নোবিপ্রবিতে ছাত্ররাজনীতির হালচাল
মো. শফিউল্লাহ, নোবিপ্রবি সংবাদদাতা || রাইজিংবিডি.কম
মো. শফিউল্লাহ
দুই দশক পূর্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) আবারো আলোচনায় এসেছে ছাত্ররাজনীতির বিষয়টি। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে, নাকি সহাবস্থানভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পথ খুলবে; তা নিয়েই চলছে আলোচনা।
২০০৬ সালে দেশের ২৭ তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও পঞ্চম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে নোবিপ্রবি। নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার দুই দশক পূরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
আবাসন সংকট, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণাগারের অভাব, শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক সংকট এবং পরিবহন সীমাবদ্ধতাসহ নানা সমস্যার মধ্যেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে অবস্থান, গবেষণা প্রকাশনা বৃদ্ধি এবং স্কোপাস ইনডেক্স জার্নালে প্রকাশনার ক্ষেত্রে অগ্রগতি নোবিপ্রবিকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে।
তবে, বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও ব্যতিক্রমধর্মী সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ রাখা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে তৎকালীন প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণির অংশীজনের আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ২০ বছর আনুষ্ঠানিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকবে। এর উদ্দেশ্য ছিল সংঘাতমুক্ত, আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
আগামী জুনে সেই ২০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর কার্যক্রম সক্রিয় ছিল এবং বর্তমানে তা আরো দৃশ্যমান। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—নোবিপ্রবিতে কি এখন আনুষ্ঠানিক ও সহাবস্থানভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির পরিবেশ তৈরি হওয়া উচিত, নাকি বর্তমান নিষেধাজ্ঞাই বহাল রাখা প্রয়োজন?
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও যখন রাজনৈতিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখা সম্ভব হয়নি, তখন নিয়ন্ত্রিত, সহাবস্থানভিত্তিক ও শিক্ষাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর প্রত্যাশা, রাজনৈতিক চর্চা যেন সহিংসতা, পেশিশক্তি ও ভয়ভীতির সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে।
বর্তমানে ক্যাম্পাসে সক্রিয় বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রমে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় দিকই পরিলক্ষিত হচ্ছে। নোবিপ্রবি ছাত্রদল ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন, অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের টিউশনের ব্যবস্থা, বইমেলায় ব্যতিক্রমধর্মী অংশগ্রহণ এবং ভর্তি পরীক্ষার্থীদের সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের প্রশংসা অর্জন করেছে। একইসঙ্গে সংগঠনটির কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, হেনস্তা ও সহিংসতার অভিযোগও উঠেছে, যা তাদের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
অন্যদিকে, ছাত্রশিবির সারা বছর বিভিন্ন শিক্ষার্থী কল্যাণমূলক ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করেছে বলে অনেকের ধারণা। তবে, দীর্ঘদিনেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ না করায় সংগঠনটি সমালোচনার মুখেও রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীর প্রশ্ন, সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও নেতৃত্ব কাঠামো প্রকাশে অনীহা কেন রয়ে গেছে।
ছাত্রশক্তি ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলন এখনো ক্যাম্পাসে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও তাদের বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষার্থীসংক্রান্ত কার্যক্রম ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের নজরে আসছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করছে, সুস্থ ধারার রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে এসব সংগঠনও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে নোবিপ্রবির বর্তমান বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ইতিবাচক প্রতিযোগিতার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে কিনা; নাকি অতীতের মতো সংঘাত, পেশিশক্তি ও অস্থিতিশীলতার রাজনীতি আবারো ফিরে আসে।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যেন ক্ষমতার প্রদর্শনের পরিবর্তে শিক্ষা, গবেষণা, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও শিক্ষার্থীকল্যাণকে প্রতিযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করে। জুলাই আন্দোলনে যেমন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি লক্ষ্য অর্জনের বার্তা দিয়েছিল, তেমনি নোবিপ্রবিতেও সব ছাত্রসংগঠন শিক্ষাবান্ধব ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে— এমন প্রত্যাশাই এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
ঢাকা/জান্নাত
হামে আরো ৮ শিশুর মৃত্যু