ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১৬ ১৪৩০

২৭০ বছরের পুরনো কান্ত জিউ মন্দিরের রাস উৎসব

নাঈম ইসলাম সংগ্রাম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:০৬, ৩ ডিসেম্বর ২০২৩  
২৭০ বছরের পুরনো কান্ত জিউ মন্দিরের রাস উৎসব

উৎসব অর্থ আনন্দ। রাস উৎসব সম্পর্কে উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে রাসলীলা বা রাস যাত্রা সনাতন ধর্মালম্বীদের একটি বাৎসরিক উৎসব। রাস মূলত শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলার অনুকরণে বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় অনুষ্ঠিত ধর্মীয় উৎসব। ভগবান কৃষ্ণের রসপূর্ণ অর্থাৎ তাত্ত্বিক রসের সমৃদ্ধ কথাবস্তুকে রাসযাত্রার মাধ্যমে জীবাত্মার থেকে পরমাত্মায়, দৈনন্দিন জীবনের সুখানুভূতিকে আধ্যাত্মিকতায় এবং কামপ্রবৃত্তিসমূহকে প্রেমাত্মক প্রকৃতিতে রূপ প্রদান করে অঙ্কন করা হয়েছে।

দিনাজপুরের কান্ত জিউ মন্দিরকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে সনাতন ধর্মালম্বীদের রাস উৎসব। আড়াইশো বছর আগে শুরু হওয়া মাসব্যাপী এ উৎসবটি কার্তিক মাসের শেষে শুরু হয়।

মন্দিরটি দিনাজপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে এবং কাহারোল উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সুন্দরপুর ইউনিয়নে এবং দিনাজপুর-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেঁপা নদীর তীরবর্তী গ্রাম কান্তনগরে অবস্থিত।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুরের তৎকালীন মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় শেষ বয়সে কাহারোল উপজেলার ঢেঁপা নদীর তীরবর্তী এলাকায় একটি মন্দির স্থাপনের ইচ্ছা করেন। তার ইচ্ছা অনুযায়ী ১৭২২ সালে এ মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিন্তু মন্দির নির্মাণের পূর্বেই তার মৃত্যু হয়। প্রাণনাথের মৃত্যুর পর তার পোষ্য পুত্র রামনাথ রায় ১৭৫২ সালে মন্দিরের নির্মাণকাজ শেষ করেন। মন্দিরটি হিন্দু ধর্মের কান্ত বা কৃষ্ণের মন্দির হিসেবে নামকরণ করা হয়। তখন থেকেই মূলত এই মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের পূজা হয়ে।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, কান্তজিউ এই মন্দিরে থাকেন নয়মাস। আর বছরের বাকি তিনমাস থাকেন দিনাজপুর শহরের রাজবাড়ী মন্দিরে।

দিনাজপুরের অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও ১৭৫২ সাল থেকে শুরু হওয়া রাস উৎসব চলছে ২৭০ বছর ধরে। শুধু রাস উৎসব নয়, কান্তজিউ মন্দিরকে ঘিরে সবকটি উৎসবেই হাজারো ভক্ত ও পূণ্যার্থীরা এখানে আসেন।

রাস উৎসবকে ঘিরে কান্তজিউ মন্দিরে কেউ আসেন মনোবাসনা পূরণে, কেউ আসেন মনোবাসনা পূরণের পর কৃতজ্ঞতা জানাতে, কেউ আসেন ঐতিহাসিক এই মন্দির দর্শনে, আবার কেউ কেউ আসেন রাস উৎসবে অংশ নিতে, কেউবা কান্তজিউ মন্দির দেখতে।

দিনাজপুরসহ আশেপাশের বিভিন্ন জেলা নীলফামারি, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, নওগাঁ, বগুড়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন আসেন এই রাস উৎসবকে উপভোগ করতে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকেও অনেকেই আসেন দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দিরে আয়োজিত রাস উৎসব উপভোগ করতে। দূর দূরান্ত থেকে আসা হাজারো মানুষ তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করে, পাশাপাশি নিজেরাই  রান্না করে খায়। অনেকে আবার তাঁবুর ব্যবস্থা করে থাকেন।

উৎসব উপলক্ষে সাজানো হয় কান্তজিউ মন্দিরকে। হাজার হাজার ভক্ত, পূণ্যার্থী ও দর্শনার্থীর ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। তাদের অধিকাংশই রাতে মন্দির এলাকায় থাকেন। ভজন, কীর্তন আর ধর্মীয় সঙ্গীতের ধ্বনিতে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় ঐতিহাসিক এই মন্দিরকে ঘিরে।

রাস উৎসবকে কেন্দ্র করে মন্দিরের বাইরের অংশে বিভিন্ন রকমের দোকানপাট বসে। দর্শনার্থীরা সেই দোকানগুলো থেকে বিভিন্ন রকমের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে থাকেন। দোকানগুলোতে বিভিন্ন রকমের মিষ্টান্ন খাবার পাওয়া যায়। যেমন- রসগোল্লা, জিলাপি, বুন্দিয়া, কটকটি, গুড়ের তৈরি খই, চিনির বাতাসা, খাগড়াই ইত্যাদি। এছাড়াও পিঁয়াজু, বারো ভাজা, চানাচুর মাখা, বাদাম, চাটনিসহ বিভিন্ন রকমের মুখরোচক খাবার পাওয়া যায়।

দর্শনার্থীরা এবং স্থানীয় লোকেরা রাস মেলা থেকে তাদের সৌখিন পণ্যও কিনে থাকেন। রাস মেলাটিতে বিভিন্ন রকমের হাতে কাজ করা নকশিকাঁথা, শাড়ি, পাঞ্জাবি, ঘরের শোভাবর্ধনকারী পণ্য পাওয়া যায়। মেলাটিতে আসবাবপত্র, তৈজসপত্র থেকে শুরু করে অনেক প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী পাওয়া যায়। এছাড়াও এখানে মাটির তৈরি বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দিত খেলনা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র পাওয়া যায়।

এখানকার স্থানীয় মানুষেরা অগ্রহায়ণ মাসের ধান ঘরে তুলে তাদের অনেক প্রয়োজনীয় কেনাকাটাও এই মেলা থেকেই সেরে ফেলেন।

আপনারও চাইলে রাস উৎসব দেখতে চলে আসতে পারেন দিনাজপুরের কান্ত জিউ মন্দিরে। রাস উৎসব দেখা উপলক্ষে দেখে নিতে পারবেন দিনাজপুর দর্শনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

/মেহেদী/

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়