ঢাকা     বুধবার   ১৩ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ৩০ ১৪৩৩ || ২৫ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

রয়টার্সের প্রতিবেদন

ইরানের ভূখণ্ডে ‘গোপন’ হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৫৮, ১৩ মে ২০২৬   আপডেট: ১২:০৭, ১৩ মে ২০২৬
ইরানের ভূখণ্ডে ‘গোপন’ হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধচলাকালীন সৌদি আরবের ওপর হওয়া হামলার প্রতিশোধ নিতে রিয়াদ ইরানের ভূখণ্ডে বেশ কিছু অঘোষিত হামলা চালিয়েছে। বুধবার (১৩ মে) দুজন পশ্চিমা কর্মকর্তা ও দুজন ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এই সৌদি হামলাগুলো আগে কখনো জনসমক্ষে আসেনি। এটিই প্রথমবারের মতো জানা গেল যে, সৌদি আরব সরাসরি ইরানি ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান চালিয়েছে।

আরো পড়ুন:

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরব তার নিরাপত্তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হলেও, সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে দেশটি এখন সরাসরি তার প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে মোকাবিলা করতে দ্বিধা করছে না।

পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, সৌদি বিমান বাহিনী এই হামলাগুলো মার্চ মাসের শেষের দিকে চালিয়েছিল। একজন কর্মকর্তা একে ‘সৌদি আরবে হামলার বিপরীতে সমানুপাতিক প্রতিশোধমূলক হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রয়টার্স নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলো নিশ্চিত করতে পারেনি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরাসরি হামলার বিষয়টি স্বীকার করেননি। ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

পাল্টা আঘাত শুরু করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো

প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবের এই হামলাগুলো সংঘাতের ব্যাপকতা ও যুদ্ধের গভীরতা ফুটিয়ে তোলে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরু করে, তখন থেকেই এই যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যা আগে কখনো প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়নি।

মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর থেকে ইরান ছয়টি জিসিসি দেশের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। তারা কেবল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নয়, বরং বেসামরিক এলাকা, বিমানবন্দর ও তেল শোধনাগারেও আঘাত হানে। এছাড়া বিশ্ববাণিজ্য ব্যাহত করতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।

গত সোমবার (১১ মে) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানে সামরিক হামলা চালিয়েছে। সৌদি ও আরব আমিরাতের এই যৌথ পদক্ষেপগুলো যুদ্ধের এমন এক রূপ উন্মোচন করে যা এতদিন আড়ালে ছিল- যেখানে ইরানি হামলার শিকার হওয়া উপসাগরীয় দেশগুলো পাল্টা আঘাত করা শুরু করেছে।

তবে দুই দেশের কৌশল এক ছিল না। সংযুক্ত আরব আমিরাত আরো কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তারা তেহরানের সঙ্গে খুব কমই কূটনৈতিক আলোচনা করেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করেছে ও তেহরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলেন, “আমরা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে উত্তেজনা হ্রাস ও ধৈর্য ধারণের পক্ষে আমাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করছি।”

হামলা ও এরপর উত্তেজনা প্রশমন

রয়টার্সকে ইরানি ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার বিষয়ে সৌদি আরব আগে ইরানকে সতর্ক করেছিল। এর পরপরই নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা ও সৌদির পক্ষ থেকে আরো বড় প্রতিশোধের হুমকির মুখে দুই দেশ উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ-এর ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজ বলেন, “সৌদি আরবের প্রতিশোধমূলক হামলা ও এরপর উত্তেজনা প্রশমনের সমঝোতা এটিই প্রমাণ করে যে, উভয় পক্ষই বুঝতে পেরেছে অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের চড়া মূল্য দিতে হবে।”

তিনি আরো যোগ করেন, এই ঘটনাগুলো বিশ্বাস নয়, বরং একটি অভিন্ন স্বার্থের প্রতিফলন- যাতে যুদ্ধ আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ না নেয়। গত ৭ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হওয়ার এক সপ্তাহ আগে এই অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা কার্যকর হয়।

সৌদি আরবে সরাসরি হামলা কমিয়েছে ইরান

রয়টার্সকে পশ্চিমা সূত্রগুলো জানিয়েছে, মার্চ মাসের শেষ নাগাদ সৌদি আরবের কূটনৈতিক তৎপরতা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কঠোর হওয়ার হুমকির ফলে ইরান সরাসরি হামলা কমিয়ে দেয়।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২৫-৩১ মার্চের মধ্যে সৌদি আরবে ১০৫টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল, যা ১-৬ এপ্রিলের মধ্যে কমে মাত্র ২৫টিতে দাঁড়ায়। পশ্চিমা সূত্রগুলোর মতে, বড় ধরনের যুদ্ধবিরতির ঠিক আগে সৌদি আরবে ছোড়া প্রজেক্টাইলগুলো ইরান থেকে নয়, বরং ইরাক থেকে ছোড়া হয়েছিল। এর অর্থ হলো, ইরান সরাসরি হামলা বন্ধ করলেও তাদের অনুগত গোষ্ঠীগুলো হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল।

গত ১২ এপ্রিল ইরাকের মাটি থেকে হওয়া হামলার প্রতিবাদে সৌদি আরব ইরাকি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে। এপ্রিলের ৭-৮ তারিখেও সৌদি আরবের ওপর ৩১টি ড্রোন ও ১৬টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে, যার ফলে রিয়াদ আবারো পাল্টা হামলার কথা বিবেচনা করেছিল। সেই সময় পাকিস্তান সৌদি আরবের নিরাপত্তায় যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আলোচনার আহ্বান জানায়।

সৌদি মালিকানাধীন ‘আরব নিউজ’-এ এক নিবন্ধে সাবেক সৌদি গোয়েন্দা প্রধান প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল দেশটির কৌশল ব্যাখ্যা করে লিখেছেন, “যখন ইরান ও অন্যান্য পক্ষগুলো সৌদি আরবকে ধ্বংসের আগুনে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন আমাদের নেতৃত্ব নাগরিকের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় প্রতিবেশীর দেওয়া কষ্ট সহ্য করাকেই বেছে নিয়েছিল।”

ঢাকা/ফিরোজ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়