ঢাকা     শুক্রবার   ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ১০ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাবির জগন্নাথ হলে সরস্বতী পূজা, ৭৬ মণ্ডপে সম্প্রীতি ও সৃজনশীলতার মেলবন্ধন

ডেস্ক রিপোর্ট || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:১১, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ২১:১১, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
ঢাবির জগন্নাথ হলে সরস্বতী পূজা, ৭৬ মণ্ডপে সম্প্রীতি ও সৃজনশীলতার মেলবন্ধন

ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মাঠে মানুষের ঢল। ধূপের গন্ধে ভারী বাতাস, শঙ্খধ্বনি আর মন্ত্রোচ্চারণে ভোর যেন অন্য এক ছন্দে ধরা দেয়। শাড়ি, পাঞ্জাবি আর চোখে এক ধরনের প্রত্যাশা: জগন্নাথ হল এই দিনে আর কেবল একটি আবাসিক হল থাকে না; এটি রূপ নেয় জ্ঞান ও জীবন্ত সংস্কৃতির এক তীর্থভূমিতে।

শরৎ থেকে বসন্তে: পূজার উৎস ও ইতিহাস

আরো পড়ুন:

সরস্বতী পূজা, অনেকে Basanta Panchami নামে চেনেন, বাংলা মাস মাঘের শুক্লপক্ষের পঞ্চমীতে অনুষ্ঠিত হয়; যেমনটি ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী সরস্বতীর আগমন বা জন্মদিন হিসেবে ধরা হয়। এই দিন শিশুদের প্রথম শিক্ষা বা হাতে-খড়ি দেওয়া হয়, যা ‘হাতে খাড়ি’ নামে পরিচিত; a ritual symbolic of initiation into learning। সাধারণ হিন্দু আয়োজনের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও দিনটি জ্ঞান, শিক্ষা ও শিল্পের শুভ সূচনার দিন হিসেবে বিবেচিত হয়।

জগন্নাথ হলে সরস্বতী পূজার ইতিহাস শতক কেটে গেছে। পুরনো সময় থেকেই এখানকার শিক্ষার্থীরা এ দিনটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সাংস্কৃতিক বিনোদনে উদযাপন করে এসেছে; ২০০০-এর দশকে ৩০–৪০টি মণ্ডপ থাকলেও দিন দিন সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে আজ এখানে পাঁচ দশকের ধারাবাহিকতায় অসংখ্য মণ্ডপ নির্মাণ হচ্ছে।

ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে: একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

বাংলাদেশে সরস্বতী পূজা কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উৎসব নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটি একটি আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক মিলনমেলাতে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও অন্যান্য অনুরাগীরা এখানে অংশগ্রহণ করেন, এবং এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রীতির জীবন্ত প্রকাশ।

৭৬টি মণ্ডপ: জ্ঞান, ভাবনা ও আধুনিক ব্যঞ্জনা

শৈল্পিক বহুমাত্রিকতায় মণ্ডপসমূহ

এই বছর জগন্নাথ হলে ৭৬টি মণ্ডপ স্থাপিত হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা প্রতিটি মণ্ডপে নিজেদের শৈল্পিক ধারণা ও সমাজচিন্তা তুলে ধরেছেন: এটি শুধুই দর্শনের মঞ্চ নয়, বরং চিন্তার ব্যঞ্জনা।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষার সংমিশ্রণ থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতিফলন, সমাজের অসংখ্য প্রশ্ন ও প্রত্যাশা; এর সবই কাজগুলোতে ফুটে উঠেছে।

কোথাও মণ্ডপে দেখা গেল পৃথিবীর সীমাহীন জ্ঞানের প্রতীক আলোকসজ্জা ও আলপনা; কোথাও আবার হাতে আঁকা দেয়ালচিত্রে সামাজিক জীবনের সংমিশ্রণ; শিল্পীর শ্রম, সময় ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নির্মিত।

এই বহুমাত্রিক শিল্পবোধ শুধু ধর্মীয় ভাবেই নয়, সমকালীন শিক্ষা, পরিবেশ ও মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলনও হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবাদের ভাষা: সরস্বতী নয়, বিবেক ও ন্যায়ের প্রতীক

এই বছরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো; অনেক মণ্ডপে সরস্বতীকে কেবল বিদ্যার দেবী হিসেবে নয়, বিবেকের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মণ্ডপে থেমে থাকা কলম, পোড়া সংবাদপত্র আর রক্তাক্ত শিরোনাম চোখে পড়লেই অনুভূত হয় এক ধরণের নীরব প্রতিবাদ।

শিক্ষার্থী শ্রাবস্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়, “আমরা যুদ্ধ চাইনি, আমরা শান্তির কথা বলতে চেয়েছি। নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ভাষা খুঁজেছি।”

হরিজন সম্প্রদায়ের বঞ্চনা, ন্যায্য মজুরি না পাওয়া শ্রমিকদের সংগ্রাম বা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের শিশুদের মুখ—এখানে সরস্বতীর উপস্থিতি সমাজের নীরব প্রশ্নে রূপ নিয়েছে, যা দর্শকের বিবেককেই টোকা দেয়।

জলের ওপরের শিল্পকর্ম: প্রতিফলিত জ্ঞান

জগন্নাথ হলে সরস্বতী পূজার সবচেয়ে আইকনিক দৃশ্যটি হলো পুকুরের মাঝখানে স্থাপিত প্রতিমা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা বাঁশ, বেত ও পাটের মতো দেশজ উপকরণে নির্মিত এই প্রতিমা জলে প্রতিফলিত হয়ে দ্বিগুণ হয়ে ওঠে; একটা চলমান শিল্পকর্মের মতো।

এই সৃষ্টি শুধু প্রতিমা নয়; এটি পরিবেশবান্ধব শিল্প, নান্দনিক সংলাপ ও জ্ঞানচেতনার মিলনক্ষেত্র। দর্শনার্থীরা থেমে তাকিয়ে থাকেন; কেউ ছবি তুলেন, কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। জলের ওপর আলোর প্রতিবিম্বে মনে হয়: এই আলো কেবল বৈদ্যুতিক নয়, এটি জ্ঞানের আলো, যা শ্রেণিকক্ষ থেকে পাঠাগার, সংবাদকক্ষ ও রাজপথ পর্যন্ত ছড়িয়ে।

সম্প্রীতি ও দায়িত্ব: সহাবস্থানের উৎসব

এই পূজা শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরই নয়; মাঠজুড়ে দেখা যায় বিভিন্ন ধর্ম ও পরিচয়ের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে অঞ্জলি দিচ্ছেন, ছবি তুলছেন ও গল্প করছেন। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রীতির ঐতিহ্য, যেখানে বন্ধুত্ব ও সহাবস্থা কোনো স্লোগান নয়, বাস্তব চর্চা। প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও দিনটি স্মৃতি ও বর্তমানের মিলনস্থান হিসেবে উপভোগ করেন।
উৎসবের ভেতর মানবিক দায়বদ্ধতা

মণ্ডপের পাশে বসেছে মেলা; খাবারের গন্ধ, হাসির শব্দ আর রঙিন আলো। কিন্তু, এই আনন্দের মাঝেও রয়েছে দায়িত্ববোধ। প্রসাদ বিতরণ ছাড়াও আয়োজন করা হয়েছে রক্তদান কর্মসূচি, যা উৎসবকে শুধু ভোগের নয়, দান ও মানবিক দায়িত্বের উৎসবে রূপান্তরিত করে।

শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা: আনন্দের নিরাপদ কাঠামো

এই বিশাল আয়োজনের পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত প্রশাসনিক প্রস্তুতি: সিসিটিভি নজরদারি, মেটাল ডিটেক্টর, শিশুদের নিরাপদ কর্নার, পটকা নিষিদ্ধ—সবই বলে দেয় আনন্দের সঙ্গে নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জগন্নাথ হল সংসদের প্রভোস্ট জানান, “এই পূজা শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, মানের দিক থেকেও অনন্য।”

বিশ্বের বৃহত্তম সরস্বতী পূজার স্বীকৃতি আসুক বা না আসুক, এই আয়োজন ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে; জ্ঞান কখনো নির্জীব নয়, সৌন্দর্য কখনো নিরপেক্ষ নয়, আর উৎসব কখনো দায়িত্বহীন হতে পারে না।

একটি চর্চা, একটি দৃষ্টিভঙ্গি

পুকুরের জলে প্রতিফলিত দেবীমূর্তির দিকে তাকিয়ে মনে হয়, এই আলো কেবল এক দিনের জন্য নয়। এ আলো ছড়িয়ে পড়ুক পাঠাগারে, সংবাদকক্ষে, শ্রেণিকক্ষে, রাজপথে। সরস্বতী পূজা এখানে একটি দিন নয়, একটি চর্চা; যা বলছে: জ্ঞানকে সুন্দর করা, আর সৌন্দর্যকে দায়বদ্ধ করা, এই তো এর প্রকৃত অর্থ।

ঢাকা/সৌরভ/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়