২ মণ ধানের টাকাতেও মিলছে না শ্রমিক, বৃষ্টিতে বিপাকে কৃষক
বাগেরহাট সংবাদদাতা || রাইজিংবিডি.কম
বাগেরহাটে বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হচ্ছে কৃষকের কেটে রাখা ধান।
পঞ্চাশোর্ধ্ব দিনমজুর মুজিবর শেখ। অন্যের বাড়িতে কাজ করে চলে তার পাঁচ সদস্যের পরিবার। ভাগ্য বদলাতে ঋণ নিয়ে এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। ধান কেটে ঘরে তোলার সময় হঠাৎ বৃষ্টিতে ডুবে গেছে ক্ষেত। এখন এনজিও থেকে ঋণ কিভাবে শোধ করবেন সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।
বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার ধলনগর গ্রামের বাসিন্দা মুজিবর শেখ বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিবেলে বলেন, “আমার নিজের জমি নেই। অন্যের এক বিঘা জমি ১৫ হাজার টাকা হারি দিয়ে ধান চাষ করেছিলাম। জমিতে হালচাষ, মেশিন দিয়ে পানি সেচ ও সার, কীটনাশক দিতে প্রচুর খরচ হয়। এই খরচ মেটাতে একটা এনজিও থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলাম।”
তিনি বলেন, “অনেক কষ্ট করে ধান চাষ করেছিলাম, প্রথমে কিছুদিন শিলা বৃষ্টি হয়ে প্রায় চার আনা ধান ঝরে গেছে। কিছু ধান কেটে আটি বাঁধার জন্য মাঠে রাখছিলাম, কিছু ধান কাটা হয়নি, বৃষ্টিতে সব পানিতে তলিয়ে গেছে। এভাবে থাকলে তো সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে। দামও ভালো পাওয়া যাবে না।”
এই কৃষক বলেন, “এই এক বিঘা জমি থেকেই আমার পরিবারের ৬ মাসের চালের ব্যবস্থা হয়ে যেত। এখন যে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটব তারও উপায় নেই। একজন শ্রমিক আনতে গেলে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা দিতে হয়। সঙ্গে তিন বেলা খেতে দিতে হয়। আরো খরচ রয়েছে। সব মিলিয়ে একজন শ্রমিকের পিছে প্রতিদিন ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা খরচ হয়। ফলে শ্রমিক দিয়ে একদিন কাজ করাতে হলে দুই মণ ধানের টাকা দিয়ে দিতে হচ্ছে। তাও শ্রমিক মিলছে না। এখন ঋণ কিভাবে শোধ করব বা খাব কি তাই ভাবতেছি।”
কৃষি অফিস সূত্র জানা যায়, এ বছর জেলায় ৬৮ হাজার ১৭১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এরই মধ্যে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। বাকি প্রায় ৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে এখনো ধান রয়েছে। এ অবস্থায় বৃষ্টিপাত বেশি হলে মাঠে থাকা ধানের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
ধলনগর গ্রামের কৃষক ইয়াকুব আলী হাওলাদার বলেন, “ধানে একটু চাল চাল ভাব আসলেই প্রথমে শিলা বৃষ্টি হয়েছে। তখন বিঘায় ৫ থেকে ৭ মণ ধান ঝরে পড়েছে। এখন যখন ধান কাটার সময় হয়েছে, তখনই বৃষ্টিতে হাঁটু পানি হয়ে ধানক্ষেত তলিয়ে গেছে। এখনো আমরা পাকা ধান কেটে ঘরে তুলতে পারছি না।”
তিনি বলেন, “এ বছর আমি অন্যের চার বিঘা জমি হারি নিয়ে চাষ করেছি। প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এ বছর ধানের দামও কম, মণ ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। অন্য বছরের তুলনায় এ বছর ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কম। এখন বৃষ্টি কমলেও যে ক্ষতি হয়েছে তাতে খরচের টাকাও উঠবে না। সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা উঠবে। ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মতো লস হবে।”
বিনয় সরকার নামে অপর কৃষক বলেন, “প্রতি বছর দুই বিঘার মতো জমিতে ধান চাষ করি। ৮০ থেকে ১০০ মণ ধান পাই। এবার হঠাৎ বৃষ্টির কারণে মাঠে কাটা ধান তলিয়ে গেছে। কবে পানি শুকাবে আর কবে ধান ঘরে তুলব তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ধান এরকম পানির ভিতর থাকলে তো দুইদিনেই গজ বেরিয়ে যাবে। খরকুটোও নষ্ট হয়ে যাবে। বিক্রি করা যাবে না। এ বছর সর্বোচ্চ ৩৫ থেকে ৪০ মণ ধান পেতে পারি। তাতে খরচার টাকাও উঠবে না।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “কৃষি অফিস থেকে কোনো পূর্বাভাসও পাইনি যে, বৃষ্টি বা আবহাওয়া খারাপ হতে পারে। পেলে আগে ভাগে ধান কেটে ঘরে তুলতাম। সারাদিন আমরা মাঠে কাজ করি। টিভিতে খবর দেখার সময় পাই না। কৃষি অফিস থেকে মাইকিং করা হলেও আমরা কৃষকেরা বিষয়টা জানতে পারতাম।”
বাগেরহাটের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ. মোতাহার হোসেন বলেন, “বৃষ্টির কারণে কিছু জমিতে ধান হেলে পড়ছে। কিছু কৃষকের জমিতে কাটা ধান রয়েছে যা ঘরে তুলতে পারেনি। এর মধ্যে ৫ থেকে ১০ পার্সেন্ট ধান ঝরে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। টানা বৃষ্টিতে ক্ষতি বেশি হলে কৃষকের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ নিরূপণ করব।
ঢাকা/আমিনুল/মাসুদ