা গাই। নেচে-গেয়ে নানা অঙ্গভঙ্গিতে চলে গান। পরিশ্রম অনেক। পালাগান আমার কাছে বহু কষ্টের ধন। তাই আমি চাই, এই পালাগান যেন বিলুপ্ত হয়ে না যায়। আমি না থাকলেও পালাগান যেন টিকে থাকে, একজন্য দু-একজন ছাত্র খুঁজছি। তারা যেন টিকিয়ে রাখতে পারে এই পালাগান। ধরে রাখতে পারে আমার স্মৃতি।”

ইসলাম উদ্দিন পালাকারের সঙ্গে (বাঁয়ে) রাইজিংবিডি ডটকমের কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি রুমন চক্রবর্তী


দর্গাভিটা বাজারে ইসলাম উদ্দিনের ভক্ত হযরত আলী বললেন, “ইসলাম উদ্দিনের কণ্ঠে শুধু সুর নয়, আছে গ্রামের ইতিহাস। আছে মানুষের সুখ-দুঃখ। তার গানে উঠে আসে মাটির গল্প, নদীর গল্প, প্রেম আর বেদনার গল্প। তাকে সরকার যে একুশে পদক দিচ্ছে আমরা এলাকাবাসী খুব খুশি হয়েছি। এটা তার প্রাপ্য ছিল।”

 

মুসলেহ উদ্দিন নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি প্রশংসা করে বলেন, “চার দশকের বেশি সময় ধরে ইসলাম উদ্দিন পালাগানকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছেন এই ঐতিহ্য। পালাগানকে আরো বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তার এই প্রচেষ্টাকে আমি সম্মান জানাই।” 

ইসলাম উদ্দিনের সঙ্গে বাজনা বাজান শামীম খান শান্ত। তিনি বলেন, “একজন মানুষ এতগুলো পালাগান মুখস্ত রেখেছেন। বিভিন্ন চরিত্র একাই অভিনয় করেন। এটি না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। আমি তাকে যতই দেখি মুগ্ধ ও অভিভূত হই। এ এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা।”

একুশে পদক পাওয়ায় রাষ্ট্রের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ইসলাম উদ্দিন। তিনি বলেন, “আমি গ্রামবাংলার শিল্পী। সেখানেই থাকতে চাই। গ্রামই আমার প্রেরণা। যারা সন্ধ্যায় মাঠে বসে আমার পালা শোনে, হাততালি দেয়, চোখ ভেজায়- তারাই আমার শক্তি।”

ঢাকা/মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়