ঢাকা, সোমবার, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

স্যার আমরা ফ্রি আছি, আপনি কোথায়?

মুনজুরুল ইসলাম নাহিদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২২ ১০:৩৫:০১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২২ ১২:২২:৪৫ পিএম

অনুষদ ভবনের ১০১ নম্বর কক্ষ। ক্লাস শুরুর তখনও কয়েক মিনিট বাকি। ম্যাম ক্লাসে আসেননি ভেবে নিজের মতো করে ক্লাসে ঢুকতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু চোখে পড়ল একটি ব্যাগ হাতে হাফ হাতা শার্ট, বেল্ট বিহীন প্যান্টে ইন করা একজন বেঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। আমার সহপাঠীরা কৌতুহল নিয়ে কথা শুনছে। ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে সামনের বেঞ্চে বসে পড়লাম৷

হঠাৎ ক্লাসে এসে তিনি কে এবং তার কথার প্রসঙ্গ বুঝতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ কথা শোনার পর তার কথাতেই বুঝতে পারলাম তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এক বিভাগের অধ্যাপক। পরে জানতে পেরেছি তিনি বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ইয়াসিন আলী স্যার।

তিনি একজন সিনিয়র অধ্যাপক হওয়ার পরও এরকম সাদামাটা পোশাক আর সহজ সরল কথবার্তা আমাদের অনেক বেশি আগ্রহী করে তুলছে তার কথা শুনতে। কখনো বাংলা কখনো ইংরেজিতে কথা বলে চলছেন।

আমরা ল' অ্যান্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী। বিভাগের প্রয়োজনীয়তা ও মান নিয়ে কিছু প্রশংসা করে বুঝানো শুরু করলেন ম্যানেজমেন্ট কি? ম্যানেজমেন্টের প্রয়োজনীয়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে। স্যার যুক্তি দিয়ে বুঝাচ্ছিলেন বিশ্বের সবকিছুতেই ম্যানেজমেন্টের প্রয়োজন হয়। এমনকি মহা বিশ্বের সব কিছুই ন্যাচারাল ম্যানেজমেন্ট মেনে চলে। তার ক্লাস করে ম্যানেজমেন্ট নিয়ে বিস্তৃত এক নতুন ধারণা পেলাম। আমার চিন্তায় বড় ধরনের পরিবর্তন চলে আসল।

স্যার তার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালের বিভিন্ন গল্প শোনালেন। জানালেন তার মেস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কিছু স্মৃতি। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা জীবনে তার প্রাপ্তির কথাও জানালেন সংক্ষেপে৷ স্যারের দাবি তিনি নির্দিষ্ট কোনো এক বিভাগের শিক্ষক নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগেরই শিক্ষক। সুযোগ পেলেই ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন বিভাগে গিয়ে ক্লাস নেন।

স্যার জানালেন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন তার ব্যাক্তিগত লাইব্রেরিটি। নিজ বাসার এ লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করেছেন প্রায় ২২ হাজার বই। স্যারের কথা শুনে আমরা একে অপরের দিকে তাকালাম। যতই শুনছি অবাক হচ্ছি স্যারের কথায়। তার প্রত্যাশা ব্যক্ত করলেন, শেষ জীবনে তিনি তার লাইব্রেরির সকল বই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে দান করবেন। সেখানে তার নামে নয়, বরং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নামে একটি কর্নার থাকবে।

সামনের বেঞ্চে বসায় স্যার আমার পাশে দাঁড়িয়ে এবং অনেকবার আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলেন৷ স্যারকে কয়েকবার তার হাতের ব্যাগটি রাখার অনুরোধ করলেও তিনি পুরো সময় ব্যাগ হাতে নিয়েই ক্লাস নিলেন। ক্লাস শেষের দিকে উপদেশ দিলেন প্রযুক্তিকে ভালোভাবে জানতে ও ইংরেজি শেখার প্রতি গুরুত্ব দিতে।

বের হতে হতে বললেন আমরা ফ্রি থাকলেই যেন স্যারকে জানাই। স্যার এসে আমাদের সাথে গল্প করবেন। এই একদিনই তাকে কাছে পেয়েছিলাম।

এরপর স্যার সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠি। তার ব্যাপারে যত জেনেছি শুধুই অবাক হয়েছি। সাদামাটা দার্শনিক খ্যাত ইয়াসীন আলী স্যার খুব সহজেই মন জয় করে নিয়েছেন তাকে একবার দেখা মানুষেরও।

১৮ নভেম্বর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি।  খবর শুনে একদিনের পরিচিত মানুষের জন্য চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। প্রিয় স্যারের চির বিদায়ে শোক নেমে এসেছে হাজারো প্রাণে।

খুব ইচ্ছে ছিল স্যারের সাথে আরও কিছু সময় কাটানোর। তার সাথে গিয়ে লাইব্রেরিটি ঘুরে আসার। মনের কোণে তার জীবন নিয়ে কিছু প্রশ্নের জবাব আর পাওয়া হবে না। লাইব্রেরি আর জীবনী নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে ছিল। হয়তো অনেকেই লিখবে কিন্তু স্যারকে দেখানো হবে না। নিজ লাইব্রেরিতে বই হাতে নিয়ে পড়ায় ব্যস্ত স্যারের এমন একটি মুহূর্তের ছবি ক্যামেরাবন্দি করার ইচ্ছেটা অপূরণীয়ই থেকে গেল।

আজ বারবার বলতে ইচ্ছে করছে, স্যার আমরা ফ্রি আছি, আপনি কোথায়? শোকাহত মনের গভীর থেকে কামনা স্যার, স্রষ্টার কাছে শান্তিতে থাকুন।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

 

ইবি/হাকিম মাহি

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন