‘আমার স্বামীর সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল, আমি শুধু সেটার উত্তর চাই’
বাদল সাহা, গোপালগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম
পরিবারের আহাজারি। ইনসেট: সন্তানের সঙ্গে নিহত বুলেট বৈরাগী।
আজ ২৭ এপ্রিল, একমাত্র সন্তান অব্যয় বৈরাগীর প্রথম জন্মদিন। অনেক পরিকল্পনা ছিল ছেলের জন্মদিন পালন নিয়ে। সেই পরিকল্প আর পূরণ করতে পারলেন না কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। গত ২৪ এপ্রিল নিখোঁজ হন তিনি। পরদিন সড়কের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়।
রবিবার (২৬ এপিল) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বুলেটের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের ডুমুরিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছায়। অ্যাম্বুলেন্স বাড়ির উঠানে প্রবেশ করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবার-পরিজন। তাদের সান্তনা দিতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছিলেন প্রতিবেশীরা। স্বামীর মরদেহবাহী গাড়ির সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী উর্মি হীরা।
বুলেটের বাবা সুশীল বৈরাগী ছেলেকে মানুষ করতে নিজের শেষ সম্বল ২৭ শতক ধানের জমি বিক্রি করেছিলেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে চালিয়েছেন সংসার আর ছেলের পড়ালেখা। মা লিলিমা বৈরাগী নিজের কানের স্বর্ণের দুল বিক্রি করে ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ার পথ খুলে দিয়েছিলেন।
অভাবের সংসারে বড় হলেও বুলেটের স্বপ্ন ছিল আকাশে ছোঁয়ার। ছেঁড়া জামা নিজেই সেলাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন বুলেট। বাড়ি ফিরে হাসতে হাসতেই বলতেন, “আমি নিজেই সেলাই করে পরে যাই।”
বুলেটের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া বহুমুখী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, গোপালগঞ্জ হাজী লালমিয়া সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কর্মজীবন শুরু করেন খাদ্য অধিদপ্তরে, পরে ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে ঢাকা কাস্টমস কার্যালয়ে যোগ দেন। সর্বশেষ কর্মরত ছিলেন কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে। ২৪ এপ্রিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। এরপর থেকেই বন্ধ ছিল তার ফোন। পরদিন সকালে কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় সড়কের পাশ থেকে উদ্ধার হয় তার মরদেহ।
নিহত বুলেটের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে আমগাছের ছায়ায় নীরবে বসে আছেন স্বজনরা। কেউ কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। বৃদ্ধ দাদি নাতির মারা যাওয়ার খবর শুন বাকরুদ্ধ।
স্ত্রী উর্মি হীরা বলেন, “আমি শুধু আমার স্বামীর রক্তাক্ত শরীর দেখেছি। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে কী আসবে, তদন্ত কী বলবে- এসবের বাইরে আমার একটাই প্রশ্ন, আমার স্বামীর সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল, আমি শুধু সেটার উত্তর চাই।”
নিহতের মা নিলীমা বৈরাগী ছেলের হত্যার বিচার দাবি করে বলেন, “আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। আমি খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
নিহতের চাচা বিমল বৈরাগী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, “জীবনে কাউরে নখের আঁচড়ও দেয় নাই, কেউ তার দিকে আঙুলও তোলে নাই। সেই শান্ত ছেলেটার লাশ আজ রাস্তায় পড়ে থাকতে হলো! আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে..।”
চাচা সুশান্ত বৈরাগী জানান, একটি ছেঁড়া জামা নিজেই সেলাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন বুলেট। বাড়ি ফিরে হাসতে হাসতেই বলতেন, আমি নিজেই সেলাই করে পরে যাই।”
বুলেটের চাচাতো বোন দুলালী রানী মণ্ডল বলেন, “দাদার ছেলের এক বছর পূর্ণ হবে সোমবার। জন্মদিন করতে চট্টগ্রাম থেকে ফিরছিল। বড় চাকরি করাই কি তার জীবনের কাল হলো?”
ঢাকা/মাসুদ