নির্বাচন-পরবর্তী রাবি: সংঘাত নয়, রাজনীতিতে সহাবস্থান চান ছাত্রনেতারা
ফাহমিদুর রহমান ফাহিম, রাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকবদলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) বরাবরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আন্দোলন-সংগ্রামে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সর্বশেষ জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের রাজনীতিতে ক্যাম্পাসগুলোর ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জাতীয় স্বার্থে আন্দোলনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলোর দখলদারিত্ব, আধিপত্য বিস্তার এবং সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। হল দখল, সিট বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও সংঘর্ষের কারণে বহুবার অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও এ বাস্তবতার বাইরে নয়। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতায় এখানে অন্তত ৩৩ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। নিহতদের মধ্যে ছাত্রশিবিরের ১৬ জন, ছাত্রলীগের সাতজন, ছাত্রদলের দুজন এবং প্রগতিশীল (বাম) সংগঠনের চারজন রয়েছেন।
তবে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাবি ক্যাম্পাসে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। বর্তমানে ক্যাম্পাসে আগের মতো প্রকাশ্য সহিংসতা, শোডাউন, মিছিল কিংবা হলের সিট দখলের চিরচেনা দৃশ্য তেমন দেখা যাচ্ছে না।
বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এখন সংঘাতনির্ভর ও পেশিশক্তির রাজনীতির পরিবর্তে ক্যাম্পাসের সার্বিক উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক সহাবস্থান নিশ্চিত করার বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তাদের মতে, “অতীতের সহিংসতার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার এখনই সময়।”
বর্তমানে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে দখলদারিত্বের পরিবর্তে ছাত্রসংসদ (রাকসু) কার্যকর করা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মতো মৌলিক দাবিগুলো সামনে আসছে। ছাত্রনেতারা মনে করছেন, এ ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলে রাবি একটি স্থিতিশীল ও সহাবস্থানের আদর্শ শিক্ষাঙ্গনে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন রাবি শাখার সদস্য সচিব ওয়াজিদ শিশির অভি বলেন, “নব্বই দশকের পর থেকে ক্ষমতাসীন দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলো অনেক ক্ষেত্রে মূল দলের ‘পেটোয়া বাহিনী’ হিসেবে কাজ করেছে। ফলে ছাত্ররাজনীতি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা হারিয়ে ক্যাডারভিত্তিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়। তবে, সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পর এ প্রবণতা কিছুটা কমেছে, যদিও অনেক সংগঠন এখনো কেন্দ্রীয় সংগঠনের ওপর নির্ভরশীল।”
তিনি আরো বলেন, “নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাস স্থিতিশীল রয়েছে। ভ্রাতৃত্বপূর্ণ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা, ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার এবং জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে তারা কাজ করতে চান।”
বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) রাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মিশুক চাকমা বলেন, “সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরিবর্তন বাংলাদেশের পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তবে, এসব পরিবর্তন কতটা শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, “সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার—যেমন ধর্মীয় উপকরণ অবমাননা, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও অপহরণ, তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।” সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের রাবি শাখার আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, “নির্বাচনের পরও ক্যাম্পাসে ইতিবাচক পরিবেশ বজায় আছে। অতীতের মতো সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব বা শোডাউন রাজনীতি এখনো দেখা যায়নি। তবে, রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও কয়েক মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি তেমন চোখে পড়েনি।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার বুলিংয়ের ঘটনাও কিছুটা কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ছাত্র অধিকার পরিষদের রাবি শাখার সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, “জুলাই-পরবর্তী সময়ে যে সহাবস্থানের রাজনীতি শুরু হয়েছিল, তা এখনো বহাল রয়েছে। হল দখল বা সিট বাণিজ্যের মতো ঘটনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।” ছাত্রসংসদকে কার্যকর রাখা এবং বড় সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ একটি স্থিতিশীল ক্যাম্পাস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।
রাবি শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল মিঠু বলেন, “আগে বিরোধী সংগঠন হিসেবে তারা চাপে ছিলেন, তবে এখন দায়িত্ব বেড়েছে। সহাবস্থান নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্বের অংশ।”
তিনি দাবি করেন, সিট বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি বা শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের কোনো অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে নেই এবং বর্তমানে ক্যাম্পাস আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি নিরাপদ।” তবে, স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, “অতীতে যে দখলদারিত্ব ও সহিংসতার সংস্কৃতি দেখা গেছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এ ধরনের রাজনীতির আর কোনো জায়গা থাকা উচিত নয়।”
তিনি আরো বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চা ও মুক্তচিন্তার স্থান। এখানে সহিংসতার পরিবর্তে সহাবস্থান, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।” একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সব ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ঢাকা/জান্নাত
নিখোঁজ পাইলটকে উদ্ধারে আসা মার্কিন বিমান ধ্বংসের দাবি ইরানের