ট্রাম্প-জিনপিংয়ের বৈঠকে গুরুত্ব পাবে যেসব ইস্যু
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে যোগ দিতে বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। ইরানকে পুনরায় শান্তি আলোচনায় ফিরিয়ে আনা ও হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চীনকে রাজি করানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক সপ্তাহের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বুধবার (১৩ মে) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল-জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের পর এটিই হবে ট্রাম্পের প্রথম চীন সফর। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দুই দেশের এই শীর্ষ নেতারা বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বৈঠকে বসবেন বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে যে, এই আলোচনায় বাণিজ্য, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ট্রাম্প-শি সম্মেলন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাণিজ্য, প্রযুক্তি, তাইওয়ান এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যেই বেজিংয়ে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ গত প্রায় এক দশকের মধ্যে ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি চীন সফর করছেন। এই বছরের শুরুর দিকে বৈঠকটি হওয়ার কথা থাকলেও ইরান যুদ্ধের কারণে তা পিছিয়ে গিয়েছিল।
বেজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে ট্রাম্প বলেন, তিনি এবং শি ইরান নিয়ে ‘দীর্ঘ আলোচনা’ করবেন, তবে তিনি এটিও জোর দিয়ে বলেন যে, বাণিজ্যের বিষয়টিই এই সফরের মূল কেন্দ্রে থাকবে।
লাইডেন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক সালভাদর সান্তিনো রেজিলমে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “বাণিজ্য রাজনৈতিকভাবে খুবই শক্তিশালী, বিশেষ করে ট্রাম্পের জন্য; কারণ এটি এমন একটি ভাষা যা সাধারণ ভোটাররা সহজেই বুঝতে পারে। তবে এর গভীর লড়াইটি আসলে বৈশ্বিক ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব, বৈধতা ও ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে।”
বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইস্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে-
প্রযুক্তি বনাম বিরল মৃত্তিকা
সেমিকন্ডাক্টর এবং খনিজ সম্পদের সরবরাহ নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের মধ্যে চলমান লড়াইয়ের কারণে প্রযুক্তি ও সরবরাহ শৃঙ্খল এই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হতে যাচ্ছে।
চীন যেন তাদের সামরিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন দ্রুততর করতে না পারে, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র উন্নত চিপ ও চিপ তৈরির সরঞ্জাম রপ্তানির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। অন্যদিকে, বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ বিরল মৃত্তিকা শোধনের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে, যা সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরির জন্য অপরিহার্য। মার্কিন পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় চীন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
এই সম্মেলনে বেজিং চাইবে যুক্তরাষ্ট্র যেন প্রযুক্তির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে ওয়াশিংটন চাইবে চীন যেন পুনরায় খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা সরবরাহ শুরু করে, কারণ এই সংকটে মার্কিন গাড়ি ও মহাকাশ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি
এই সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হতে পারে ইরান যুদ্ধ। বিশ্লেষকদের ধারণা, ওয়াশিংটন বেইজিংকে তেহরানের ওপর প্রভাব খাটানোর জন্য চাপ দেবে। এর কারণ হলো, চীন ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা- তারা ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনে থাকে। এছাড়া মার্কিন কর্মকর্তারা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় উন্মুক্ত ও নিরাপদ করার প্রচেষ্টায় চীনের সমর্থন চেয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত চীনের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছে। চীনের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তাই পারস্য উপসাগরে অস্থিরতা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হামলার ঝুঁকিতে ফেলছে।
স্টিমসন সেন্টারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি রিফর্ম প্রোগ্রামের পরিচালক ড্যান গ্রেজিয়ার আল-জাজিরাকে বলেন, “আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, ট্রাম্প অন্তত শি জিনপিংকে দিয়ে ইরানিদের ওপর চাপ দেওয়ার চেষ্টা করবেন, যাতে তারা আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে ও একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে রাজি হয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান ইস্যুটি এমন একটি ক্ষেত্র হতে পারে যেখানে দুই দেশের স্বার্থ এক বিন্দুতে মিলেছে, কারণ উভয় দেশই উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি প্রবাহ সচল রাখতে চায়।
সিএসআইএস-এর সিনিয়র ফেলো গ্রেগরি পোলিং আল-জাজিরাকে বলেন, “উভয় পক্ষই চায় প্রণালিটি উন্মুক্ত থাকুক।” তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে, তেহরান ইস্যুতে বেইজিং সম্ভবত সরাসরি ওয়াশিংটনের পথে হাঁটবে না। পোলিংয়ের মতে, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার ফলে সৃষ্ট কূটনৈতিক ও কৌশলগত চাপ চীনের চেয়ে ওয়াশিংটনের ওপরই বেশি পড়ছে। তার ভাষায়, “হরমুজ প্রণালিতে চীন অপমানিত হচ্ছে না... হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।”
তাইওয়ান সংকট
তাইওয়ান ইস্যুটি এই সম্মেলনের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয় হতে যাচ্ছে। বেইজিং বারবার সতর্ক করে বলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটিই উত্তেজনার সবচেয়ে বড় উৎস।
চীন এই স্বশাসিত দ্বীপটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্বীপটির চারপাশে নিয়মিত বিমান ও নৌ মহড়া চালিয়ে চীন সামরিক চাপ বৃদ্ধি করেছে।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই চিং-তে-এর অধীনে উত্তেজনা আরো বেড়েছে। চিং-তে সরকার তাইওয়ানকে একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে মনে করে।
যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট শাসিত মূল ভূখণ্ডকে ‘চীন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’-এর অধীনে তাইওয়ানের আত্মরক্ষায় সহায়তা করতে আইনত বাধ্য। গত বছর ট্রাম্পের ঘোষিত ১১ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজসহ বিগত বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে কয়েক হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে। ট্রাম্প সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, সম্মেলনের আগে তিনি শির সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্মেলনের পর প্রতিরক্ষা ও অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে ট্রাম্প ও শি জনসমক্ষে কী বলেন, সেদিকে তাইওয়ান তীক্ষ্ণ নজর রাখবে। অধ্যাপক রেজিলমে বলেন, “এখানে প্রতিটি শব্দের প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।” তাইওয়ান আশঙ্কা করছে যে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার বড় কোনো ভূ-রাজনৈতিক চুক্তির বলি হতে পারে তারা।
শুল্ক
দীর্ঘদিন ধরে চলা বাণিজ্য সংঘাত ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে ‘ট্যারিফ’ বা শুল্ক নিয়ে আলোচনা বেশ কঠিন হতে পারে।
গত বছর ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করলে বাণিজ্য যুদ্ধ তীব্র হয়। চীনও এর পাল্টা জবাব দেয়। উত্তেজনার একপর্যায়ে কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়ায় আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশ একটি ‘বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতি’তে সম্মত হয়। সেই চুক্তির অংশ হিসেবে চীন আরো বেশি মার্কিন কৃষিপণ্য (যেমন সয়াবিন) কিনতে রাজি হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র কিছু শুল্ক কমিয়ে দেয়।
ট্রাম্প এবং শি-র জন্য ‘সফল’ ফলাফল কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের জন্য সাফল্য হবে এমন কিছু যা দৃশ্যমান ও দেশের রাজনীতিতে ‘বিজয়’ হিসেবে প্রচার করা সহজ। যেমন- চীনের মার্কিন পণ্য কেনা, শুল্ক কমানো, ইরান ইস্যুতে সহযোগিতা অথবা বিরল মৃত্তিকা রপ্তানিতে অগ্রগতি।
রেজিলমে বলেন, “ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘চুক্তি করার প্রকাশ্য প্রদর্শনী’র ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। তাই সাফল্যের সারমর্মের চেয়েও সেটি দেখতে কতটা সফল মনে হচ্ছে, তা তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।”
অন্যদিকে, শি জিনপিংয়ের জন্য সাফল্য হবে ওয়াশিংটনের কাছে মাথা নত না করে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং চীনের বিশ্বশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করা।
রেজিলমের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং শুল্ক স্থগিত রাখা বা নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য কেনার মতো একটি সীমিত চুক্তি হতে পারে। এটি সাময়িকভাবে উত্তেজনা প্রশমন করলেও গভীরতর সমস্যাটি অধরাই থেকে যাবে- ‘দুই দেশের অর্থনীতি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু উভয় দেশের সরকারই এখন সেই নির্ভরশীলতাকে একটি কৌশলগত বিপদ হিসেবে দেখছে’।
ঢাকা/ফিরোজ
হামে আরো ৮ শিশুর মৃত্যু