নারী দিবস
কাজ হারানোর শঙ্কায় কক্সবাজারের শুঁটকি মহালের নারী শ্রমিকরা
তারেকুর রহমান, কক্সবাজার || রাইজিংবিডি.কম
কক্সবাজারের পল্লীতে শুঁটকি শুকানোর কাজ করছেন নারী শ্রমিকরা।
আজ ৮ মার্চ, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিবস ঘিরে নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির নানা আলোচনা চললেও কক্সবাজারের শুঁটকি পল্লীর হাজারো নারী শ্রমিক এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সাগরে মাছের সংকটের কারণে জেলার অন্যতম বৃহৎ শুঁটকি উৎপাদনকেন্দ্রের প্রায় ৬০০টি মহালে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজ হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন তারা।
দেশের অন্যতম বড় শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্র কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এখানে ছোট-বড় প্রায় ৭০০ মহালে প্রতি মৌসুমে প্রায় ৫৫ হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হতো। কয়েক মাস ধরে সাগরে মাছ কম ধরা পড়ায় শুঁটকি উৎপাদন দিন দিন কমছে। ফলে শুঁটকি শুকানোর কাজে নিয়োজিত নারীদের কর্মসংস্থানও দ্রুত কমে যাচ্ছে।
একটি শুঁটকি মহালে কথা হয় শ্রমিক রাজেমা খাতুনের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টা কাজ করে মজুরি পান ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। তার সাত সদস্যের সংসার চালাতে এই আয় যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, ‘‘অনেক মহাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজেরও অভাব দেখা দিয়েছে। তাই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় কাজ না করলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।”
রাজেমা খাতুনের মতো নাজিরারটেকের শুঁটকি মহালে পেটের তাগিদে কাজ করেন রহিমা বেগম। কয়েক বছর আগে তার স্বামী সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে মারা যান। এরপর চার মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসারের পুরো দায়িত্ব তার কাঁধেই এসে পড়ে। জীবিকার তাগিদে শুঁটকি মহালে কাজ শুরু করেন তিনি। মাছের সংকটে অনেক মহাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন নিয়মিত কাজ মিলছে না তার।
রহিমা বেগম বলেন, “আগে প্রায় প্রতিদিনই কাজ পাওয়া যেত, এখন সপ্তাহে দুই-তিনদিনের বেশি কাজ মেলে না। তবুও যা আয় হয়, তা দিয়েই সন্তানদের নিয়ে কোনোভাবে সংগ্রাম করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছি।”
মুর্শিদা আক্তার বলেন, “শুঁটকি মহালের কাজের ওপরই আমার পরিবার চলে। মাছের সংকটে কাজ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে। কষ্টে দিন যাচ্ছে।”
শুঁটকি তৈরি করে যা আয় হয় তার পুরোটাই সংসারে বিনিয়োগ করেন নারী শ্রমিকরা
জুহুরা খাতুন বলেন, “মহালে মাছ কাটা, ধোয়া ও শুকানোর কাজে অনেক নারী শ্রমিক যুক্ত থাকলেও বেশিরভাগ মহাল বন্ধ থাকায় অনেকেই এখন কাজ হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন। কাজ না থাকলে দিনমজুর পরিবারের জন্য সংসার চালানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।”
মহালমালিক, ব্যবসায়ী, জেলে ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাগরে মাছ কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি, ট্রলিং জাহাজের বেপরোয়া মাছ আহরণ, নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের ব্যবহার করে মাছের পোনা ধ্বংস, উপকূলে জাটকা ইলিশ নিধন, সাগরের পানিদূষণ এবং লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি। এসব কারণে সামুদ্রিক মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে শুঁটকি উৎপাদনে।
কক্সবাজার শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, “উপকূলে এখন সামুদ্রিক মাছ খুব কম মেলে। বর্তমানে শতাধিক মহালে কিছু শুঁটকি উৎপাদন হচ্ছে। গত ছয় মাস ধরে এই শুঁটকি পল্লীতে মাত্র ২০ শতাংশ মাছ আসে কক্সবাজার উপকূল থেকে। বাকি ৮০ শতাংশ আসে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে।”
তিনি বলেন, “ট্রলারের জালে ধরা পড়া মাছের একটি বড় অংশ নাজিরারটেক, নুনিয়ারছড়া ও মগচিতাপাড়াসহ বিভিন্ন উপকূলের শুঁটকি মহালে সরবরাহ করা হতো। এখন মাছ না থাকায় প্রায় ৬০০টি মহালে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।”
কক্সবাজার শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ৭০০টি মহালে প্রায় ৫৫ হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হয়েছিল। চলতি মৌসুমের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন। সাগরে মাছ ধরা না পড়লে চলতি মৌসুমে শুঁটকি উৎপাদন অর্ধেক কমে যেতে পারে বলে ধারণা তাদের।।
১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, “মাছের সংকটের কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ মহালে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অন্তত ৪০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ অর্থসংকটে পড়েছেন এবং অনেকেই সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।”
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ নানা কারণে সাগরে মাছের প্রাপ্যতা আগের তুলনায় কমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে শুঁটকি উৎপাদনেও।
তিনি জানান, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে কক্সবাজারে মোট ৪৮ হাজার ২৮৫ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) শুঁটকি উৎপাদন হয়েছে ১১ হাজার মেট্রিক টনের কিছু বেশি।
ঢাকা/মাসুদ