ঢাকা     রোববার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||  আশ্বিন ১০ ১৪২৯ ||  ২৮ সফর ১৪৪৪

অটোপাস: স্বস্তি মিললেও হতাশায় শিক্ষার্থীরা

বিনায়েক রহমান কীর্তি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩২, ১৭ জুন ২০২১   আপডেট: ১৩:৩৮, ১৭ জুন ২০২১
অটোপাস: স্বস্তি মিললেও হতাশায় শিক্ষার্থীরা

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের অনার্স প্রথম বর্ষের ৩ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থীকে অটোপাস দেওয়া হয়েছে। বুধবার (১৬ জুন) জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এদিকে করোনার থাবায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে পরীক্ষা নিতে না পেরে শর্তসাপেক্ষে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

তবে যে শর্তগুলো দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান শর্ত হলো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এসব শিক্ষার্থীদের অবশ্যই প্রথম বর্ষের লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। কেউ যদি এই পরীক্ষায় অংশ না নেয় বা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে রেগুলেশন অনুযায়ী ‘নট প্রমোটেড’ হয় সেক্ষেত্রে তার শর্তসাপেক্ষে দেওয়া প্রমোশন বাতিল বলে গণ্য হবে। শিক্ষার্থীরা জানান, অটোপাস দেওয়ার পরও সেই বিষয়ে পরবর্তী সময়ে আবার পরীক্ষা যেন আরেক প্রহসন। একদিকে শিক্ষার্থীদের মনে স্বস্তি ফিরলেও অনেকে আবার চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

আরও পড়ুন: অটোপাস পেলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী 

এ বিষয়ে তেজগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ওয়ালিদুন নুর আকাশ বলেন, একজন ছাত্র হিসেবে আমি কখনোই অটোপ্রমোশনের পক্ষে নই। কারণ, একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েই নিজেকে যাচাই করে পরবর্তী বর্ষে ওঠার। কিন্তু বর্তমান করোনার মহামারি পরিস্থিতিতে আমরা যেভাবে প্রথম বর্ষে আটকে গিয়েছি, তাতে সেশনজট সৃষ্টি হবে, যা আমাদের কাছে মহাবিপদ। কিন্তু মহামারি পরিস্থিতি বিবেচনা করে যে শর্তগুলো জুড়ে দিয়ে অটোপ্রমোশন দেওয়া হয়েছে, তাতে করে দ্বিতীয় বর্ষে প্রমোশন পাওয়া শিক্ষার্থীদের পরবর্তী সময়ে আরও বিশাল চাপ সৃষ্টি হবে। এমতাবস্থায় অটোপ্রমোশনের জন্য জুড়ে দেওয়া শর্তগুলো শিথিল করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করছি।

এদিকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের হতাশ করেছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন একই কলেজের আরেক শিক্ষার্থী মো. মাহাদী হাসান। তিনি বলেন, এসবের কোনো মানে হয়? এতদিন ধরে পরীক্ষা নেবে নেবে বলে এখন ‘অটোপ্রমোশন’ তাও আবার শর্তসাপেক্ষে! আর যে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের জন্য, এক ধরনের প্রহসনই বলা যায়। যদি সিদ্ধান্ত এমন হতো যে, দ্বিতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ করা হয়েছে কোনো শর্ত ছাড়া, তাহলে আমরা দ্বীতিয় বর্ষের পাঠ্যক্রম চালিয়ে যেতাম। কিন্তু দেখা গেলো, দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হলাম, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পর ক্লাস পরীক্ষার পরে হুট করে একদিন তারা প্রথম বর্ষের পরীক্ষার রুটিন দিলো! এ যেন একসঙ্গে দুই নৌকায় পা রাখার মত অবস্থা। 

তিনি বলেন, এভাবে পাস কোনো পাসই না। শুধু জায়গা খালি করছে, যেন আবার নতুন করে অনার্সে ভর্তি নিতে পারে। এতে আমাদের কোনো লাভ আছে মনে হয় না। বরং একই বছরে দুই বছরের পরীক্ষা কাভার করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে গেলো।

এভাবে অটোপ্রমোশনের ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মেধাশুন্য হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন দিনাজপুর সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তাকিমা রহমান বিনীতা। তিনি বলেন, আমি একজন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে কখনোই অটোপাসের পক্ষে নই। কারণ, এটা একটি শিক্ষার্থীর মেধাকে নিশ্চিতভাবে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। 

করোনা মহামারীর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জানেনই না তার ক্লাসে কোন কোন বিষয় আছে। অথচ সারাবছর না পড়ে অটোপ্রমোশন পেয়ে পরবর্তী বর্ষে উঠে যাচ্ছে, ফলে একজন শিক্ষার্থীর উন্নয়নের মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে কতদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে আর কতদিন অটোপ্রমোশন হতে থাকবে? তাই কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, অটোপ্রমোশন নয়, স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে পরীক্ষার সুযোগ করে দিন।

এছাড়াও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থায় অটোপ্রমোশন কখনোই কাম্য নয় জানিয়ে পঞ্চগড় মকবুলার রহমান সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আবু হানিফ বলেন, ব্যাপারটা অনেকটা নাই মামার থেকে, কানা মামাই ভালো। কারণ, এভাবে এক বর্ষেই সেশনজটে পড়ে না থেকে অটোপ্রমোশন কিছুটা হলেও আমাদের কষ্ট লাঘব করবে। কিন্তু অটোপ্রমোশন পেয়েও দ্বিতীয় বর্ষে আবার পরীক্ষা দিতে হবে, এই ব্যাপারটা আমাদের জন্য কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়ালো। 

তিনি আরও বলেন, একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি চাই, দ্রুত এই মহামারি কাটিয়ে মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা ফিরে আসুক।

এ বছর সিলেটের এমসি কলেজ থেকে ১৪০০ জন শিক্ষার্থী প্রথমবর্ষ থেকে দ্বিতীয়বর্ষে উত্তীর্ণ হন। তাদের মধ্যে আছেন নিশু রাণী দে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, প্রথম বর্ষে সবার সাথে গিয়ে পরীক্ষা দেবো। ভালো একটা রেজাল্ট আসবে। এমন একটা ইচ্ছা ভর্তি হওয়ার পর থেকেই কাজ করছিল। খুব ইচ্ছা ছিল ক্যাপটিকেলি পরীক্ষার পর মূল্যায়িত হবো। কিন্তু করোনার জন্য সেটি আর হয়ে উঠল না। তারপরও দেড়িতে হলেও যে দ্বিতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হয়েছি, এজন্য একটা ভালো লাগা কাজ করছে। তবে, শর্তসাপেক্ষে পাস, মেনে নিতে পারছি না।

তায়েরা, শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, অটোপ্রমোশন শুনে ভালো লাগছে কিন্তু আমরা পরীক্ষা না হওয়ার কারণে নিজেকে মূল্যায়ন করতে পারলাম না। কলেজ বন্ধ থাকায় কোনো ক্লাস হয়নি, এতে আমরা আমাদের সিলেবাস থেকে অনেকটা পিছিয়ে আছি। শর্তসাপেক্ষ শুনে আরও খারাপ লাগছে। 

ঢাকা/মাহি 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়