চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিয়ে মেয়র ও সিডিএ চেয়ারম্যান মুখোমুখি
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম || রাইজিংবিডি.কম
চট্টগ্রাম নগরীর প্রবর্তক মোড়।
চট্টগ্রাম নগরীতে গত দুই দিনের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি ঘিরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিমের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন, দায় নির্ধারণ এবং মাঠে উপস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অপরদিকে দুই দিনের জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতিতে ক্ষোভ বাড়ছে নগরবাসীর মধ্যে।
টানা বৃষ্টিপাতের পর গত মঙ্গলবার ও বুধবার চট্টগ্রাম নগরের অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। বিশেষ করে নগরের প্রবর্তক মোড়, জামালখান, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, কাতালগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পানি জমে জনদুর্ভোগ তৈরি হয়। এতে অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কোথাও হাঁটু সমান, কোমরসমান পানি জমে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। অনেক বাসা-বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য হন ব্যবসায়ীরা। ক্ষতিগ্রস্থ হয় দোকানের পণ্য। সড়কে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার থেকে বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ছুটে যান সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি প্রবর্তক মোড়, জামালখানসহ কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং নগরবাসীর দুর্ভোগের জন্য প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন।
মেয়র বলেন, নগরবাসীর কষ্ট আমাকে কষ্ট দিয়েছে। যেসব কাজ চলমান রয়েছে সেগুলোর কারণে কোথাও পানি আটকে থাকলে তা দ্রুত সমাধান করতে হবে। জনগণ কষ্ট পেলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য যে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে তা সিডিএর অধীনে। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর কাজ করছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সমন্বয় ঘাটতি থাকলে এমন সমস্যা তৈরি হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের মাঠে থাকা উচিত ছিল।
অন্যদিকে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম জানান, যখন আকস্মিক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় তখন তিনি সরকারি কাজে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। ফলে তাৎক্ষণিক জলাবদ্ধতা প্রবণ এলাকায় যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে প্রকল্প এলাকা আগে পরিদর্শন করেছেন। তিনি দাবি করেন, প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং খালের বাঁধ অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন সামনে পানি আটকে থেকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নগরের ৩৬টি খাল সংস্কারের কাজ চলছে। প্রায় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার এই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার কোটির বেশি ব্যয় হয়েছে।
বর্তমানে জামালখান ও হিজড়া খালে সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। খালের দুই পাশে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের জন্য বিভিন্ন অংশে অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এই বাঁধগুলোই বৃষ্টির পানি স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।
এদিকে সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নগরবাসীর ভোগান্তি কমাতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি জানান, সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে নগরের অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, কেবল প্রবর্তক মোড় এলাকায় সিডিএ’র চলমান উন্নয়ন কাজের কারণে সাময়িক জলজট দেখা দেয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলমান খাল সংস্কার প্রকল্পের কারণে কিছু জায়গায় পানি প্রবাহে বাধা তৈরি হলেও দ্রুত তা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে খালের পানি প্রবাহ সচল করা হবে এবং বর্ষার পর পুনরায় স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড ইতোমধ্যে ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির কাজ সম্পন্ন করেছে এবং প্রায় ৬ হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে। বাকি খালগুলোর কাজ চলমান রয়েছে এবং চলতি বছরের মধ্যেই তা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ৫০-৬০ শতাংশ কমেছে বলেও এ সময় জানান তিনি।
ঢাকা/রেজাউল//